কী দেবে ‘সম্প্রচার সম্মেলন’?

Send
সাইফুল হাসান
প্রকাশিত : ১৪:৩৩, ফেব্রুয়ারি ০৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৩৮, ফেব্রুয়ারি ০৭, ২০১৯

সাইফুল হাসানবছর তিনেক আগে রোজার ঈদের দিন, একটি টেলিভিশনের নিউজ এডিটরসহ তিনজনের চাকরি নেই হয়ে গেলো। কেন বা কোন অপরাধে তা বলা হলো না। এমনকি নোটিশও দেওয়া হয়নি। শুধু পরদিন থেকে অফিসে না আসার নির্দেশটা মানবসম্পদ বিভাগ থকে জানিয়ে দেওয়া হয়। যদিও, সাংবাদিকদের ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার মুখে চাকরি ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলো প্রতিষ্ঠানটি।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের অনিয়ম নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ার কারণে একজন প্রতিবেদককে চাকরিচ্যুত করার উদ্যোগ নেয় একটি টেলিভিশন। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হলেও কারও কিছু করার ছিল না। কারণ, প্রতিষ্ঠানটির মালিক-কর্মকর্তাদের স্বৈরাচারী মনোভাব। যা হোক, ওই প্রতিবেদকের চাকরি না গেলেও, তাকে রিপোর্টিং থেকে সরিয়ে অনলাইনে পাঠানো হয়। যতদূর জানি, তাকে আর রিপোর্টিংয়ের সুযোগ দেওয়া হয়নি। অথচ সে ছিল ওই টেলিভিশনের সেরা প্রতিবেদকদের একজন।

অপর আরেকটি ২৪ ঘণ্টার খবরের টেলিভিশনের প্রথম বছর শেষে, সবাইকে যখন বেতন বৃদ্ধির চিঠি দেওয়া হচ্ছিলো, একই সঙ্গে কয়েকজন বিভাগীয় প্রধানকে দেওয়া হয় অব্যাহতির চিঠি। কেন বা অপরাধটা কী তার উল্লেখ ছিল না। এমন বহু ঘটনা-দুর্ঘটনা, অন্যায়-অনিয়মের সাক্ষী দেশের বেসরকারি খাতের টেলিভিশন বা সম্প্রচার মাধ্যমের কর্মীরা।

টেলিভিশন বা সম্প্রচার মাধ্যমের কর্মীরা, কতটা অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকে সে সম্পর্কে ধারণা দিতেই এসব ঘটনা তুলে ধরা হলো। হাতেগোনা দু-একটি প্রতিষ্ঠান বাদে এই চিত্র, টেলিভিশন, রেডিও, পত্রিকা সব জায়গায় সমানই মনে হয়। সে তুলনায় সুযোগ-সুবিধা বেশিরভাগ টেলিভিশনে নেই বললেই চলে। বরং, চাকরির অনিশ্চয়তা, নিয়মিত বেতন-বোনাস না হওয়া, বছরের পর ইনক্রিমেন্ট বন্ধ, অতিরিক্ত কাজের চাপ, বিভিন্ন মহলের ন্যায্য-অন্যায্য অনুরোধ-আদেশ রক্ষা, হুমকিসহ ভয়ানক রকমের চাপ-ঝুঁকির মধ্যে কাজ করতে হয় সম্প্রচার কর্মীদের।

অথচ তাদের সুরক্ষায় কোনও ব্যবস্থা নেই, যেটা পত্রিকার ক্ষেত্রে আছে। যদিও সবাই তা মানছে কিনা সেটা ভিন্ন আলোচনা। প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্রাচ্যুয়িটি, ওভারটাইম, বাৎসরিক ছুটি, ঝুঁকি ভাতা, স্বাস্থ্যবিমাসহ আরও যেসব সুযোগ-সুবিধা পুরো বিশ্বের গণমাধ্যম ভোগ করে তার প্রায় কিছুই নেই বাংলাদেশের সম্প্রচার মাধ্যমে। বরং কর্মীদের কতভাবে ঠকানো যায় (আইনের মধ্যে থেকে বা না থেকে), তার চমৎকার সব উদাহরণ আছে গণমাধ্যমগুলোতে। ফলে একজন সম্প্রচারকর্মী কোনও প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন সেবা দেওয়ার পর যখন চাকরিচ্যুত হন বা ছেড়ে আসেন, তখন তাকে শূন্যহাতে ঘরে ফিরতে হয়। 

অথচ গত দুই দশকে বেসরকারি খাতে অনেক টেলিভিশন বাজারে এসেছে। শত শত কোটি টাকা লগ্নি হয়েছে। বহু মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। অসাধারণ সব কাজ হয়েছে। কিন্তু টেলিভিশন শিল্প হয়ে উঠতে পারেনি। নিজস্ব সমস্যা সমাধানের শক্তি অর্জন করতে পারেনি। সুযোগ-সুবিধা তো বাড়েইনি; বরং দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে।

দৃশ্যমান-অদৃশ্যমান নানা কারণে, বর্তমানে টেলিভিশনের অবস্থা দাঁড়িয়েছে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় সাঁতার কাটার মতো। রাজনৈতিক বিবেচনায় টেলিভিশনের লাইসেন্স প্রদান, নিয়ন্ত্রণ, আপসকামিতা, ব্যক্তিগত লাভের চিন্তা, বিভিন্ন ক্ষেত্রে অযাচিত হস্তক্ষেপ, টেলিভিশনের আধিক্য, বৈচিত্র্যহীন দুর্বল কনটেন্ট, অসুস্থ প্রতিযোগিতা, বিজ্ঞাপনের সংকুচিত বাজার, মানবসম্পদ উন্নয়ন-অনুষ্ঠান নির্মাণ ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের অভাব, দুর্বল বেতন কাঠামোসহ হাজারো প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের সম্প্রচার মাধ্যম।

এরমধ্যেও টেলিভিশনে অসাধারণ প্রতিবেদন, টকশো, প্রামাণ্যচিত্রসহ অন্যান্য অনুষ্ঠান নির্মাণের জন্য কর্মীদের প্রতি সবার কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। দেশের নানা সংকট, সম্ভাবনায় সম্প্রচার কর্মীরা রাতদিন যেভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন তা অতুলনীয় এবং প্রশংসার যোগ্য।

এমন অবস্থায় বহুদিন থেকেই ব্রডকাস্ট বা সম্প্রচার মাধ্যমের সব বিভাগের কর্মীদের জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম বা সংগঠনের অভাব অনুভূত হচ্ছিলো। আগে কয়েকবার বিচ্ছিন্ন কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি।

অবশেষে মাছরাঙা টেলিভিশনের রেজোয়ানুল হক রাজা, একাত্তর টেলিভিশনের শাকিল আহমেদ, এটিএন বাংলার মানষ ঘোষ, আরটিভির মামুনুর রহমান খানসহ বেশ ক’জন সাংবাদিকের উদ্যোগে গত বছর প্রতিষ্ঠিত হয় ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টার বা বিজেসি, যেখানে টেলিভিশনের সব বিভাগের কর্মীদের প্রতিনিধিত্ব আছে এবং সত্যিকার অর্থেই সম্প্রচার মাধ্যমের কর্মীদের একটি প্ল্যাটফর্মের রূপ নিয়েছে। যদিও রেডিওগুলো অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় উদ্যোগটা কিছুটা অসম্পূর্ণ মনে হতে পারে। এই সংগঠনটি পরিচালিত হবে একটি ট্রাস্টি বোর্ডের মাধ্যমে। যারা নীতিগত সব সিদ্ধান্ত নেবে। ট্রাস্টিদের ওপরে উপদেষ্টা পরিষদ। যারা ট্রাস্টি বোর্ড বা বিজেসিকে বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দেবে।

বিজেসি’র উদ্যোগে, আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি, শুক্রবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে অনুষ্ঠিত হবে দিনব্যাপী ‘সম্প্রচার সম্মেলন’। ইতিহাসের প্রথম এই সম্মেলন উদ্বোধন করবেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমীন চৌধুরী। পরে অন্যান্য সেশনে তথ্যমন্ত্রীসহ গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা অংশ নেবেন। আর এই অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়েই আনুষ্ঠানিক পথচলা শুরু হবে বিজেসি’র।

সম্প্রচার কর্মীদের জন্য বিজেসি প্রতিষ্ঠা এবং সম্প্রচার সম্মেলন আয়োজন দুটোই অসাধারণ ঘটনা। যদিও এই সংগঠনটি সাংবাদিক ইউনিয়ন, ফোরাম বা দরকষাকষির কোনও সংগঠন নয়। সম্প্রচার মাধ্যমের কর্মীদের জীবনমান উন্নয়ন ও সার্বিক কল্যাণই একমাত্র উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য। টেলিভিশনে কাজের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝি, এ কাজটিই সম্প্রচার কর্মীদের জন্য সবচেয়ে জরুরি এ মুহূর্তে।

বিজেসির মূল্য লক্ষ্য হচ্ছে, ট্রাস্টের মাধ্যমে বিভিন্ন আর্থিক প্রকল্প গ্রহণ এবং আর্থিক সক্ষমতা অর্জন করা। যেন ক্ষতিগ্রস্ত যেকোনও সদস্যের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব হয়। পাশাপাশি সম্প্রচার কর্মীদের জন্য আবাসন, সম্প্রচার সেন্টার প্রতিষ্ঠা, ইন্স্যুরেন্স, মাল্টিটাস্কিং হতে সাহায্য করা, পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়তা, দেশি-বিদেশি প্রশিক্ষণের আয়োজন, সম্প্রচার সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো সঙ্গে সংযোগ স্থাপনসহ আরও অনেক কাজ করতে চায় বিজেসি। যার কিছুটা বাস্তবায়িত হলেই বাংলাদেশের সম্প্রচার মাধ্যম অন্য উচ্চতায় পৌঁছে যাবে।

লেখার শুরুতে যেসব ঘটনার উল্লেখ করেছি, এসব ক্ষেত্রে সংগঠন হিসেবে বিজেসির কোনও ভূমিকা রাখার সুযোগ নেই সত্য। কিন্তু সংগঠনটি সম্প্রচার কর্মীদের মনোবল বাড়াতে সাহায্য করবে। উদ্দীপনা তৈরি করবে। হতাশা ও ক্ষোভ প্রশমিত করতে সাহায্য করবে। বিপদের দিনের বন্ধু বা অনিশ্চয়তার দোলাচলে থাকা কর্মীদের কিছুটা হলেও আশার প্রদীপ হয়ে পথ দেখাবে বিজেসি– এমন স্বপ্নই দেখছেন সকল সম্প্রচার কর্মী।

ইতোমধ্যেই সম্মেলনকে ঘিরে সম্প্রচার মাধ্যমের কর্মীদের মধ্যে উৎসব শুরু হয়েছে। সাজ সাজ রব পড়ে গেছে টিএসসি ঘিরে। ধারণা করা হচ্ছে, সম্মেলনে প্রায় ১২শ সম্প্রচার কর্মীসহ দেড় হাজার মানুষ উপস্থিত হবেন। যেখানে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরবেন সংগঠনটির নেতৃবৃন্দ। আশা করি প্রতিবছর একটি সম্প্রচার সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। যেখানে সম্প্রচার মাধ্যমের সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ, প্রযুক্তি, প্রাক্কলন, কাঠামো, করণীয়গুলো ওঠে আসবে।

সংবাদকর্মী হিসেবে প্রত্যাশা, সে অনুযায়ী আগামীতে দেশের সম্প্রচার মাধ্যমকে পথ দেখাবে বিজেসি। নিজেদের শক্তি ও সামর্থ্যে শক্তিতে বিকশিত হবে সম্প্রচার মাধ্যম। মর্যাদার সঙ্গে বাঁচবে সম্প্রচার মাধ্যমের ভাই-বোন-বন্ধুরা।

সফল হোক সম্প্রচার সম্মেলন।

লেখক: সাংবাদিক।

[email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ