ঘুষ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ও কিছু কথা

Send
সারওয়ার-উল-ইসলাম
প্রকাশিত : ১৬:৫৭, আগস্ট ৩০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৩৫, আগস্ট ৩০, ২০১৯

সারওয়ার-উল-ইসলামকর্মকর্তাদের মধ্যে যিনি ঘুষ নেবেন, তার বিরুদ্ধে তো অবশ্যই, যিনি ঘুষ দেবেন তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে সম্প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি আরও বলেছেন, সম্পদ গড়ারও তো সীমা থাকা আছে। এই সম্পদ ছেড়ে একদিন চলে যেতে হবে। সম্পদ বেশি থাকলে পরবর্তী সময়ে ছেলে-মেয়েদের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি হবে।
খুবই তাৎপর্যপূর্ণ কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। সম্পদের প্রতি তার নিজের যেমন কোনও লোভ নেই, তার পরিবারেরও কোনও সময় ছিল না। যে বিষয়ে তার লেখালেখি থেকেও জেনেছি। ‘প্লিজ, সাদাকে সাদা কালোকে কালো বলুন’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন, প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতির ছেলে হিসেবে শেখ কামাল কিছুই করে নাই। শেখ কামাল আবাহনী ক্রীড়াচক্র প্রতিষ্ঠা করে গেছে। সম্পদ বলতে রেখে গেছে তার সেতার আর ক্রিকেটের ব্যাট। আমার স্বামী আণবিক কমিশনে চাকরি করতেন। সীমিত আয়ের মধ্যে দিয়ে চলতে হতো। প্রধানমন্ত্রীর মেয়ে হিসেবে কয়েকটি বাড়ি, শিল্প কলকারখানাসহ অনেক কিছুরই মালিক হতে পারতাম যদি ইচ্ছে করতাম। সে ইচ্ছা কখনোই করিনি।[…] বাবা-মা আমাদের সেই শিক্ষা দিয়েছেন। আমার আব্বা বলতেন, সব সময় নিচের দিকে তাকিয়ে চলবে। তোমার থেকে কে বেশি কষ্টে আছে তাই দেখবে তা হলেই বুঝবে তুমি কেমন আছে?’

আসলে ঘুষ কেন দিতে বাধ্য হয় সাধারণ মানুষ। যেন তার কাজটি হয়রানি ছাড়া নির্বিঘ্নে করতে পারে। এর মানে এই নয়, ঘুষ দেওয়া ভালো। সে দিতে বাধ্য হয়। বলা যায়, তাকে বাধ্য করা হয়। কারণ আমাদের দেশের সেবামূলক প্রতিষ্ঠানসহ সরকারের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে ঘুষ ছাড়া কোনও ফাইলই নিয়মতান্ত্রিকভাবে নড়াচড়া করে না বলে দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে। একে একে সেই ফিরিস্তি দেওয়া যাক–

আপনি ফ্ল্যাট কিনেছেন, এর ক্রয়-বিক্রয় অনুমতি প্রয়োজন। অনুমতি দেবে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ। নিয়ম অনুযায়ী কাগজপত্র দিলে আপনাকে তিন মাসের মধ্যে দিয়ে দেবে, যদি আপনার কাগজপত্র সব ঠিক থাকে। আপনি দিলেন জমা, কিন্তু সপ্তাহের পর সপ্তাহ যাবে আপনি একদিন গিয়ে দেখবেন ফাইল যেখানে আছে সেখানেই পড়ে আছে। আপনাকে হাজিরার জন্য সময় তো দূরের কথা, আজ না কাল আসেন করতে করতে মাস পার করে দেবে। কিংবা অযথা কিছু হয়রানির ভেতরে ফেলে দেবে। এই কাগজ না সেই কাগজ— এভাবে আপনার সময় নষ্ট পাশাপাশি মন মেজাজ খারাপ করে ফেলবে সংঘবদ্ধ চক্র। এর মধ্যে জেনে যাবেন, এক লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে কেউ কেউ সাতদিনের ভেতর অনুমতিপত্র নিয়ে চলে যাচ্ছেন। কিন্তু আপনার ফাইলের ব্যাপারে কারও কোনও মাথাব্যথা নেই। আপনি নিয়মিত যাতায়াত করতে করতে আরও জেনে যাবেন, ফাইল পাস করার জন্য এক লাখ টাকা কোন কোন টেবিলে দিতে হয়। একদম  ছোটো কর্তাসহ বড় কর্তার ড্রয়ারে আপনার টাকার ভাগ চলে যায়। কেউ টেরও পায় না, এতটাই নিরবে সেটা হয়। সম্প্রতি দুদক বা সরকারের অন্যান্য সংস্থা কিছুটা তৎপর হওয়ায় ঘুষের টাকা অফিসের পিয়ন বা অন্যরা অফিসের বাইরে কোথাও নিয়ে থাকে।

এই হলো সরকারের একটি সংস্থার অবস্থা। এভাবে সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর অফিসেও ঘুষ ছাড়া একটি ফাইল যথাযথ নিয়ম অনুযায়ী নড়ে না—এই অভিযোগও আছে। তবে এর মধ্যে যে ব্যতিক্রম নেই, তা না। ব্যতিক্রমও আছে। দেখা গেলো কোনও একটি ফাইলের জন্য সরকারের ঊর্ধ্বতন কোনও কর্মকর্তা বা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ফোন করলেন। তখন বিশেষ কায়দায় দ্রুত ছাড়ার ব্যবস্থা করা হয়।

এর বাইরে আসেন ঢাকা ওয়াসা, তিতাস গ্যাস বা ডেসকো অফিস। আপনার প্রয়োজন মিটার বা বাড়তি বিদ্যুতের লোড। টেবিলে টেবিলে অফিস খরচা বলে একটা শব্দ চালু আছে এইসব প্রতিষ্ঠানে। সেই খরচা ছাড়া সাধারণ মানুষ কোনও ধরনের সেবা পান না।

আর এসব প্রতিষ্ঠানেই সরকারি দলের শ্রমিক সংগঠনের নেতাকর্মীদের ছত্রছায়ায় আবার কখনও সরাসরি মদদে হয়ে থাকে। এটার কারণ হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে হাতে রাখার কৌশল। আপনি এই ঘুষ দেওয়া-নেওয়ার ব্যাপারে হইচই করবেন  অফিসে, আপনাকে হেনস্ত করে ছাড়বে এই শ্রমিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা। প্রয়োজনে এরা পুলিশের সহায়তায় আপনাকে থানায় নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।

প্রধানমন্ত্রীর আহবানের প্রতি জোর সমর্থন রেখে আমার অনুরোধ থাকবে,  সরকারের সেবামুলক প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত গোয়েন্দা সংস্থার লোককে নজরদারিতে রাখা জরুরি। নিয়মানুযায়ী কয়টা ফাইল গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ বা অন্যান্য  প্রতিষ্ঠান ছাড়ছে একটু তদারকির ব্যবস্থা স্বচ্ছভাবে করা জরুরি। দুই-একজনকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করলেই দেখা যাবে দুর্নীতি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ হতে থাকবে। আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে এসব প্রতিষ্ঠানের ভেতর ওই শ্রমিক সংগঠনের তৎপরতা কমিয়ে আনার ব্যবস্থা করা। তাহলেও কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসবে। কারণ, এইসব সংগঠন সরকারের নানা অনুষ্ঠানের দোহাই দিয়ে জন সাধারণের কাছ থেকে পরোক্ষভাবে টাকা পয়সা নিয়ে থাকে। অফিসের ভেতর বাইরে দলীয় ব্যানারে সয়লাব করে রেখে সাধারণ মানুষের মনকে বিষিয়ে তোলে এই শ্রমিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

ঘুষ নেওয়া বন্ধ করা জরুরি। প্রতিটা প্রতিষ্ঠানে কি সরকারের নিয়ন্ত্রণ আছে? সেই প্রশ্নটাও এসে যায়। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কোনও নিয়ন্ত্রণ না থাকার কারণেই প্রধানমন্ত্রীকেই বলতে হয় ঘুষ নেওয়া-দেয়ার বিষয়ে। অর্থাৎ মানুষ যে হয়রানির শিকার হচ্ছেন সেটা প্রধানমন্ত্রীও অবগত।
মানুষকে বিষিয়ে তুলে কীভাবে টাকা নিচ্ছে কেরানি থেকে শুরু করে অফিস পিয়ন। আর সেই টাকার ভাগ বড় কর্তাদের ড্রয়ারে চলে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষ ঘরে ফিরে পরোক্ষভাবে সরকারকেই গালাগাল দিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তো যথার্থই বলেছেন, ‘এত সম্পদ নিয়ে কেউ যেতে পারে না, রেখেই যেতে হয়। আর বেশি সম্পদ পরবর্তী প্রজন্মের ভেতর পারস্পরিক সম্পর্কের অবনতি ঘটায়’।

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা বলেই এই উপলব্ধি তার আছে। এর আগের কোনও রাষ্ট্রপ্রধান এই উপলব্ধি করেনি।

অবশ্যই ঘুষ নেওয়া আর দেওয়া সমান আপরাধ। তবে দাতারা কতটা অসহায় হওয়ার পর ঘুষ লুকিয়ে দিয়ে– চেহারায় হাসি হাসি ভাব করে এইসব রাষ্ট্রীয় সেবামূলক প্রতিষ্ঠান থেকে কাজ সেরে বাড়ি ফেরেন, সেই অনুভবটাও ভেবে দেখা জরুরি।

ঘুষখোর এই কর্মচারী আর কর্মকর্তাদের প্রতি কঠোর হলেই ঘুষ নেওয়া আর দেওয়ার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ সফল হবে। তা না হলে বছরের পর বছর এভাবে চললে আওয়ামী লীগ সরকারের সব অর্জন ম্লান হতে বেশিদিন লাগবে না, এটা হলফ করেই বলা যায়।

লেখক: ছড়াকার ও সাংবাদিক

/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ