কিশোরদের সামনে আদর্শ কারা?

Send
শান্তনু চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৮:৫৮, সেপ্টেম্বর ০১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:০২, সেপ্টেম্বর ০১, ২০২০

শান্তনু চৌধুরীসম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ভাইরাল হতে দেখলাম। বিশেষ করে কথিত টিকটক তারকা অপু গ্রেফতার ও তার চুলের কালার নিয়ে আলোচনার পর। ভিডিওটিতে দেখা গেলো, এক পুলিশ চুল রঙ করা এক কিশোরকে সেলুনে নিয়ে এসেছেন এবং ক্যামেরার সামনে তার বাবা বলছেন ছেলে কথা না শুনে চুলে রঙ করছে। পরে পুলিশের কাছে ওই কিশোর বিষয়টি ‘খারাপ’ মন্তব্য করে সেলুনে চুল কাটতে বাধ্য হয়। বিষয়টি সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ের কথা মনে করিয়ে দিলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যা হয়, পক্ষে বিপক্ষে নানা আলোচনা চলতে থাকে।
এসব আলোচনা যাই বলুক না কেন–প্রশ্ন জাগছে, কিশোর তরুণরা কেন বিপথগামী হচ্ছে? তাদের সামনে আদর্শ কারা? কাদেরকে অনুসরণ বা অনুকরণ করে একটি প্রজন্ম গড়ে উঠছে। আবার একথাও ঠিক, প্রজন্ম বলতে পুরো একটি প্রজন্মের সবাই নয়। এর মধ্যে ভালো উদাহরণেরও শেষ নেই। কিন্তু যে তরুণরা ক্রমে ক্রমে ভয়ংকর হয়ে উঠছে, তারা কারা? আগে পাড়ার মোড়ে মোড়ে যাদের অপরাধ সীমাবদ্ধ থাকতো তারা কেন খুন, সন্ত্রাস, মাদক ব্যবসার মতো অপকর্মে জড়াচ্ছে? তাদের পথ প্রদর্শক কারা? 

আমরা জানি, ব্যক্তিত্বের উন্মেষ শৈশবে হলেও কিশোর বয়সেই ঘটে জাগরণ। যাকে বলা হয় বয়ঃসন্ধিকাল। এ সময় কিশোরের শরীরে-মনে যে আলোড়ন উঠে সেই সময় তারা চায় সবকিছু ছাপিয়ে যেতে। তারা ভাবে গণ্ডিছাপানো কোনও কাজের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে। সুকান্তের কবিতায় বলা হয়েছে, ‘আঠারো বছর বয়স কী দুঃসহ, স্পর্ধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি/আঠারো বছর বয়সেই অহরহ, বিরাট দুঃসাহসেরা দেয় যে উঁকি।’ ছুটি গল্পে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেমন বলেছিলেন, ‘তেরো-চৌদ্দ বছরের ছেলের মতো পৃথিবীতে এমন বালাই আর নাই। তাহার মুখে আধো-আধো কথাও ন্যাকামি, পাকা কথাও জ্যাঠামি এবং কথামাত্রই প্রগলভতা।’ কিন্তু এসব ছাপিয়ে যাওয়ার উদাহরণ তো হতে পারতো বিপ্লবী ক্ষুদিরামের মতো কেউ। যে কিনা দেশের স্বাধীনতার জন্য হাসতে হাসতে ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়েছিল। আর সেই কিশোরকে স্মরণ করতে পারি, যার কথা পাকিস্তানি এক সামরিক কর্মকর্তা লিখেছিলেন তার বইয়ে। সেই কিশোরকে কোনও টোপই গলাতে পারেনি পাকিস্তানি হায়েনারা। বরং জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে সে প্রাণ দিয়েছিল। কিন্তু পাড়ায় পাড়ায় গ্যাং কালচারে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া এখনকার কিশোররা নায়ককে আদর্শ না মেনে মানছে খলনায়ককে। তারা কিশোর গ্যাংস্টার হতে গিয়ে সিনেমার খলনায়কের মতো বাহাদুরি দেখাতে যায়, আর ক্রমেই জড়িয়ে পড়ে একের পর এক অপরাধে। এদের মধ্যে তখন খুন করা বা আঘাত করা অপরাধ না হয়ে মনে হয় হিরোইজম। এসব করতে গিয়ে তারা একের পর এক রাষ্ট্রের নিয়ম ভাঙাতে আনন্দ লাভ করে। 

বছর তিনেক আগে উত্তরায় ডিসকো বয়েজ ও নাইন স্টার গ্রুপের অন্তর্দ্বন্দ্বে খুন হয় ট্রাস্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্র আদনান কবির। আদনান হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়েই আলোচনায় আসে কিশোর গ্যাং। এরপর একের পর এক বেরিয়ে আসতে থাকে ‘গ্যাং কালচার’ এবং তাদের সংঘবদ্ধ অপরাধের ভয়ংকর সব চিত্র। এই চিত্র শুধু ঢাকা শহরে নয়, সমস্ত জেলা শহরে গ্যাং কালচার যেন প্যাশনে পরিণত হয়। পুলিশের ক্রাইম অ্যানালাইসিস বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকাতেই গত কয়েক বছরে কিশোর গ্যাং গ্রুপের সন্ধান মিলেছে অন্তত ৫০টি। তা ক্রমান্বয়ে বাড়ছেই। বিভিন্ন জেলা শহরের কিশোররাও জড়িয়ে পড়ছে পাড়া বা মহল্লাভিত্তিক নানারকম অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে। এই সময়গুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শত শত কিশোরকে গ্রেফতার করেছে। অনেক গ্যাং ভেঙে দিয়েছে, এরপরও থামানো যাচ্ছে না অপরাধ। আগে যেখানে ভয়ংকর অপরাধী নিয়ে ব্যতিবস্ত থাকতে হতো, এখন এরাই সমাজের মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি টিকটক খ্যাত অপুর কথাই যদি বলি, গণমাধ্যম বলছে, নোয়াখালী থেকে ঢাকা আসা অপু ভাই নামক এই কথিত টিকটক সেলিব্রেটির আশ্রয়দাতা ছিল ঢাকার উত্তরার কিশোর গ্যাং-এর তিন নেতা সাকিল, শাহাদাত ও সানি। অপু একসময় সেলুনে কাজ করতো, পরে লাইকি এবং টিকটক ভিডিওর প্রতি আসক্ত হয় এবং ঢাকা এসে ইয়াছিন আরাফাত থেকে ‘অপু ভাই’ নামে পরিচিতি লাভ করে। 

ছোটবেলাতেই তার বাবা-মা আলাদা হয়ে যায় এবং দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে লেখাপড়ার ইতি টানে। অথচ তার ফলোয়ার কয়েক মিলিয়ন। তো যে কিশোররা অপুর মতো ছেলেকে ফলো করে তাদের কাছে সমাজ আগামীতে কীইবা আশা করবে। 

আমেরিকান সাইকোলজিস্ট ডারা গ্রিনউড ও তার সহযোগীরা ২০১৩ সালে পরিচালিত এক গবেষণায় উল্লেখ করেন, মানুষ মূলত তিনটি কারণে বিখ্যাত হতে চায়, অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করা, বাস্তব জীবনে অতিরিক্ত কিছু সুযোগ-সুবিধা আদায়ের জন্য এবং বৃহত্তর কল্যাণে নিজের খ্যাতিকে কাজে লাগানোর জন্য। গবেষণায় বেরিয়ে আসে তৃতীয় উদ্দেশ্যে খ্যাতি লাভ করতে চাওয়া মানুষের সংখ্যা খুবই কম।

কিশোরদের গ্যাং কালচার এবং কিশোর অপরাধ বর্তমান সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই এই সমস্যা নিরসনে দরকার সর্বসম্মতিক্রমে সামাজিক আন্দোলন। উপদেশ, আইন, নীতিবাক্য, শাস্তি দিয়ে বা শাস্তির ভয় দেখিয়ে এদের দমানো যাবে বলে মনে হয় না। এতে আরও বিপথগামিতা বাড়বে। বিচার কখনও মুক্তির পথ দেখাতে পারে না, বিশেষ করে কিশোরদের ক্ষেত্রে। এক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে পরিবারকে। অনেক সময় দেখা যায়, সন্তান কী করছে, কার সঙ্গে মিশছে পরিবার জানেই না। সবাই যার যার কাজ নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তু পরিবারই মানুষের আদি সংগঠন এবং সমাজ জীবনের মূলভিত্তি। পরিবারের চেষ্টা করতে হবে কিশোরদের সমাজের ইতিবাচক কাজে সম্পৃক্ত রাখতে। স্কুলে তাদের আনন্দময় সৃজনশীল চর্চার অবকাশ দিতে হবে। সুস্থ বিনোদন, নির্মল আনন্দ ও সৃজনশীল দলীয় কাজে উৎসাহ দিতে হবে। পড়ার যে বিশাল জগৎ, জানার যে কোনও সীমা পরিসীমা নেই। নেই আনন্দময় দরজাটা তাদের সামনে তুলে ধরতে হবে। পড়ার বিষয়টা যে কতটা আনন্দের, সঙ্গে সঙ্গে খেলাধুলা। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, এখন স্কুলে খেলার পর্যাপ্ত মাঠ নেই। জনসংখ্যার হিসাবে যেখানে ঢাকায় প্রায় ১ হাজার ৩০০ খেলার মাঠ থাকার কথা ছিল, সেখানে দুই সিটি করপোরেশনে আছে মাত্র ২৩৫টি খেলার মাঠ, অর্থাৎ মাঠের ঘাটতি প্রায় ১ হাজার ১০০। তাহলে ছেলেমেয়েরা যাবে কোথায়? খেলার মাঠ নেই, পাঠাগার নেই, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নেই কোথাও। এ বিষয়েও রাষ্ট্রের ভাবনা জরুরি। কিশোর গ্যাং কালচার প্রতিরোধে জরুরি রাজনৈতিক সদিচ্ছাও। কারণ তারা তাদের সামনে দেখছে, বড় ভাইয়েরা রাজনৈতিক ছত্রছায়ার থেকে কীভাবে অবৈধ উপার্জন করছেন, কীভাবে চাঁদাবাজি সন্ত্রাসে জড়াচ্ছেন। কীভাবে মেয়েদের নাজেহাল করছেন, কীভাবে মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছেন। আর এসবের মদত দিচ্ছেন পাড়ার কথিত রাজনৈতিক নেতা। এটাও কিশোরদের কাছে হিরোইজম দেখানোর জায়গা হয়ে পড়েছে। রাজনীতিবিদরা যেমন তাদের ব্যবহার করতে না পারে তেমনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাজেও যেন হস্তক্ষেপ না করে, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। 

কিশোর তরুণেরাই পরিবর্তন আনে, যুগে যুগে, কালে কালে। সেই আগুয়ান তরুণদের চেতনার ক্যানভাস রাঙিয়ে দিতে এমন মানুষের আদর্শের গল্প তাদের সামনে উপস্থাপন করতে হবে, যাতে জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া যায়। যাতে তাদের মনে হয় দেশের জন্যও কিছু করার থাকতে পারে। পাড়ার মাস্তান বড় ভাই বা রাজনৈতিক পরিচয়ধারী চাঁদাবাজ যেন তাদের আদর্শ না হয়। হতে পারে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মাদার তেরেসা, নেলসন ম্যান্ডেলা, রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম বা মাশরাফি বিন মুর্তজা, ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ কিংবা জ্যাক মা এর মতো কোনও ব্যক্তিত্ব। এ প্রসঙ্গে প্রয়াত প্রকৌশলী ও শিক্ষাবিদ জামিলুর রেজা চৌধুরীর একটা লেখা থেকে বলতে পারি, ‘আমরা তো ছেলেবেলা থেকে পরিবার, সমাজ বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পছন্দের মানুষকে অনুসরণ করি। তিনি হতে পারেন বাবা, শিক্ষক বা দেশ-বিদেশের বিখ্যাত কেউ। তাই আমার মনে হয়, কোনও একক ব্যক্তি কারও অনুপ্রেরণা হতে পারেন না। একেকজন মানুষের একেক ধরনের ভালো গুণ আমাদের আকৃষ্ট করে। তরুণদের বলবো, কোনও একক ব্যক্তির জীবনের সবদিক অনুসরণ না করে কয়েকজন মানুষকে অনুসরণ করতে পারো। সবার ভালো গুণাবলির সমষ্টি নিজের পথচলায় কাজে লাগাতে পারো’। যেই কিশোর আদর্শ মেনে, রাষ্ট্রকে গঠনের মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসবে সে-ই হবে আগামী সমাজের নেতা। শুধুমাত্র পাড়ায় মাস্তানি বা চাঁদাবাজি করে ততোটাই বড় হওয়া যায়, যার শেষ ঠিকানা জেলজীবন বা সংশোধনাগার। আর দেশপ্রেমিক কিশোর তরুণদের দেখে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো বলতে ইচ্ছে করবে, ‘ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা/ওরে সবুজ, ওরে অবুঝ, আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা’। বিপথগামী কিশোর তরুণদের বাঁচানোর দায়িত্ব কিন্তু পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সবার। 

লেখক: সাংবাদিক ও সাহিত্যিক 

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ
X