হায় বৈশাখ, সবকিছু অন্তরীণের আওতায় যাবে?

Send
আহসান কবির
প্রকাশিত : ১৩:৪৪, এপ্রিল ১৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:২৪, এপ্রিল ১৪, ২০২০

আহসান কবির‘বাংলা নববর্ষ’ মানে যে কথা বলা হয়ে গিয়েছিল! এবারের ‘অন্তরীণ বাংলা নববর্ষ’ মানে হয়তো অনেক কিছু দেখা হয়নি, তাই বলাও হয়নি! সাদা চোখে যে পার্থক্যগুলো চোখে পড়বে এবার—
এক. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার সামনে থেকে সেই চিরাচরিত মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হবে না! বের হবে না দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উৎসব আর মঙ্গলের জন্য বাঙালির চিরন্তন অভিযাত্রা।
দুই. রাজধানীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে যেমন লাখো ‘রঙিন’ মানুষ নতুন পোশাকে নিয়মানুবর্তিতার সঙ্গে উৎসবে মেতে উঠতো, সেই স্মৃতি মনে রেখে দীর্ঘশ্বাসে মেতে উঠবে লাখো মানুষ।  দীর্ঘশ্বাস আসবে নেমে বাংলার উৎসবে।
তিন. বাংলার পথে প্রান্তরে হবে না কোনও বৈশাখী মেলা। মুড়ি, মুড়কি, নাড়–, চিড়া, পিঠা, পায়েস, গুড়, বাতাসা যারা বানাতেন নববর্ষকে ঘিরে, যারা সার্কাস বা খেলা দেখাতেন, সবাইকে ঘরবন্দিই থাকতে হবে। পেট চলবে কীভাবে, সেই চিন্তায় দিশেহারা ভাব নিয়ে কাটবে সময়।

চার. বাংলা নববর্ষের সঙ্গে অর্থনীতির ছিল আত্মার যোগাযোগ। সেই যোগাযোগ করোনা আক্রান্ত। হালখাতা তাই আক্ষরিক অর্থে ক্রমান্বয়ে হয়ে উঠবে (এলসি খোলার মতো) ডিজিটাল খাতা!

পাঁচ. করোনা ক্ষমতাশালী থাকলে হবে না নববর্ষকে ঘিরে কোনও গানের উৎসব বা কনসার্ট। বেশ আগেই গান চলে গেছে, আরও বেশি যাবে ‘অনলাইন’ বা ‘ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে’! এখনই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভেসে বেড়াচ্ছে চৈত্রসংক্রান্তি বা বৈশাখের গান শোনার অনেক আমন্ত্রণ। গানের বিনিময়ে উপার্জিত অর্থের ভাগ যাবে করোনা আক্রান্তদের সাহায্যে! ৮৮ সালের বন্যার পর পর ব্যান্ডদল ফিডব্যাকের একটা গান খুব জনপ্রিয় হয়েছিল—মাঝি তোর রেডিও নাই বইলা জানতেও পারলি না আইতাছে ভাইঙ্গা, এতো বড় ঢেউ, সারা বাংলাদেশ জানলো মাঝি তুইতো জানলি নারে...।

করোনাকালে এই গানের কথা কী হতে পারে? ‘মানুষ তোর সচেতনতা নাই বইলা বুঝতেও পারলি না/চায়না আমেরিকা ইতালি বুঝলো মানুষ তো বুঝলো নারে...।’

গানের মানুষরা হয়তো আগের মতোই এগিয়ে আসবেন করোনার কালে। কিন্তু আগের মতো বৈশাখ কি ফিরে আসবে কখনও সেই চিরচেনা রূপে?

বৈশাখকে আসতেই হবে বাঙালির কাছে, বাঙালির সম্মিলিত অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে শান দিতে বাঙালিকে যেতেই হবে বৈশাখের কাছে! আবহমানকাল থেকেই বৈশাখ আর বাঙালির নাড়ির যোগ। কর্ম শেষের আনন্দ, গলা ছেড়ে গান গাইবার স্বাধীনতা, নদী বা হাটে মানুষের মিলন মেলা, মেলাতে দা, খুন্তি, ছুরি থেকে শুরু করে নাগরদোলা, মুড়ি, মুড়কি, পিঠা, পায়েস, নাড়ু, মিষ্টি, পোশাক, স্যান্ডেলসহ আরও বহু কিছুর সমাহার, বিকেলে হাডুডু বা নৌকা বাইচ, রাতে যাত্রাপালা কিংবা বাউল গান, বছরের পর বছর ধরে বৈশাখ এমন উৎসবের বাহক হয়ে এসেছে বাঙালির জীবনে, এখনও তা অব্যাহত আছে। বৈশাখের মৃত্যু মানে বাঙালির মৃত্যু। আর তাই অসাম্প্রদায়িক বাঙালি চেতনার সবচেয়ে বড় উৎসব বৈশাখ উদযাপনকে ভিন দেশের কিংবা নিজস্ব শাসক গোষ্ঠীর কেউ কেউ দেখেছে ভিন্ন চোখে! করোনা যতই অন্তরীণ রাখুক মানুষকে, বৈশাখ বাঙালির অস্তিত্বের কারণেই এসেছিল, থাকবেও অস্তিত্ব আর নাড়ির বন্ধন হয়ে। বন্দুক কিংবা মারণাস্ত্র থাকলেও পাকিস্তানিরা যেমন ‘রবীন্দ্রসংগীত’ লিখতে বা লেখাতে পারেনি, সাম্প্রদায়িকতার নামে বৈশাখকেও কেউ রুদ্ধ করতে পারবে না। করোনা দীর্ঘকাল থাকলে হয়তোবা বদলে যাবে বৈশাখ উদযাপন। যেমন—

এক. মানুষ মার্কেটে যাবে না, মার্কেট আসবে মানুষের ঘরে। অনলাইনে অর্ডার করা হবে। পোশাক চলে আসবে বাসায়। নতুন পোশাক তৈরি ও বিপণন কমবে না জীবনের প্রয়োজনে। বৈশাখে কমবে না রঙিন পোশাকের বাড়ন্ত কেনাবেচা!

দুই. জীবনের প্রয়োজনে থামবে না খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন। সেখানেও অনলাইন এবং প্রিয়জনের পাঠানো খাবার চলে যাবে প্রিয়তম কারও কাছে। কুলোয় সাজানো মুড়ি মুড়কি কিংবা পান্তা ইলিশ ‘খাদ্য সহায়ক কর্মী’ নিয়ে এলে সেই ছবি আপ হবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। শিরোনাম হবে—বৈশাখ উদযাপন থামেনি!

তিন. যারা সমাজের খেটে খাওয়া মানুষ, তাদের কী হবে? হয়তো কোনও ধনাঢ্য ব্যক্তি তার সামর্থ্যমতো কয়েকজনকে জড়ো করে সামাজিক নিরাপদ দূরত্বে দাঁড় করাবেন। পান্তা ইলিশ-এর শানকি, মুড়ি মুড়কির ডালা বা পোশাকের প্যাকেট দেবেন। খেটে খাওয়া মানুষেরা সেসব পেয়ে হয়তো মনের আনন্দে বাড়ি ফিরবেন। শুধু থেকে যাবে একসঙ্গে হতে না পারার দীর্ঘশ্বাস। বৈশাখ আজীবন মানুষকে একসঙ্গে হওয়ার প্রেরণা জুগিয়েছে, কখনও বিচ্ছিন্ন থাকতে বলেনি, মানুষকে বিচ্ছিন্ন করেনি।

চার. বৈশাখকে ঘিরে যত উৎসব ছিল রেডিও, টেলিভিশনে বা মঞ্চে, সব হয়তো থাকবে কিন্তু ক্রমশ এসব আরও বেশি চলে যাবে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। যার যা সামর্থ্য এবং পছন্দ, সে সেটা দেখবে। কন্টেন্ট প্রোভাইডিংয়ের যুগে ‘বৈশাখী কন্টেন্ট’-এর মূল্য হয়তো আগের মতোই থাকবে। নববর্ষে যে বাংলা ছবি মুক্তি পাওয়ার চল ছিল, সেটা হয়তো একই সময়ে এক দুইটা হলে মুক্তি পাবে, কিন্তু ঢের বেশি প্রচারণার মাধ্যমে মুক্তি পাবে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। হায়, সবকিছু এমন করে অন্তরীণের আওতায় যাবে? মুঠোফোনের মাধ্যমে শেষমেশ ব্যক্তির কাছেই পৌঁছে দেওয়া হবে সব? মানুষ মূলত একা, সঙ্গী তার মুঠোফোন, সামর্থ্য তার টাকা, এই-ই কী নিয়তি?

প্লেগ, কলেরা, ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া কিংবা স্মল পক্সের মতো মহামারি বহুবার মানুষকে বিচ্ছিন্ন করতে চেয়েছে। যে অসুখে ভুগেছে তাকে হয়তো বিনা চিকিৎসায় মরতে হয়েছে, মরার পরেও সম্মান নিয়ে কবরে যেতে পারেনি লাখো কোটি মানুষ। ছোটকালে দেখতাম যার স্মল পক্স বা গুটিবসন্ত হতো (১৯৭২-৭৭), তাকে বাড়ির বাইরে পরিত্যক্ত কোনও জায়গায় মশারি খাটিয়ে খাবার দিয়ে রেখে আসতো অন্যরা। এসময়ের করোনার আইসোলেশন এবং অন্যদের কোয়ারেন্টিন বা অন্তরীণও অনেকটা তেমন। মানুষের হাত ধরে বিজ্ঞান ঠিকই একদিন পথ দেখাবে। আবিষ্কৃত হবে ভ্যাকসিন। বৈশাখ ফিরবেই স্বমহিমায়।

লাখো কোটি মানুষের অভ্যাসের ওপরই গড়ে ওঠে ব্যবসা কিংবা শোষণ। আমরা জানি, মোগল সম্রাট আকবর চাঁদনির্ভর হিজরি সালের ওপর ভর করে কিংবা তার সঙ্গে মিলিয়ে সৌর গণনার মাধ্যমে বাংলা সাল প্রবর্তন করেন। ইংরেজি মাস মার্চের প্রথম দিন থেকে ফসলি সন হিসাব করে এবং বৈশাখকে প্রথম মাস ধরে এই বর্ষপঞ্জিকা প্রবর্তন করা হয়। বাদশাহ আকবর বাংলা সালের প্রবর্তন করেছিলেন তার সিংহাসনে আরোহণের দিনটার সঙ্গে মিলিয়ে। সিংহাসনে আরোহণের দিন অর্থাৎ ১৫৫৬ সালের ৫ নভেম্বর থেকে এটা কার্যকর করা হয়! উৎসব করে, মেলা বসিয়ে, প্রজাদের মুড়ি, মুড়কি, মিষ্টি খাইয়ে এই দিন থেকে নতুন করে খাজনা আদায় শুরু করেন নবাব মুর্শিদ কুলী খান। পরবর্তী রাজারাজরারা বা জমিদাররাও এই প্রথা অব্যাহত রাখেন।

পশ্চিমবঙ্গে বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন পালনের আগেই বাংলাদেশে নববর্ষ পালিত হয়ে যায়। যত পান্তা আর ইলিশ বাংলাদেশের মানুষই হয়তো আগেভাগে খেয়ে ফেলে, পশ্চিমবঙ্গের মানুষদের জন্য থাকে কিনা জানি না। কেউ কেউ কৌতুক করে বলে থাকেন—বাংলাদেশ পূর্বদিকে অবস্থিত বলে সূর্য এখানে আগে ওঠে এবং দিন আগেই শুরু হয়। আর পশ্চিমে অস্ত যায় বলে পশ্চিমবঙ্গে বাংলা নববর্ষ পরে শুরু হয়!

আসলে আকবরীয় বাংলা সাল গণনার শুরু থেকে ইংরেজি ক্যালেন্ডারের অমিল দেখা দেয়। বিশ্বখ্যাত জ্যোতি পদার্থবিদ ড. মেঘনাদ সাহা প্রাচীন বর্ষপঞ্জি সংস্কার করেন ১৯৫২ সালে। মেঘনাদ সাহার সংস্কার অনুযায়ী ইংরেজি ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ হওয়ার কথা, যা পরবর্তীকালে ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সমর্থন করেন। এ কারণে বাংলাদেশে ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ পালিত হয়। কিন্তু ভারত ও বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে, ত্রিপুরা বা আসামে প্রাচীন বা সংস্কারপন্থী পঞ্জিকাবিদরা ড. মেঘনাদের সংস্কার গ্রহণ না করায় দুই দেশের একই উৎসব দুই দিনে পালিত হয়! অনেকেই বলে থাকেন মূলত রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্য নিয়ে স্বৈরশাসক এরশাদ এ দেশে ১৪ এপ্রিলকে পহেলা বৈশাখ হিসেবে পালনের রাষ্ট্রীয় নিয়ম করে যান।

যাহোক, শেষমেশ একটা গল্প বলে বিদায় নেই। করোনার কারণে চীন, আমেরিকা, ইতালি ও ইরানে প্রায় একই ধরনের কিছু কৌতুক ছড়িয়ে পড়েছে। আমেরিকানদের জবানিতে একটা কৌতুক বলা যাক।

রবার্টের করোনা টেস্ট পজিটিভ এসেছে। সে হাসপাতালে ভর্তি হতে এসেছে। রবার্টের সামনে লম্বা লাইন। রোগীরা বিরক্তি প্রকাশ করছে। পর্যাপ্ত ভেন্টিলেটর আর আইসোলেশন নেই। নেই পর্যাপ্ত ডাক্তার আর নার্স, রোগীদের ভর্তি না করে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। রবার্টের মেজাজটা খিচড়ে গেলো। সে ঘোষণা দিলো—যেমন করে হোক সে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পে পশ্চাৎদেশে একটা কশে লাথি মারবে। এই মৃত্যু উপত্যকার নাম আমেরিকা না!

রবার্ট খানিক পর হাসপাতালের লাইনেই ফিরে এলো। সবাই জানতে চাইলো—লাথি কি মারতে পেরেছেন? রবার্ট উত্তর দিলো—নাহ। ট্রাম্পের ওখানে এরচেয়ে দশগুণ লম্বা লাইন!

বিশেষ দ্রষ্টব্য: করোনা আক্রান্ত বৈশাখে বাড়ুক মানুষের সৃষ্টিশীলতা। অন্তরীণে কীভাবে কেটেছে বৈশাখ, ভিডিও করে আপ করুন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ছড়িয়ে দিন আপনার বৈশাখ। নিদেনপক্ষে কবিতা লিখুন—তুমি আমায় ডেকেছিলে অন্তরীণের দিনে/কেন আমায় দাওনি তুমি একটা পিপিই কিনে!

লেখক: রম্যলেখক

/এসএএস/এমএমজে/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ