ইরানে চলমান যুদ্ধের মধ্যে একটি কুর্দি বিদ্রোহ উসকে দিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এক জোট হয়ে কাজ করছে বলে জোরালো গুঞ্জন শুরু হয়েছে। গোয়েন্দা প্রতিবেদন ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরাসরি স্থল সেনা না পাঠিয়ে ইরানকে ভেতর থেকে দুর্বল করতে কুর্দি জাতীয়তাবাদী শক্তিকে ‘বুটস অন দ্য গ্রাউন্ড’ হিসেবে ব্যবহার করতে চায় তেল আবিব ও ওয়াশিংটন। তবে এই পরিকল্পনার পথে পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে কৌশলগত ও আঞ্চলিক বাধা। মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই এ খবর জানিয়েছে।
গত ২ ও ৩ মার্চ ইসরায়েলি বিমান বাহিনী ইরানের কুর্দিস্তান অঞ্চলে সামরিক অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালায়। এর পাল্টা জবাবে ইরানপন্থি মিলিশিয়া কাতায়িব হিজবুল্লাহ ইরাকের কুর্দিস্তান আঞ্চলিক সরকারের (কেআরজি) লজিস্টিক অবকাঠামোতে আঘাত হানে। সিএনএনের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিআইএ ইতোমধ্যে কুর্দি বাহিনীকে সশস্ত্র করার কাজ শুরু করেছে।
গত মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরাকের কুর্দি আন্দোলনের দুই প্রভাবশালী নেতা মাসুদ বারজানি এবং বাফেল তালবানির সঙ্গে বৈঠক করেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষক গোললেহ শরাফকান্দি জানান, গত ২২ ফেব্রুয়ারি ইরানের পাঁচটি কুর্দি দল মিলে কোয়ালিশন অব পলিটিক্যাল ফোর্সেস অব ইরানিয়ান কুর্দিস্তান গঠন করেছে। ইরানের মোট জনসংখ্যার ১২ শতাংশই কুর্দি। শরাফকান্দির মতে, এই জোটের অধীনে একটি সশস্ত্র বাহিনী ও কূটনৈতিক কমিটি গঠন করা হয়েছে, যারা একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে কাজ করছে।
রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো বুরজু ওজচেলিক বলেন, সিরিয়ায় যেভাবে পিকেকে-কে ব্যবহার করে মার্কিন স্বার্থ রক্ষা করা হয়েছিল, ইরানেও পিজেএকে ব্যবহার করে সেই একই ‘কৌশল’ অনুসরণের চেষ্টা চলছে। তবে কুর্দিদের জন্য বড় দুশ্চিন্তা হলো ‘ব্যবহৃত হয়ে পরিত্যক্ত’ হওয়ার ইতিহাস। ১৯৯১ সালে সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে যুক্তরাষ্ট্র কুর্দিদের উৎসাহ দিলেও পরে মাঝপথে তাদের একা ফেলে চলে গিয়েছিল। সম্প্রতি সিরিয়াতেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। ইরাকের ফার্স্ট লেডি শানাজ ইব্রাহিম আহমেদ এক বার্তায় স্পষ্ট বলেছেন, ‘কুর্দিদের একা থাকতে দিন। আমরা ভাড়াটে নই।’
আঙ্কারার সেন্টার ফর ইরান স্টাডিজের গবেষক ওরাল তোগা মনে করেন, ৮ থেকে ১০ হাজার সেনার এই কুর্দি বাহিনী ইরানের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর বড় কোনও প্রভাব ফেলতে পারবে না। তোগা সতর্ক করে বলেন, ‘বিমান হামলা একসময় থেমে যাবে, কিন্তু তেহরান সব সময়ই এখানেই থাকবে।’ এ ছাড়া তুরস্ক কখনোই তার সীমান্তের কাছে নতুন কোনও কুর্দি রাষ্ট্র বা সত্তার উত্থান মেনে নেবে না।
অন্যদিকে আজারবাইজানও এই হস্তক্ষেপের বিপক্ষে। বাকু স্পষ্ট করেছে যে তারা কোনও বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন সমর্থন করে না। আজারবাইজান ও তুরস্কের ভয়, উত্তর ইরানে কুর্দিদের সাফল্য তাদের নিজস্ব সীমানায় অস্থিতিশীলতা ও শরণার্থী সংকট তৈরি করতে পারে।
হেনরি জ্যাকসন সোসাইটির ফেলো বারাক সিনার প্রশ্ন তুলেছেন, ইরান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের আসলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কী? তারা কি ইরানকে একটি একক রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায়, নাকি খণ্ডবিখণ্ড করতে চায়? সিনারের মতে, সার্বভৌমত্বের প্রতিশ্রুতি বা সরাসরি সেনা সহায়তা ছাড়া কুর্দিদের ব্যবহার করা হবে একটি ‘কৌশলগত স্ববিরোধিতা’। ইসরায়েল প্রায়ই দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের চেয়ে তাৎক্ষণিক জয়কে বেশি প্রাধান্য দেয়, যার ফলে চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জিত হয় না।
সব মিলিয়ে ইরানের কুর্দিদের সামনে এখন এক কঠিন পরীক্ষা। তারা কি বিদেশি শক্তির দাবার ঘুঁটি হবে, নাকি নিজস্ব রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে এগোবে, এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ।








