সীমাবদ্ধ সবুজ আর সীমিত নববর্ষে?

Send
হাসান মামুন
প্রকাশিত : ১১:২৭, এপ্রিল ১৮, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:৩২, এপ্রিল ১৮, ২০১৬

হাসান-মামুনদেশে এবার যেভাবে পহেলা বৈশাখ পালন করা হলো, তা নিয়ে কিছু কথা বলে নিবন্ধটা শুরু করতে চাই। এটি অবশ্য নতুন করে বলার কিছু নেই। সবাই কমবেশি জানেন। এর মধ্যে একটি বিষয়কে বিশেষভাবে সামনে আনা দরকার। যে কারণে অনেকেই মনে করছেন, এতে উৎসবটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পহেলা বৈশাখে এবার বিকেল পাঁচটার মধ্যে রাজধানীর খোলা জায়গায় আয়োজিত অনুষ্ঠানগুলো গুটিয়ে ফেলতে বলা হয়েছিল পুলিশের পক্ষ থেকে। এটা সরকারের রাজনৈতিক বিবেচনাতেই হয়েছিল, যেটি পরে স্পষ্ট হয় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে। অন্যান্য শহরেও স্থানীয় প্রশাসন একই ধারায় নির্দেশনা জারি বা তেমন পদক্ষেপ নেয়।
কারা যেন মাঝে ঘোষণা দিলেন, এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা তারা মানবেন না। তবে মানামানি নিয়ে কোথাও কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে বলে জানা নেই। রাজধানীর মানুষ হিসেবে এটির কথা বলতে পারি। পহেলা বৈশাখের দিন সন্ধ্যার পর থেকে রাজধানী অনেকটা সুনসান হয়ে পড়েছিল। বাইরে অবস্থান করায় যদিও কোনও নিষেধাজ্ঞা ছিল না, কিন্তু লোকে যে যার ঘরে ফিরে যেতেই উৎসাহী ছিলেন বেশি। সেটাই স্বাভাবিক। লোকজন এ দিন কম বের হয়েছিলেন বলেও মনে হয়। নারী, শিশু ও বয়স্ক লোকের উপস্থিতি অন্যবারের চেয়ে কম ছিল।
বর্ষবরণের কেন্দ্রে বরাবরই থাকে রমনা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। তাতে যানবাহন প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। বহিরাগতদের প্রবেশকেও কার্যত নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। ভাসমান দোকানপাট বসতে দেওয়া হয়নি। মুখোশের ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। সেভাবেই মঙ্গল শোভাযাত্রা বেরিয়েছিল চারুকলা থেকে। তাতেও লোক সমাগম কম হয়েছে বলে অনেকের পর্যবেক্ষণ।
পহেলা বৈশাখের আগে থেকে চলছে দাবদাহ। সেটি ওইদিনও অব্যাহত ছিল। এটা একটা কারণ হতে পারে মানুষজন পথে কম বেরুনোর। টানা তিনদিনের ছুটি পেয়ে অনেকে বেড়াতে গিয়েছিলেন পর্যটন স্পটগুলোয় এবং গ্রামের বাড়ি। সেটাও একটা কারণ হতে পারে। তবে পথে-পথে লোক সমাগম কম হওয়ার বড় কারণ যে প্রশাসনিক অবস্থান ঘিরে সৃষ্ট উৎকণ্ঠা, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
বহু লোক ফেসবুকে আছে। যারা নেই, তারাও জানে, ওটায় এখন কী নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে? ফেসবুকে এবার নববর্ষ ঘিরে নানা বিতর্ক তীব্র রূপ নেয়। তার একটি ছিল, এটা মুসলমানদের জন্য গ্রহণযোগ্য কিনা। এ প্রশ্ন আগেও তোলা হতো বিশেষ মহল থেকে। এবার মনে হলো প্রশ্ন তোলার প্রবণতা বেড়েছে এবং তারা যে একটি শক্তি, এর প্রকাশ ঘটেছে। এ নিয়ে স্বভাবতই অনেকের মধ্যে বাড়তি উদ্বেগ ছিল।
রাজধানীর বাইরের খবর সেভাবে জানি না। মিডিয়ায়ও খুঁটিয়ে রিপোর্ট হতে দেখিনি। তবে মনে হয়, সারাদেশেই এর একটা প্রভাব পড়েছে। শুধু রাজধানীতেও যদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে থাকে, সেটাও খবর হিসেবে বড়। বর্ষবরণের এ উৎসব তো এখন রাজধানীসহ শহরাঞ্চলেই বেশি করে হয়ে থাকে। ষাটের দশকের শেষভাগ থেকে নববর্ষের এ রূপান্তর ঘটেছে প্রধানত রাজনৈতিক কারণে। তখন থেকে এটি গভীরভাবে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ধারণার সঙ্গে।
জানি না, পুলিশের কাছে কী তথ্য ছিল পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে গোলযোগ সৃষ্টির ব্যাপারে। কোনও তথ্যই ছিল না বা তারা এমনি এমনি ওই রকম নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন, তা কিন্তু মনে হয় না। পুলিশ ও সরকারের কর্তাব্যক্তিরা নিশ্চয়ই জানতেন, প্রথমবারের মতো এ ধরনের পদক্ষেপে উৎসবপ্রিয় মানুষের মধ্যে কেমন প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হবে বা উৎসবমুখরতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে কতটা। জেনেবুঝেই তারা সিদ্ধান্তটি নিয়েছেন বলে ধরে নেওয়া যায়।

গতবারের পহেলা বৈশাখে সন্ধ্যার দিকে একটি বড় অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যে নারী লাঞ্ছনার সে ঘটনা প্রতিহত করা যায়নি। তার তদন্তেও সত্যি বলতে কোনও অগ্রগতি নেই।
প্রশাসনের দিক থেকে যা বলা হয়েছিল, তা বরং উৎপাদন করে বিরক্তি। এর আগেও এমনতরো ঘটনা ঘটেছে উৎসবে ভিড়ের মধ্যে। তাতে সমাজ ও রাজনীতিতে, বিশেষত জাতীয় সংসদে প্রতিক্রিয়া আবার স্বাভাবিক হয়নি। তবে এবার বিশেষত ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় বেশ আলোচনা হয় নারী লাঞ্ছনা প্রতিরোধে কী করা যায়, তা নিয়ে। পরিবারগুলোয় এবং বিশেষ করে মেয়েদের মধ্যে এর কী প্রতিক্রিয়া হয়েছে, তা অবশ্য জানা যায় না।

পহেলা বৈশাখে রমনা বটমূলে ছায়ানটের মূল অনুষ্ঠানে আত্মঘাতী বোমা হামলাও হয়েছিল দেড় দশক আগে। সেটি ভিড়ে নারী নিগ্রহের চেয়ে অনেক বেশি ভয়াবহ ঘটনা। নারী নিগ্রহের উদ্দেশ্য রাজনৈতিক নাও হতে পারে, তবে বোমা হামলা নিশ্চিতভাবেই ছিল রাজনৈতিক। এরপর দেশে জঙ্গি তৎপরতা বেড়েছে বৈ কমেনি। দেশি জঙ্গিদের আন্তর্জাতিক কানেকশনও বেড়েছে মনে হয়।

জঙ্গিবিরোধী অভিযান চলেছে দেশে এক সময় এবং ক'জন জঙ্গি নেতার ফাঁসিও হয়েছে তাদের বিচারের পর। এতে জঙ্গিবাদ দুর্বল হয়নি। বিশ্বপরিসরেও এটা ক্রমবর্ধমান। জঙ্গিগোষ্ঠীর সংখ্যা বেড়েছে, তাদের হামলার টার্গেট আর ধরনও পাল্টেছে। এবারের পহেলা বৈশাখের জমায়েতে সন্ধ্যা বা রাতের দিকে তেমন কোনও হামলার শঙ্কা কি ছিল? রমনার বটমূলে বোমা হামলা কিন্তু চালানো হয়েছিল সকালে। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকলে জঙ্গিরা আলো-অন্ধকারকে আলাদা করেন না। তবে বখাটেদের কথা আলাদা। তারা আড়াল খুঁজে থাকেন।

সরকার কেবল বখাটে সামলানোর জন্য যদি বিকেল পাঁচটার মধ্যে উন্মুক্ত জায়গায় অনুষ্ঠান শেষ করার কথা বলে থাকে, তাহলে সেটা কোনও কাজের কথা নয়। একটা সরকার কিছু বখাটের কবল থেকে মেয়েদের রক্ষায় চিরাচরিত উৎসবমুখরতা হতে মানুষকে বঞ্চিত করবে, এটা মেনে নেওয়া যায় না। প্রথম কথা হলো, গতবার কারা ওই অসভ্যতা করেছিল, প্রশাসন তাদের চিহ্নিতই করতে পারেনি। পারলে কিন্তু পরিস্থিতি ভিন্ন হতো। এও জানা যেত, ওটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা না পরিকল্পিত।

পরিকল্পিত হলে জানা যেত, কারা আর ঠিক কী উদ্দেশ্যে মেয়েদের ওপর এমন নির্বিচারে হামলে পড়ছেন। হতে পারে, ধর্ম-বর্ণ ও নারী-পুরুষ নির্বিশেষে পহেলা বৈশাখের যে একটা উৎসবমুখরতা, সেটি তারা বিনষ্ট করতে চান মেয়েদের অংশগ্রহণকে নিরুৎসাহিত করে। সেক্ষেত্রে এটি হবে ভয়াবহ। তাহলে বুঝতে হবে, দেড় দশক আগে পরিচালিত বোমা হামলার সঙ্গে এর যোগসূত্র রয়েছে। কিন্তু তদন্তই যদি ঠিকমতো না হয়, প্রশাসন গা না করে, তবে কিভাবে বুঝব—কোত্থেকে কী হয়েছিল বা হচ্ছে?

উন্মুক্ত জায়গায় পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানের সময় বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত বেঁধে দেওয়ার বিষয়টিকে তাই হালকা করে না নিয়ে প্রশ্ন তোলা দরকার, কেন এমন সিদ্ধান্ত? প্রশাসন তার ক্ষমতাবলে এমন সিদ্ধান্ত নিতেই পারে। তবে এতদিন পর কেন, কোন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত নিতে হলো, তার ব্যাখ্যাও জানতে চাওয়া যেতে পারে। আর এটা যেহেতু বাঙালির সবচেয়ে বড় অসাম্প্রদায়িক উৎসব; যেহেতু ঐতিহাসিকভাবে এর বৈশিষ্ট্য হলো বাধাহীনভাবে পালনের এবং সে উদ্দেশ্যে উন্মুক্ত স্থানে মানুষের মিলনের। তাই ওই প্রশ্ন করা যেতেই পারে, আর করাও উচিত।

এ পর্যন্ত পহেলা বৈশাখ উদযাপনে দুটি কাঁটা আমাদের বিদ্ধ করেছে, সেগুলো হলো বোমা হামলা ও নারী নিগ্রহ। প্রশ্ন তো উঠতেই পারে, এ দুটোকে আমরা তাহলে মোকাবিলা করব কিভাবে? মোকাবিলা না করে বাধাহীনভাবে উৎসব পালন করে যাওয়া এবং বারবার আক্রান্ত হওয়াটা অবশ্য কোনও কাজের কথা নয়। উৎসবকে সীমিত করে, এটাকে প্রধানত মিলনায়তন, ঘর বা আঙিনা কিংবা ছাদে গান-বাজনার অনুষ্ঠানে পরিণত করাটাও মেনে নেওয়া যায় না।
বর্তমান সরকার একটি ভালো কাজ করেছে 'নববর্ষ ভাতা' চালু করে। এতে উৎসবটিকে কিন্তু একটা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হলো। নববর্ষ সামনে রেখে এমনিতেই লোকজন একটু কেনাকাটা করতো, আয়োজন করতো বিশেষ খাবারের। ভাতা চালু হওয়ার পর এ প্রবণতা আরও বাড়বে। কিন্তু এর পাশাপাশি যদি উৎসব বা উৎসবমুখরতা সীমিত হয়ে পড়ে!

রাতে কারা অনুষ্ঠান করবেন, কি করবেন না, কারা কোথায় থাকবেন—এটা সমাজের ওপর ছেড়ে না দিয়ে প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ আরোপ করলে এ প্রশ্নও কিন্তু উঠবে যে, এটি কি শুধু এবারের ব্যাপার? নাকি প্রতিবারই এমনটা ঘটবে এখন থেকে? সেক্ষেত্রে উৎসব কি ধীরে ধীরে আরও সীমিত হয়ে পড়বে? আর সেটা জঙ্গি ও দুর্বৃত্তদের ভয়ে? এতে কি তাহলে পরোক্ষে ওদেরই বিজয়বার্তা ধ্বনিত হচ্ছে না?

প্রথম কথা হলো, সরকারকে পহেলা বৈশাখের পক্ষে সুস্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে। সে অবস্থান কিন্তু সে নিয়েছে 'নববর্ষ বোনাস' চালু করে। দেশে যারা পহেলা বৈশাখবিরোধী, তাদের একটা আপত্তি, এমনকি গাত্রদাহ আছে এ বিষয়ে। তারাও হয়তো এ সুবিধা নিয়েছে, ছুটি উপভোগ করেছে। তবু, ওলামা লীগের একাংশের বক্তব্যে সেটা একরকম ভাষা পেয়েছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হয়েছে, ওটা তাদের কোনও সংগঠন নয়। লোকে এখন এ বিষয়ে আরও উচ্চ পর্যায় থেকে যথেষ্ট স্পষ্ট বক্তব্য শুনতে চাইবে।

তারা বুঝতে চাইবে, বিকেল পাঁচটার মধ্যে পহেলা বৈশাখের উন্মুক্ত অনুষ্ঠান সীমিত করে আনাটা ওই ধরনের শক্তিকে খুশি করার জন্য কিনা। নাকি সত্যি কোনো ঝুঁকি ছিল? ঝুঁকি থেকে থাকলে আগাম গ্রেফতার অভিযান দেখতে পাওয়া গেল না কেন? রাষ্ট্র কেন তার মর্যাদাসম্পন্ন উৎসবের জঙ্গি ও দুর্বৃত্ত প্রতিপক্ষকে ঘি দিয়ে চলবে? তারা তুষ্ট বা উৎসাহিত হয়, এমন পদক্ষেপ কেন নেবে? এ ধরনের আপস বা আত্মসমর্পণ কিন্তু একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস উদযাপনকেও গ্রাস করবে ধীরে ধীরে। এসব ক্ষেত্রেও তো সন্ধ্যা ছাড়িয়ে রাত পর্যন্ত খোলা জায়গায় অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। তাতে হাজার হাজার মানুষও অংশ নেন।

সরকারকে তাই এখন থেকে সে লক্ষ্যে কাজ করতে হবে এবং মানুষের মধ্যে এ আস্থা জাগাতে হবে, যেন আগামী বর্ষবরণ আগেকার মতোই একটা বাধাহীন পরিবেশে অনুষ্ঠিত হতে পারে। সতর্কতার প্রয়োজন বুদ্ধিমান কেউ অস্বীকার করবেন না। কিন্তু জঙ্গি ও দুর্বৃত্তদের ভয়ে বিকেলের পরপরই উৎসবপ্রিয় মানুষকে নিজ নিজ বৃত্তে বা ঘরে ফিরে যেতে বলাটা মোটেও ঠিক কাজ নয়।

এভাবে নিরাপত্তা জোগানো বা নিরাপত্তাবোধ তৈরি করা যায় কিনা, সে প্রশ্নও থাকল। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে আসলে কোণঠাসা ও জব্দ করে ফেলা দরকার তাদের, যারা জীবনের প্রতিপক্ষ আর উৎসবের কাঁটা।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ