সোনা নিয়ে কেলেঙ্কারি, আর নিরর্থক আলোচনা

Send
মাসুদ কামাল
প্রকাশিত : ১৬:১৪, জুলাই ২৫, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:২০, জুলাই ২৫, ২০১৮

মাসুদ কামালঅর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত মাঝে মধ্যে বেশ কৌতুককর কথাবার্তা বলেন। উনি বয়স্ক এবং অভিজ্ঞ, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদেও রয়েছেন। এমন লোকের কাছ থেকে জনগণ অবশ্যই দায়িত্বশীল বক্তব্য আশা করেন। অর্থনৈতিক অঙ্গনে কোনও একটি অঘটন ঘটলে মানুষ তাকিয়ে থাকেন অর্থমন্ত্রীর দিকে। অপেক্ষা করেন- দেখেন, উনি কী বলেন। অঘটনটিকে কেন্দ্র করে অনেকেই যখন বিতর্কিত কথা বলেন, একে ওকে দায়ী করেন, তখন সবাই আশা করেন– এবার চূড়ান্ত বক্তব্যটি বুঝি পাওয়া যাবে অর্থমন্ত্রীর কাছ থেকে। তিনি হয়তো এমন কিছু বলবেন, যাতে সমাধান না পাওয়া গেলেও সমস্যার স্বরূপটি অন্তত প্রকাশিত হবে। সর্বোপরি একটা দিকনির্দেশনাও থাকবে।
কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের, তেমনটি হয় না। আমি সেরকম কোনও ঘটনার কথা মনে করতে পারি না। বহুল আলোচিত হলমার্ক কেলেঙ্কারির বিষয়টি যখন প্রকাশিত হলো, সোনালী ব্যাংক থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়ে গেলো, এই অর্থমন্ত্রী তখন নির্বিকার ভঙ্গিতে বললেন– সরকারের জন্য এই অর্থ নাকি তেমন কোনও টাকাই নয়! বেসিক ব্যাংক বা জনতা ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারি সময়, এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির সময়ও তিনি নানা এলোমেলো কথা বলেছেন। কেউ কেউ অবশ্য বলেন, অর্থমন্ত্রীর কথায় একধরনের সরলতা থাকে। সেটা আমি অস্বীকার করি না। হয়তো আছেও ওনার সরলতা। কিন্তু এই সরলতা কি একটি সরকারের অর্থমন্ত্রী পদের জন্য বিশেষ কোনও যোগ্যতা হতে পারে?

এবার বরং সাম্প্রতিক প্রসঙ্গে আসি। বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে থাকা সোনা নিয়ে কথা উঠলো। শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের একটি প্রতিবেদনের ভিত্তিতে রিপোর্ট হলো পত্রিকায়। প্রতিবেদনের অভিযোগগুলো মারাত্মক। অধিদফতরের একটি কমিটি বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্ট পরিদর্শন করে বেশ কিছু অনিয়ম পায়। ভল্টে থাকা সোনা থেকে ৯৬৩ কেজি সোনা তারা পরীক্ষা করে। পত্রিকার রিপোর্টে অনিয়মের একটি উদাহরণে বলা হয়– তিন কেজি ৩০০ গ্রাম ওজনের একটি সোনার চাকতি এবং সোনার রিং পরীক্ষা করে সোনার মানের হেরফের পাওয়া গেছে। ভল্টে জমা দেওয়ার সময় এগুলোতে ছিল ৮০ শতাংশ বিশুদ্ধ সোনা (১৯ দশমিক ২ ক্যারেট), অথচ পরিদর্শনের সময় দেখা গেলো ওই দুটি নমুনায় সোনা রয়েছে ৪৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ (১১ দশমিক ২ ক্যারেট)। এমনটি হলো কী করে? কীভাবে সুরক্ষিত ভল্টের সোনায় ভেজাল পাওয়া গেলো? তাহলে কি ওই নমুনা দুটি পাল্টে দেওয়া হয়েছে?

রিপোর্টটি প্রকাশিত হওয়ার পরদিনই বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে একটা প্রেস কনফারেন্স করা হলো। সেখানে বলা হলো, ঘটনাটি নাকি হয়েছে তাদের ক্লারিক্যাল মিসটেকের কারণে। শুল্ক গোয়েন্দারা যখন চাকতি ও রিংটি ব্যাংকে জমা রাখে, তখন এতে সোনার পরিমাণ ৪০ শতাংশই ছিল। ইংরেজির আট আর বাংলার চার দেখতে একই রকম বলে খাতায় ওঠানোর সময় ৪০ কে ৮০ করে দেওয়া হয়েছে! অসাধারণ যুক্তি।

বাংলাদেশ ব্যাংক যখন মিডিয়াকে এসব যুক্তি শোনাচ্ছিলেন, অর্থমন্ত্রী তখন যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে বাংলাদেশের একটি নিউজ চ্যানেলকে তিনি জানালেন, এই ঘটনার জন্য আসলে বাংলাদেশ ব্যাংক তার দায় এড়াতে পারে না। বললেন- ‘দায়িত্বে অবহেলার জন্য এমনটি হতে পারে। দেশে ফিরে কঠোর ব্যবস্থা নেবেন’। মন্ত্রীর এমন বক্তব্য যে কাউকেই আশাবাদী করে তুলতে পারে। কিন্তু তারপর দেশে ফিরে কী বললেন? মঙ্গলবার (২৪ জুলাই, ২০১৮) ডিসি সম্মেলন শেষে সাংবাদিকদের তিনি বললেন, ‘৯৩৬ কেজি সোনার মধ্যে দূষিত সোনার পরিমাণ মাত্র তিন কেজি। তাও পুরোটা নয়। কাজেই এটি বড় কোনও সমস্যা নয়’। মনে হতেই পারে দেশে ফিরে সোনা বিষয়ক তার চিন্তা বা মনোভাব পাল্টে গেছে। কেন পাল্টে গেছে– সে আলোচনা সহজ নয়, হয়তো নিরাপদও নয়। তারচেয়ে বরং দেখি এবার তিনি আরও কী কী কথা বলেছেন। শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর এই অনিয়ম উদঘাটন করেছে, অথচ অর্থমন্ত্রী এবার এই বিভাগেরই সমালোচনা করলেন। বললেন, ‘এই ইস্যুতে তাদের কথা বলারই দরকার ছিল না। এটা বাংলাদেশ ব্যাংকের বিষয়। তারাই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে’। তিনি আর একটি কথা বলেছেন। এ কথাটি বলেছেন কিছুটা বিরক্তি সহকারে, বলেছেন- ‘সোনা নিয়ে অনর্থক আলোচনা হচ্ছে’।

আচ্ছা, অর্থমন্ত্রীর এই বক্তব্যগুলো শোনার পর কি তাকে কিছুটা পক্ষপাতদুষ্ট মনে হয় না? মনে কি হয় না যে তিনি বুঝি বাংলাদেশ ব্যাংককে রক্ষা করতে চাইছেন? বাংলাদেশ ব্যাংক তার মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ একটি প্রতিষ্ঠান। সেই প্রতিষ্ঠানের প্রতি তার এক ধরনের পক্ষপাত থাকতেই পারে। কিন্তু তার প্রদর্শিত পক্ষপাত কি প্রতিষ্ঠানের দিকে যাচ্ছে, নাকি সেখানে ঘাপটি মেরে থাকা কতিপয় ক্ষতিকর ব্যক্তির দিকে যাচ্ছে?

অর্থমন্ত্রী যে তিন কেজি সোনাকে কোনও গুরুত্বই দিতে চাইছেন না, এটা কি শোভন? এখানে কি পরিমাণটা গুরুত্বপূর্ণ নাকি অপকর্মের প্রকৃতিটি গুরুত্বপূর্ণ? আর তাছাড়া তদন্ত দল তো ভল্টের সকল সোনা পরীক্ষা করেনি, তারা কেবল দৈবচয়ন পদ্ধতিতে সামান্য কিছু নমুনা পরীক্ষা করেছে। তাহলে পুরো সোনার ক্ষেত্রে ফলাফলটা কি দাঁড়াতে পারে– সেটা বিবেচনা কি করছেন তিনি বা তার মন্ত্রণালয়? আবার এখানে পরিমাণটা কম বললেও সোনাগুলো যে দূষিত, সেটা কিছু স্বীকার করেছেন অর্থমন্ত্রী। অথচ দু’দিন আগেই বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা সোনায় ভেজালের পরিমাণ যে বেশি- সেটি পর্যন্ত মানতে চায়নি।

আবার এনবিআরকে সমালোচনা করতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী যখন বলেন, ‘বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকের’, তখন আরও একবার হতাশ হতে হয়। এটা কীভাবে হয়? এই সোনার মালিক কি বাংলাদেশ ব্যাংক? বিভিন্ন জায়গা থেকে অবৈধ সোনা উদ্ধার করেছে শুল্ক গোয়েন্দারা, তারপর তারাই সেগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকে রেখেছে। তাহলে এগুলো ব্যাংকের হলো কী করে? এগুলো আসলে জনগণের সম্পত্তি, বাংলাদেশ ব্যাংকের কাজ কেবল এগুলোকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা। এই সংরক্ষণের কাজে বাংলাদেশ ব্যাংক এর আগেও ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। এদের কারণে রিজার্ভ থেকে আটশ’ কোটি টাকারও বেশি চুরি হয়ে গেছে। সেগুলোও জনগণেরই সম্পদ ছিল। তখনও দেখা গেছে মাননীয় অর্থমন্ত্রীকে প্রকারান্তরে ব্যাংকেরই পক্ষ নিতে।

তবে সোনা নিয়ে আলোচনাকে ‘অনর্থক’ বলে যে মন্তব্য তিনি করেছেন, সেটাকে আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। তার এ কথাটি অর্থবহ এবং ইঙ্গিতপূর্ণ। আসলেই তো এই আলোচনা অনর্থক। এ ধরনের আলোচনা সমালোচনায় কিছুই হবে না, কিছুই হয় না। হলমার্ক, বেসিক ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, ফারমার্স ব্যাংক, রিজার্ভ চুরি- প্রতিটি ঘটনার পর বিস্তর আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয়নি। অর্থ উদ্ধার দূরে থাক, দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পর্যন্ত দেওয়া যায়নি। এবারও যে কিছু হবে না, কেবল এমনি এমনি সময় নষ্ট হবে মানুষের, হয়তো সে কথাটিই বলতে চেয়েছেন মাননীয় অর্থমন্ত্রী। এই একটি ক্ষেত্রে নিশ্চয়ই তিনি জনগণের ভালোর কথা চিন্তা করেছেন। অনেক মন্দের মধ্যে এটাইবা কম কী!

লেখক: সিনিয়র নিউজ এডিটর, বাংলাভিশন

 

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ