উপস্থাপক আনিসুল হক ও শেষ টিভি অনুষ্ঠান

Send
জুবায়ের বাবু
প্রকাশিত : ১৬:০১, ডিসেম্বর ০২, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:০৪, ডিসেম্বর ০২, ২০১৭

জুবায়ের বাবু১৯৯৯ সালের মাঝামাঝি, একুশে টেলিভিশনের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইমন ড্রিং-এর বাসায় প্রায়ই আড্ডা জমে একুশের স্বপ্ন নিয়ে। আর সেই আসরে মাঝে মাঝে হাজির হতেন আনিসুল হক। তখনও পথের অনেক বাকি। আমাদের সমস্ত ভাবনা জুড়ে একটি নতুন টেলিভিশন, একটি নতুন সংকল্প। সেই থেকে কী করে যেন খুব আপন হয়ে যাই এই সদা হাস্যোজ্জ্বল মানুষটির সঙ্গে। টুকটাক নানা অনুষ্ঠান নির্মাণ শুরু তখন থেকেই। একদিন আড্ডার এক ফাঁকে সাইমন আমাকে বললেন, কী? তোমার পরবর্তী অনুষ্ঠানের উপস্থাপক পেয়ে গেলে নাকি? সঙ্গে সঙ্গে আনিস ভাইয়ের স্বভাব সুলভ হাসি। আর আমি ভাবছি আসলেইতো তাই, আনিস ভাইকে নিয়ে অনুষ্ঠান করতে পারলে তো কোনও কথাই নেই, যদি তিনি রাজি হন।
ভাবনাটা ভাবনায় রয়ে গেলো অনেক দিন। ২০০২ সালের কোরবানির ঈদ। আমার ওপর দায়িত্ব পড়লো একুশের প্রথম ঈদের বিশেষ ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান নির্মাণের। তখন আমি আমার সাপ্তাহিক অনুষ্ঠানগুলো নিয়ে হিমশিম খাচ্ছি। তারপর ঈদের বিশেষ অনুষ্ঠান হিসাবে আরও ৬টা নতুন অনুষ্ঠান তৈরি করছি। এর ওপর ঈদের মূল অনুষ্ঠান? প্রথমে রাজি ছিলাম না। কিন্তু সাইমন ড্রিংয়ের পীড়াপীড়িতে ঈদের মাত্র একমাস আগে রাজি হই। অনুষ্ঠানের একটা থিম দাঁড় করাই। নাম দেই ‘ঈদের ঢোল’, তখনও বুঝতে পারিনি যে কী বড় একটা দায়িত্ব আমি কাঁধে নিয়েছি। ড. রুমেন রায়হানকে নিয়ে চমৎকার একটা টিম তৈরি করি। শুরু হয় আমাদের টিমের দৌড়-ঝাঁপ। কখনও প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদের বাসায়, কখনও অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের কাছে কিংবা উম্মাদ পত্রিকার সম্পাদক আহসান হাবীব ভাইয়ের সঙ্গে আড্ডা। উদ্দেশ্য একটাই, সবার কাছ থেকে রসদ সংগ্রহ করা। প্রাথমিক একটা পরিকল্পনা দাঁড় করাই। বাজেট শুনে একুশের সহকারী ব্যবস্থাপনা পরিচালক জনাব ফরহাদ মাহমুদের হার্ট ফেইল হওয়ার জোগাড়। অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধান নওয়াজেশ আলী খানও খুব বেশি ভরসা করতে পারছেন না, কারণ তার আগে আমি কখনোই এ ধরনের অনুষ্ঠান নির্মাণ করিনি। একুশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট। কিন্তু আমার অনড় অবস্থানের কারণে তা পাস হয়ে যায়। সমস্যার শুরু সেদিন থেকেই।  কারণ আমি অনুষ্ঠান প্রস্তাবনায় অনুষ্ঠান সম্পর্কে মাত্র দুইলাইন লিখেছি এমন কী উপস্থাপক হিসাবে কারও নামও প্রস্তাব করিনি। আমার ওপর সাইমনের অগাধ আস্থা। তাই অনুষ্ঠান পাস। সাইমন বার বার ঘুরে ফিরে একটাই প্রশ্ন করে, উপস্থাপক কে? আর এই প্রশ্নের উত্তর আমিও খুঁজে বেড়াচ্ছি। সাইমন অবশ্য তৎকালীন জনপ্রিয় উপস্থাপক হানিফ সংকেতের নাম আমার কানের কাছে জপে যাচ্ছে। কিন্তু আমার এই অনুষ্ঠানের সঙ্গে কোনোভাবেই ওনাকে মিলাতে পারছিলাম না। হঠাৎ করে আনিস ভাইয়ের কথা মনে পড়লো। তখন দুপুর, গাড়িটা নিয়ে সোজা মতিঝিলে আনিস ভাইয়ের ব্যবসায়িক অফিসে। উনি তখন দুপুরের খাবার খাচ্ছিলেন। আমার কথা শুনে রুমে ঢুকতে দিলেন। প্রথম প্রশ্নই ছিল, ‘জুবায়ের, খেয়েছো কিছু?’ না আনিস ভাই। ‘এসো শেয়ার করি’।

খেতে খেতেই বললাম আসল কথা, শুনে আনিস ভাই হো হো হো করে হেসে উঠলেন। আমি তো হাসির ধরন দেখে বুঝে গেলাম, আনিস ভাই করবেন না। আনিস ভাই বললো, ‘সবিনয়ে জানতে চাই’র মতো অনুষ্ঠানের পর উনি আর কোনও অনুষ্ঠান করতে চান না। উপস্থাপনা থেকে উনি অবসর নিয়েছেন। এখন শুধু ব্যবসা আর ব্যবসা। আমি হাল ছাড়লাম না, বললাম, ঠিক আছে, আপনি না করলেন, কিন্তু আমার অনুষ্ঠানের মূল ভাবনাটাতো শুনবেন? আনিস ভাই কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,  ঠিক আছে, সন্ধ্যায় কাজ সেরে বাসায় চলে আসো।

অফিসে ঢুকেই সাইমনকে জানালাম। সাইমনতো মহা খুশি। আমি সন্ধ্যায় বাসায় যাবো শুনে সাইমন বললো, রাতে দেখা হবে। সাইমন ছিলেন আনিস ভাইয়ের পারিবারিক বন্ধু। সুতরাং সাইমন এলে তো ভালোই হয়। সন্ধ্যা ৭ টার কিছু পরে আমি গিয়ে উপস্থিত হয় বনানীর বাসায়। বাড়ির বেইজমেন্টে ছিল আনিস ভাইয়ের এক নিজস্ব জগৎ। পরিপাটি করে সাজানো গোছানো সবকিছু। চায়ের পর্ব সেরেই বললো, বলো, এখন শোনা যাবে। আমি অনুষ্ঠানটি সম্পর্কে বললাম, যতটা গুছিয়ে বলা যায়।  কিন্তু আনিস ভাইয়ের একটু এলার্জি ছিল ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের বিষয়ে। আমি ওনাকে আশ্বস্ত করলাম এই অনুষ্ঠান ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের নামে ভ্যারাইটি শো হবে না। সত্যিকারের ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান নির্মাণ করতে চাই, যেখানে সমস্ত অংশগুলো একটা নির্দিষ্ট বিষয়ে এগিয়ে যাবে। অনুষ্ঠানের একটা থিম আছে আর তা হলো–দেশপ্রেম। আনিস ভাই বললেন, ঈদের ম্যাগাজিনে দেশপ্রেম? বাহ্ ভালোইতো। সিরিয়াস অংশগুলো নিয়ে তাঁর একটু সন্দেহ ছিল, কিন্তু আমি তাকে বললাম, ঈদের দিন, মানুষের মন থাকে হাসিখুশি, একদম ফুরফুরা, এমন দিনেইতো সিরিয়াস কিছু বলা যায়। নরম মনে আঁচড় কাটে বেশি। আমার কথা মেনে নিয়ে রাজি হয়ে গেলেন। আমার মাথা থেকে যেন পাহাড় সরে গেলো। রাত ১০টার পর সাইমন এসে সব শুনে আনিস ভাইকে বললো, আমি নিশ্চিত তুমি অনুতাপ করবে না।

আনিস ভাইকে উপস্থাপক পেয়ে সবচেয়ে বেশি উত্তেজিত ছিল আমার দুই সহকারী পরিচালক আলমগীর হোসেন আর মনো আলম। তাই তাদের খুশির মাত্রাটাও ছিল দেখার মতো। তারা দু’জন কথার আগেই ছুটতেন। পুরো অনুষ্ঠানটির আয়োজনে তাই কমতি ছিল না কোনও কিছুর। কাজের গতি বেড়ে গেলো। কিন্তু আমি বারবার একটা কথাই ভাবছি, আনিস ভাইয়ের মতো একজন ব্যস্ত মানুষকে নিয়ে আমি কি ভুল করলাম? আবার এত ভালো একজন উপস্থাপকের বিকল্পও তো নেই। কিন্তু আমাকে অবাক করে ঘণ্টায় ঘণ্টায় ফোন দিতে লাগলেন আনিস ভাই। এই অংশটা কেমন হবে? ওই অংশটা কেমন হবে? আমি কোন ড্রেসটা পরবো? টাইটা নীল হবে নাকি লাল হবে? প্রতি রাতে টিম নিয়ে হাজির হয়ে যাই আনিস ভাইয়ের বনানীর বাসায়। আনিস ভাই তার সমস্ত কাজকর্ম ফেলে আমাদের সঙ্গে বসে থাকেন আর মাঝে মাঝে ফোড়ন কাটেন। কথার জাদুতে আমরা মন্ত্র মুগ্ধের মতো তাকিয়ে থাকি। আমি আর ড. রুমেন রায়হান উপস্থাপনার অংশটুকু ঠিক তার কথা বলার মতো করেই লিখার সিদ্ধান্ত নিলাম। যেহেতু কোরবানির ঈদ, তাই গরু নিয়ে মজার কিছু করার কথা ভাবছি।  অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার এবং গরু নিয়ে আমার একটা বিশেষ পরিকল্পনার কথা বলতেই আনিস ভাইয়ের ঘর কাঁপিয়ে সে কী হাসি। অথচ এই হাসির ঠিক পেছনেই যে লুকিয়ে আছে এক মহাকাশ কষ্ট, তা একবারের জন্যও আমাদের বুঝতে দেননি। তখন ওনার এক ছেলে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন আছে সুদূর যুক্তরাষ্ট্রে। যে কোনও সময় আসতে পারে এক ভয়াবহ মৃত্যু সংবাদ। তাই ওনাকে তখন প্রায়ই দৌড়াতে হতো আমেরিকায়। কিন্তু এত কষ্ট বুকে চেপে আমাদের সঙ্গে পুরো পরিকল্পনায় মেতে ছিলেন সারাক্ষণ।

শুটিং শুরু হলো ‘ঈদের ঢোল’-এর। প্রথম দিনে অনুষ্ঠান শুরুর একটা অংশ, যেখানে অংশগ্রহণ করেছিল ১০০ ঢোল বাদক। আনিস ভাই দেখে অবাক। আর আমি অবাক আনিস ভাইকে দেখে। বিস্ময়ে লক্ষ্য করলাম, স্কুলের ছাত্রের মতো স্ক্রিপ্ট হাতে নিয়ে সারাক্ষণ পড়ছেন আনিস ভাই। ঠিক যেভাবে পরীক্ষার আগে আমরা পড়তাম। তখন বুঝতে পারলাম তিনি কেন এত সফল জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে। প্রচণ্ড ক্যামেরা সচেতন ছিলেন আনিস ভাই। মাঝে মাঝে এসে ফুটেজ দেখে যেতেন। আমি বিরক্ত হলে তিনি তার স্বভাব সুলভ একটা হাসি দিয়ে চলে যেতেন। যেহেতু উপস্থাপনার কাজটা আলাদা করে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে শুটিং করা, তাই মাঝে মাঝে একটু বুঝতে সমস্যা হতো পুরো বিষয়টি আঁচ করতে। কিন্তু আমার ওপর তার ভরসা ছিল।  তাছাড়া বিটিভি’র মতো যে আমাদের স্টাইল নয়, তা তিনি বুঝতেন। অনুষ্ঠানের শেষ অংশে ছিল একজন মুক্তিযোদ্ধার মাকে নিয়ে, যিনি মুক্তিযুদ্ধে তার সন্তান হারিয়ে গত ২৫ বছর ধরে ভিক্ষা করছেন ফার্মগেট এলাকায়। কিন্তু এই পর্বের উপস্থাপনার অংশটি ধারণ করতে গিয়ে দেখি উনি কাঁদছেন। বার বার স্ক্রিপ্টা পড়ছেন আর কাঁদছেন। আমি সবাইকে বললাম, আজ থাক, এই অংশটা কাল করবো। আমি স্টুডিও’র বাইরে দাঁড়িয়ে আছি, ভাবছি, হাতে সময় একদম নেই। কয়েকদিনের মাঝেই অনুষ্ঠানটির শুটিং শেষ করে এডিটিংয়ে চলে যেতে হবে। হঠাৎ আনিস ভাইয়ের হাতটা কাঁধে পড়তেই ফিরে তাকালাম। আনিস ভাই বললেন, ‘চলো, টেক করে ফেলি’। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলাম, একটা মানুষ কাজের প্রতি কতটা অনুরক্ত হতে পারে। ৪ দিনে স্টুডিওর কাজ শেষ। প্রতিদিন শুটিং শেষ করার পরে রাতে আবার ফোন করতেন। আচ্ছা আমার এই কথাটা এভাবে বললে ভালো হতো না, কিংবা এখানে হাসিটা মনে হয় একটু বেশি হয়ে গেলো, চলতো চুল চেরা বিশ্লেষণ।

এভাবেই আনিস ভাইয়ের হাসি আর অনুপ্রেরণায় মাত্র ১২ দিনেই শেষ হয় ঈদের ঢোলের কাজ। আনিস ভাইয়ের উপস্থাপনার সবচেয়ে বড় গুণ হলো, তিনি যা বলতেন তা মন থেকে বলতেন এবং তিনি তা বিশ্বাস করতেন।

মনে পড়ে, উপস্থাপক হিসাবে আনিস ভাইকে একুশে টেলিভিশনের পক্ষ থেকে পারিশ্রমিক হিসাবে দিয়েছিলাম ১০১ টাকার একটি শুভেচ্ছা চেক, যা তিনি সযত্নে আগলে রেখেছিলেন। কিন্তু একটিবারও ভাবিনি যে এই ‘ঈদের ঢোল’-ই হবে আনিস ভাইয়ের টেলিভিশনে শেষ উপস্থাপনা। অনুষ্ঠানের শেষ অংশে যেভাবে কাঁদিয়ে ছিলেন পুরো বাংলাদেশকে, ঠিক সেভাবে সবাইকে কাঁদিয়ে তিনি নিজেই চলে গেলেন অন্য এক জগতে। তিনি আর সেই হাসি আর হাসবেন না ক্যামেরার সামনে, কথার সম্মোহনী শক্তিতে স্তব্ধ করে রাখবেন না গোটা বাংলাদেশকে।

লেখক: নির্মাতা

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ