কেজরিওয়ালের ঝাড়ুতে সাফাই মোদির বিজেপি

Send
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৫:১১, ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৩৮, ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২০

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীসত্যি ভারতের প্রতি আস্থা হারানো কঠিন। ভারতীয়রা কখনও কখনও উন্মাদনায় বিভ্রান্ত হয়েছে সত্য, কিন্তু তা স্থায়ী হতে দেয়নি কখনও বা স্থায়ী হতে পারেনি। নেতা হিসেবে নিঃসন্দেহে চমৎকার ছিলেন শিবাজী। শাসক হিসেবে ছিলেন ন্যায়পরায়ণ এবং রাজনীতিজ্ঞ হিসেবেও ছিলেন অসাধারণ বুদ্ধিমান। কিন্তু দৃষ্টিভঙ্গিতে ছিলেন রক্ষণশীল। তার সমসাময়িকদের কাছে তিনি সনাতনের পুনরুদ্ধারকারী হিসেবে যতটা পরিচিত ছিলেন, নবায়নপ্রিয় হিসেবে ততটা নন। ধর্মীয় বিভেদের ঊর্ধ্বে উঠে নতুন ধরনের এক রাষ্ট্র গড়ে তোলার বৃহত্তর ও পূর্ণাঙ্গ দৃষ্টি ছিল না তার।
মারাঠা বীর শিবাজী এক নব হিন্দু সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন করলেও বেশিদিন টেকেনি। সাম্রাজ্য স্থায়ী হতে পারে একমাত্র নিশ্ছিদ্র সহনশীলতার ভিত্তিতে। সংমিশ্রিত প্রজা হলে তো সহনশীলতা অফুরন্ত হতে হয়। শিবাজীর সেনাপ্রধান ছিলেন মুসলমান আর তার সৈন্যবাহিনীতে মুসলমান ছিল উল্লেখযোগ্য সংখ্যক। সুতরাং হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত ছিল তার ভুল সিদ্ধান্ত। পাঞ্জাবের শিখ রাষ্ট্রটিও ধর্মকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠিত ছিল। সেই রাষ্ট্রও টেকেনি। এই রাষ্ট্রগুলোর পতন হয়েছিল আওরঙ্গজেবের সময়ে। তিনিও রাষ্ট্রপর্যায়ে ধর্মকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন, যার ফলে মোগলদের প্রতিষ্ঠিত সাম্রাজ্যের ভিত্তি দুর্বল হয়ে গিয়েছিল।
ভারতীয় জনতা পার্টির নেতারা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ছত্রপতি শিবাজীর সঙ্গে তুলনা করেছেন। কথাটা শুনে ভয় পেয়েছিলাম যে, এই বিশ্বাস ভারতের সাধারণ মানুষের বিশ্বাসে রূপান্তরিত হচ্ছে কিনা। কারণ ধর্মীয় আবেগ ক্ষণস্থায়ী হলেও উন্মাদনা সৃষ্টি করে, যা ভারতের মতো একটি বহুজাতিক রাষ্ট্রের সর্বনাশ ডেকে আনতে পারে। কিন্তু ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২০ দিল্লির বিধানসভা নির্বাচনের ফল দেখে মনে হলো, পুরোপুরি ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিরা ব্যর্থ হয়েছেন। দিল্লি বিধানসভার ৭০টি আসনের মধ্যে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের দল আম আদমি পার্টি পেয়েছে ৬২ আসন, আর বিজেপি পেয়েছে মাত্র ৮টি আসন।

নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহরা পায়ের নিচে মাটি সৃষ্টি করতে পারলেন না। কেন্দ্রীয় রাজধানীটিই দিল্লি রাজ্য। আর সেই রাজ্যে নরেন্দ্র মোদির হাজার রকমের চেষ্টা করেও ক্ষমতা কব্জা করতে ব্যর্থ হলেন। তারা সব অধ্যায়ের পাট চুকিয়ে চেষ্টা করেছেন, কিন্তু প্রত্যাশিত ফল পাওয়া সম্ভব হয়নি। ফল দিয়ে তারা ‘শক’ দিতে চেয়েছেন। অথচ উল্টা ‘শক’ তারা খেয়েছেন।

নরেন্দ্র মোদি তার নির্বাচনি সমাবেশে বলেছেন, ১০-১২ দিনের মধ্যে ভারত ইচ্ছা করলে পাকিস্তানের অস্তিত্ব মিটিয়ে দিতে পারে। মোদির বক্তব্যের জবাবে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে ৫ ফেব্রুয়ারি এক জনসভায় কঠোর হুঁশিয়ারি  উচ্চারণ করেছেন। পাকিস্তানের পার্লামেন্ট এখন অধিবেশনে রয়েছে। পাকিস্তানের পার্লামেন্ট সদস্যরা ১০ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ভারত আক্রমণের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করেছেন। উভয় রাষ্ট্র পারমাণবিক শক্তির অধিকারী দেশ। উভয়ের অসাবধানতায় এই উপমহাদেশের অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে যেতে পারে। উগ্র হিন্দুত্ববাদী শক্তির হাতে ভারতের ক্ষমতা। তাই আমরা এই উপমহাদেশে রাষ্ট্রগুলো তাদের কথাবার্তায় বিপন্ন হয়ে উঠি।

নরেন্দ্র মোদি ভারতের ক্ষমতায় রয়েছেন গত ছয় বছর, আর এই ছয় বছরের মধ্যে কোনও সুখ-সমৃদ্ধি ভারতের মানুষকে তিনি দেখাতে পারেননি। বরং এক অস্থিরতার মধ্যে নিক্ষেপ করে রেখেছেন। মোদি, অমিত শাহ, উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ—নির্বাচনি প্রচারণায় প্রায় ২০ দিন দিল্লি বেড়িয়েছেন এবং হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে ধর্মীয় বিভেদ সৃষ্টি করে এক অপ্রীতিকর আবহাওয়া সৃষ্টির চেষ্টা করেছিলেন। হিন্দু ভোট একতরফা করতে পারলে কেল্লাফতে করা সম্ভব হতো, কারণ মুসলিম ভোট পশ্চিমবাংলা, উত্তরপ্রদেশ ও  বিহারের মতো দিল্লিতে ডিসাইডিং ফ্যাক্টর নয়।

নির্বাচনি প্রচারে কেজরিওয়াল পানির মূল্য, বিদ্যুতের মূল্য, রাজ্যের উন্নয়নের কথা, শিক্ষার কথা, চিকিৎসার কথা বলে ঘুরে বেড়িয়েছেন এবং  মোদি, অমিত শাহ ও যোগী আদিত্যনাথ সেই পথে পা বাড়াননি। তারা নাগরিকত্ব সংস্কার আইন পাস হওয়ার পর থেকে অব্যাহতভাবে শাহীনবাগে চলা মুসলিম নারী শিশুদের প্রতিবাদে সমাবেশকে পাকিস্তানের আইএসআই পরিচালিত বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাদের সঙ্গে কেজরিওয়ালের সম্পৃক্ততার কথা বলেছেন। কেজরিওয়ালকে এর আগের নির্বাচনে তারা নকশালবাদী বলেছিলেন। এবারের নির্বাচনে বলেছেন সন্ত্রাসী।

দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়াল উল্টো প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়েছেন, যেখানে ইংরেজিতে লেখা—‘মাই নেম ইজ কেজরিওয়াল অ্যান্ড আই অ্যাম নট অ্যা টেরোরিস্ট’। তিনি দিল্লিবাসীর উদ্দেশে বলেছেন, ‘আমি আপনাদের সন্তান। আমাকে সন্ত্রাসী মনে হলে ভোট দেবেন না। বিজেপিকে ভোট দিন।’ তিনি প্রচারণায় শাহীনবাগ সম্পর্কে মুখ খোলেননি। জেএনইউ ও জামিয়া মিলিয়ার আন্দোলন সম্পর্কে কিছু বলেননি। শুধু বলেছেন, ‘বিজেপির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কেন শাহীনবাগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছেন না, যদি তারা খারাপ হয়? শাহীনবাগের বিরুদ্ধে বলে কে ফায়দা নিচ্ছে সেটা দেখুন।’ কিন্তু বিজেপির প্রচেষ্টা ছিল এই তিন বিষয়ে কেজরিওয়ালের মুখ খোলানো কিন্তু তিনি উন্নয়নের কথা বলা ছাড়া সব বিষয়ে এড়িয়ে চলেছিলেন।

অবশ্য প্রচারণার শেষের দিকে এসে তার অর্থমন্ত্রী এক নির্বাচনি সমাবেশে বলে বসলেন, আম আদমি পার্টি শাহীনবাগের সঙ্গে রয়েছে। বিজেপি শেষের কয়দিন খুব নাচানাচি করেছে। বিভ্রান্ত হয়ে বিশ্লেষকরা বলেছিলেন, আম আদমি পার্টির সর্বনাশ হয়ে গেছে। বিজেপি নেতা মহেশ শর্মা আনন্দে আত্মহারা হয়ে বলেছিলেন, ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান তুলে আমরা সরকার গঠন করতে যাচ্ছি। লোকসভায় রাম মন্দিরের ট্রাস্ট গঠন নিয়ে তড়িঘড়ি করে বিল এনেছে বিজেপি। সবই ছিল নির্বাচনকে প্রভাবিত করার আয়োজন। দিল্লির নির্বাচনে এই প্রথম ধর্মকে কার্ড হিসেবে খেলা হয়েছে। বিজেপি যখন ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দিয়েছে, আম আদমি পার্টি তার বিপরীতে ‘জয় হনুমান’ খাড়া করেছিল শেষ বেলায়।

কিন্তু ১১ ফেব্রুয়ারি ফল প্রকাশের সময় দেখা গেলো, দিল্লির ভোটাররা সবকিছু পেছনে ফেলে ‘কাজের পক্ষে’ ভোট দিয়েছে, যেটি আগামী কয়েকটি নির্বাচনেও কাজ করবে বলে ভারতীয় ভোট বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন। বিজেপির জয় শ্রীরাম, মন্দির ট্রাস্ট, শাহীনবাগের সমাবেশের সঙ্গে পাকিস্তানের আইএসআই-এর যোগসাজশ এবং কেজরিওয়ালকে সন্ত্রাসী বলা—সবকিছুকে প্রত্যাখ্যান করেছে। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে কেজরিওয়ালকে দিল্লিবাসী জিতিয়েছেন। আম আদমি পার্টির প্রতীক ‘ঝাড়ু’ সাফ করে দিয়েছে বিজেপির দিল্লি দখলের স্বপ্ন। তৃতীয়বারের মতো ১৬ ফেব্রুয়ারি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে যাচ্ছেন কেজরিওয়াল। ভোট বিজয়ের পর পরই কেজরিওয়াল বিজয় র‌্যালির বক্তৃতায় বলেছেন, ‘দিল্লিবাসী, আপনারা গজব করে দিয়েছেন। আই লাভ ইউ।’

গত লোকসভা নির্বাচনের পর আমি বহু ভারতীয়কে জিজ্ঞেস করেছি—এত বিপুল ভোটে মোদিকে জিতিয়ে দিলেন কেন? তারা উত্তরে বলেছিলেন, আরেকবার দেখলাম। ভবিষ্যতে ভারতীয় ভোটারেরা তৃতীয়বার নরেন্দ্র মোদিকে দেখে কিনা, তা নিয়ে সংশয় জেগেছে। এক ব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছায় একটা জাতির ভবিষ্যৎ ছেড়ে দেওয়া নিরাপদ নয়—এ কথাটা ভারতীয় ভোটারদের উপলব্ধিতে আসবে, সেটাই স্বাভাবিক। গত সাধারণ নির্বাচনের পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিজেপি একের পর এক হেরেছে। কর্নাটক ও ইউপি ছাড়া বড় কোনও রাজ্য তার হাতে নেই।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

[email protected]

 

/এসএএস/এমএনএইচ/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ