১ ফেব্রুয়ারি বিশেষ কিছু ঘটবে?

Send
বিভুরঞ্জন সরকার
প্রকাশিত : ১৮:২৯, জানুয়ারি ৩০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৩০, জানুয়ারি ৩০, ২০২০

বিভুরঞ্জন সরকারআমরা নিজেদের জীবনকে আনন্দময় করে তুলতে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন উপলক্ষ বেছে নিতে ভুল করি না। পৃথিবীর যেমন তিন ভাগ জল আর এক ভাগ স্থল, তেমনি আমাদের অনেকের জীবনেও যেন তিন ভাগ বিষাদ আর মাত্র এক ভাগ আনন্দ। কিন্তু আনন্দের অংশটা বাড়ানোর জন্য আমরা অনেক কিছু থেকেই বিনোদনের উপকরণ খোঁজার চেষ্টা করি। এমনকি একজনের জন্য যেটা বেদনার, সেটা থেকেও হাসির খোরাক পাই। রাস্তায় নিরপরাধ মানুষকে পিটিয়ে মারতে দেখলেও দাঁত কেলিয়ে হাসি, সেলফি তুলি কিন্তু আক্রান্ত ব্যক্তিকে রক্ষা করতে বা বাঁচাতে চেষ্টা করি না। কাজ করার চেয়ে পরামর্শ দিতে পছন্দ করি। ব্যয়ের চেয়ে অপব্যয় বেশি করি। ভেবে কাজ করার চেয়ে হুজুগে ঝাঁপিয়ে পড়তে বেশি পছন্দ করি। নিজে দুর্নীতিমুক্ত না হয়ে অন্যের দুর্নীতির সমালোচনা করি।  অপ্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে বেশি মাতামাতি করি।
নিজে সুযোগের অপেক্ষায় থেকে আরেকজনকে সুযোগসন্ধানী বলে টিটকারি দিতে আমোদ অনুভব করি। মূল্যবোধের অবক্ষয় নিয়ে আক্ষেপ করি কিন্তু নিজে চূড়ান্তভাবে গর্হিত অপরাধে জড়াতে দ্বিধা করি না। স্ববিরোধী আচরণ আমাদের একটি প্রধান জাতীয় বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। পরনিন্দা-পরচর্চায় আমাদের উৎসাহে কমতি নেই। কারও ভালো দেখতে পারি না। প্রশংসা করতে সীমাহীন কার্পণ্য। নিজে নিরাপদ থেকে অন্যকে বিপদের মুখে ঠেলে দিতে প্ররোচিত করি। মুখে রাজনীতির শাপশাপান্ত করি কিন্তু রাজনীতি নিয়ে চায়ের কাপে ঝড় তুলতে আমাদের জুড়ি নেই।

এই সব মনে রেখেও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের নির্বাচন নিয়ে কারও কারও দুঃখবোধ, আক্ষেপ, প্রত্যাশা, আশাবাদ ইত্যাদি দেখে-শুনে আমি তো রীতিমতো বিভ্রান্ত। বুঝতে পারছি না,  কী প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা উচিত। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পরিকল্পনা ও কৌশল, গত কয়েকটি নির্বাচনের অভিজ্ঞতা, নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ইত্যাদি বিবেচনায় নিলে কারও বুঝতে বাকি থাকার কথা নয় যে, ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাচন কেমন হবে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জিতলেও বিতর্ক হবে, হারলেও। তাই জিতে বিতর্ক হওয়াটাকেই আওয়ামী লীগ প্রাধান্য দেবে–এটাই স্বাভাবিক। এরপরও আমরা অনেকেই আকাশকুসুম চয়ন করছি। আশা করছি, এটা যেন প্রহসনের নির্বাচন না হয়, নির্বাচন কমিশন যেন কঠোর অবস্থান নেয়, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী সব প্রার্থী যেন সমান সুযোগ পায়, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হয়। আদতে এগুলোর কোনোটাই হয়তো হবে না, হওয়ার কথাও নয়। তাতে কি ১ ফেব্রুয়ারির পর দেশে বড় কোনও উলটপালট হয়ে যাবে? ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণে যদি আওয়ামী লীগের আতিকুল ইসলাম ও শেখ ফজলে নূর তাপস মেয়র নির্বাচিত হন, বিএনপি যদি সেই ফল প্রত্যাখ্যান করে, এমনকি আন্দোলনের ডাকও দেয়, তাহলেই বা কী হবে? মানুষ আন্দোলনে নামবে? সরকারের পতন হবে কিংবা সরকার বিএনপির সঙ্গে সমঝোতায় আসবে? না, তেমন কিছু হওয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতা দেশে বিরাজ করছে না।

সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে দুই জন বিদেশি কূটনীতিকের তৎপরতাকে বড় করে দেখার কিছু নেই। বিএনপির মেয়র প্রার্থীদের সঙ্গে আমেরিকা ও ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূতেরা দেখা-সাক্ষাৎ করেছেন বলেই এটা মনে করার কারণ নেই যে, নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থীর পরাজয় ঠেকানো যাবে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে ওই দুই কূটনীতিকের নাক গলানোই অনুচিত। নির্বাচন কেমন হবে না হবে, সেটা নিয়ে বিদেশিদের খবরদারি করার সুযোগ আমরাই করে দিয়েছি। তবে তারা নাক গলিয়েও যে বিএনপির কোনও উপকার করতে পারেনি, সেটা অতীতেও  দেখেছি। বিএনপি তো নিয়মিত বিদেশিদের কাছে নালিশ জানাচ্ছে, কী ফল পাচ্ছে তারা? গত দুটি জাতীয় নির্বাচন নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হয়নি। বিএনপিসহ বেশিরভাগ নিবন্ধিত দল নির্বাচনে অংশ নেয়নি। নির্বাচন ভণ্ডুল করার অনেক কসরত করেও বিএনপি-জামায়াত সফল হয়নি। নির্বাচন হয়েছে। টানা দ্বিতীয় মেয়াদে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হয়ে রেকর্ড তৈরি করেছেন। কিন্তু নির্বাচন নিয়ে কত প্রতিবাদ, কত সমালোচনা। দেশের ভেতরে-বাইরে নানামুখী তৎপরতা দেখে কারও কারও মনে হয়েছিল, সরকার বুঝি মেয়াদ পূরণ করতে পারবে না। একবছর পর বিএনপি-জামায়াত শুরু করেছিল সরকার পতনের হঠকারী আন্দোলন। ফল কী হয়েছে?

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কয়দিন আগে বলেছেন, ‘২০১৪-১৫ সালে আন্দোলন করতে গিয়ে দলের যে ক্ষতি হয়েছে, তা পুষিয়ে উঠতে এখনও বেগ পেতে হচ্ছে। ভুলত্রুটি থাকতেই পারে, তবে সেই ভুলত্রুটি থেকে শিক্ষা নিতে হবে।’  বিএনপি যে ভুল রাজনীতি করেছে, সেটা পরোক্ষভাবে স্বীকার করে নিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব। ভুল রাজনীতির খেসারত এখন বিএনপিকে দিতে হচ্ছে। দলটি আর ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হয়েছে। বিএনপি বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তুলে আওয়ামী লীগ এবং তার মিত্রদের মোকাবিলা করতে গিয়েও বড় রকমের হোচট খেয়েছে। নির্বাচনে ব্যাপক বিজয় পেয়েছে আওয়ামী লীগ ও তার মিত্ররা বিএনপি ও তার সহযোগীদের হয়েছে চরম ভরাডুবি। বলা হয়েছে, ওই নির্বাচনও গ্রহণযোগ্য হয়নি। মানুষ পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেনি। অনেকক্ষেত্রে আগের রাতেই ব্যালটবাক্স ভরার অভিযোগ উঠেছে।

কিন্তু এসব অভিযোগ, বিতর্ক সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়েছে বলে মনে হয় না। বিএনপি এবং তার মিত্ররা যত সমালোচনাই করুক না কেন শেখ হাসিনার ভাবমূর্তি আন্তর্জাতিক পরিসরে এতটুকু মলিন হওয়ার কোনও আশঙ্কা দেখা যায় না। দুনিয়াব্যাপীই এখন গণতন্ত্র আর সনাতন ধারণা বা সংজ্ঞায় চলছে না। ভোট নিয়েও চলছে একেক দেশে একেক রকম পরীক্ষানিরীক্ষা। এই পরিবর্তনটা বিএনপি বুঝতে বা ধরতে না পারলেও আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা পেরেছেন। এতদিন পরে এসে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘বিশ্বরাজনীতির যে পরিবর্তন হয়েছে, সেই পরিবর্তনগুলোকে সামনে নিয়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের এগুতে হবে। আজকে হঠাৎ করে হঠকারী কোনও সিদ্ধান্ত নিয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে চাই না।’ মির্জা ফখরুল যেটা বুঝেছেন, সেটা দলের সব নেতাকর্মী একইভাবে বোঝেননি। এই বুঝের ঘাটতি আমাদের অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যেও আছে বলেই সরকার সম্পর্কে, নির্বাচনে সরকারের জয়ের কৌশল সম্পর্কে কিছু গৎবাঁধা বস্তাপচা কথা নিয়মিত উগড়ে যান। পান থেকে চুন খসলেই তারা সরকার পতনের পায়ের আওয়াজ শুনতে পান।

রাজনীতিতে একটি মুখরোচক কথা আছে–জনগণই ক্ষমতার উৎস। এটা কখনও কখনও সত্য। সব অবস্থায় সব সময়ের জন্য সত্য নয়। সরকার সব সময় ক্ষমতাশালী, আর যদি সেই সরকারের পেছনে জনগণের একটি বড় অংশের সমর্থন থাকে তাহলে সে সরকার কত শক্তিশালী হতে পারে, সেটা আমরা আবেগের বশে অধিকাংশ সময় বুঝতে চেষ্টা করি না। শেখ হাসিনার নেত্রীত্বে আওয়ামী লীগ যে একটি জনবিচ্ছিন্ন স্বৈরাচারী দল নয়–এটা বুঝতে না পারার জন্যই বিরোধীরা রাজনীতিতে সুবিধা করতে পারছে না। সব সময় সব ইস্যুতে সব ধরনের সরকারের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যাওয়া ঠিক নয়। একরোখা হিংসাত্মক প্রতিবাদ একসময় ফলদায়ক হলেও এখন তা কার্যকারিতা হারিয়েছে। বোমা মেরে, আগুন দিয়ে মানুষের হৃদয়-মন পুড়িয়ে দিয়ে, ঝলসে দিয়ে তাকে পাশে চাইলে কি পাওয়া যাবে? এখন প্রতিবাদ-আন্দোলন হতে হবে সৌন্দর্যপূর্ণ, শান্তিপূর্ণ। সাহস ও বুদ্ধিমত্তার সমন্বয় থাকতে হবে আন্দোলন-কর্মসূচিতে। যেমনটা হয়েছিল গণজাগরণ মঞ্চের ক্ষেত্রে। তাই ওই আন্দোলন সাড়া ফেলতে পেরেছিল।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও পরিকল্পনা নিয়ে রাজনীতি করেন। এই লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য তিনি কৌশল নির্ধারণেও পারদর্শী। একটি রাষ্ট্রের ‘পাওয়ার রিসোর্স’ কী কী, কীভাবে সেগুলোকে কাজে লাগাতে হয়, এটা শেখ হাসিনার চেয়ে বাংলাদেশে আর কেউ ভালো জানেন না। তিনি যে অন্যদের থেকে আলাদা, তিনি যে বুদ্ধিবৃত্তি এবং হৃদয়বৃত্তির সমন্বয়ে রাজনৈতিক কৌশল ঠিক করেন, এটা এতদিনেও যারা বোঝেননি, তারা কীভাবে তার সঙ্গে রাজনৈতিক লড়াইয়ে পেরে উঠবেন? তার সব সিদ্ধান্তের সঙ্গে সবাই একমত হবেন, এটাও আশা করা ঠিক নয়। দেশে যা হচ্ছে, সব ঠিক হচ্ছে, ভালো হচ্ছে, তা-ও নয়। রাজনৈতিক শক্তির বিন্যাস, ভারসাম্য বিবেচনা করেই নিন্দা কিংবা প্রশংসা করা উচিত।

২০২০ এবং ২০২১ সাল বাংলাদেশের জন্য এবং আওয়ামী লীগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বছর। দুটোর সঙ্গেই শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত আবেগ গভীরভাবে জড়িত। ২০২০-এ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী। ২০২১-এ বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না থাকলে এই দুটি স্মরণীয় ঘটনা উদযাপন যে যথাযথভাবে সম্ভব হবে না–সেটা বুঝেই এই সময়কালে ক্ষমতায় থাকাটা ছিল শেখ হাসিনার অগ্রাধিকার তালিকায়। বাংলাদেশের ক্ষমতার রাজনীতি কীভাবে গতিপথ তৈরি করে, এই পথযাত্রায় শত্রু-মিত্র কারা তা-ও শেখ হাসিনা ভালো জানেন। রাজনীতির প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা এবং পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সান্নিধ্য ও জীবন অধ্যয়ন তাকে সমৃদ্ধ করেছে।

মুজিববর্ষের ক্ষণগণনা চলছে। এই অবস্থায় ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে যারা কল্পনার ফানুস ওড়াতে চাইছেন তাদের হতাশ হতে হবে ১ ফেব্রুয়ারি। বিএনপির শক্তি-সম্ভাবনা নিয়ে যারা অতি আশাবাদী তারা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্য মনে রাখলে ভালো করবেন। তিনি বলেছেন, ‘বিএনপি উদারপন্থী দল। এই দলের কাছে বিপ্লব আশা করলে হবে না। এই দল তার নিজস্ব চরিত্র নিয়ে এগিয়ে যাবে।’

১ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন শেখ হাসিনার পরিকল্পনা মতোই হবে এবং রাজনীতির নিয়ন্ত্রণভারও তার হাতেই থাকবে। এই মুহূর্তে ক্ষমতায় থাকার পাটিগণিত, বীজগণিতের পরীক্ষায় শেখ হাসিনার চেয়ে বেশি নম্বর পাওয়ার মতো আর কেউ আছে বলে মনে হয় না।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

 

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ