ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মেজর’ ও ‘মাইনর’

Send
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
প্রকাশিত : ১২:৪৭, জুলাই ০১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:৪৮, জুলাই ০১, ২০২০

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজাকোনও কোনও বিশ্ববিদ্যালয় নাকি অ্যাকটিভিজমে মেজর, আর বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজের যে কাজ অর্থাৎ শিক্ষা ও গবেষণা সেখানে সে থাকে মাইনর অবস্থানে। শততম বর্ষে দাঁড়িয়ে আমি আমার নিজের প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে ঠিক এমনটাই ভাবছি। আজ শতবর্ষে পা দিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। গতকাল মঙ্গলবার (৩০ জুন) ৯৯ বছর পূর্ণ হয়েছে ঐতিহ্যবাহী এই বিশ্ববিদ্যালয়ের।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পটভূমি লিখতে বা বলতে গেলে অনেকেই সঙ্গত কারণে বাঙালি মুসলমানের শিক্ষা উন্নয়নে এর ভূমিকার কথা বলবেন, বলবেন ঢাকার নবাবদের কথা, কেউ কেউ ইতিহাসকে টেনে নিয়ে যাবেন ১৭৫৭ সালের পলাশীর ময়দানে এবং বলবেন সেখানেই নাকি বাঙালি মুসলমানের ভাগ্যবিপর্যয় ঘটেছিল। সেখান থেকেই শিক্ষা-সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও রাজনীতি থেকে ছিটকে পড়েছিল বাঙালি মুসলমান। সেখান থেকে বাঙালিকে উদ্ধারের জন্যই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম।
নবাব সিরাজউদ্দৌলা কতটা বাঙালি ছিলেন, কতটা বাঙালির শিক্ষা-সংস্কৃতি ধারণ করতেন, সেটা যতটা মিথ, ততটা ঠিক কিনা, সে নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। তবে যে গোষ্ঠী বলতে চায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন, সেটা নিয়ে কোনও কথাও হবে না, কারণ এটি চরম এক সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর প্রচারণা।

আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অতীত রাজনৈতিক অর্জন নিয়ে যতটা আলোচনা হয়, যতটা গর্ব করে আলোচিত হয় বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনে এর শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের অবদান, তত আলোচনা পাই না তার একাডেমিক অর্জন নিয়ে। ঠিক এ পটভূমিতেই জানতে ইচ্ছা করে বাংলাদেশের প্রধান বিদ্যাপীঠের মেজর আর মাইনর ভূমিকা আসলে কী ছিল বা আছে।

শিক্ষকদের বর্ণিল রাজনীতি, কিছু কিছু ছাত্র সংগঠনের সহিংস এ চাঁদাবাজি সংস্কৃতির রাজনীতি শিক্ষাঙ্গনের পবিত্রতা রক্ষা যে করছে না, সেটা আমরা দেখে আসছি বহুকাল ধরে। একটা সভ্য সমাজে শিক্ষাঙ্গনের সুস্থতা বলতে যা বোঝায় এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীদের কীর্তিকলাপ সেটা কতটা রক্ষা করছে বা কতটা লঙ্ঘন করছে, সে নিয়ে জনমনে প্রচুর প্রশ্ন আছে। আজ যারা বিরোধী আসনে বসে শিক্ষাজগতে কদর্য উচ্ছৃঙ্খলতার নিন্দায় পবিত্র কথা বিতরণ করছেন, তাদের আমলে বিশ্ববিদ্যালয়ে দলতন্ত্রের সৃষ্টি ও লালন কতটুকু হয়েছে সেটাও ইতিহাসে লেখা আছে। আমাদের চরম দুর্ভাগ্য, যে দলই ক্ষমতায় আসুক, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রশাসনিক কাজে জড়িত শিক্ষক সমাজের একমাত্র যোগ্যতা থাকে প্রশ্নহীন আনুগত্য। শিক্ষক রাজনীতি বা ছাত্র রাজনীতির প্রতিটি স্তরে দলতন্ত্রের চেহারা ও চরিত্র বহুদিন ধরেই অনেক বেশি স্থূল আর উৎকট।

একথা নিশ্চয়ই বলা সঙ্গত, বিশ্ববিদ্যালয়কে সুস্থ রাখার প্রথম শর্ত ক্যাম্পাস থেকে দলকেন্দ্রিক রাজনীতিকে যতদূর সম্ভব দূরে রাখা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তো বটেই, প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঘটেছে এর সম্পূর্ণ বিপরীত। কিন্তু এই দোষ যদি আমরা শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাত্র-ছাত্রীদের দেই, তাহলে অন্যায় হবে বৈ কি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে যে অধ্যাদেশের মাধ্যমে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গণতন্ত্রের চর্চা সমৃদ্ধ করতে চেয়েছিলেন, তার অপব্যবহারই যেন অবধারিতভাবে এই বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একাডেমিক চর্চাকে মাইনর করে দিয়েছে। শাসক রাজনৈতিক দল নিজেদের সব সমস্যায় বিশ্ববিদ্যালয়কে জড়িয়ে এক ধরনের সামাজিক সমস্যা যেন চিরস্থায়ী করেছে।

দৃঢ় আত্মমর্যাদাবোধের বদলে সুদৃঢ় আনুগত্যের চর্চায় লিপ্ত উপাচার্য ও শিক্ষকরা অম্লানবদনে দলনেতাদের সঙ্গে এখন মঞ্চ আলোকিত করাকেই বড় সাধনা বলে মনে করেন। ন্যায্যত চর্চার বদলে রাজনৈতিক অন্যায্য চর্চা যেখানে শিক্ষকদের প্রতিযোগিতার উপকরণ, সেখানে শিক্ষকদের কোনও মর্যাদা থাকে কিনা, সেটা ভাবনার বিষয়। কোনও কোনও বিবেচনায় শিক্ষকদের চেয়ে শাসক দলের ছাত্র সংগঠনের নেতাদের মর্যাদাই বরং বেশি অনুভূত হয় ক্যাম্পাসে।

এমন নিম্নমানের রাজনৈতিক সংস্কৃতি শিক্ষাঙ্গনে দাপিয়ে বেড়ালে ছাত্রছাত্রীরা সুস্থ, সুশৃঙ্খল আচরণের ভেতর দিয়ে শিক্ষা গ্রহণ করবে, সেটা ভাবা বাতুলতা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশের মুহূর্ত হতে প্রতিনিয়ত বিষবৃক্ষের ফল খেয়ে গেলে কোনটা মেজর হয় আর কোনটা মাইনর হয়ে যায়, তা বুঝতে ভুল হয় না কারও।

শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়ন যেমন, অধ্যাপক হওয়া, ডিন হওয়া, প্রভোস্ট হওয়া, সিন্ডিকেট ও সিনেটে সদস্য পদ পাওয়া, উপাচার্যের পদ পাওয়া, ক্যাম্পাসের বাইরে লাভজনক পদে যাওয়া সবই যখন হয় কে কতটা মারদাঙ্গা রাজনীতিক সেই বিবেচনায়, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের আসল কাজ-শিক্ষা বিতরণ ও গবেষণা- যেমনই উধাও হয়ে যায়, তেমনি অন্তরালে চলে যান একাডেমিক কাজে মেধাবী ও সুশৃঙ্খল শিক্ষকরা। ছাত্র রাজনীতিতে যারা একটু ভালো চর্চা করতে আগ্রহী হয়, তারা অপাঙতেয় হয়ে যায় সামাজিক শ্রোতধারায়।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের মাধ্যমে সরকার আর্থিক অনুদান দিতে কার্পণ্য করেনি কখনও। শত শত কোটি টাকার প্রকল্প, ঝকঝকে, চকচকে শিক্ষক লাউঞ্জ দেখে বোঝা যায় আর্থিক সচ্ছলতা। কিন্তু গবেষণা নিয়ে বিশ্ববুকে দাঁড়াতে পারে না আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

প্রতি বছরই প্রতিষ্ঠা দিবস পালিত হয়। স্মরণিকা প্রকাশিত হয়। আবার সেটা নিয়ে রাজনৈতিক কেলেংকারির গল্পও ছড়ায়। সেসব প্রকাশনা চকচকে কাগজে ছাপানো হলেও এগুলো ভরা থাকে নানা অপ্রয়োজনীয় ছবিতে। এসব ছবির বেশিরভাগই উপাচার্য ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের সঙ্গে জড়িত রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী অধ্যাপক-অধ্যাপিকার নানা র্কীতি। কোনও প্রবন্ধ চোখে পড়ে না, যা থেকে বার্ষিকীর তাৎপর্য বোঝা যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় কীভাবে সমাজকে আলোকিত করে, সেটাও বোঝা যায় না কোনও লেখা থেকে।

সারা দেশে উচ্চশিক্ষা চলছে জটিল সমস্যার মধ্য দিয়ে। তার মধ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে পথ চলতে হচ্ছে। দোষ আছে অনেক, কিন্তু আমাদের আর আছেটা কী? যত সমালোচনাই করি আমাদের সভ্যতা, প্রতিষ্ঠান, শিল্প সবই যখন নিম্নমুখী, তখন প্রত্যাশা একটাই, শিক্ষাটাকে প্রাণপণে ধরে রাখুক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এটা অন্তরের চাওয়া। আমাদের বাঁচতে হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বাঁচাতে হবে। শতবর্ষে দাঁড়িয়ে প্রাণের এই প্রতিষ্ঠানের জন্য ভাবনা- রাজনীতি থেকে সৃষ্ট দুর্নীতি আর অনাচারের বিষবৃক্ষ হতে এই প্রতিষ্ঠানটি মুক্তি পাক।

লেখক: সাংবাদিক

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ