শুধু বাজেটে বরাদ্দ বাড়িয়ে স্বাস্থ্যখাতের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা যাবে না

Send
মামুন রশীদ
প্রকাশিত : ১৩:৫৮, এপ্রিল ২০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৫৮, এপ্রিল ২০, ২০২০

মামুন রশীদসিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজের মেধাবী সহকারী অধ্যাপক ডা. মঈন উদ্দীনকে কে মেরেছে? আমি, আপনি নাকি বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে প্রচলিত নিয়মবিধি? তাকে কেন তার হাসপাতালের আইসিইউতে রাখা গেলো না? ডিসি অফিসের একজন কর্মচারীকে হেলিকপ্টারে নেওয়া গেলো, তিনি কেন একটি কার্যকর অ্যাম্বুলেন্সও পেলেন না? তার সোজা উত্তর আপনারা জেনে ফেলেছেন—প্রচলিত টার্মস অব সার্ভিসে এগুলো তার প্রাধিকার বা প্রাপ্তব্য ছিল না।    
সবাইকে বলতে শুনছি, করোনায় স্বাস্থ্যসেবা তথা জীবন বাঁচানো সবচেয়ে বড় ফরজ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান থেকে অনেকেই শুরু থেকে বলে আসছেন—পরীক্ষা, পরীক্ষা আর পরীক্ষা। সেই সঙ্গে আমরা সবাই জানি—ন্যূনতম সাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব। আর চিরকাল জেনে এসেছি চিকিৎসাসেবা একটি মহান পেশা। জীবন দিতে বা রক্ষা করতে পারেন বলে সৃষ্টিকর্তা আর মায়ের পরেই চিকিৎসকের অবস্থান। সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড এমনকি ভারতেরও অনেক নামকরা হাসপাতালের ডাক্তারের চেম্বারে গেলে দেখতে পাই দেশ-বিদেশের অনেক রোগী জটিল রোগ থেকে নিরাময় লাভ করে কত কত কৃতজ্ঞতা জানান ডাক্তার মহোদয়কে। আমাদের দেশেও প্রায় একই রকম। অনেক ডাক্তার রাত-বিরাতে এমনকি বন্ধের দিনেও চিকিৎসাপত্র দিতে বিন্দু পরিমাণ দ্বিধা করেন না। সংখ্যায় কম হলেও অনেকে দেখেছি গরিব রোগীকে নিজ চেম্বারেও স্বল্পমূল্যে বা অনেক সময় প্রায় বিনামূল্যে যে চিকিৎসাপত্র দেন তা-ই নয়, ফ্রি ওষুধও দিয়ে দেন। অনেক বন্ধু ডাক্তারকে দেখেছি চেম্বারে দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীকে প্রাধান্য দেন।  

কিন্তু করোনায় কী দেখেছি? খোদ হাসপাতালের প্রধান এমনকি প্রধানমন্ত্রীকেও খেদোক্তি করতে হয়েছে। প্রথমে ধমক, এখন নেওয়া হয়েছে পুরস্কৃত করার উদ্যোগ। নেওয়া হয়েছে জীবন বিমার ব্যবস্থা।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন এসেছে, করোনা চিকিৎসায় ডাক্তারদের এতো অনীহা কেন, কেন এতো নিষ্ঠুরতা?

করোনা ছোঁয়াচে, তাই পারসোনাল প্রটেকটিভ ইকুইপমেন্ট বা পিপিই ছাড়া এসব রোগীর কাছে যাওয়া উচিত নয়। যথার্থ যুক্তি। সরকার, ডিজি হেলথসহ অনেক প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসলেন, হয়তো আরও আসবেন কিংবা আসাটাই প্রয়োজন। কিন্তু ডাক্তারদের নাকি ভয় কাটছেই না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে বলছেন, এটা ভয় নয়, অবহেলা। ডাক্তাররা আবার বলছেন—তারাও মানুষ, তাদেরও বাবা-মা, পরিবার-পরিজন আছেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা আর এগোবেন না। ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নাকি একজন ইন্টার্নি ডাক্তারও যোগ দেননি, পালিয়ে গেছেন।

আমার এক নিকটাত্মীয় প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা বাবার পরামর্শক্রমে গ্রামের গরিব রোগীদের চিকিৎসাপত্র দিচ্ছে সপ্তাহের ছুটির দিনগুলোতে। একাজটি করছেন অনেকেই। অথচ তাদেরই বন্ধুরা কিনা রোগী ফিরিয়ে দিচ্ছেন? সাধারণ সর্দিকাশির রোগীরও চিকিৎসা দিতে নারাজ। পর্যাপ্ত পিপিই দেওয়া হচ্ছে বা আসছে, সরকার হয়তো প্রণোদনাও দেবে, কিন্তু তাদের বেশিরভাগ অনড়, বিভ্রান্ত বা ভীত। জানি ব্যতিক্রম আছেন, তবে সেটা আমরা জানতে পারছি না।

এবার আসি করোনা মোকাবিলায় স্বাস্থ্যখাতের প্রস্তুতি বিবেচনায়। শুরু থেকেই আইইডিসিআর বা সংক্রামক ব্যাধি কেন্দ্রের দোমনায় মানুষের মধ্যে অনেক সন্দেহ দানা বাঁধে। তাদের পাশে নিপসম এবং আইসিডিডিআরবি। কিন্তু তাদের ইচ্ছা সত্ত্বেও করোনা পরীক্ষার সঙ্গে জড়িত করা হচ্ছিল না, পর্যাপ্ত পরীক্ষা কিট নেই বলে। ইতোমধ্যে পরীক্ষার কিট এসেছে বেশ, তবে পরীক্ষার প্রক্রিয়া এখনও শ্লথ বলছেন অনেকেই। কিট থাকলেও নাকি পর্যাপ্ত টেকনিশিয়ান নেই। তাছাড়া মাস্ক নিয়ে, পিপিই নিয়ে আমরা দুর্নীতিরও খবর পাচ্ছি। সেদিন শুনলাম ঢাকার এক প্রায় নবনির্মিত হাসপাতালে করোনা মোকাবিলায় নতুন এক আইসিইউ স্থাপন করা হবে। জরুরিভাবে টেন্ডার দিয়ে ৪০০ টাকার জিনিস কেনা হচ্ছে ১২ হাজার টাকায়। বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে যন্ত্রপাতি বা চিকিৎসাসামগ্রী সংগ্রহের পদ্ধতি নিয়ে জ্ঞান না থাকলে আপনি শিউরে উঠতে পারেন এগুলো শুনে।   

বাংলাদেশে মেডিক্যাল কলেজ রয়েছে ১১১টি, তারমধ্যে ৩৬টি সরকারি, ৬৯টি বেসরকারি আর ৬টি সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন। রয়েছে ৬০টি পূর্ণাঙ্গ নার্সিং কলেজ। তারমধ্যে ১৫টি সরকারি আর ৪৫টি বেসরকারি। তদুপরি ডিপ্লোমা প্রদানের জন্য রয়েছে ১৮৩টি নার্সিং ইনস্টিটিউট। ২০১৮ সালের হিসাবে বাংলাদেশে রয়েছেন ৫৬ হাজার ৬৭০ জন নার্স ও ৯১ হাজার ৩২১ জন রেজিস্টার্ড ডাক্তার। তারমধ্যে সরকারের সঙ্গে জড়িত ২৫ হাজার ৯৮০টি পদের বিপরীতে ২০ হাজার ৯১৪ জন। কমিউনিটি ক্লিনিক ছাড়া প্রাথমিক সেবাদানকারী হাসপাতালের সংখ্যা সরকারি ২ হাজার ৪টি আর বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের সংখ্যা ৫ হাজার ৫৪টি। এই সমস্ত হাসপাতাল ও ক্লিনিকে মোট বেড রয়েছে ১ লাখ ৪৩ হাজার ৩৯৪টি। সরকারের ৫২ হাজার ৮০৪টি আর বেসরকারিখাতে ৯০ হাজার ৫৮৭টি। আইসিইউ বা ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে বেড রয়েছে ১ হাজার ১৬৯টি। ১১২টি (সিলেটসহ বিভিন্ন হাসপাতালে) করোনা রোগীদের জন্য নির্ধারিত রাখা হয়েছে। তার মধ্যে ৪৩২টি সরকারি এবং ৭৩৭টি বেসরকারি। দেশে মোট ভেন্টিলেটর রয়েছে ১ হাজার ২৫০টি, তার মধ্যে ৫০০টি সরকারি হাসপাতালগুলোতে আর ৭৫০টি বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে (যদিও কার্যকর ইউনিটের সংখ্যা অনেক কম বলে রিপোর্ট বেরিয়েছে)। কিন্তু আমাদের প্রয়োজন ২৫ হাজার ভেন্টিলেটরের।

একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমরা যে স্বাস্থ্য অবকাঠামোতে খুব পিছিয়ে আছি তা কিন্তু নয়। অবশ্যই আমাদের আরও আইসিইউ প্রয়োজন, প্রয়োজন সংক্রমণ ব্যাধি বিশেষজ্ঞ, ভেন্টিলেটর আর প্রশিক্ষিত নার্সের।

তবে তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন একটি ন্যূনতম কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়া তোলা এবং কার্যরত ডাক্তারদের মধ্যে ন্যূনতম জবাবদিহিতা সৃষ্টি। শুধু মহান পেশা, মহান পেশা বলে কাজ হবে না। তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য থাকতে হবে সমন্বিত বিধিমালা। সরকারি ডাক্তারদের শুধু নগদ সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো নয়, নজর দিতে হবে তাদের অন্যান্য সরকারি অফিসারদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রেখে পর্যাপ্ত ক্ষমতায়ন ও সঠিক প্রাধিকার বিবেচনায়।

এটাও মনে রাখতে হবে, যেকোনও পেশায় জবাবদিহিতা দেশের সামগ্রিক সুশাসনের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। রাজনৈতিক কারণে সুবিধা নেওয়া ডাক্তার মহোদয়দের কাছ থেকে ক্রান্তিলগ্নে বেশি আশা করাটাও কিছুটা বোকামি। তার চেয়েও বেশি নির্বুদ্ধিতা হচ্ছে স্বাস্থ্যখাতের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতের জন্য যারা শুধু বাজেট বাজেট করে গলা ফাটিয়ে ফেলছেন, তাদের বুঝতে হবে বরাদ্দের চাইতেও বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের মূল সমস্যা ব্যবস্থাপনা আর পরিচালনগত দক্ষতা।

লেখক: অর্থনীতি বিশ্লেষক। 

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ