‘আজ আমাদের ছুটিরে ভাই, আজ আমাদের ছুটি’

Send
রুমিন ফারহানা
প্রকাশিত : ১৯:৫৫, মে ০৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:০০, মে ০৩, ২০২০

রুমিন ফারহানাষষ্ঠবারের মতো বাড়ানো হলো ‘ছুটির’ মেয়াদ। সম্ভবত আগামী ১৬ মে পর্যন্ত বাড়ানো হচ্ছে ‘ছুটি’। প্রথমে ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত ‘ছুটি’ দেওয়া হয়েছিল। তারপর ক্রমান্বয়ে ১১ এপ্রিল, ১৪ এপ্রিল, ২৫ এপ্রিল থেকে ৫ মে পেরিয়ে ১৬ মে পর্যন্ত গড়ালো এই ‘ছুটি’। কিন্তু এই ‘ছুটি’তো ঈদ, পূজা, বড়দিন, পহেলা বৈশাখের আনন্দময় ‘ছুটি’ নয়। এটি এক বিশেষ ধরনের ‘ছুটি’। এই ‘ছুটি’ ঘরে থাকার, এই ‘ছুটি’ সামাজিক দূরত্ব মানার, এই ‘ছুটি’ অতি সাবধানতার সঙ্গে নানা বিধিনিষেধ মেনে চলার। কিন্তু এমন ‘ছুটি’র সঙ্গে তো পরিচিত নই আমরা। আমাদের কাছে ছুটি মানে আনন্দ, সপরিবারে ঘুরতে যাওয়া, বাইরে খাওয়া, বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে ঘুরে আসা, সামর্থ্যে কুলালে কক্সবাজার বা বান্দরবান যাওয়া, আর কিছু না হলে নিদেনপক্ষে নিজের ভিটায় স্বজনদের কাছে ছুটে যাওয়া। ঘরে বন্দি ছুটি আবার কে কাটিয়েছে কবে?   
আর তাই বিশ্বজুড়ে মহামারির এই তাণ্ডব যতই চলুক, টিভি, রেডিও বা সংবাদপত্র ঘণ্টায় ঘণ্টায় যতই জানাক আক্রান্ত  কিংবা মৃতের আপডেট, যে মুহূর্তে আমাদের দেশে ‘ছুটি’ ঘোষিত হয়েছে, সপরিবারে তা উদযাপন করতে বেরিয়ে পড়েছে মানুষ। কেউ গেছে হোটেল রেস্তোরাঁয়, কেউ ঘুরেছে পার্কে, কেউ গেছে কক্সবাজার, কেউ বা পাড়ার মোড়ের চায়ের দোকানে। অর্থাৎ ঘরে থাকার বোকামি অন্তত করেনি। আবার এই ছুটি ছুটি আমেজকে আরও পাকাপোক্ত করতে এসব কিছুর মধ্যেই চুপিসারে হয়ে গেছে ঢাকা-১০, বাগেরহাট-৪ আর গাইবান্ধা-৩ আসনের উপনির্বাচন। নির্বাচন পেছানোর বিষয়ে কমিশন কর্ণপাত করেনি সম্ভবত এই ভেবে যে নির্বাচনে কেন্দ্রগুলো এমনিতেই যেহেতু জনমানবশূন্য থাকে, তাই নিতান্তই আনুষ্ঠানিকতা রক্ষার নির্বাচন আর যাই হোক জনস্বাস্থ্যে কোনও প্রভাব ফেলবে না। সত্যি বলতে কী, জনস্বাস্থ্যে এর কোনও প্রভাব পড়েনি। তবে প্রভাব যদি কোথাও পড়ে থাকে সেটা পড়েছে মানুষের মনে। অর্থাৎ পুরো বিষয়টিকেই মানুষ আরও হালকাভাবে নিয়েছে। সরকার ঘোষিত শব্দটি যেহেতু ‘ছুটি’ তাই দেশের অতি সচেতন অংশের সামান্য কিছু মানুষ বাদ দিলে অধিকাংশই শুরুতে বোঝেননি এই ছুটির সঙ্গে ঈদ বা পূজার আনন্দময়, উষ্ণ, আরামদায়ক, ঢিলেঢালা ছুটির পার্থক্য কোথায়? ছুটি তো ছুটিই।   

ফল যা হওয়ার তা-ই হয়েছে। সিন্ধুতে বিন্দুসম পরীক্ষার মধ্যেই আজ পর্যন্ত মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৯৪৫৫ জন, মৃত্যুবরণ করেছেন ১৭৭ জন। ১৮ কোটি মানুষের দেশে পরীক্ষার সংখ্যা প্রতিদিন গড়ে তিন হাজার থেকে বেড়ে এখন সাড়ে পাঁচ থেকে ছয় হাজারের মধ্যে। অর্থাৎ প্রতি ১০ লক্ষ মানুষে পরীক্ষা হচ্ছে মাত্র ৩২ জনের, অথচ যেখানে পরীক্ষাই এখন প্রতিরোধের একমাত্র উপায়। আবার করোনাভাইরাসে দক্ষিণ এশিয়া কেবল নয়, বরং সারা বিশ্বেই সর্বনিম্ন সুস্থতার হার বাংলাদেশে। বিশ্বে গড় সুস্থতার হার যেখানে ২৭% সেখানে বাংলাদেশে মাত্র ২.৫৭%। অথচ পাশের দেশ ভারতে এই সুস্থতার হার ১৭.২৪%, পাকিস্তানে ২১.৬৭%। বাংলাদেশে নমুনা পরীক্ষার সঙ্গে রোগী শনাক্তের হার বিবেচনা করলে আক্রান্তের হার দাঁড়ায় ১২.৫%। বিশ্বে আক্রান্ত এবং মৃতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি যুক্তরাষ্ট্রে। কিন্তু ভয়ের কথা হলো, প্রথম শনাক্ত হওয়ার ৪২ দিনের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বাংলাদেশে আক্রান্ত প্রতিটি ব্যক্তি দ্বারা এই ভাইরাস সংক্রমণের হার যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে অনেক বেশি। বাংলাদেশে যেখানে একজন সংক্রমিত মানুষ তিন জনকে সংক্রমিত করছেন, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম ৪২ দিনে এই হার ছিল ২ জনের কম। প্রথম ৪২ দিনের পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে প্রতি ৪.৩ দিনে এই সংক্রমণ দ্বিগুণ হচ্ছে অথচ যুক্তরাষ্ট্রে শুরুর ৪২ দিনে এই সংখ্যা দ্বিগুণ হতো প্রতি ৮ দিন পর পর।

করোনাভাইরাসের সাধারণ উপসর্গ হলো জ্বর, কাশি, গলাব্যথা ও শ্বাসকষ্ট। কিন্তু আতঙ্কের বিষয় হলো, এসব উপসর্গ নেই এমন ৮০০ জনের করোনা শনাক্ত করা হয়েছে। দেশের মোট ব্যক্তিদের মধ্যে এই ৮০০ ব্যক্তির মধ্যে করোনার কোনও লক্ষণ বা উপসর্গ কিছুই ছিল না। তারা সম্পূর্ণ সুস্থ ছিলেন। কিন্তু আর সব করোনা রোগীর মতোই তারাও সংক্রমিত করেছেন অসংখ্য মানুষকে। যেহেতু লক্ষণ ছিল না কোনও, তাই তারাও সাবধান হননি, যারা তাদের সংস্পর্শে এসেছেন, তারাও নন। সুতরাং লক্ষণহীন অথচ আক্রান্ত এই মানুষগুলো থেকে রোগ ছড়ানোর আশঙ্কা অনেক বেশি।

ইউরোপে যেখানে যুক্তরাজ্য, ইতালি, ফ্রান্স, স্পেন করোনার যুদ্ধে বিপর্যস্ত সেখানে অবিশ্বাস্য সাফল্য দেখিয়েছে জার্মানি। জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য মতে, করোনা দ্বারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে এখানে মৃত্যুর রেকর্ড সর্বনিম্ন হারের মধ্যে রয়েছে। আর সুস্থ হয়ে ঘরে ফেরার রেকর্ডও সবচেয়ে বেশি। করোনা যখন আঘাত হানে তখন ১১ মার্চ চ্যান্সেলর মেরকেল ভাষণ দেন, যা অত্যন্ত ইতিবাচক ও বাস্তবভিত্তিক ছিল। তিনি তথ্য নিয়ে লুকোচুরি করেননি বা নিয়তির ওপর নির্ভর করেননি। তিনি বরং বলেন, ‘পরিস্থিতি আতঙ্কজনক, আপনারা আতঙ্কিত হবেন। ৬০-৭০ শতাংশ জার্মান আক্রান্ত হতে পারেন।’ জার্মান প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘এটা কোনও জাতি বা সৈনিকের বিরুদ্ধে লড়াই নয়, এটা মানবতার পরীক্ষার লড়াই’। জার্মান কোনও নেতা বলেননি মেরকেলের মতো নেতা থাকায় জার্মানিতে করোনা আসবে না, সুতরাং কোনও ভয় নেই। এই সস্তা ধাঁচের রাজনীতির মিলিত বয়ান আমরা কোনও জার্মান নেতার মুখে শুনিনি। জার্মানির হেসে রাজ্যের অর্থমন্ত্রী করোনাভাইরাসের অর্থনৈতিক পরিণতি নিয়ে অতি উদ্বেগ থেকে আত্মহত্যা পর্যন্ত করেন। তিনি ১০ বছর ধরে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছিলেন, তাকে এই প্রদেশের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দেখা হতো। মুখ্যমন্ত্রী জানান, করোনাভাইরাসে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সাহায্যের প্যাকেজ নিয়ে দিন রাত কাজ করছিলেন অর্থমন্ত্রী। জার্মানিতে ২০ এপ্রিল থেকে কিছুটা বিধিনিষেধ হ্রাস করার সময় চ্যান্সেলর মেরকেল সাবধান করে দিয়ে বলেন, ‘এই অন্তর্বর্তীকালীন অর্জন খুবই ভঙ্গুর, যেন আমরা পাতলা বরফের ওপর আছি।’ তিনি সংসদে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট উচ্চারণ করেন, ‘কেউ এটি শুনতে পছন্দ করেন না, তবে এটি সত্য যে আমরা এই সংকটের শীর্ষ পর্যায় এখনও পার হইনি।’ ভবিষ্যতের সাবধানতা হিসেবে ইতোমধ্যে সারা জার্মানিতে ১৩ হাজার বেড আলাদা করে রাখা হয়েছে, তার সঙ্গে বার্লিনের ‘Messe Berlin”-কে এখনই ভবিষ্যতের জরুরি হাসপাতাল বানানোর কাজ চলছে। অর্থনৈতিক সক্ষমতা, শক্তিশালী স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, রাজনৈতিক দক্ষতা, বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি, দৃঢ়চেতা নেতৃত্ব এবং সর্বোপরি সব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা জার্মানির সফলতার মূলমন্ত্র হিসেবে কাজ করেছে।

করোনা মোকাবিলায় আর একটি সফল দেশের নাম ভিয়েতনাম। ১০ কোটি মানুষের এই দেশটি চীনের সঙ্গে ১৩০০ কিলোমিটার সীমান্ত ভাগাভাগি, ২৫ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার পরও ১ জন মানুষও এখন পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করেনি এই ভাইরাসে। ২৭০ জন সংক্রমিতের মধ্যে ২২০ জনই সুস্থ এখন। এই সফলতার জন্য মূলত বলা হয় রাজনৈতিক দূরদর্শিতার কথা। রোগী ধরা পড়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেনি দেশটির নেতৃত্ব। তার আগেই সর্বোচ্চ প্রশাসনিক সতর্কতায় সরকারের সর্বাধিক ‘অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়’ হয় করোনা মোকাবিলা। শুরুতেই যারা সংক্রমিত হয়েছিল তাদের চলাফেরা, মেলামেশার ইতিহাস সংগ্রহ করা হয় এবং তাদের সবাইকে পরীক্ষার আওতায় আনা হয় ব্যাপক হারে। মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক, মাস্কের দাম বৃদ্ধিকে শাস্তিমূলক এবং তথ্য লুকানোকে শাস্তিযোগ্য করা হয়। মার্চ থেকেই ভিয়েতনামে আসা সব নাগরিককে বাধ্যতামূলক আইসোলেশনে নেওয়া হয়। বিদেশিদের আসায় নিষেধাজ্ঞা জারি হয়, অনেক অস্থায়ী হাসপাতাল ও আশ্রয়কেন্দ্র বানিয়ে ফেলা হয়, বিমানবন্দরে বিনা খরচে ভাইরাস পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। একটা সংক্রমণের সঙ্গে সঙ্গে পুরো এলাকাকে কোয়ারেন্টিন করে শুরু হতো গণহারে পরীক্ষা। প্রশাসন কাজ করেছে বহুমুখী। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ সব আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রশংসা সত্ত্বেও কোনও সন্তুষ্টি বা শ্লাঘা কাজ করেনি তাদের মধ্যে। প্রকৃত চিত্র, তা যত ভয়াবহই হোক না কেন, তা তুলে ধরে জনগণকে সচেতন করা হয়েছিল। বিষয়টির ভয়াবহতাকে কোনোভাবেই ঢাকার চেষ্টা করা হয়নি।

শ্রীলঙ্কা মার্চেই জারি করেছিল কারফিউ, স্থগিত করেছিল নির্বাচন। আমাদের দেশে ঘটেছে ঠিক উল্টোটা। সর্বক্ষেত্রে এক ধরনের ঢিলেঢালা ভাব, সমন্বয়হীনতা, পরীক্ষার কিট আর চিকিৎসা সরঞ্জামের অপ্রতুলতা পুরো বিষয়টিকে জটিল করেছে অনেক বেশি। করোনা শুরু না হতেই আমাদের রাজনীতিবিদদের গগনবিদারি রাজনৈতিক বক্তব্য করোনাকে যতটা না স্বাস্থ্য, তারচেয়ে বেশি রাজনৈতিক বিষয়ে পরিণত করেছিল। তার ওপর বারবার ‘ছুটি’ শব্দের ব্যবহারে সাধারণ মানুষ এর ভয়াবহতা বুঝতে পারেনি। আর তাই সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‌্যাব মাঠে থাকার পরও মানুষকে বোঝাতে সক্ষম হয়নি ঘরে থাকার গুরুত্ব। এখন অতি সীমিত পরীক্ষার মধ্যেও দেখা যাচ্ছে প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত আর মৃতের সংখ্যা। এরমধ্যেই খুলছে পোশাক কারখানা, ইফতারির দোকান। শুরু থেকেই বিষয়টিকে সরকারের তরফে যেমন হালকাভাবে দেখানো হয়েছে, তেমনি দেখেছে মানুষ। আর তাই ‘ছুটি’ এখানে ‘ছুটির’ আমেজ নিয়েই এসেছে, এর বেশি কিছু না। এর পরিণতি কি হতে যাচ্ছে তা সময়ই বলে দেবে।

লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট।  জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে বিএনপির দলীয় সংসদ সদস্য

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ