ঈদের রঙ বদলে যায়

Send
রুমীন ফারহানা
প্রকাশিত : ১৩:০১, জুন ১৬, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:২৬, জুন ১৭, ২০১৮

রুমীন ফারহানাঈদ মানে খুশি, ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে সব ভেদাভেদ ভুলে নিজের খুশি সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া। ঈদের রঙ নতুন জামায়, ঈদের রঙ ফিরনি-পায়েসে, ঈদের রঙ নতুন চাঁদে, ঈদের রঙ শিশুর হাসিতে। আজ যখন পেছন ফিরে তাকাই, তখন মনে হয় ঈদের খুশির অনেকটাই যেন রেখে এসেছি শৈশবে। ছোটবেলায় আমার ঈদ শুরু হতো শবেবরাত থেকেই। শবেবরাত নিয়ে আসতো ঈদের আগমনী বার্তা। শবেবরাতে সন্ধ্যা হতে না হতেই মরিচবাতি, তারাবাতি, পটকার আওয়াজ, বাসায় বাসায় নানান রঙের হালুয়া মিঠাই পাঠানো, আমাদের শিশু মনে একটাই কথা বলতো ‘আসছে খুশির ঈদ’। তখন শবেবরাতে কত রঙের হালুয়া মিঠাইয়ের যে আয়োজন হতো, সেগুলো বাড়ি বাড়ি নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব ছিল আমাদের ওপর। কই, আজ তো তেমনটা আর চোখে পড়ে না। ফেসবুকের কল্যাণে সবই এখন ভার্চুয়াল। এখন যে সময় ব্যয় হয় হালুয়া-রুটির ছবি তুলতে আর তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছডিয়ে দিতে, তার অনেক কম সময়ে আমরা ছডিয়ে দিতাম ঈদের আগমনী বার্তা পাড়ার সব ঘরে ঘরে।
ছেলেবেলায় ঈদ মানে রোজা শুরু হ‌ওয়ার আগেই নতুন পোশাকের বায়না, সঙ্গে চাই জুতা, মোজা, রঙিন ফিতা, ছোট্ট হাতের চুড়ি, এমনকি পারলে নতুন সুবাস মাখা শ্যাম্পু সাবান। মা’র কাছে আমার আবদার তেমন পাত্তা পেতো না, বাবাই ভরসা। বাবার হাত ধরে নতুন জামা, বাবার হাত ধরেই ঘুরতে যাওয়া। ঈদ শুরু হতো শবেবরাতের সঙ্গে আর চলতো ঈদের পরে কয়েক দিন যাবত। ঈদের দিন শেষে সালামি গুনবার যে উত্তেজনাপূর্ণ আনন্দ, তার সামনে আজকের বহু বড় সাফল্যও নিতান্তই পানসে মনে হয়। ঈদের সালামিই তখন সারাবছরের একমাত্র উপার্জন। কত সাবধানেই না গুনতাম আর জমিয়ে রাখতাম সেগুলো।
দুটো ঈদের সকালই আমার শুরু হতো বাবার দেওয়া এক তোড়া লাল গোলাপের সঙ্গে। তখন তো আর ফ্রেনসেস অ্যান্ড প্যাটেল আসেনি যে নিখুঁত মাপ মতো রঙিন গোলাপ চাইলেই কেনা যেতো, তবু কোথা থেকে যেন বাবা ঈদের সকালগুলোয় ঠিক ঠিক মাপ মতো অপূর্ব লাল গোলাপ নিয়ে আসতেন আমার জন্য। তারপর ঈদের নামাজ শেষ হতে না হতেই বাসায় মেহমান। মা ছিলেন শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক, বাবা রাজনীতিবিদ। সুতরাং দুই পক্ষেরই পরিচিত মানুষের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। তারপর আছে স্বজন। আজকের মতো তখনও বিদেশ বিভুইয়ে ‘আমিটি আর তুমিটি’ নিয়ে ঈদ করার প্রথা চালু হয়নি। মানুষ তখন নিজের খুশি ছড়িয়ে দিতো চারপাশে। পরিবার আর প্রতিবেশীর মাঝে ফারাক ছিল না তেমন। সম্প্রীতির সূতোয় টান পড়েনি কখনও।
রাজনীতিতে আসার পর আমার ঈদগুলো হয়েছিল অন্যরকম। প্রথমেই আমি যে দায়িত্ব পেয়েছিলাম, তাতে সকাল কাটতো কূটনীতিবিদদের সঙ্গে চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে যেখানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় করতেন সর্বস্তরের নেতাকর্মীসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও কূটনীতিকদের সঙ্গে। সন্ধ্যায় থাকতো চেয়ারপারসনের বাসায় ছোট্ট আয়োজন। ঈদের দিনের সারাটা বেলা কাটতো আনন্দঘন ব্যস্ততায়। আর রমজান আসতো ইফতারের ব্যস্ততা নিয়ে। রাজনৈতিক নেতা, কূটনৈতিক ব্যক্তি থেকে শুরু করে পেশাজীবী বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে ইফতারে পার হতো রোজা। তারাবি পড়া হতো গুলশান কার্যালয়ে খালেদা জিয়ার সঙ্গে। এ যেন নিজের ছোট পরিবারের বাইরে বড় একটি পরিবার। সদস্যদের মাঝে ভালোবাসা আছে, মমত্ববোধ আর সম্প্রীতি আছে, আছে এক পরিবারভুক্ত হওয়ার একাত্মতাবোধ।
সাল ২০১৮। এবার রমজানের পুরো প্রেক্ষাপটই সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিএনপি চেয়ারপারস ৪ মাসের বেশি সময় ধরে কারান্তরীণ। যে মামলাটিতে, যেকোনও বিবেচনায় তিনি তাৎক্ষণিক জামিন লাভের যোগ্য, সেই মামলাটিতেই দীর্ঘ তিনমাস ঘোরানোর পর সর্বোচ্চ আদালত থেকে জামিন পেলেও মুক্তি মেলেনি তার। একটির পর একটি নতুন মামলা এসে মুক্তির পথ রুদ্ধ করেছে। এবারের রমজানে তাই নিতান্তই দায়িত্ব পালনের খাতিরে ইফতারের আয়োজন করা হয়েছে ছোট পরিসরে। চেয়ারপারসনের জন্য রেখে দেওয়া শূন্য আসনটি আমাদের কষ্টই বাড়িয়েছে কেবল। বহু বছর পর এবার ঈদের দিনটি কাটবে তাকে ছাড়া। তিনি এক লৌহমানবী, যাকে ৩৭ বছরের রাজনৈতিক জীবনে গণতন্ত্রের জন্য একা লড়াই করতে হয়েছে বারংবার। ক্ষতবিক্ষত হয়েছেন, হারিয়েছেন প্রাণপ্রিয় স্বামী, প্রাণাধিক পুত্রকে। মাইনাস টু ফর্মুলা বাস্তবায়নকালে জেলে থাকা অবস্থায় হারিয়েছেন মা’কে। তবু মুহূর্তের জন্য বিচ্যুত হননি নিজের পথ থেকে, ন্যূনতম আপসের কোনও ইতিহাস নেই তার জীবনে। শুনতে পাই অন্ধকার কারাগারে দুর্বিষহ জীবন তার। ২০০ বছরের পরিত্যক্ত ভবনের স্যাঁতস্যাঁতে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ক্রমেই স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটছে। বিশাল এই পুরনো ভবনে একাই বন্দি তিনি। এর মাঝে মাথা ঘুরিয়ে পড়ে গিয়েছিলেন। ৪/৫ দিন পর্যন্ত এই খবর কারও কাছে পৌঁছায়নি। এই দেশে যেখানে ইয়াবা ব্যবসায়ী, সিরিয়াল কিলার কিংবা ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসীরা বেসরকারি হাসপাতালে বিনা অসুখে বিলাসবহুল চিকিৎসা সেবা পায় সেখানে তিন বারের প্রধানমন্ত্রী, সাবেক রাষ্ট্রপতি ও সেনাপ্রধানের স্ত্রী, বাংলাদেশের গণমানুষের নেত্রী বিনা চিকিৎসায় অসুস্থ থেকে অসুস্থতর হতে থাকে আর আমরা নিশ্চুপ তাকিয়ে রই।
গত ১০ বছরের শাসনামলে আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে বহু নেতাকর্মীকে গুম ও বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন অনেকে, রাজনৈতিক মামলায় অনেকেই কারাগারে, ফেরারি অনেকেই নিজ এলাকায় ঢুকতে পর্যন্ত পারে না কেবল দল করার অপরাধে। এ পর্যন্ত কত মা হারিয়েছে তার সন্তান, বোন হারিয়েছে ভাই, স্ত্রী হারিয়েছে স্বামী, শিশু হারিয়েছে বাবাকে তার হিসাব পর্যন্ত নেই। অনেকে অপেক্ষার প্রহর গোনে, একদিন হয়তো ফিরে আসবে প্রিয় মুখটি। সবকটা জানালা তারা খোলা রাখে, বিশ্বাস করে এই দেশকে ভালোবেসে যারা হারিয়ে গেছে তারা আসবে একদিন, চুপি চুপি। দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয় অপেক্ষার প্রহর, কিন্তু আমরা আশা হারাই না।
লেখক: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

আপ-এআর

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ