ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেষ্ঠত্ব ও বর্তমানে শরীরে বার্ধক্যের সূচনা

Send
স্বদেশ রায়
প্রকাশিত : ১৫:৪৯, জুলাই ০২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৫০, জুলাই ০২, ২০২০

স্বদেশ রায়প্রায় বছর পনের আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর একটা লেখা লিখেছিলাম। পরে ওই লেখাটি  ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ সম্পর্কে ঢাকা ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় যৌথভাবে একটা বই বের করে সেখানে রাখা হয়েছে। সেখানে এ কথাটাই বলার চেষ্টা করেছিলাম, অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ, হার্ভার্ড প্রভৃতি বিশ্ববিদ্যালয় অনেক বিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ, সাহিত্যিকের জন্ম দিয়েছে। তাদের একটি বিরাট সংখ্যক নোবেল লরিয়েট। সে হিসেবে হিসেব করলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালযের অবস্থান অনেক নিচে। কিন্তু প্রিজমের অন্য একটি পার্শ্ব দিয়ে দেখলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান পৃথিবীতে শীর্ষে। কারণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই পৃথিবীতে একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়, যা কিনা একটি ভাষা, একটি জাতি ও একটি রাষ্ট্র দিয়েছে। আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষের দ্বারপ্রান্তে এসে আমরা নিশ্চয়ই এ নিয়ে আর কোনও বিতর্ক করবো না যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় না হলে বাংলা রাষ্ট্রভাষা, বাঙালি একটি স্বতন্ত্র জাতি ও বাঙালির একটি রাষ্ট্রের জন্ম হতো না। পৃথিবীর কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গৌরব নেই। আর এই গৌরব কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষকদের নয়, সমগ্র বাঙালি জাতির। কারণ, এই জাতি এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম দিয়েছে এবং ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের সব আন্দোলনে সমর্থন করেছে।
বাস্তবে আজ একথা বলতে হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মূলত তৃতীয় বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়ের পথনির্দেশক। তৃতীয় বিশ্বের পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীতে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব যে শুধু ছাত্র পড়ানো এবং ছাত্রদের একটি বিশেষ সাবজেক্টে জ্ঞানী করে তোলা নয়, ওই বিশ্ববিদ্যালয় যে ওই জাতির আলোর দিশারী সেটা প্রমাণ করা। আর এ কাজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার জন্মের পঞ্চাশ বছরের ভেতরই অনেক পথ পাড়ি দিয়ে সফল হয়। তারপরেও কম দায়িত্ব পালন করেনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৪৭-এর পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পশ্চাৎপদ এই গ্রামবাংলা বা পূর্ববাংলার মানুষের জন্যে শুধু ভাষা, জাতীয়তা এবং রাষ্ট্র দেয়নি, রাষ্ট্র ও সমাজের একটি অনিবার্য চালিকা শক্তি শিক্ষিত এবং রাষ্ট্র ও সমাজ সচেতন মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে তোলে। এই মধ্যবিত্ত শ্রেণি ছাড়া একটি রাষ্ট্র ও সমাজ দাঁড়াতে পারে না। ১৯৪৭-এ বাংলা ভাগ হওয়ার ফলে উনবিংশ ও বিংশ  শতকের প্রথম ভাগে যে বাঙালি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে উঠেছিলে তার বড় একটি অংশ দেশান্তরিত হয়। তখন পূর্ববাংলার সমাজে অনিবার্যভাবে প্রয়োজন পড়ে সমাজ সচেতন, সভ্যতা সচেতন মধ্যবিত্ত গড়ে তোলা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সেই মধ্যবিত্ত বিকাশের সুযোগ ও পরিবেশ দেয়। তাই যে সংস্কৃত মধ্যবিত্ত মানসিকতার ওপর ভিত্তি করে বাঙালি তার নিজস্ব রাষ্ট্র খুঁজেছিল ও সৃষ্টি করেছিল এই মানসিকতার বীজ যেমন বপন হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তেমনি বীজটি শুধু অংকুরদোগম নয় সেটা গাছে পরিণত হয়।
বাঙালির একটি রাষ্ট্র সৃষ্টির জন্যে সব থেকে বেশি দরকার ছিল বাঙালি মধ্যবিত্ত মানসিকতা তৈরি বা আধুনিক বাঙালি সংস্কৃতিনির্ভর মানসিকতা তৈরি করা। কারণ, কলকাতা কেন্দ্রিক একটি রেনেসাঁর ভেতর দিয়ে বাঙালির মোটামুটি যে আধুনিক বাঙালি মানসিকতা তৈরি হয়েছিল তার অনেকখানি মৃত্যু ঘটে ১৯৪৬-এর দাঙ্গা ও ১৯৪৭-এ হিন্দু মুসলিম ভিত্তিতে দেশভাগের ভেতর দিয়ে। কারণ, তখন কম বেশি সবার মানসিকতায় একটি হিন্দুত্ব ও মুসলিমত্ব’র ছাপ পড়ে। এর বাইরে থাকে খুবই কম অংশ। অন্যদিকে, পূর্ববাংলার প্রাদেশিক রাষ্ট্রযন্ত্রটি তখন পূর্ব বাংলার মেজরটির মানসকে মুসলিম মানস তৈরিতে ব্যস্ত ছিল। বাস্তবে তারা যদি সফল হতো, পূর্ববাংলার মানস যদি মুসলিম মানসে পরিণত হতো তাহলে কোনোদিনই বাঙালির আর কোনও রাষ্ট্র তৈরি হতো না। পৃথিবীতে থাকতো না বাঙালি জাতীয়তা রাষ্ট্রীয়ভাবে। কারণ, জনগণের যেমন মানস তৈরি হয় শেষ অবধি জনগণ তেমনি রাষ্ট্র পায় বা তৈরি করতে পারে। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকজুড়ে মুসলিম হিন্দু মানসের পরিবর্তে বাঙালির বাঙালি মানস তৈরি হয়েছিল বলেই ১৯৭১ সালে বাঙালি তার নিজস্ব রাষ্ট্র পায়। বিশাল পাকিস্তানি রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই সূচনা করে বাঙালি মানস তৈরির কাজটি। আর সেই আগুনই ছড়িয়ে যায় সবখানে। দেশজুড়ে তৈরি হয় বাঙালি মানস। এমনকি এ মুহূর্তে এই ধর্মান্ধ বিশ্বে, ধর্মীয় বিজয়ডঙ্কার বাংলাদেশে এখনও যে টিম টিম করে একটি আধুনিক বাঙালি মানসিকতা সবখানে জেগে আছে, আর যে কারণে এখনও একটি আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্ববুকে পরিচিত- এটাও কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যে সূচনা করেছিল তারই একটি সারাংশ।
আজ শতবর্ষের প্রান্তে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য ঠিকই পঞ্চাশ বা ষাটের দশকের মতো ভালো নেই। বাস্তবে একটি বিশ্ববিদ্যালয় শতবর্ষে  যৌবনের দিকে এগিয়ে যায় কিন্তু তার পরিবর্তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শরীরে কিছুটা হলেও জরা নেমেছে। বিশেষ করে এখনও বাংলাদেশের মতো একটি পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীতে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের যে দায়িত্ব আছে, তার ঐতিহ্য অনুযায়ী সে সেটা পালন করতে পারছে না। তবে তারপরেও হতাশ হওয়ার কোনও স্থান নেই। কারণ, ২০১৩-তে গণজাগরণ মঞ্চে অধিকাংশ ছেলেমেয়েকে আসতে দেখেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। পার্থক্য হলো ষাটের দশক হলে এই আগুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরেই জ্বলে উঠতো আর ২০১৩ সালে জ্বলে উঠেছিল শাহবাগ চত্বরে। তবে তা হতাশ হওয়ার কিছু নয়, ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরাই পল্টনে আগুন জ্বালিয়েছিল। তারপরেও সত্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শরীরে কিছুটা হলেও জরা নেমেছে। হয়তো বলা যেতে পারে এই জরা সামগ্রিকভাবে আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজে নেমে এসেছে। আর যাই হোক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তো সমাজের ও রাষ্ট্রের বাইরে নয়। তাই স্বাভাবিকই সমাজের ছাপ তার ওপরে পড়বে। কিন্তু এখানেই বিশ্ববিদ্যালয়কে শক্তি দেখাতে হয়। আর এ কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়। সেই শক্তি হলো সমাজের ওপর ছাপ ফেলবে বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর সমাজ ছাপ ফেলতে পারবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজই হলো সমাজের ওপর ছাপ ফেলা বা সমাজ কোন পথে চলবে সেই আলোর রেখা তৈরি করা।
বিশ্ববিদ্যালয় সৃষ্টিই হয়েছিল সেই মানুষ তৈরি করার জন্যে যে মানুষ পৃথিবীকে তার চারপাশের মানুষকে আলোর পথে নিয়ে যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার জন্ম থেকে সে কাজই করে আসছে। এবং তার এই শতবর্ষে বেশি সময়ই সে যৌবনের প্রতিনিধি হয়ে পথ চলেছে। কোনও রাষ্ট্র, কোনও রাজনীতি, কোনও সামরিক শক্তি তার যৌবনকে কেড়ে নিতে পারেনি। তার যৌবনকে কেড়ে নিতে পারেনি কোনও মধ্যযুগীয় পশ্চাৎপদ চিন্তা চেতনা। যুক্তির বাইরে কোনও অন্ধ বিশ্বাসের পথ তৈরির গড্ডালিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কখনও হারিয়ে যায়নি। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ছাত্র সংগঠন সরকারি দলের ছাত্র সংগঠন হতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, প্রো ভিসি সরকারের মাধ্যমে নিয়োগ হতে পারে। এমনকি শিক্ষকরা সরকারি দল থেকেও অনেকে আসতে পারেন। ক্ষতি নেই। তবে সবাইকে মনে রাখতে হবে, আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। আমার দায়িত্ব আমার রাষ্ট্রের জন্যে আধুনিক পথটি এগিয়ে নেওয়া, আমার সমাজের জন্যে আলোর রেখা তৈরি করা। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, শিক্ষক , উপ- উপাচার্য, উপাচার্য কারোরই তো এর বাইরে যাওয়ার কোনও সুযোগ নেই। এর বাইরে গেলে তিনি আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থাকেন না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শরীরে যে জরা নেমেছে তার কারণ কিছু কিছু পা বাইরে চলে গেছে বলেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ পালন তখনই সফল হবে যখন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সব পা তার আপন অঙ্গনে তার আপন ঐতিহ্য ধারায় ফিরে আসবে।

লেখক: রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ