বাজারই শেষ কথা নয়

Send
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
প্রকাশিত : ১৩:১৩, জুন ১০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:১৪, জুন ১০, ২০২০

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজাদেশে প্রথম করোনা শনাক্ত হয়েছিল ৮ মার্চ। তিন মাস পার হয়ে গেছে। এখন এলাকাভিত্তিক লকডাউনের ভাবনায় প্রথম পাইলট প্রকল্পের সেই অনুশীলন চলছে রাজধানীর পূর্ব রাজাবাজারে।
করোনা কী? এমন একটা প্রশ্ন করলে নানা উত্তর উঠে আসবে। বিশেষ করে ডাক্তাররা এই রোগের আনুষ্ঠানিক নাম কোভিড-১৯ এর অনেক ধরনের বিশ্লেষণ আর বৈশিষ্ট্য উপস্থিত করবেন। কিন্তু সারা বিশ্বের সাধারণ মানুষ এই রোগ সম্পর্কে সেই ডিসেম্বর থেকে যা যা শিখেছে সেটা বলতে গিয়ে বলবে, একটি ক্ষুদ্র ভাইরাস বিদ্যুৎ গতিতে ছড়িয়ে আজ বিশ্বজুড়ে হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে। এই অজানা অদেখা ভাইরাস পৃথিবীজুড়ে নিস্তব্ধতা এনেছে, আলো ঝলমল শহরকে নীরব করে রেখেছে দিনের পর দিন। লকডাউন আর আইসোলেশন নামের এক কঠোর শাসনে মানুষ অভ্যস্ত হয়েছে। সচেতনরা শিখেছে ২০ সেকেন্ডের অনবরত হাত ধোয়া আর হ্যান্ড স্যানিটাইজারের ব্যবহার।
বাংলাদেশে তিন মাসে আমরা লকডাউনের পরিবর্তে সাধারণ ছুটি পালন করেছি। দেশের করোনা আক্রমণের শুরুর দিকে এই ছুটি বেশ উৎসবের আয়োজনে বরণ করেছে মানুষ। এ কারণে পুলিশ, র‌্যাবের পাশাপাশি সেনাবাহিনী নামিয়েও লকডাউনের কঠোর কোনও বার্তা মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হয়নি, আমাদের কোনও জনপদ পুরোপুরি নিস্তব্ধও হয়নি কখনও।

তিন মাসে অনেক দেশ এই রোগ নিয়ন্ত্রণে আনলেও, আমরা এখনও ভাইরাসের সঙ্গে যুদ্ধ করছি। এর লাল চোখ কতদিন দেখতে হবে, আমাদের জানা নেই। তাহলে কি আমরা কিছুই করিনি? অবশ্যই আমরা অনেক কিছু করেছি। শুরুর দিকে একটি মাত্র টেস্ট সেন্টার থেকে আজ অর্ধশতেরও বেশি করোনা পরীক্ষা কেন্দ্র হয়েছে, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা সরঞ্জামের সরবরাহ বেড়েছে, করোনা চিকিৎসার হাসপাতাল বেড়েছে, ব্যক্তিখাত যুক্ত হয়েছে, জীবনের পাশাপাশি মানুষের জীবিকা বাঁচাতে বিভিন্ন খাতকে রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে, অর্থনীতিকে সচল করতে নানা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং বহু হতদরিদ্র মানুষকে সরকারি বেসরকারি ও ব্যক্তি উদ্যোগে ত্রাণ দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু তবুও বলতে হচ্ছে ১৬ কোটি মানুষের দেশে যত সংখ্যক পরীক্ষা সুবিধা হওয়ার কথা তা থেকে অনেক দূরে অবস্থান করেও করোনাভাইরাস সংক্রমণের বিবেচনায় বাংলাদেশের অবস্থান এখন ১৯তম। এই তিন মাস করোনা থেকে মানুষকে দূরে রাখতে লকডাউন আর ছুটির সংশয় থেকে মানুষকে বের করা যায়নি। সবচেয়ে বেশি প্রণোদনা পেয়েও সবচেয়ে বড় রফতানি পণ্য পোশাক খাতের মালিকরা এখন ব্যাপক হারে কর্মী ছাঁটাইয়ের হুমকি দেয়, মানুষের আয় কমার পরও তাদের ওপরই ৬০ ভাগ বেশি ভাড়া চাপিয়ে গণপরিবহন রাস্তায় নামে। আমাদের প্রয়োজন ছিল ভাইরাসের মারণ ক্ষমতার গুরুত্ব বুঝে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যৌক্তিক সময়ের জন্য বন্ধ রাখা, যেটা করা যায়নি।  

এখন প্রতিদিন দুপুর দুইটায় মানুষের অভ্যাসে দাঁড়িয়েছে করোনা পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের ব্রিফিং দেখা। এবং প্রায় প্রতিদিনই মৃত্য আর আক্রান্তের হার বাড়ছে। মানুষকে সংক্রমণের ভয় তাড়া করছে। আতঙ্ক আর উদ্বেগে থাকা মানুষ বুঝতে পারছে না এই করোনাভাইরাসের বিস্তার কবে নিয়ন্ত্রণে আসবে।

যে কাজগুলো করা যেতো তার তালিকা খুব বেশি দীর্ঘ না। প্রবাসীদের এভাবে গণহারে আসতে না দেওয়া, দিলেও তাদের কোয়ারেন্টিনে রাখা, করোনা রোগ শনাক্তের জন্য টেস্টের আওতা বাড়ানো, হাসপাতাল ঠিক করা, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য আগে থেকেই সুরক্ষা সামগ্রীর ব্যবস্থা করা এবং দেশব্যাপী একটা জনতার কারফিউর মতো নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কঠোর লকডাউন করা। কিছু কিছু চেষ্টা হয়েছে, এলাকাভিত্তিক লকডাউনও হয়েছে, কিন্তু ঢিলেঢালাভাবে হওয়ায় সাধারণ ছুটি রোগ সংক্রমণ ঠেকাতে বড় ভূমিকা রাখতে পারেনি। এক বাক্যে বলতে গেলে দ্বিধা, অদক্ষতা আর অপরিকল্পনার মধ্য দিয়েই এই মহামারিকে মোকাবিলা করে করে এখন চূড়ান্ত স্তরে পৌঁছেছি আমরা।

ভয়াল ভাইরাস ধনী, দরিদ্র, ক্ষমতাবান বা ক্ষমতাহীন নির্বিশেষে কাউকে ছেড়ে কথা বলছে না। এখন সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ঢাকায়, এরপর চট্টগ্রাম। অন্য জেলায় কোথাও বেশি সংক্রমণ, কোথাও কম।

লাল, হলুদ আর সবুজ নির্দিষ্ট করে যে এলাকাভিত্তিক লকডাউনের অনুমতি প্রধানমন্ত্রী দিয়েছেন তা কঠোরভাবে, সুচিন্তিতভাবে বাস্তবায়ন করা হোক এখন। আমরা একবার সমন্বিত লড়াইটা করতে পারলে সাফল্য আসবেই, সংক্রমণ কমবেই।

অতিরিক্ত বাণিজ্য-মনস্কতা থেকে বেরিয়ে এসে মানুষকে বাঁচানোর পথ ধরাই হবে আসল কাজ। একটা কথা মনে রাখা দরকার, মানুষই অর্থনীতির সেবা করে, অর্থনীতি মানুষের সেবক নয়। অর্থনীতি চাঙ্গা করতেই হবে, কিন্তু যেনতেন ‌প্রকারে অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখতে হবে এমন মনোভাব যেন না আসে।

বাজেট আসছে। আয় ব্যয়ের হিসাব উঠে আসবে নানা আলোচনায়। আমাদের উন্নয়ন প্রয়াসও অব্যাহত থাকবে। কিন্তু মনে রাখা দরকার এই করোনাকাল আমাদের সামনে বেশ কিছু বাস্তবতা হাজির করেছে। বিশেষ করে আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা যে চরম নাজুক অবস্থায় আছে তা সবাই উপলব্ধি করতে পারছি। আবহাওয়ার পরিবর্তন, সমাজে বিরাজমান চরম বৈষম্য, এত উন্নয়নের পরও ভয়ংকর দারিদ্র্য, ভেঙে পড়া স্বাস্থ্য ব্যবস্থা—এগুলোই নিয়েই ভাবতে হবে আগামীর অর্থনীতিকে। বাজার অর্থনীতিই শেষ কথা নয়।

লেখক: সাংবাদিক  

  

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ