পাকিস্তান দায় এড়াবে কীভাবে

Send
মোস্তফা হোসেইন
প্রকাশিত : ১৫:৩৮, মার্চ ০৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৩৯, মার্চ ০৩, ২০১৯

মোস্তফা হোসেইনকাশ্মিরের পুলওয়ামায় ভারতীয় প্যারা মিলিটারি বাহিনীর কনভয়ের ওপর পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন জইশ-ই-মোহাম্মদের হামলার পর যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তার কমবেশি প্রভাব সার্কভুক্ত দেশগুলোতেও পড়তে পারে। পারমাণবিক মারণাস্ত্রের অধিকারী দুটি দেশের উত্তেজনা অন্যদিকে গোটা দক্ষিণ এশিয়ায়ও উদ্বেগ ছড়িয়ে দিতে পারে। আর অশান্তির আভাস হওয়ায় বিশ্বকেও নিরুত্তাপ রাখতে পারে না।
এই মুহূর্তে দুটি দেশের নাগরিকদের মধ্যে উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে এবং অর্থনৈতিক গতিকে যে কিছুটা হলেও কমিয়ে দিতে পেরেছে, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। পাকিস্তানে ইমরান খানের নেতৃত্বাধীন সরকার এখনও অভিষেককাল পার করছে। রাষ্ট্রক্ষমতায় নবাগত ইমরান খানের রাজনৈতিক দলটিও পাকিস্তানের বয়সের তুলনায় নবীনই বলতে হবে। এমন পরিস্থিতিতে দেশ আক্রান্ত হওয়া কিংবা বিদ্যমান জঙ্গিদের তৎপরতা বৃদ্ধি স্বাভাবিকভাবেই তাকে উৎকণ্ঠিত করবে। বিশেষ করে অর্থনৈতিক দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর তুলনায় অনেক পিছিয়ে থাকা দেশটিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে যে নিরাপদ পরিবেশ জরুরি, তা কিন্তু বিঘ্নিত হচ্ছেই। এমনিতেই জঙ্গিপ্রধান দেশ হিসেবে বিশ্বব্যাপী নিন্দিত ওরা। এই নিন্দার ভারটা আরেক ধাপ বেড়ে গেলো এই ঘটনার পর। ফলে এটা শুধু অভ্যন্তরীণভাবেই নয়, সার্কভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে তাদের বাণিজ্য সম্পর্ককেও আঘাত করবে। বাণিজ্য বৈষম্য বেড়ে যেতে থাকবে আগের তুলনায়। যদি ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনাকে সহজেই নিরসন করা না যায়, পাকিস্তানকে মূল্য দিতে হবে ভারতের তুলনায় বেশি। আর সেই কারণটি যে ইমরান খান বুঝতে পেরেছেন, সেটাও বোঝা যায়। বিশেষ করে ভারতের প্রতি আলোচনার আহ্বান জানানোর মধ্য দিয়ে ইমরান খান তা-ই প্রমাণ করেছেন। তিনি বলেছেন, ভারত ও পাকিস্তান যদি পরস্পরের বিরুদ্ধে অস্ত্র ব্যবহার করে তা যে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীদ্বয়ের নিয়ন্ত্রণে থাকবে না তা স্পষ্ট। যুদ্ধের পরিণতি যে কী হতে পারে সে বিষয়েও তিনি উল্লেখ করেছেন। পুলওয়ামারের ঘটনাকে দুঃখজনক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন স্পষ্টত। প্রশ্ন হচ্ছে, ১৪ ফেব্রুয়ারি ঘটে যাওয়া এই দুঃখজনক ঘটনার পর তিনি কি পদক্ষেপ নিয়েছেন? তিনি কি জঙ্গি দমনে আগের চেয়ে বেশি তৎপর হয়েছিলেন? ভারতীয় বিমানবাহিনী যখন পাকিস্তানি সীমানার অভ্যন্তরে গিয়ে বোমা হামলা করলো, তখন তিনি এভাবে জরুরি বৈঠক ডেকে ভারতের প্রতি আহ্বান জানালেন কেন। এটা তো তিনি পুলওয়ামার ঘটনার পরপরই করতে পারতেন। যদিও পাকিস্তানের পক্ষে এটা অস্বাভাবিক, তারপরও সুন্দর হতো ১৪ ফেব্রুয়ারির পরপরই উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কোনও প্রতিনিধিদলকে ভারতে পাঠাতে পারতেন। তিনি কি বুঝতে পারেননি ৪০ জন জওয়ান হারানোর কোনও ব্যথা ভারতকে উত্তেজিত করতে পারে? আজকে তিনি যে ভাষায় ভারতকে আহ্বান জানাচ্ছেন, সেটুকু তো তিনি ঘটনার পরপরই জানাতে পারতেন। তার বক্তব্যকে বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, তিনি ভারতের ওপর এই আঘাতকে জঙ্গিদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে রাষ্ট্রীয় দায়মুক্তির চেষ্টা করেছেন। তার ধীরে এগিয়ে চলা নীতি কিংবা পরোক্ষভাবে জঙ্গি হামলাকে সমর্থন করায় বালাকোটে ভারতীয় বোমাবর্ষণের মতো ঘটনাকেই নিশ্চিত করেছে। পাকিস্তানিরা বলছে, ভারতীয় বোমাবর্ষণের কারণে পাকিস্তানের কোনও হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। যদিও ভারত দাবি করছে– এতে জঙ্গিদের বহুসংখ্যক প্রাণ হারিয়েছে। এবং ভারতের একজন বিমানসৈনিক পাকিস্তানের হাতে বন্দি হয়েছে। এটা দুই পক্ষই স্বীকার করছে।

অন্যদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে আর ক’দিন বাদেই নির্বাচনি পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হবে। ভারতে চলছে নির্বাচনি উত্তাপ। ঠিক এই মুহূর্তে পুলওয়ামার ঘটনা এবং বালাকোটে বোমাবর্ষণ নরেন্দ্র মোদির জন্য শাপেবর হিসেবেও দেখা দিতে পারে। আবার বিরূপ ফল দিতে পারে এমনটাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। পুলওয়ামায় পাকিস্তানি জঙ্গি হামলার পর ভারতের নাগরিকদের উত্তেজনাও কম নয়। শক্তি ও অর্থনীতির প্রতিযোগিতায় দ্রুত অগ্রসরমান ভারতের গতি বিঘ্নিত করার জন্য এই উত্তেজনা আগুনে ঘি ঢেলে দেওয়ার মতো ফল এনে দিতে পারে (যদি না এখানেই ঘটনার ইতি না ঘটে)। নির্বাচনি রাজনীতির ক্ষেত্রে পাকিস্তান বিরোধিতা কতটা মোদিকে ফল এনে দিতে পারে সেটাও কিন্তু স্পষ্ট নয়। কারণ, পাকিস্তান বিরোধিতার ক্ষেত্রে বিজেপি এবং কংগ্রেসসহ সব ছোট-বড় দলের মধ্যে মহা ঐক্য বিদ্যমান। এতে দল হিসেবে বিজেপি আলাদা কতটা সুফল ভোগ করবে তা বলা মুশকিল। তবে নির্বাচনি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় উভয়পক্ষই নতুন একটি উপাদান পেয়েছে তা বলা যেতে পারে।

আবার বালাকোট হামলার বিষয়টি যদি বিশ্লেষণ করা হয় তাহলে দেখা যাবে– রাজনৈতিক কারণে নরেন্দ্র মোদিকে তা করতেই হতো। এবং তিনি পুলওয়ামার ঘটনার পর প্রায় দুই সপ্তাহ অপেক্ষা করেছেন পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়া জানার জন্য। সেদিক দিয়ে বিবেচনা করলে বালাকোটে বিমান হামলা পর্যন্ত তিনি পাকিস্তানকে সুযোগ দিয়েছেন এটা মনে করা যেতে পারে।

তবে নরেন্দ্র মোদিকে এমনটা বলা যাবে না, তিনি নির্বাচনি প্রচারণায় সুবিধা অর্জনের জন্য এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করেছেন। যদিও পাকিস্তানের কিছু পত্রিকা এমনটাই দোষারোপের চেষ্টা করেছে। বালাকোটে বিমান হামলাটা কিন্তু পুলওয়ামার ঘটনার রেশ ধরে ঘটেছে। আর সেক্ষেত্রে পাকিস্তানই প্রথম আঘাতকারী হিসেবে চিহ্নিত।

পাকিস্তানে কোনও সামরিক হামলা করেনি ভারত। এটা তাদের বক্তব্য। তারা বলছে, জইশ-ই-মোহাম্মদের আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যেই তারা এই আক্রমণ চালিয়েছে। এক্ষেত্রে পাকিস্তান যদি বলে বালাকোট তো পাকিস্তানের ভূমি, তারা যদি বলে পুলওয়ামায় পাকিস্তানি সৈন্যরা অর্থাৎ পাকিস্তান রাষ্ট্র আক্রমণ করেনি, তাহলেও যুক্তিতে তারা হেরে যাবে। তাদের জবাব দিতে হবে, বালাকোট যেহেতু তাদের ভূমি তাহলে বালাকোটে জঙ্গি আস্তানা হয় কী করে। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্র হিসেবে বড় দায়িত্ব হচ্ছে জঙ্গিমুক্ত হওয়া। সেই কাজটি কি তারা করতে পেরেছে? তাদের ভূমিতে জন্ম নেওয়া জঙ্গিরা যখন অন্য রাষ্ট্রের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে এবং তারা যখন জঙ্গি দমনে ব্যর্থ হবে তখন ক্ষতিগ্রস্ত রাষ্ট্র নিজের স্বার্থেই জঙ্গির বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে। আর সেই কাজটি বালাকোটে বিমান হামলার মাধ্যমে ভারত করেছে। সুতরাং পাকিস্তান জঙ্গিদের আলাদা গোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করে নিজের দায় এড়াতে পারবে না।  

পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ শাহ কোরেশির ভাষায়, ভারতীয় আগ্রাসী হামলার জবাব দেওয়ার কথা গুরুত্বসহ চিন্তা করছে পাকিস্তান। কিন্তু তিনি যে মুহূর্তে এই ভাষ্য প্রদান করেন তার ২৪ ঘণ্টা না যেতেই প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান সুর নামিয়ে আলোচনার আহ্বান জানান ভারতের প্রতি। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কড়া সুর আর প্রধানমন্ত্রীর নরম সুর, কোনটা যে আসল রূপ তা বোঝা যাচ্ছে না এখনো। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর প্রত্যাশাও হতে পারে নরমের পক্ষে। একইসঙ্গে পাকিস্তানি জঙ্গিদের দমনের বিষয়েও। যদি পাকিস্তান জঙ্গি দমনে আন্তরিক না হয় তাহলে প্রতিটি জঙ্গি হামলার জন্য পাকিস্তানকেই মাসুল গুনতে হবে। জঙ্গি গ্রুপকে নিষিদ্ধ করে দিয়ে নিজের দায় এড়াতে পারবে না পাকিস্তান।

সবারই প্রত্যাশা থাকবে, পাকিস্তান আর কোনও জঙ্গিকে মদত দেবে না। পাকিস্তানের জঙ্গিরা অন্য রাষ্ট্রের হুমকি হয়ে দাঁড়াবে না। আর এটি নিশ্চিত করতে হবে পাকিস্তানকেই। এই জঙ্গির কারণে পাকিস্তানের ভূমিতে অন্য দেশের বিমান হামলা নতুন কিছু নয়। পাকিস্তানের বন্ধুরাষ্ট্রই পাকিস্তানি জঙ্গিদের দমনের জন্য বিমান হামলা করেছে। সুতরাং ভারতকে একা দোষারোপ করার সুযোগও তদের নেই তেমন একটা। ইমরান খান গণমাধ্যমে আলোচনার প্রস্তাব দিয়ে দায় এড়ানোর চেষ্টা না করে সরাসরি নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে কথা বলতে পারতেন। এতে দুটি দেশেরই মঙ্গল হতো। আমরা এখনও প্রত্যাশা করবো এই উত্তেজনা দ্রুত প্রশমিত হবে, যার যার পথে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ গ্রহণ করবে।

লেখক:  সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ