‘লাঠিয়াল কমিটি’র দখলে পিএইচডি

Send
মোহাম্মদ আসাদ উজ জামান
প্রকাশিত : ১৯:৫২, ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৫৫, ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২০

মোহাম্মদ আসাদ উজ জামানপিএইচডি একটি ডিগ্রি। একজন শিক্ষার্থীর অধ্যয়ন জীবনের চূড়ান্ত ডিগ্রির নামই হলো পিএইচডি। অন্য যেকোনও ডিগ্রির মতো এটিও অর্জন করতে হয়। তবে সম্মানসূচক পিএইচডিও আছে, সেটি বিশেষ ক্ষেত্রে অবদানের জন্য বড় মানুষদের দেওয়া হয়। অর্জিত পিএইচডির ক্ষেত্রে একজন প্রার্থীকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়। বলা চলে, এই ডিগ্রির জন্য জীবনে সবচেয়ে বেশি পরিশ্রম করতে হয়। যেহেতু মানুষের জীবনে এটাই চূড়ান্ত ডিগ্রি, তাই এর সঙ্গে থাকে পরিশ্রম, সম্মান ও লেখাপড়ার গর্ব।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পিএইচডি করার জন্য অনেক ভালো ভালো বিশ্ববিদ্যালয় আছে। তারা সব দেশ থেকেই মেধাবীদের নিতে বিভিন্ন প্রোগ্রাম চালু রেখেছে। আমাদের দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়েও অনেকে পিএইচডি করেন। তাদের একটি অংশ সরকারি চাকরি করেন। পিএইচডি থাকলে পদোন্নতি দ্রুত হয়, বেতনও বাড়ে। খুব ছোট একটি অংশ আছে, যারা বিশেষ কারণে দেশের বাইরে পিএইচডি করতে যেতে পারেন না। তারা দেশে বসেই পিএইচডি করার পাশাপাশি ভালো ভালো কাজ উন্নতমানের জার্নালে তুলে ধরছেন। এর বাইরে অনেকে বিভিন্ন কারণে অনেক রকম পিএইচডি করে থাকেন। সুযোগ-সুবিধা ও যার যার নিজস্ব ব্যাপারের ওপর নির্ভর করে এটি।

কিছু কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক কিছুই ঘটে অথবা ঘটেছে। এর মধ্যে মুখরোচক হলো– হল দখল ও হলের সিট দখল। কিছু কিছু খবর পড়ে মনে হয়, দেশে এখন পিএইচডি দখলও চলছে! এসব দেখে অনেকে ভাবতে পারেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কিছু কিছু মানুষ যেন এখন চাকরি দখলে নেমেছেন। বলাবাহুল্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি চাকরি দখল করতে গেলে সংশ্লিষ্ট নিয়োগ কমিটির হাত থাকা লাগে।

চাকরি পেয়ে বা দখল করার পর অনেককে অনেক রকম পদ দখলে নিতে দেখা যায়। এর মধ্যে আছে হাউজ টিউটরসহ নানাবিধ প্রশাসনিক পদ। এগুলোতে বেশ কয়েক ধরনের সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার কথা শোনা যায়। একে-ওকে ডিঙিয়ে দখল করতে করতেই হয়তো কারও কারও মনে পিএইচডি দখলের ইচ্ছা চলে আসে। মনগড়া থিসিস লিখেও যখন পিএইচডি পাওয়া যায় (এখানে পিএইচডি অর্জন কথাটা বলা যাচ্ছে না), তখন এটাকে ‘পিএইচডি দখল’ বলাই ভালো। পিএইচডি কমিটির কাজটা হলো– থিসিসের মান যাচাই করে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলকে সুপারিশ করা যে, এর ভিত্তিতে একজন ছাত্রকে পিএইচডি দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু কমিটি যখন বুঝতে পারে না এই থিসিস মনগড়া, তখন বলতেই হয় এটি ‘লাঠিয়াল কমিটি’। বিশেষ করে যখন থিসিস প্রকাশিত হওয়ার পর বিভাগের অন্য শিক্ষকরা ধরতে পারেন এটি ছিল মনগড়া।

একজন ছাত্রের পিএইচডি থিসিসের সঙ্গে একজন পিএইচডি সুপারভাইজারের (একের অধিকও থাকতে পারেন) ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকার কথা এবং তিনি পিএইচডি কমিটিতেও থাকেন। তিনিও যদি ধরতে না পারেন কারও থিসিস মনগড়া কিনা, তখন ‘লাঠিয়াল’ শব্দটি নিয়ে অন্যভাবে ভাবার কোনও অবকাশ আর থাকে না। এগুলো পত্রিকার খবর হয়েও উঠে আসে। এখানে কয়েকটি প্রশ্ন আসে, পত্রিকাওয়ালারা কি সবার সব পিএইচডি থিসিস পড়েন? না পড়লে এই খবর তারা কীভাবে পান? বড় প্রশ্নটি হলো, কেন খবরগুলো পত্রিকায় আসে?

চাকরি দখল ও একে-ওকে ডিঙিয়ে নানান পদ-পদবি দখলের সঙ্গে জড়িতরা নিজেরা যেমনভাবেই যা কিছু করেন না কেন, অন্য কেউ তা করতে চাইলেই তাদের গায়ে লাগে! আর কেউ বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে গেলেই ঝামেলা বাঁধে। হয়তো বিভাগের কয়েকজন শিক্ষক এগুলোতে অতিরিক্ত পরিমাণ বিগড়ে যান। এই সুযোগে সংবাদকর্মীরা থিসিসে কী হয় না হয় সব জেনে যান। এ ধরনের খবর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিভাগের সামগ্রিক পরিবেশ সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যায় বটে।

আপাত ক্ষমতাধর ও দখলদার স্বভাবের যে মানুষটি ‘লাঠিয়াল কমিটি’কে সঙ্গে নিয়ে পিএইচডি দখল করে নিলো, পত্রিকায় খবর চলে আসার পর তার অবস্থা হয়ে যায় পুরোপুরি ভিন্ন। তখন তিনি বিচ্ছিন্ন ও কোণঠাসা। তার দায় কেউই নিতে চায় না। কমিটিও না, আর বিভাগের একটি অংশ তো আগে থেকেই তার কর্মকাণ্ডে বিগড়ে আছে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তো দায় নেওয়ার প্রশ্নই আসে না।

পিএইচডি দখলের ঘটনার সত্যতা পেলে কারও পিএইচডি বাতিল হতে পারে, এ কারণে পরবর্তী সময়ে তার চাকরিও চলে যেতে পারে। প্রশ্ন হলো, একটি ‘লাঠিয়াল কমিটি’ই কি তাকে উসকে দিয়ে এ ধরনের অর্থনৈতিক পথে ঠেলে দেয়নি? অথচ এসব ক্ষেত্রে ‘লাঠিয়াল কমিটি’ নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার কোনও প্রয়োজন মনে করে না। দায়িত্বে অবহেলার জন্য তাদের ধরা দূরে থাক, কিছু বলার মতো যেন কেউ নেই। অথচ এই ‘লাঠিয়াল কমিটি’র কারণেই কেউ একজন পিএইচডি ডিগ্রির মতো একটি ডিগ্রি দখল করে নিয়েছিল। যে ডিগ্রির সঙ্গে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ও মান দুটোই সম্পৃক্ত। আর বিশ্ববিদ্যালয় হলো একটি দেশের জ্ঞানচর্চা ও জ্ঞান সৃষ্টিসহ নীতি নৈতিকতা চর্চার সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান। পিএইচডি কমিটিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাই বেশিরভাগ থাকেন। তাদের নানান দায়বদ্ধতা থাকার কথা, যা পিএইচডি দখল করতে চাওয়া লোকটির তুলনায় অনেক বেশি। অথচ পিএইচডি দখলদারিত্বে ‘লাঠিয়াল কমিটি’র ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বেশ নীরব থাকতে দেখা যায়। এতে প্রশ্ন ওঠে, ‘লাঠিয়াল কমিটি’র লাঠির শক্তি কি অনেক বেশি?

শুধু কি মনগড়া থিসিস দিয়েই পিএইচডি দখল করা হয়? না, এর বাইরেও অনেক কিছু থাকে। থিসিসের ক্ষেত্রে নকলও করা যায়। দুই একটি প্যারাগ্রাফ নকল করলে বা কোনও মনগড়া তথ্য দিলে (কারও লেখা নিজের বলে চালিয়ে দেওয়া, মিথ্যা তথ্য দেওয়া ইত্যাদি) কমিটির পক্ষে ধরা বেশ কঠিন। তবে যে থিসিসে নকলের পরিমাণ অনেক বেশি থাকে, সেটি ধরতে না পারার ব্যর্থতা কমিটির ওপরেই বর্তায়। অবশ্য কমিটি বাদ সাধলেও যেহেতু দখলদার মনোভাবের লোভ ও ক্ষমতার হাত অনেক লম্বা, তাই অন্য হাত দিয়েও একাডেমিক কাউন্সিলে পিএইচডি দখল করে নেওয়া যেতে পারে!

শুধু শিক্ষার্থীর দখলদারি মনোভাবের কারণেই ‘লাঠিয়াল কমিটি’ দিয়ে পিএইচডি দখল হয় এমন ভাবতে পারছি না। এমনকি এটাও হতে পারে না যে, ‘লাঠিয়াল কমিটি’র মনে শিক্ষার্থীকে দিয়ে অন্যকিছু দখল করার বাসনা আছে। এমন ঘটলে শিক্ষাঙ্গনের সামগ্রিক অবস্থা যা ভাবা যায়, সত্যিকারের অবস্থাটা তার চেয়েও ভয়াবহ। এছাড়া মনে প্রশ্ন জন্ম নেয়, পত্রিকায় যেক’টি খবর আসে সমস্যা কি ততটুকুই, নাকি এর চেয়েও ব্যাপক?

 পিএইচডি থিসিসে নকল শুধু আমাদের দেশেই হয় তা কিন্তু নয়। এটি বহু পুরনো ইতিহাস। ডিগ্রি দেওয়ার পর থিসিসে নকল ধরা পড়লে সাধারণত ডিগ্রি বাতিল করা হয়। একইসঙ্গে কমিটির ভূমিকা খতিয়ে দেখার ব্যাপার তো থাকেই। পিএইচডির মতো একটি ডিগ্রির মান ও বিশ্বাসযোগ্যতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মান ধরে রাখার জন্যই এসব কাজ করা হয়। সেজন্যই বেশকিছু দেশের পিএইচডির প্রতি পুরো বিশ্বের আস্থা এখনও অটুট আছে।

কিন্তু আমাদের দেশে কিছু কিছু পিএইচডি নিয়ে কী হচ্ছে? ‘লাঠিয়াল কমিটি’ বাগিয়ে নিয়ে যেন যখন-তখন পিএইচডি দখল চলছে! প্রশ্ন হয়, দেশের পুরো শিক্ষা ব্যবস্থা কি একেবারেই রম্যের আওতায় চলে গেলো? জিপিএ-৫ নিয়ে সবাই কথা বলে, অনেক সময় হাসাহাসিও করে, পিইসি ও জেএসসি কি কারণে এখনও আছে কেউ বলতে পারে না। নকল ও প্রশ্নফাঁস পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার আগেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা চালুর বন্দোবস্ত হয়ে যাচ্ছে। অথচ নকল ও প্রশ্নফাঁস মুক্ত পরিবেশে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার চেয়ে সুন্দর আর বাস্তব আর কিছু হতে পারে না। কিন্তু নকল ও প্রশ্নফাঁস থাকলে উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থায় এই ভর্তি পরীক্ষা বড় ধরনের একটি বিপর্যয় টেনে আনতে পারে। অথচ এ দেশে পড়াশোনা করে অনেকে উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাইরে যাচ্ছেন এবং সম্মান ও সফলতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন। এমনকি বাংলাদেশে পিএইচডি করে অনেকে ভালো ভালো কাজ করছেন, যা  একটি বিশ্ববিদ্যালয় ও দেশের জন্য অনেক গর্বের।

একটি দেশ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মানুষের সম্মানের দিকে তাকিয়ে শিক্ষাঙ্গনকে সততার সঙ্গে আঁকড়ে ধরার সময় এসে গেছে। যেহেতু বৃহৎ পরিসরে শুরু করাটা সবসময়ই কষ্টসাধ্য ব্যাপার। তাই শুরুটা ক্ষুদ্র পরিসর থেকেই হতে পারে। যেহেতু পিএইচডি খুব কম লোকই করে থাকে, তাই এখান থেকেই শুদ্ধি ব্যাপারটা শুরু হোক।

পিএইচডি দখলের কলঙ্ক থেকে শুধু শিক্ষকদের মানসিকতাই একটি বিশ্ববিদ্যালয় তথা দেশকে মুক্তি দিতে পারে। চাইলে শুরুটা একধাপ আগে থেকেই করা যেতে পারে। মাস্টার্স থিসিসের নকল যেন না হয় সেদিকে সজাগ থাকতে হবে। এ দেশের মাস্টার্স থিসিসের একটি বড় অংশই নকলের কারণে দূষিত। অনেক ক্ষেত্রে হয়তো শিক্ষার্থী জানেই না সে যা করছে তা নকলের মধ্যে পড়ে যায়! এজন্য শিক্ষকদের ভূমিকার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা জরুরি।

একই দেশের একই বিশ্ববিদ্যালয়ে খুব মানসম্পন্ন ও নকলমুক্ত মাস্টার্স থিসিসের নজির আছে অনেক। সুতরাং চাইলে মাস্টার্স লেভেলে নকলমুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা যেতে পারে। কারণ দিনে দিনে মাস্টার্স থিসিসের নকলই ফুলে ফেঁপে চলে এসেছে পিএইচডি থিসিসে। আর কয়েকটি এলোমেলো ঘটনার জন্য প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ছে পুরো উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা।

বর্তমান সময়ে আমাদের কিছু কিছু ডিগ্রি নকল বা দখলদারির দূষণে কলঙ্কিত। কিন্তু আমরা চাইলেই আগামী শিক্ষার্থীদের অর্জিত ডিগ্রিগুলোকে নকলের অভিশাপ থেকে মুক্ত রাখতে পারি। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে সিপাহী দিয়ে পাহারা দেওয়া সম্ভব নয়। নিজেই তাগিদেই ‘লাঠিয়াল কমিটি’র সদস্য হওয়া থেকে বিরত থাকা চাই তাকে। তার নিজের, বিশ্ববিদ্যালয়ের ও ছাত্রের সম্মান বোঝার মতো দেশে অন্য কেউ নেই, আছেন কেবল তিনি! একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের মধ্যে আমাদের এই বিশ্বাস থাকা প্রয়োজন। এর চেয়ে জরুরি সেটি ধরে রাখার মানসিকতা। দেশের পিএইচডি ডিগ্রিটা অন্তত দখলদারিত্ব থেকে মুক্ত থাক। আর ‘লাঠিয়াল কমিটি’র মানসিকতার পরিবর্তন হলে দখলদার মনোভাবের কাউকে দিয়েও ঠিকঠাক পিএইচডি করানো সম্ভব!

আশার কথা, আমাদের দেশের অনেকেই অনেক ভালো গবেষণা করে উন্নতমানের জার্নালে নিয়মিতভাবে তাদের গবেষণার ফল প্রকাশ করে যাচ্ছেন। তাদের সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছে এবং বিপুলসংখ্যক ছাত্র দেশে বসেই উন্নত বিশ্বের মানসিকতা নিয়ে গবেষণা করে যাচ্ছেন।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটি

/এসএএস/জেএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ