শিক্ষকদের শিক্ষাসফরের সুসংবাদ

Send
মোস্তফা কামাল
প্রকাশিত : ১৮:০৮, জানুয়ারি ২৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:১৫, মার্চ ১৮, ২০২০

মোস্তফা কামালশিক্ষকরাও পেতে যাচ্ছেন অভিজ্ঞতার জন্য বিদেশ সফরের বিশাল সুযোগ। অন্যদের চেয়ে এতদিন এই রাজসুযোগে পিছিয়ে ছিলেন তারা। মাটি খনন-ভরাট, আলু ক্ষেত বা লিফট-মোবাইলফোনের মডেল দেখা, মশা মারার উছিলায় দল বেঁধে বিদেশ গেছেন কত পেশার কত জন! সেই তুলনায় নিজেদের বঞ্চিত ভেবে শিক্ষকদের মর্মবেদনায় ভোগা একেবারে অযৌক্তিক নয়। এবার তারও একটা হিল্লে হতে যাচ্ছে। শিক্ষা ও শিক্ষকবান্ধব নির্দেশনা এসেছে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকেই।
শেরেবাংলা নগরে এনইসি সম্মেলনকক্ষে একনেকের সর্বশেষ সভায় নির্দেশনাটি দেন প্রধানমন্ত্রী। দেশে প্রশিক্ষিত শিক্ষকের ঘাটতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, ক্র্যাশ প্রোগ্রাম করে শিক্ষকদের ট্রেনিং দিয়ে আনতে। সংখ্যায় কয়েকশ হলেও তাতে তার আপত্তি নেই। তবু, বিদেশ থেকে তাড়াতাড়ি প্রশিক্ষণ নিয়ে আসুক। প্রধানমন্ত্রীর বরাত দিয়ে মিটিংয়ের পর ব্রিফিংয়ে এমন বর্ণনাই দেন পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান। একনেকের ওই বৈঠকটিতে ২২ হাজার ৯৪৫ কোটি টাকার ৮টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটি হচ্ছে, উপজেলা পর্যায়ে ৩২৯টি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ (টিএসসি স্থাপন-২য় পর্যায়)। এটি বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ২০ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা। পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, উপজেলা পর্যায়ে হতে যাওয়া টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজগুলোয় উপযুক্ত শিক্ষক দিতে হবে। এজন্য শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
কাকতালীয়ভাবে একটা বৈরী সময়ে শিক্ষাসফরের সুযোগ পেলেন শিক্ষকরা। তাদের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর উপলব্ধি ও নির্দেশনা নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী। তা ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছে শিক্ষা সংশ্লিষ্টমহলে। অনেকদিন থেকে শিক্ষকদের বিদেশ থেকে প্রশিক্ষিত করে আনার এমন উদ্যোগের তাগিদ আসছিল এই মহল থেকে। কিন্তু, ইতিবাচক কোনও পদক্ষেপ মিলছিল না। এ পর্যায়ে নির্দেশনা এলো সরাসরি স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে। এর সুবাদে শিগগিরই বিদেশ সফরের সুযোগের আশায় ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে শিক্ষক সমাজে। আবার নির্দেশনাটি এমন সময়ে এলো, যখন সরকারের বিভিন্ন অফিস ও প্রকল্পের কর্মকর্তারা বিদেশ ভ্রমণ করে শিক্ষাসফরের অর্থই পাল্টে দিচ্ছেন। আর পরিকল্পনা কমিশন নেমেছে এসব আনন্দ-ভ্রমণের কাটছাঁটে।

নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রবাসী ভোটার নিবন্ধনের নামে ৪০টি দেশ ভ্রমণের প্রস্তুতিও ভণ্ডুল হয়ে গেছে পরিকল্পনা কমিশনের বাগড়ায়। প্রবাসী ভোটার নিবন্ধনের পাশাপাশি শিক্ষা সফর নামে ইউরোপ-আমেরিকা ট্যুরের হোমওয়ার্ক সাঙ্গ করেছিলেন তারা। ইসির ৫৫ কর্মকর্তার এমন সফরের জন্য ১০০ কোটির বাইরে চাওয়া হয় আরও পাঁচ কোটি টাকা। অভ্যন্তরীণ ভ্রমণ ব্যয়ে খরচ চাওয়া হয়েছে আরও দুই কোটি টাকা। এ সংক্রান্ত দাফতরিক কাগজপত্র পোক্তভাবে গোছানোর পর আটকে দিলো পরিকল্পনা কমিশন। শুধু আটকেই দেয়নি, প্রবাসী ভোটার খুঁজতে সরকারি এত টাকা খরচ করে কেন এত দেশে যেতে হবে, এমন প্রশ্নও তুলেছে। প্রশ্নের পর আবার নিজেরাই বলেছে, এ ধরনের সফরের দরকার নেই। প্রবাসী ভোটার নিবন্ধনের জন্য ৪০ দেশে যাওয়ার প্রস্তাবকে অযৌক্তিক উল্লেখ করে পরিকল্পনা কমিশন থেকে নির্বাচন কমিশনকে বলা হয়েছে, এগুলোর মধ্যে এমন অনেক দেশ রয়েছে, যেখানে এক-দুই হাজার বা সর্বোচ্চ পাঁচ হাজারের বেশি বাংলাদেশি পাওয়া যাবে না। সেসব দেশে ভোটার খোঁজার কাজটি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমেই করা সম্ভব।

এর কাছাকাছি সময়ে পরিকল্পনা কমিশন নাকচ করে দিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ইউরোপ বা জাপান থেকে দেড় লাখ টাকা দরে ময়লা ফেলার ডাস্টবিন আমদানির আয়োজনও। তাদের বাধায় জাপান থেকে ওই মূল্যে ৩৬০টি ওয়েস্টবিন আমদানিকর্মটা থেমে গেছে। বিভিন্ন অভিজ্ঞতার জন্য বিদেশ সফর আর দেশে কয়লা-ময়লা, বালিশ-পর্দা সবখানেই গৌরিসেনের টাকার উৎসবের মধ্যে পরিকল্পনা কমিশনের বাগড়া বাধানো ব্যতিক্রমী ঘটনা। বিশেষ করে বিদেশ সফরে এমন বাধা দেওয়ার ঘটনা ক’দিন আগেও ভাবা যায়নি। পরিকল্পনা কমিশন নামের এই প্রতিষ্ঠানটি নতুন জন্ম নেয়নি।

আলু চাষ দেখতে, পুকুর খনন শিখতে, ক্যামেরা বা মোবাইলফোন কিনতে সরকারি টাকায় দল বেঁধে বিদেশ যাওয়ার খবরগুলো গত মাস কয়েক ধরে মানুষের জন্য বিরতিহীন এন্টারটেইনমেন্টের মতো। এগুলোর সঙ্গে বাড়তি যোগ হয়েছে পরামর্শক ফি, গাড়ি কেনা ও ভবন নির্মাণে যাচ্ছেতাই কাণ্ড, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বালিশ কেনা, ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৩৭ লাখ টাকায় পর্দা কেনা, গোপালগঞ্জের শেখ সায়েরা খাতুন মেডিক্যাল কলেজের জন্য সাড়ে ৫ হাজার টাকার বই ৮৫ হাজার ৫০০ টাকায় কেনা, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালকের পবিত্র কোরআন শরিফ না ছেপে টাকা হজম করে দেওয়া, স্বাস্থ্য অধিদফতরে তিন কোটি টাকার যন্ত্র ২৫ কোটি টাকায় কেনা বা স্বাস্থ্য অধিদফতরের এক আফজালের লোপাটের মতো খবর।

এগুলোর কোনোটিতেই পরিকল্পনা কমিশন বা কোনও কর্তৃপক্ষের কারও বাগড়া দেওয়ার কোনও খবর চোখে পড়েনি। তবে, এর আগে, সরকারি কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত বিদেশ সফরে প্রধানমন্ত্রীর বিরক্তি প্রকাশের খবর প্রকাশিত হয়েছে। প্রকল্পের অজুহাতে অহেতুক বিদেশ সফর না করার কঠোর নির্দেশও দিয়েছেন তিনি। এরপরও আলু চাষ, কারাগার, পুকুর খননের মতো কাজ দেখে অভিজ্ঞতা অর্জনের ছুতায় কোটি কোটি টাকা খরচ করে দল বেঁধে বিদেশ সফরের ঘটনা ঘটেছে। কোথাও থেকে বাধা আসেনি। বরং কোনও কোনও প্রকল্প বাস্তবায়নের আগেই কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের বাজেট বরাদ্দ অনুমোদন হয়ে গেছে ম্যাজিকের মতো। ফ্রি-স্টাইলে চলেছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের বিদেশে প্লেজার জার্নি। কে, কখন, কোন বাহানায়, কতবার বিদেশ ট্রিপ দেন, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য মেলে না। তারা কী শিখে এসেছেন, সেই শিক্ষা দেশের কোন কাজে লাগিয়েছেন, সেই খবর নেই। তাদের বিদেশ সফর হিসেবে রাখার কোনও দফতরও নেই।

অভিজ্ঞতা বা প্রশিক্ষণ ট্যুরের ফাঁকে বিদেশে তাদের প্রমোদের টুকটাক তথ্য প্রকাশিত হলেও এতে লাগাম পড়েনি। এবার পড়েছে। লক্ষণ মন্দ নয়। কাকতালীয়ভাবে ঠিক এ সময়েই শিক্ষকদের বিদেশ প্রশিক্ষণের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকতা-উদারতা দেখা যাচ্ছে। লক্ষণ হিসেবে এটিও শুভ। দেশে শিক্ষার হার বাড়ছে। শিক্ষার্থী বাড়ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়ছে। শিক্ষকও বাড়ছে। বিশ্বায়ন উপযোগী শিক্ষা, শিক্ষা ব্যবস্থা ও পদ্ধতির উন্নয়নে শিক্ষকদের উচ্চতর ও পেশাগত শিক্ষার আবশ্যকতা অনেকদিনের। কিন্তু, তা হালে পানি পাচ্ছিল না। তার ওপর বাংলাদেশের শিক্ষা, শিক্ষক ও শিক্ষা পদ্ধতি নিয়ে গরমিল-সমালোচনা সম্প্রতি নতুন মাত্রা পাচ্ছে। ভালো-মন্দ নিয়ে কথাবার্তাও অন্তহীন। পরীক্ষা না দিয়েও পাস করা, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির মেধা তালিকায় পর্যন্ত নাম উঠে যাওয়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বিদ্যাপীঠ থেকে ভুয়া পিএইচডি হাতানোর সাম্প্রতিক খবরগুলো ন্যূনতম কাণ্ডজ্ঞানের মানুষকেও আহত করছে। এ রকম অবস্থায় শিক্ষক প্রশিক্ষণের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর উদারতার একটি ভ্যালু রয়েছে। আবার শিক্ষাসফরের নামে রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকায় কিছু লোকের ফুর্তিতে পরিকল্পনা কমিশনের বাধা দেওয়ার নিউজ ভ্যালুও অনেক।

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন

/এমএনএইচ/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ