তারেক রহমানের নাগরিকত্ব বিতর্ক

Send
মো. জাকির হোসেন
প্রকাশিত : ১৪:২৭, এপ্রিল ৩০, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৩৩, এপ্রিল ৩০, ২০১৮

মো. জাকির হোসেনরাজনৈতিক উত্তপ্ত বিষয় নিয়ে কলাম লেখার বিপদ আছে। তবুও আইনের শিক্ষক হিসেবে আইনগত   রাজনৈতিক বিষয়ে একাডেমিক বিশ্লেষণের আগ্রহ থেকে ‘জেনে শুনে বিষ করেছি পান’। ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ, মঈন উদ্দিন আহমেদ ও ফখরুদ্দীন আহমদ এ ‘তিন উদ্দিন’- এর সরকারের সময় ২০০৭ সালের ৭ মার্চ তারেক রহমান যৌথ বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হন। গ্রেফতারের পর তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, আয়কর ফাঁকি, অবৈধ সম্পদ অর্জন, দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অভিযোগে ১৫টি মামলা করা হয়। পরে ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর জামিনে মুক্ত হয়েই উন্নত চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যে চলে যান তিনি। তারেক রহমানের লন্ডনে যাওয়া নিয়ে একাধিক মত রয়েছে। একটি মত হলো, তারেক রহমান আর রাজনীতি করবেন না এ মর্মে ইয়াজউদ্দিন, মঈন উদ্দিন আহমেদ ও ফখরুদ্দীন আহমদ’র নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে মুচলেকা দিয়ে মুক্ত হয়ে লন্ডন গিয়েছেন। আর বিএনপি নেতৃবৃন্দ বরাবরই বলে আসছেন তারেক রহমান চিকিৎসার জন্য লন্ডন গিয়েছেন, সুস্থ হলেই ফিরে আসবেন।
তারেক রহমান আদৌ মুচলেকা দিয়েছেন কিনা এ ধরনের কোনও নথি আমার দেখার সুযোগ হয়নি। তাই এ বিষয়ে জোর দিয়ে আমার বলার কিছু নেই। অন্যদিকে, বিএনপি নেতৃবৃন্দের বক্তব্যটিও হালে পানি পায় না। কারণ, যুক্তরাজ্যের চিকিৎসা ব্যবস্থা কি এতই খারাপ যে একজন ব্যক্তিকে ১০ বছর ধরে চিকিৎসা দেওয়ার পরও তাকে সুস্থ করে ‍তুলতে পারলো না? আর যদি তাই হয় তাহলে তিনি যুক্তরাজ্য ছেড়ে অন্য দেশে কেন চিকিৎসা নিচ্ছেন না? কিংবা অসুস্থতা নিয়ে অন্যান্য দেশ ভ্রমণ করতে পারলেও বাংলাদেশে কেন আসছেন না? প্রকৃত সত্য হচ্ছে দুর্নীতি, নাশকতা, মানহানি, রাষ্ট্রদ্রোহসহ শতাধিক মামলার জালে জড়িয়ে আছেন তারেক রহমান। এর মধ্যে দুই মামলায় তাকে সাজাও দিয়েছে আদালত। ২০ কোটি ৪১ লাখ ২৫ হাজার ৮৪৩ টাকা পাচারের অভিযোগে একটি মামলায় সাত বছর কারাদণ্ড ও ২০ কোটি টাকা অর্থদণ্ড ও জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির অপর মামলায় ১০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড ও ২ কোটি ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন তারেক রহমান। একই সঙ্গে তার বক্তব্য প্রচারেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে হাইকোর্টের। অন্তত ১০ মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে। আর পাঁচ মামলায় তাকে আত্মসমর্পণ করতে বলা হয়েছে আদালতের আদেশে। তার বিরুদ্ধে থাকা চাঞ্চল্যকর ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার বিচারও শেষ পর্যায়ে। এ অবস্থায় তারেক রহমান বাংলাদেশে এসে কোনও ঝুঁকি নিতে চান না। মহাজোট সরকার তারেক রহমানকে ফিরিয়ে এনে দণ্ড কার্যকর করতে ও অন্যান্য মামলায় তাকে বিচারের মুখোমুখি করতে ইন্টারপোলে নোটিশ জারি ও যুক্তরাজ্য সরকারকে চিঠি প্রদান ও দেন-দরবারসহ নানা প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে। মামলার রায় কার্যকরের উদ্যোগের পাশাপাশি লন্ডনে তারেক রহমানের সরকারবিরোধী নানা ষড়যন্ত্র নিয়েও সরকারের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। তারেক রহমানের দীর্ঘ লন্ডনবাসের সময় লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনে হামলা ও বঙ্গবন্ধুর ছবি অবমাননা, ক্রীড়া উপমন্ত্রীর ওপর হামলা, পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা আইএসআই  ও ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোশাদের সহযোগিতায় বাংলাদেশে সরকারের পতন ঘটানোর নানা ষড়যন্ত্রে তারেক রহমানের সম্পৃক্ততা নিয়ে বিতর্ক চলছে অনেক বছর ধরেই।

বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের বিস্ফোরক তথ্য– তারেক রহমান তার বাংলাদেশি পাসপোর্ট যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সমর্পণ করার পর ওই দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পাসপোর্টটি লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনে প্রেরণ করেছে। প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য হলো, বিদেশে একজন মানুষের পরিচিতি তার নিজ দেশের পাসপোর্ট, তাই বাংলাদেশি পাসপোর্ট সমর্পণের মাধ্যমে তারেক রহমান তার নাগরিকত্বও বর্জন করেছেন। অন্যদিকে, প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের বিরোধিতা করে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী সংবাদ সম্মেলন করে চ্যালেঞ্জ করেন, ‘পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নির্জলা মিথ্যা কথা বলেছেন। আমি চ্যালেঞ্জ দিচ্ছি, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান যদি বাংলাদেশি পাসপোর্ট লন্ডনের বাংলাদেশ হাইকমিশনে জমা দিয়ে থাকেন তাহলে সেটি প্রদর্শন করুন।’ এদিকে তারেক রহমান পাসপোর্ট জমা দিয়ে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব বর্জন করেছেন–এমন বক্তব্য দেওয়ায় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলমকে লিগ্যাল নোটিশ দিয়েছেন তারেক রহমান। একই সঙ্গে প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য প্রকাশ করায় লিগ্যাল নোটিশ দেওয়া হয়েছে দুটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার দুই সম্পাদককেও। নোটিশে তারেক রহমানের বাংলাদেশের নাগরিকত্ব বর্জন করার খবর ভিত্তিহীন দাবি করে তা ১০ দিনের মধ্যে প্রত্যাহার করতে বলা হয়েছে। অন্যথায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে। এমন অবস্থার প্রেক্ষিতে, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তারেক রহমানের পাসপোর্ট জমা দেওয়ার প্রমাণ হিসেবে যুক্তরাজ্যের হোম অফিসের চিঠি ও তারেকের পাসপোর্টের ছবি উপস্থাপন করে সংবাদ সম্মেলন করেন। তারেক রহমানের নাগরিকত্ব বিতর্ক ক্ষণে ক্ষণে রং পাল্টাছে। বিএনপি নেতা রুহুল কবীর রিজভী সংবাদ সম্মেলন করে তারেক জিয়ার পাসপোর্ট সমর্পণের প্রতিমন্ত্রীর দাবিকে চ্যালেঞ্জ করলেও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সেই দেশের আইন অনুযায়ী পাসপোর্ট জমা দিয়ে ট্রাভেল পারমিট নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘তারেক জিয়া সাময়িকভাবে বিদেশে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছেন এবং সঙ্গত কারণেই তা পেয়েছেন। এই প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক অংশ হিসেবেই তিনি যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র বিভাগে তার পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন। সে দেশে প্রচলিত আইন অনুযায়ী তার পাসপোর্ট জমা রেখে তাকে ট্রাভেল পারমিট দেওয়া হয়েছে। কাজেই এই মুহূর্তে বাংলাদেশের পাসপোর্ট তার কোনও কাজে লাগছে না। যখনই তিনি দেশে ফেরার মতো সুস্থ হবেন তখনই তিনি দেশের অন্যান্য নাগরিকের মতোই পাসপোর্টের জন্য আবেদন জানাতে এবং তা অর্জন করতে পারবেন।’

বিএনপি নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলমের দাবির বিষয়টি এবার আইনগতভাবে পর্যালোচনা করা যাক। যুক্তরাজ্যের আইন অনুযায়ী কেউ রাজনৈতিক আশ্রয় চাইলে তাকে নির্ধারিত পদ্ধতিতে যুক্তরাজ্য সরকারের কাছে আবেদন করতে হয়। আবেদনপত্রের সঙ্গে তাকে আবশ্যিকভাবে নিজ দেশের পাসপোর্ট কিংবা পরিচয় শনাক্তকারী অন্যান্য কাগজপত্র দাখিল করতে হয়। আবেদনকারীর পরিচয় যাচাই ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য বিষয় নিশ্চিত হওয়ার জন্য পাসপোর্ট কিংবা পরিচয় শনাক্তকারী কাগজপত্র দাখিল করতে হয়। রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনার আবেদন গৃহীত হলে আবেদনকারীকে পাঁচ বছরের ভিসা প্রদান করা হয় এবং সে সঙ্গে তার পাসপোর্ট কিংবা পরিচয় শনাক্তকারী কাগজপত্র ফেরত প্রদান করা হয়। সাধারণত পাসপোর্ট কিংবা পরিচয় শনাক্তকারী কাগজপত্র আশ্রয়প্রার্থীর আইনজীবীর নিকট ফেরত প্রদান করা হয়। আশ্রিত ব্যক্তির নিজ রাষ্ট্রের দূতাবাসে প্রেরণ করা বিধান নয়। রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য আশ্রিত সময়কালে পাসপোর্ট কিংবা পরিচয় শনাক্তকারী কাগজপত্র যুক্তরাজ্যের হোম অফিসে জমা রাখা বাধ্যতামূলক নয়। পাঁচ বছর ভিসার মেয়াদ অতিক্রান্ত হওয়ার পর আশ্রিত ব্যক্তি যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাসের আবেদন করতে পারেন এবং তার আবেদন গৃহীত হলে তিনি স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে অনির্দিষ্টকাল বসবাস করতে পারেন। স্থায়ী বাসিন্দা হিসাবে বসবাসের ক্ষেত্রেও নিজ দেশের পাসপোর্ট কিংবা পরিচয় শনাক্তকারী কাগজপত্র হোম অফিসে জমা রাখা বাধ্যতামূলক নয়। তারেক জিয়া যদি ইতোমধ্যে ব্রিটিশ নাগরিকত্বও লাভ করে থাকেন তাহলেও তার বাংলাদেশি পাসপোর্ট কিংবা পরিচয় শনাক্তকারী কাগজপত্র হোম অফিসে জমা রাখা বাধ্যতামূলক নয়। কেননা, যুক্তরাজ্যে দ্বৈত নাগরিকত্ব স্বীকৃত। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, তাহলে তারেক জিয়া কেন তার পাসপোর্ট যুক্তরাজ্যের হোম অফিসে জমা করলেন এবং হোম অফিসওবা কেন তা লন্ডনস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসে প্রেরণ করলেন? এ বিষয়ে যেহেতু তারেক জিয়া কিংবা তার কোনও প্রতিনিধি মুখ খোলেননি, তাই প্রকৃত উদ্দেশ্য বলা মুশকিল। তবে বাধতামূলক না হওয়া সত্ত্বেও পাসপোর্ট জমা দেওয়ায় যে সকল বিষয় যুক্তিসঙ্গতভাবে অনুমান করা যায়, তা হলো– এক. তারেক জিয়ার রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন গৃহীত হয়ে পাঁচ বছরের ভিসার মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পর তিনি যখন যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাসের আবেদন করেন সে আবেদন যাতে নিশ্চিতভাবে মঞ্জুর হয় সে জন্য অতিরিক্ত সতর্কতা হিসাবে যুক্তরাজ্য সরকারের সন্তুষ্টি অর্জনের পাসপোর্ট জমা দিয়ে থাকতে পারেন। দুই. যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকলে আশ্রিত ব্যক্তি আশ্রয় থাকাকালীন সময়ে কখনই নিজ দেশে যেতে পারবেন না। কেননা, নিজ দেশে জীবন বিপন্নের অজুহাতেই তো তিনি রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়েছেন। কাজেই নিজ দেশে গেলে তার রাজনৈতিক আশ্রয়ের সুবিধা বাতিল করা হবে। তারেক জিয়া যেহেতু এ সুবিধা বহাল রাখতে চান, তাই বাংলাদেশি পাসপোর্ট অপ্রয়োজনীয় হওয়ায় তা যুক্তরাজ্যের হোম অফিসে জমা দিয়ে তা বাংলাদেশ দূতাবাসে প্রেরণ করার জন্য অনুরোধ করে থাকতে পারেন। তিন. তারেক জিয়া ভালোভাবেই অবগত আছেন তাকে বাংলাদেশে ফেরত নেওয়ার জন্য বর্তমান সরকার কোনও প্রচেষ্টাই বাদ রাখবেন না। তাই তার কোনও আইনজীবীর পরামর্শে বাংলাদেশে তাকে ফেরত প্রদানে আইনগত জটিলতা সৃষ্টি করতে বাংলাদেশি পাসপোর্ট সমর্পণ করে থাকতে পারেন। তিনি প্রমাণ করতে চান, তিনি আর বাংলাদেশের নাগরিক না, বরং তিনি কেবল ব্রিটিশ নাগরিক কিংবা স্থায়ী বসবাসের মর্যাদা ভোগকারী।

বেশ কিছু নজির রয়েছে যেখানে কোনও কোনও রাষ্ট্র তাদের নাগরিককে অন্য দেশে বিচারের জন্য হস্তান্তর করেনি। ১৯৮৮ সাল লকারবি বিমান বিস্ফোরণে বিমানের সকল ক্রু ও ২৫৯ যাত্রী নিহত হয়। তদন্তে প্রমাণিত হয় লিবিয়ার গোয়েন্দা বিভাগের দু’জন কর্মকর্তা এ নাশকতামূলক কাজে জড়িত ছিল। লন্ডন ও ওয়াশিংটন এ দুই অপরাধীকে হস্তান্তরের জন্য চাপ প্রয়োগ করে। কিন্তু লিবিয়া নিজ নাগরিককে হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানায়। জাতিসংঘ লিবিয়ার বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপ করে। অবশেষে দীর্ঘ আলাপ-আলোচনা শেষে ১১ বছর পর শর্তসাপেক্ষে অভিযুক্ত দুজনকে হস্তান্তর করা হয়। তারেক রহমানের কোনও আইনজীবীর পরামর্শে এমন সুযোগ গ্রহণ করার জন্যও বাংলাদেশের পাসপোর্ট সমর্পণ করে থাকতে পারেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, একটি রাষ্ট্র অপর কোনও রাষ্ট্রের অনুরোধে ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত কিংবা আদালতের রায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে অনুরোধকারী রাষ্ট্রের আইন আনুযায়ী বিচারার্থে বা দণ্ড কার্যকর করতে হস্তান্তর করে থাকেন। অপরাধীর এ ধরনের হস্তান্তর আন্তর্জাতিক আইনে বহিঃসমর্পণ হিসাবে পরিচিত। কোনও অপরাধীই যাতে সাজাবিহীন পার পেতে না পারে সে জন্যই আপরাধীকে অনুরোধকারী রাষ্ট্রের কাছে বহিঃসমর্পণের বিধান আন্তর্জাতিক আইনে রাখা হয়েছে। যুক্তরাজ্যের বহিঃসমর্পণের নীতি ও নানা মামলা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যুক্তরাজ্য রাজনৈতিক অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি ছাড়া সাধারণ ফৌজদারি অভিযোগে অভিুযক্ত বা দণ্ডিত ব্যক্তিকে অনুরোধকারী রাষ্ট্রের নিকট বহিঃসমর্পণ করে থাকে। বিখ্যাত ক্যাসটিওনি মামলাসহ যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন মামলার রায়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে রাজনৈতিক অপরাধ হলো সে সকল অপরাধ যে অপরাধ সংঘটনের সঙ্গে– রাজনৈতিক প্রেরণা সুস্পষ্টভাবে যুক্ত থাকে, সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য অপরাধটি সংঘটিত হয়েছে, রাজনৈতিক সংগ্রামের অংশ হিসাবে অপরাধটি সংঘটিত হয়ে থাকে এবং অনুরোধকারী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপরাধটি সংঘটিত হয়ে থাকে। অর্থপাচার ও দুর্নীতির যে মামলায় তারেক রহমান দণ্ডিত হয়েছেন এবং যেসব মামলা তার বিরুদ্ধে বিচারাধীন আছে তার প্রায় সবই ২০০৩ সালের ব্রিটিশ বহিঃসমর্পণ আইন অনুযায়ী বহিঃসমর্পণযোগ্য। উল্লেখ্য, যুক্তরাজ্য থেকে কোনও অপরাধীকে অনুরোধকারী রাষ্ট্রে বহিঃসমর্পণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা যুক্তরাজ্যের আদালতের। এখন দেখার বিষয় বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় যুক্তরাজ্যের আদালত অর্থপাচার ও দুর্নীতির দায়ে দণ্ডিত রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী তারেক রহমানের অপরাধকে রাজনৈতিক না সাধারণ ফৌজদারি অপরাধ হিসাবে চিহ্নিত করেন। তারেক জিয়ার অপরাধ ‘রাজনৈতিক অপরাধ’ হিসাবে বিবেচিত হলে বাংলাদেশে তাকে ফিরিয়ে আনার সুযোগ নেই। তদুপরি যুক্তরাজ্য সরকার তারেক রহমানকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়েছেন। যে কারণে রাজনৈতিক আশ্রয়দান করা হয়েছে যুক্তরাজ্য সরকার যতক্ষণ পর্যন্ত তা পুনর্মূল্যায়ন না করবেন কিংবা সে কারণের অবসান হয়েছে বলে মনে করবেন ততক্ষণ পর্যন্ত তারেক রহমানকে ফিরিয়ে আনা অসম্ভব বলেই প্রতীয়মান হয়।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী দাবি করেছেন, তারেক জিয়া পাসপোর্ট সমর্পণের মাধ্যমে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব বর্জন করেছেন। পাসপোর্ট থাকা বা না থাকার সঙ্গে নাগরিকত্ব জড়িত নয়। এটি বিদেশে ভ্রমণের একটি দলিল মাত্র। নাগরিকত্ব একজন ব্যক্তির সঙ্গে একটি রাষ্ট্রের আইনগত সম্পর্ক, যা কেবল আইনগত পদ্ধতিতে অর্জন ও বর্জন করা যায়। বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আইনে পাসপোর্ট সমর্পণ করলেই নাগরিকত্ব বাতিল হবে এমন কোনও বিধান নেই। জার্মানি ও সুইডেনে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের ওয়েবসাইটে বাংলাদেশি নাগরিকত্ব পরিত্যাগের বিধান বর্ণিত আছে। বার্লিন দূতাবাসের ওয়েবসাইটে বাংলায় বর্ণনা করা হয়েছে, নাগরিকত্ব পরিত্যাগের জন্য ইচ্ছুক আবেদনকারীকে বর্তমান ঠিকানা সম্বলিত পূরণকৃত আবেদন ফরম, জার্মান অথবা অন্য দেশের নাগরিকত্ব সনদের কপি, দূতাবাসের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ৬০ ইউরো ফি প্রদানকৃত স্লিপের কপি, Original বাংলাদেশি পাসপোর্ট এবং তার একটি ফটোকপি ও ডাকটিকিট যুক্ত এবং নিজের নাম-ঠিকানা লিখিত একটি ফেরত খাম (যদি ডাকযোগে কেউ সনদটি পেতে চান) দাখিল করতে হবে। পিতা-মাতার পাসপোর্ট থেকে সন্তানের নাগরিকত্ব পরিত্যাগের জন্য প্রয়োজনীয় শর্ত হলো, বর্তমান ঠিকানা সম্বলিত পূরণকৃত আবেদন ফরম, পিতা-মাতার Original বাংলাদেশি পাসপোর্ট এবং একটি ফটোকপি (১-৫ পৃষ্ঠা)। সন্তানের বৈদেশিক নাগরিকত্ব সনদের কপি। ডাকটিকিট যুক্ত এবং নিজের নাম-ঠিকানা লিখিত একটি ফেরত খাম (যদি  কেউ ডাকযোগে সনদটি পেতে চান)। দূতাবাসের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ৬০ ইউরো ফি প্রদানকৃত স্লিপের কপি জমা দিতে হবে। নাগরিকত্ব পরিত্যাগের আবেদন পাওয়ার পর সরকার নাগরিকত্ব পরিত্যাগের কারণ অনুসন্ধান করে আবেদনকারীকে পরিত্যাগের একটি সনদ প্রদান করে থাকেন। নাগরিকত্ব পরিত্যাগের চূড়ান্ত সনদের অনুমোদনের জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রক্রিয়াধীন সময় ৬ মাস থেকে ২ বছর পর্যন্ত বলে ওয়েবসাইটে উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে স্টকহোম দূতাবাসের বর্ণনা অনুযায়ী, সকলের সদয় অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে বাংলাদেশের নাগরিকদের নাগরিকত্ব পরিত্যাগের আবেদন অনুমোদনের জন্য নিম্নবর্ণিত কাগজপত্রাদি সংযুক্ত হিসেবে জমা প্রদান করতে হবে- বাংলাদেশ নাগরিকত্ব পরিত্যাগের কথা উল্লেখপূর্বক প্রার্থীর স্বাক্ষরিত আবেদনপত্র ০২ কপি। ১৮ বছরের কম আবেদনকারীর পক্ষে তার পিতা ও মাতা উভয়ের স্বাক্ষরিত আবেদনপত্র। ০২ কপি পাসপোর্ট সাইজের ছবি (০৬ মাসের বেশি পুরনো নয় এবং সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডসহ), ফি প্রদানের রসিদ, যে দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করতে ইচ্ছুক সেই দেশের যথাযথ কর্তৃপক্ষের নিকট হতে এতদসংক্রান্ত চিঠি, বাংলাদেশ পাসপোর্ট ও এর ফটোকপি। এ ওয়েবসাইটে স্বেচ্ছায় নাগরিকত্ব পরিত্যাগের ছাপানো নমুনা আবেদন ফরমও রয়েছে। এ বিষয়ে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়, এ পরিত্যাগ সংক্রান্ত আইন কি কেবল সেসব দেশে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের জন্য যেসব দেশ দ্বৈত নাগরিকত্ব স্বীকার করে না, নাকি সর্বজনীনভাবে যেকোনও নাগরিকের নাগরিকত্ব পরিত্যাগের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য তা স্পষ্ট নয়।

আমার মতে, নাগরিকত্ব পরিত্যাগ করতে পরিত্যাগের আবেদন ও পরিত্যাগের সনদ মঞ্জুরি সকল বাংলাদেশি নাগরিকের জন্য প্রযোজ্য।

তারেক রহমানের নাগরিকত্ব বিতর্ক আওয়ামী লীগের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ বিবেচনায় যে, খালেদা জিয়া জেলে আর তারেক রহমান নাগরিকত্ব বর্জন করলে নেতৃত্বদানে অযোগ্য। বিএনপির জন্য এ বিতর্ক বড় শঙ্কার। কেননা, নাগরিকত্ব পরিত্যাগ হয়েছে এটা প্রমাণিত হলে তারেক রহমান আইনগত ও নৈতিকভাবে বিএনপির নেতৃত্ব দিতে পারেন না। তখন বিএনপির সংকট আরও ঘনীভূত হবে। পাসপোর্ট জমাদানের রাজনৈতিক বাহাস যে দিকেই গড়াক না কেন, বাধ্যবাধকতা না থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ হাইকমিশনে জমাদানের পরিবর্তে যুক্তরাজ্য হোম অফিসের মাধ্যমে তারেক রহমানের পাসপোর্ট জমাদানের পেছনে রহস্য ও তাৎপর্য তো রয়েছেই।

লেখক: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

 ই-মেইল: [email protected]    

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ