ওহ নারী, তোর নিষেধ কেন?

Send
করভী মিজান
প্রকাশিত : ১৬:২৭, অক্টোবর ২৮, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৩০, অক্টোবর ২৮, ২০১৮

করভী মিজানওখানে যাচ্ছো কেন, ওটা সেইফ না

নিজের কথা দিয়েই শুরু করি। যখন ছোট ছিলাম, মা সারাক্ষণ বলতেন, ‘ওখানে যাবি না, ওটা সেইফ না’, ‘ওটা করবি না, সেইফ না’। প্রথম প্রথম মেনে নিতাম। তারপর ছোট মগজে সমস্যা শুরু হলো। কী ব্যাপার, ভাইয়েরা সব জায়গায় যেতে পারছে। সব করতে পারছে। আমায় বারণ কেন? চটাস করে অব্যর্থ লক্ষ্যে গালে একটা চড়। মানে এটা হলো উত্তর—‘খবরদার কোনও কথা শুনতে চাই না’। আর এখন আমি তো রীতিমতো জেলাস আমার দুই মেয়ে এবং এই জেনারেশন পরবর্তী বাচ্চাদের নিয়ে। এদের চড় মারা দূরে থাকুক। কোনও গালিও তো দেওয়া যায় না। মায়েদের চড়-থাপ্পরের ব্যাপারে কোনও অভিজ্ঞতাই নতুন জেনারেশনের হলো না! যাই হোক,  আগের কথায় ফিরে যাই। মাত্র এসএসসি পরীক্ষা শেষ হয়েছে, মার্চের ২৪ তারিখে। আমার ১৫ বছর। ১৬ হলো মার্চে ২৮ তারিখে। সামনে তিন মাস ছুটি। প্ল্যান আগের থেকেই করা ছিল। লাফাতে লাফাতে মাকে গিয়ে বললাম, ‘ড্রাইভিং শিখবো টাকা দাও’। আবারও চড়। তার সঙ্গে লেকচার। মেয়েরা গাড়ি চালায় না। আবারও মাথা কাজ করে না। আরে টিভিতে যে দেখি সব মেয়ে গাড়ি চালাচ্ছে। আমার মা তখন স্পেসিফিক্যালি বলেন, ঢাকায় মেয়েরা গাড়ি চালায় না। এরপর থেকে প্রতিদিন এসে মাকে রিপোর্ট দেই। অমুক আন্টি গাড়ি চালায়। তমুক এক মহিলাকে নিজের চোখে দেখেছি গাড়ি ড্রাইভ করে ভিডিও শপে আসতে। কিন্তু কারে কী বলি! বলাই বাহুল্য আমার বড় ভাই ক্লাস নাইন থেকেই গাড়ি চালাচ্ছে। বুঝলাম অন্য বুদ্ধি করতে হবে। সে যুগে মানে ষাট সত্তর বা আশির দশকের মায়েরা দিবানিদ্রা দিতে এক্সপার্ট ছিলেন। এমন না যে, আমার মা রান্না-বান্না করে অস্থির কাহিল অবস্থা। সে যুগে বিত্তবান বা বিত্তের কাছাকাছি স্বামীর স্ত্রীরা রান্নার তদারকি করতেন। মেহমান এলে রাঁধতেন এবং কাজের লোক দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকতেন।

অতএব প্রতিদিন ধানমন্ডির সুনসান দুপুর বেলায় রাস্তায় গলিতে আমাদের টয়োটা পাবলিকা চালানো শুরু হয়ে গেলো আমার। বেসিক তো জানাই ছিল। চলছিল প্র্যাকটিস। এক দুপুরে ঘটলো মহা অপকর্ম। গ্যারেজে গাড়ি পার্ক করতে গিয়ে গাড়ির একপাশ মোটামুটি চ্যাপ্টা করে ফেললাম। মা এককথাই আমাকে শুনিয়ে গেলেন। কাল তোর বাপ ফ্লাইট থেকে আসুক। তারপর হবে। ভাইদের চোখেমুখে ক্ররতার দারুণ চাপা হাসি। কিন্তু আমার কোনও দুশ্চিন্তাই হলো না। রাতে হাওয়াই ফাইভ দেখে ঘুমাতে গেলাম। আব্বু সকালেই এলেন ফ্লাইট থেকে। ঘুম-টুম দেওয়ার পর আমার মা মহাসমারোহে মেয়ের কীর্তি বর্ণনা করলেন। সাক্ষী ২ ভাই। আব্বু কিছুই বললেন না। নিচে গ্যারেজে গাড়িও দেখতে গেলেন না। বিকেলে আমাকে ডেকে বললেন, চল রিবন ঘুরে আসি। ওহ, বাই দ্য ওয়ে—আমাকে আব্বু রিভি নামে কমই ডাকতেন। আদর করে ডাকতেন রিবন বা নিমো নামে। সেই দিনই আব্বু আমাকে গাড়ি নিয়ে অনেকক্ষণ প্র্যাকটিস করালেন। কিছু ট্রিকস বুঝিয়ে দিলেন। এরপর আর সমস্যা হয়নি। তারপর বড় ভাইকে প্রতি ট্রিপে ১০০ টাকা ঘুষ দিয়ে আরও কিছুদিন প্র্যাকটিস করে গাড়ি নিয়ে নেমে পড়লাম রাস্তায়। ইতোমধ্যে রিকশায় ধাক্কা, ব্যাক করতে গিয়ে গেট ভেঙে সবই কমপ্লিট। অবশ্য যেখানে এই সেদিন জুনের ২৪ তারিখে সৌদি আরবের নারীরা গাড়ি চালানোর অধিকার অর্জন করেছে, সেখানে ঢাকার মতো জায়গায় ১৯৮২ সালের কথা—এত ইনিয়ে-বিনিয়ে বলাটাও আদিক্ষেতাই বটে!

যাকগে আরেকবার ‘সেইফ না’ শব্দটা স্বয়ং আমার মায়ের মুখেই শুনেছিলাম। সেটা আরও আগের কথা ‘৭৬ বা ‘৭৭ সালের দিকে। আমি শাহীন স্কুলের স্টুডেন্ট তখন। সামার ভ্যাকেশন। মন ফুরফুরে। পরেরদিন ব্যাংকক যাবো। সেই সময় ব্যাংকক নামের জায়গার অস্তিত্ব মানুষ কমই জানতো। আমরা যাচ্ছি, কারণ বাংলাদেশ বিমান যায়।  ক্যাপ্টেন হিসেবে আব্বু ফুল ফ্যামিলি ফ্রি বিজনেস ক্লাস টিকেট বা সাব-লো টিকেট পেতেন। স্যুটকেস গোছানো শেষ। হঠাৎ আব্বু মিটিং ডাকলেন আমার চাচাসহ। কারণ চাচাও যাচ্ছেন ব্যাংকক, তারপর ট্রেনে মালেয়শিয়া ঘুরতে। ঘোষিত হলো—আব্বু আগামীকাল আমাদের সঙ্গে ব্যাংকক যেতে পারবেন না। তার বোম্বে যেতে হবে। ওই সময় বোম্বে মুম্বাই হয়নি। আর যতদূর মনে পড়ে, বোম্বে বাংলাদেশ বিমানের হাব ছিল। অর্থাৎ সব ফ্লাইট বোম্বে টাচ করে যেতো। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর আব্বু বাংলাদেশ বিমানের অন্যতম ফাউন্ডার ক্যাপ্টেন ছিলেন। ৭০ এবং ৮০-এর দশকে বিমানের পাইলটের এত অভাব ছিল যে, আব্বুদের মানে প্রায় ২৫ দিনই ফ্লাই করতে হতো। তারপরও বিদেশি পাইলটদের হায়ার করতে হতো ফ্লাইট অপারেট করতে। কাজেই হঠাৎ সিডিউলের বাইরের ফ্লাইট হলেও না বলা যেতো না। হঠাৎ মা কান্না শুরু করে দিলেন। ‘না আমি যাবো না একা। এটা সেইফ না’। আবারও সেই ‘সেইফ’ শব্দ! আমার তো মেজাজ চরম। ভাবছি ক্লাসের বন্ধুদের কাছে মুখ দেখাবো কী করে! গল্প তো অলরেডি করা শেষ। এরমধ্যে আব্বু বলেই চলেছেন, ‘আশ্চর্য মাত্র ২ দিনের ব্যাপার। তোমরা কাল ফ্লাই করো। আমি পাইলটকে বলে রেখেছি (আব্বুর কোর্স মেট ছিলেন)। আমি একদিন বাদেই জয়েন করবো। আর কাঞ্চন তো যাচ্ছেই’। কাঞ্চন মানে আমার চাচা। সেও যাচ্ছে। চাচা বললেন, ভাবি নো প্রবলেম। চলুন। আমি তো আছি। বাচ্চাদের আমি দেখবো। অবশেষে পরদিন ফ্লাইটে ওঠা হলো। আব্বু জয়েন করলেন একদিন বাদেই। এসেই বললেন, ‘জানো আজকের ফ্লাইটে দু’জন বাঙালি মহিলাকে দেখলাম একা ব্যাংকক আসতে। আলাপ করলাম বললো বেড়াতে যাচ্ছে। বাহ্ কী স্মার্ট!’ সেই সময় বিমানে সিকিউরিটি বলতে কিছুই ছিল না। ক্যাপ্টেনরা প্রায়ই প্যাসেঞ্জারদের সঙ্গে গিয়ে গল্প করতেন। ককপিটে এসে ছবি তুলতে দিতেন। এমনকি প্যাসেঞ্জাররা অটোগ্রাফও নিতো। হাস্যকর ব্যাপার হলো। পরে দেখা গেলো ওই সাহসী স্মার্ট নারীদ্বয় আমার বেস্ট ফ্রেন্ড শাহপার আলী মলি’র মা ও ফুপু। ও যায়নি সেবার। মলির কথা পরে বলবো। আমার পুরো জীবনটাই মোটামুটি ওকে ঘিরেই আবর্তিত। যদিও ও এখন নেই। ক্যানসার ওকে বাঁচতে দেয়নি। কিন্তু ওর পুরো ফ্যামিলি দায়িত্ব নিয়ে আমাকে আগলে রাখে।

আবারও আগের কথায় ফিরে যাই। সত্যি কথা বলতে কী, তখন রাগ হলেও সেইফটি নিয়ে আমার মায়ের অসহায়ত্ব আমাকে দুঃখই দিয়েছিল। আসলে আমরা নারীরা ছোটবেলা থেকেই নিজেদের কন্ডিশন করে ফেলি। কোনটা সেইফ বা কোনটা সেইফ না। কন্যা শিশু জন্মানোর সঙ্গে সঙ্গেই এই কন্ডিশনিংটা ভূতের মতো বাবা-মা-পরিবারের সবার ঘাড়ের ওপরেই চেপে বসে। ভাগ্যে আমার বাবা ভিন্ন মতাদর্শের মানুষ ছিলেন।

গ্রামের কথা তো বাদই দিলাম। কন্যা সন্তানের জন্মানোর খবরটাই গ্রামে একটা বিস্বাদ শব্দ আজও। কারণ ওদের যুদ্ধ করতে হয় যৌতুক দিয়ে মেয়ের বিয়ে দেওয়ার, যুদ্ধ করতে হয় বাবাদের পাড়ার বখাটে ছেলে বা চেয়ারম্যানের ছেলের কুনজর থেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য। যুদ্ধ করতে হয় কন্যাকে বড় করতে গিয়ে সমাজের হাজারও প্রশ্ন, কুকথা কুমন্ত্রণার সঙ্গে। মায়েদের অভিশাপগ্রস্ত হতে হয় কন্যা সন্তানটিকেই জন্ম দেওয়ার জন্য। এই রকম পরিবেশ-পরিস্থিতিতে একটি মেয়েকে জন্মের পর থেকেই শুনে বড় হতে হয়–ওদিকে যাবে না, ওটা নিরাপদ নয়। এটা করো না, নিরাপদ নয়। পারলে আমাদের সমাজ নিরাপদ সড়ক চাইয়ের মতো জন্মের পর থেকেই কন্যাদের নিরাপদ বলয়ে বন্দি করে রাখতো।

শহুরে মানসিকতাও কি সেইফটিবলয়ের বাইরে?

কয়েক বছর আগে আমার এক কোটিপতি বান্ধবী তার মেয়ের বিয়ে দিচ্ছে। অবাক হয়ে বললাম, ‘বয়স এত কম। কেন বিয়ে দিচ্ছ? পড়াশোনাটা কমপ্লিট করুক’।বান্ধবী হাসতে হাসতে বললো, ‘এই জন্যই তো বিয়ে দিচ্ছি’। বুঝলাম না পড়াশোনা করতে বিয়ের প্রয়োজন কেন। বান্ধবীর কথা–‘হবু বর নিউইয়র্কে পড়ছে। মেয়েও যাচ্ছে পড়তে সেখানে’। কাজেই সেইফটির একটা ব্যাপার আছে না। তাই বিয়ে। বলাই বাহুল্য যে, সেইফটির দোহাই দিয়ে ১০ কোটি টাকা বাজেটের যে বিয়ে হলো বাচ্চা মেয়েটির, তার মেয়াদ শেষ হতে লেগেছিল মাত্র ছয় মাস। অর্থাৎ ডিভোর্স। কোথায় আর পড়াশোনা! আমার আরেক বান্ধবী তো রিসেন্টলি রেকর্ড করে ফেললো তার মেয়েকে নিয়ে। কয়েক দশক আগে টেলিফোনে বিয়ে হতো। অর্থাৎ যেহেতু পাত্র বিদেশে থাকে ও আসতে পারবে না। কাজেই কাজি ডেকে টেলিফোনের মাধ্যমে ‘কবুল’ বলে বিয়ে করে সেইফলি পাত্রীকে বরের কাছে পাঠানো হতো। সেই যুগে সেল ফোন ছিল না। তো এই বান্ধবী তার মেয়ের বিয়ে দিলো আই ফোনের মাধ্যমে। তারপর সেইফলি মেয়েকে তার পছন্দের বরের কাছে যাওয়ার পারমিশন মিললো মা’র থেকে।

আমি সত্যি এই সমাজকে বুঝি না। যেই সমাজে বিত্তবানদের সবকিছু সাতখুন মাফ। সেই সমাজে ওদেরই এগিয়ে আসা উচিত। নিজের মেয়েকে বলার কথা, ‘যা মা, বিশ্ব দেখে আয়। আমি আছি তোর সাথে’, যেই দেশে  আদালত রায় দিতে পারেন, বিয়ে ছাড়াই এই দেশে দুইজন নারী-পুরুষ আইনত একসঙ্গে থাকতে পারবে। তবে আমাদের সমাজে আমাদের শহুরে মানসিকতায় এমন ভণ্ডামি কেন? বিদেশে নিজের বাচ্চাদের লিভ টুগেদার নিয়ে আমরা মুখে কলুপ এঁটে রাখি। কারণটা কী?

জীবনকে জানতে হলে জীবন-যাপন করতে হয়। জীবনের অভিজ্ঞতার ওপরে কোনও শিক্ষা নেই। উপদেশেও কাজ হয় না। ইয়ু হ্যাভ টু লিভ ইট টু লার্ন ইট। সহি না গলদ—সেটা পরে। আগে তো দরকার সাহস। জীবনের সবচেয়ে বড় নিশ্চয়তা যেখানে অনিশ্চয়তা। সেখানে ‘সেইফটির’ নামে নিজ মেয়েদের পায়ে বেড়ি বাঁধতে থাকবো কতদিন?

বিশ্ব কী বলে?

সৌদি আরবের নারীদের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে না হয় কথা নাই-ই বলি। বিবিসি রিপোর্ট অনুযায়ী চীনে নারীদের মাইনিং, টানেল ইঞ্জিনিয়ারিং, নেভিগেশন ও এই ধরনের বিভিন্ন বিষয়ে নারীদের পড়াশোনার ওপর নিষেধাজ্ঞা আছে। এই ব্যানকে চীনে বলা হয়েছে ‘মেইড আউট অব রেসপেক্ট টু উমেন’। রাশিয়াও পিছিয়ে নেই নারী শিক্ষায় নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে। যেমন—কাঠ মিস্ত্রি, অগ্নি নির্বাপক, ট্রেইন চালনা, মুক্তা বাছাই প্রভৃতি। তবে বিবিসি’র তথ্য অনুযায়ী রুশ নারীরা এসব কাজ করতে বা শিখতে পারবে যদি শুধু প্রমাণ করা যায় যে, ক্ষেত্রটি নারীর জন্য ‘সেইফ’। ইসরায়েলি নারীদের এখনও তালাক দেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আছে। স্বামীর পারমিশন বাঞ্ছনীয়। সুদানে নারীদের পোশাক সমাজের চোখে inappropriate হলেই ৪০টি বেত্রাঘাত। ভারতের গুজরাটের অনেক গ্রামের অবিবাহিত নারীর মোবাইল বা সেলফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা  আছে। স্বামীকে তার নাম ধরে ডাকাটা নিষেধই বটে। এমনকি খোদ ইংল্যান্ডে নারী ফুটবল দল ৭০ দশক অব্দি অনুমতি পায়নি সব স্টেডিয়াম ব্যবহারের। ব্রিটিশ আর্মি ১৯৩০ সাল পর্যন্ত নারীদের অলিম্পিক দেখার অনুমতি পর্যন্ত দেয়নি। বলাই বাহুল্য, এই নিষেধাজ্ঞার নোট লিখতে গেলে মহাভারত লেখার সমান হয়ে যাবে।

কী ভাবছেন? মার্কিন নারীদের নিষেধাজ্ঞা নেই? মার্কিন নারীরা স্বাধীনচেতা নারীদের মধ্যে অন্যতম হলেও ওদের এসব নিষেধাজ্ঞার অনেক চ্যালেঞ্জ পার হয়ে হতে এসেছে। মজার কথা হলো, ১৯০৮ সাল পর্যন্ত রাস্তা-হোটেলসহ পাবলিক সব স্থানে প্রকাশ্যে মার্কিন নারীদের ধূমপান নিষেধ ছিল। এরপর কিছু সাহসী নারী নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটন রাস্তায় সিগারেট ধরিয়ে প্রতিবাদ জানায় এবং প্রেসের কাছে এই হাস্যকর নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে জানায়। দ্য মিউজিয়াম অব দ্য সিটি অব নিউইয়র্কের তথ্য অনুযায়ী, ১৯২৭ সালে এই নিষেধাজ্ঞা উঠানো হয়।

১৯৭০ সালে যেমন—ক্যাট স্টিভেনস এর গান ‘বেবি বেবি ইট’স এ ওয়াইল্ড ওয়ার্ল্ড আউট দেওয়ার’ গানটি সুপারহিট ছিল। সেখানে এক প্রাক্তন প্রেমিক তার প্রাক্তন প্রেমিকাকে ইনিয়ে বিনিয়ে বলে যায়, ওহ প্রিয় তুমি যেও না, বাইরের পৃথিবীটা বড়ই ভয়ঙ্কর। তেমনি ৭০ দশক মার্কিন নারীদের নিষেধাজ্ঞার দেয়াল ধসানোর স্বর্ণযুগ ছিল বলা যায়। যেমন—জন্মনিরোধক পিল মার্কিন কুমারী নারীদের জন্য নিষেধ ছিল। ‘৭২ সালে সুপ্রিম কোর্ট তা সব নারীর জন্য উন্মুক্ত করে। শুধু তাই নয়, একা নারীরা কোনও ব্যাংকে ক্রেডিট কার্ড অ্যাপ্লাই করতে পারতো না, পুরুষ যৌথস্বাক্ষর ছাড়া। এই ‘৭০ দশকেই এই নিষেধাজ্ঞার অবসান ঘটে। মাত্র ‘৭৫ সালে কোর্টে জুরি বোর্ডে নারীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৯২০ সাল পর্যন্ত সমুদ্র সৈকতে নারীদের পোশাকের ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। সত্যি বলতে কী, আজও ওই দেশের নারীদের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন রাইটে যুদ্ধ চালিয়েই যেতে হচ্ছে।

নাতি এসে বলবে, কবরে কেন শুয়ে আছ? ইটস নট সেইফ আউট দেয়ার

আলবার্ট আইনস্টাইন শুধু বৈজ্ঞানিক ফরমুলা দিয়েই ক্ষান্ত ছিলেন না। নারীদের জন্য দারুণ একটা কোটেশন আছে তার। ‘যে নারী জনতার পিছে পিছে চলে, তার গন্তব্য ওই জনতার চেয়ে বেশি হবে না। কিন্তু যে নারী একাকি চলা শুরু করে, তার পথচলা এমন স্থানে শেষ হতে পারে, যেখানে কেউ আজও যায়নি’। সবসময় যদি সমাজের বা পুরুষের তৈরি নিয়মে আমরা চলি, তবে বেগম রোকেয়া বা মাদার তেরেসা বা প্রীতিলতা বা আরও বহু নারীর সৃষ্টি হতো না।

 ছোটবেলা থেকেই ওখানে যাবি না, সেইফ না। ওটা করবি না, সেইফ না, শুনতে শুনতে আমরা নারীরা বড় হই। বাবা’র বাসা থেকে স্বামীর বা শ্বশুরবাড়ি ট্রান্সফার হওয়ার পর তখন নতুন করে শুরু হয় নিষেধাজ্ঞার লিস্ট। এই আমাদের জীবন। এই চলছে এখনও। হয়তো বা আমরা মায়েরাই নিজের অজান্তে নিজ কন্যাদের স্বপ্ন দেখাতে ভয় পাই। ভয় পাই ওদের স্বাধীনতা দিতে। কখন যেন ওদের পায়ে বেড়ি পরিয়ে ফেলি। আবার যখন আমরাই নারীরা বুড়ো বয়সে পৌঁছি, তখন নিজের সন্তানরাই শুরু করে এটা করো না। ওখানে যাবে না। মৃত্যু আসার আগেই তারা নিজ অজান্তেই যেন আমাদের মেরে ফেলে। নিজের কথা বলতে গেলে এখন নিজের ছেলে-মেয়ের কাছেই শুনতে হয়, মা এটা করো না, তোমার বয়স হয়েছে। মা ওখানে যেও না, তোমার শরীরে কুলাবে না। ওটা ঠিক  না। ওটা করো না। কথাগুলো যেমন আমাদের মায়েরাও বোঝেনি বা ভীত ছিল, আমরা মা হয়েও কি পেরেছি নিজেদের যাপিত জীবনে নিষেধাজ্ঞার বাইরে বেরিয়ে আসতে? আমাদের মেয়েরা যেন পায়ের বেড়ি পরে না বেড়ায়, সেটার দিকে একটু লক্ষ রাখি। প্রায় বছর বিশেক আগে তাসলিমা নাসরিনের লেখা—‘যাবো না কেন, যাবো’ আমায় নাড়া দিয়েছিল ভীষণভাবে। কিন্তু পেরেছি কি নিষেধাজ্ঞার গণ্ডি পেরোতে?

আমার তো মনে হয় যখন কবরে শুয়ে থাকবো, তখনো নাতি এসে বলবে, ‘নানু কবরে কেন শুয়ে আছো? ইটস নট সেইফ আউট দেয়ার’। কিন্তু কানে গুনগুন করে একটা গানই বাজে আমার। বন জোভি’র

It’s my life
It’s now or never
I ain’t gonna live forever
I just want to live while i am alive.

লেখক: সাংবাদিক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ