কওমি মাদ্রাসার স্বীকৃতি ও ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা ব্যবস্থা

Send
ফারজানা মাহমুদ
প্রকাশিত : ১৩:২২, নভেম্বর ২৫, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:২৩, নভেম্বর ২৫, ২০১৮

ফারজানা মাহমুদদেশে দুই ধরনের মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলিত–সরকার নিয়ন্ত্রিত আলিয়া মাদ্রাসা ও বেসরকারি তদারকিতে পরিচালিত কওমি মাদ্রাসা। ২০১৬ সালে দেশে প্রায় ১৫ হাজার কওমি মাদ্রাসা ছিল, যেগুলো কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের (বেফাকুল মাদারিসির আরাবিয়া-বেফাক) অধীনে পরিচালিত। এসব মাদ্রাসায় মূলত কোরআন-হাদিস সম্পর্কে বিশ্লেষণধর্মী শিক্ষা দেওয়া হয়ে থাকে। বাংলা, ইংরেজি, অঙ্ক, সাহিত্য বা সমাজ-বিজ্ঞানের মতো বিষয়গুলো শুধু অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শেখানো হয়ে থাকে। 
কওমি শিক্ষা ব্যবস্থা কোরআন ও ইসলাম ধর্ম নিয়ে আবর্তিত, যেখানে আধুনিক বিজ্ঞান, বৈশ্বিক জ্ঞান ও কারিগরি দক্ষতার ওপর কোনও জোর দেওয়া হয় না। স্বভাবতই এসব শিক্ষার্থী অন্যান্য মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের থেকে অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে থাকে এবং সরকারি বেসরকারি দাফতরিক গুরুত্বপূর্ণ পদে সুযোগ করে নিতে পারেন না। দীর্ঘকাল সরকারি তত্ত্বাবধানহীন থাকায় ও সনদের স্বীকৃতি না পাওয়ায় কওমি শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষাজীবন শেষে সাধারণত বেসরকারি মুসলিম অনুদান সংস্থা, কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক, মসজিদের ইমাম বা খতিবের পেশায় নিজেদের সম্পৃক্ত করতে পারতেন।

আধুনিক পাঠ্যসূচির অনুপস্থিতি, বৈশ্বিক বাজার সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা, শিক্ষার উপাদান, শিক্ষকদের মান, দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা ও রাজনৈতিক জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রে কওমি শিক্ষার্থীদের দৃষ্টিভঙ্গি সুদূর প্রসারী না হওয়ায় তারা আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও জাতি গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারছেন না। অনেক ক্ষেত্রে এই তরুণেরা জীবনের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে হতাশাগ্রস্ত হয়ে ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা ও সন্ত্রাসবাদের দিকেও ঝুঁকে পড়েন।

সরকার কওমি শিক্ষা ব্যবস্থাকে স্বীকৃতি দিয়েছে, যার ফলে যোগ্যতায় কওমি মাদ্রাসা থেকে পাস শিক্ষার্থীরা এখন অন্যান্য মাধ্যম থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের সমতুল্য হিসেবে গণ্য হবেন। কিন্তু এই স্বীকৃতিকে অনেকেই ধর্মনিরপেক্ষতা এবং ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক মনে করছেন। এটি সম্পূর্ণভাবে ধর্মীয় শিক্ষা ব্যবস্থার একটি মাধ্যম। কিন্তু বাংলাদেশের সংবিধান, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে আমরা ভিন্ন চিত্র দেখতে পাই। প্রথমত, দেশের সংবিধান ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে যা বোঝায়, তা পাশ্চাত্যের সঙ্গে মেলে না। পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্ম ও রাষ্ট্রের সম্পূর্ণ ব্যবধান—যেখানে ধর্ম রাষ্ট্রের কোনও ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করে না বা জড়িত হয় না। কিন্তু বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে আমরা বুঝি এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে রাষ্ট্র ধর্মীয় ব্যাপারে নিজেকে সম্পূর্ণ দূরে সরিয়ে রাখে না বরং বিভিন্ন বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্য সৌহাদ্র্যপূর্ণ সম্পর্ক সৃষ্টির চেষ্টা করে এবং সব ধর্মকে সমান মর্যাদা দেয়। ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণয়নের সময় সংসদের ডিবেটে বলা হয়, ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয় বরং ধর্মনিরপেক্ষর মূল উদ্দেশ্য হলো ধর্মের অপব্যবহার রোধ করে বিভিন্ন ধর্মালম্বীর মধ্যে শান্তি  প্রতিষ্ঠা করা।

কওমি মাদ্রাসার শিক্ষা ব্যবস্থাকে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে বিশেষভাবে ইসলাম ধর্মকে প্রাধান্য দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতাকে বা ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার বিষয়টি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। কারণ, এটি একটি প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা, যা এই উপমহাদেশে বহুকাল ধরে বিদ্যমান আছে। নতুন করে এই ব্যবস্থার উদ্ভুদ হয়নি। প্রচলিত এই শিক্ষাব্যবস্থাকে অস্বীকার করে বা সম্পূর্ণ বিলোপ করলে তা দেশের বিশাল এক জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় চেতনাকে অস্বীকার করা হবে। একইসঙ্গে অংসখ্য তরুণের ভবিষ্যৎ প্রশ্নবিদ্ধ হবে। ধর্মীয় শিক্ষা ব্যবস্থা বাঙালি জাতির সঙ্গে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত এবং এর সাক্ষী আমাদের ইতিহাস। পাকিস্তান শাসনামলে ইসলামিয়াতকে প্রাইমারি ও মাধ্যমিক স্তরে বাধ্যতামূলক করা হয়।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ধর্মনিরপেক্ষ সরকার ১৯৭২ সালে শিক্ষা কমিশন গঠন করে, যা ১৯৭৩ সালে এই সংক্রান্ত একটি অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে কমিশন ধর্মকে শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে আলাদা করার সুপারিশ করে। কিন্তু প্রতিবেদনটি যখন প্রশ্ন আকারে জনসম্মুখে তুলে ধরা হয়, তখন দেখা যায়, মাত্র ২১ ভাগ শিক্ষিত বাঙালির কাছে প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য হয়। প্রায় ৭৫ ভাগ অভিমত প্রকাশ করেন যে, ধর্মীয় শিক্ষা আমাদের শিক্ষা ও সমাজ ব্যবস্থার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই প্রতিবেদনে প্রাপ্ত তথ্যই বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থায় ধর্মীয় শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে।

কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে প্রচলিত এবং পৃথিবীর অসংখ্য দেশে চার্চের মাধ্যমেও প্রাপ্তবয়স্কদের খ্রিস্ট ধর্মীয় উচ্চশিক্ষা দিয়ে থাকে। এই অবস্থায় কওমি শিক্ষাকে অস্বীকার করার কোনও প্রেক্ষাপট তো নেই-ই, বরং স্বীকৃতি দেওয়াটাই একটি সময়পযোগী সিদ্ধান্ত হয়েছে। আশা করা যায়, এই স্বীকৃতির ফলে কওমি  শিক্ষার্থী/ অভিভাবক/  শিক্ষকদের  মধ্যে  আধুনিক  শিক্ষার  আগ্রহ  জন্মাবে, যা  তাদের  চাকরির  ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার জন্য অবশ্যই শিক্ষণীয়। কওমি মাদ্রাসাগুলো অদূর ভবিষ্যতে ছাত্রদের সমান সুযোগ ও প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য তাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় ইসলামের পাশাপাশি আধুনিক বিজ্ঞান ও কলার ওপরও জোর দেবেন, যেন শিক্ষার্থীরা পরবর্তী সময়ে জাতি গঠনে মূল্যবান ভূমিকা রাখতে পারে। এই সংক্রান্ত প্রকাশিত গেজেট অনুযায়ী কওমি মাদ্রাসা কমিটি, যা কওমি শিক্ষা ব্যবস্থা নিরূপণ ও নিয়ন্ত্রণ করে, তারা সরকারকে তাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবহিত করবেন। সব ধরনের রাজনীতি থেকে তারা দূরে থাকবেন। এর মাধ্যমে সরকার কওমি  শিক্ষা ব্যবস্থায় সহযোগিতার পাশাপাশি নজরদারির ও সুযোগ উন্মুক্ত করেছে, যা সুদূর প্রসারী ফল বয়ে আনতে পারে।

কওমি শিক্ষাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি না দেওয়ায় বহুদিন যাবৎ অসংখ্য কওমি শিক্ষার্থী চাকরিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বঞ্চিত হয়েছে, যা তাদের অনেক ক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেছে। বর্তমানে ধর্মের নামে যে সংঘর্ষ হচ্ছে বা ধর্মের অপব্যবহার করে যুবসমাজকে বিপথে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তা রোধে সংবাদ মাধ্যমে ছাড়াও কওমি মাদ্রাসাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এই ক্ষেত্রে মাদ্রাসাগুলোকে সঠিকভাবে পরিচালিত ও ব্যবহার করা গেলে তা ইসলামের সঠিক ও সময়োপযোগী ব্যাখ্যা দিতে পারে, যা ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র বা বাক স্বাধীনতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয় বরং সামঞ্জস্যপূর্ণ। সুতরাং কওমি শিক্ষা ব্যবস্থার স্বীকৃতি এমন একটি পথ, যাকে কাজে লাগিয়ে এই শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিককরণের মাধ্যমে বাংলাদেশের  একটি বিশাল জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করা যাবে। একইসঙ্গে বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষতার পরিচিতিকে আরও সমুন্নত করা যাবে।

লেখক: আইনজীবী

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ