কী, কেন, কীভাবে

মধ্যপ্রাচ্যে কি নতুন সামরিক কৌশলের পরীক্ষা করছে ইরান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১০ জুন ২০২৬, ১৮:০০ আপডেট : ১০ জুন ২০২৬, ২১:৪৪

চলতি সপ্তাহে ইসরায়েলের সঙ্গে ঘটে যাওয়া সরাসরি বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র যুদ্ধকে কেবল একটি সীমিত আকারের প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে না তেহরান। ইরানের চোখে, এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যে এক নতুন আঞ্চলিক বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে। এই নতুন বাস্তবতায় ইরানের যেকোনও মিত্র, বিশেষ করে লেবাননের হিজবুল্লাহর ওপর হামলা চালানো হলে তেহরান এখন থেকে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নেবে।

গত ৭ ও ৮ জুনের এই তীব্র উত্তেজনা ও সংঘাতের পর ইরানজুড়ে যে বার্তা দেওয়ার চেষ্টা চলছে, তা বেশ সুসংগত। জ্যেষ্ঠ সামরিক কমান্ডার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদপত্র ও প্রচারমাধ্যমগুলোর সবার বক্তব্যের সুর একই বিন্দুতে মিলেছে, আর তা হলো যুদ্ধের নিয়ম এখন পুরোপুরি বদলে গেছে।

বৈরুতের দক্ষিণ উপশহরে হিজবুল্লাহর শক্তিশালী ঘাঁটিতে ইসরায়েলি বিমান হামলার পর এই আকাশযুদ্ধ শুরু হয়। পাল্টা জবাবে ইরান সরাসরি ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়, যা ছিল গত এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর প্রথম সরাসরি ইরানি আঘাত। এর জবাবে ইসরায়েলও ইরানের অভ্যন্তরে রাডার ব্যবস্থা এবং দক্ষিণ-পশ্চিমের একটি পেট্রোকেমিক্যাল কারখানাসহ বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ব্যাপক বোমাবর্ষণ করে, যা ইরানকে পুনরায় ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে বাধ্য করে।

তবে এই সামরিক হামলা-পাল্টা হামলার চেয়েও তেহরান এর কৌশলগত গুরুত্বকে অনেক বড় করে দেখছে। ইরানের রাজনৈতিক ও সংবাদমাধ্যমের পরিমণ্ডলে কর্মকর্তারা দাবি করছেন, এই সংঘাত আঞ্চলিক নিরাপত্তায় একটি ‘নতুন সমীকরণ’ তৈরি করেছে, যা ইরানের নিজস্ব প্রতিরোধ ক্ষমতাকে সরাসরি তাদের তথাকথিত প্রতিরোধ অক্ষের নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করেছে। দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ বলেন, আগের যুদ্ধবিরতিটি কেবল ‘কাগজে-কলমে’ ছিল কিন্তু বাস্তবে বারবার তা লঙ্ঘিত হতো, যা ইরান এবার উল্টে দিয়েছে। কট্টরপন্থি সংবাদপত্রগুলোর মতে, তেহরান ‘প্রতিরোধের এক নতুন পথ’ সংজ্ঞায়িত করেছে এবং ‘যুদ্ধের নিয়ম’ মৌলিকভাবে বদলে গেছে।

মিত্রদের রক্ষায় সরাসরি যুদ্ধের ঘোষণা

তেহরানের এই নতুন কৌশলের মূল কথা হলো, তারা একটি নতুন ‘রেড লাইন’ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। আর তা হলো, লেবাননের হিজবুল্লাহ-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ইসরায়েলি হামলাকে এখন আর ইরানের সরাসরি সম্পৃক্ততা ছাড়া আলাদা কোনও যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে গণ্য করা যাবে না। দেশটির রাষ্ট্র-অর্থায়নে পরিচালিত ইয়ং জার্নালিস্টস ক্লাব বার্তা সংস্থা স্পষ্ট করে বলেছে, সাম্প্রতিক এই অভিযানের মূল উদ্দেশ্য ছিল এটি প্রমাণ করা যে ‘প্রতিরোধ ফ্রন্ট’-এর নিরাপত্তা মূলত ইরানের জাতীয় নিরাপত্তারই অবিচ্ছেদ্য অংশ। অর্থাৎ, ইরান নিজে সরাসরি আক্রান্ত না হলেও তার প্রধান মিত্রদের ওপর আক্রমণ হলে তেহরান এখন থেকে সরাসরি যুদ্ধে জড়াবে।

এটি ইরানের দীর্ঘদিনের কৌশলগত অবস্থানের একটি বড় বিবর্তন। গত কয়েক দশক ধরে ইরান লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠী, ইয়েমেনের হুথি এবং ফিলিস্তিনি উপদলগুলোর মতো আঞ্চলিক অংশীদারদের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্কের ওপর ভর করে তাদের ইসরায়েলবিরোধী এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে আসছিল। এর মাধ্যমে সরাসরি যুদ্ধ এড়িয়ে নিজেদের আড়ালে রাখার সুযোগ পেতো তেহরান। কিন্তু বর্তমানের কট্টর সুর সেই পার্থক্যকে পুরোপুরি মুছে দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এই কৌশলের আরেকটি উদ্দেশ্য হলো, গত কয়েক মাসের যুদ্ধ ও ক্ষয়ক্ষতির পর নিজেদের শক্তি ও আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনা। ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর শুরু হওয়া এই আঞ্চলিক যুদ্ধে ইরান ও তার মিত্ররা বেশ সামরিক ধাক্কা খেয়েছে। হিজবুল্লাহ ক্রমাগত ইসরায়েলি চাপের মুখে রয়েছে এবং ইরান নিজেও গত নয় মাসে নিজের ভূখণ্ডে দুটি যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেছে। এই প্রেক্ষাপটে তেহরান দেখাতে মরিয়া যে তারা কেবল পরিস্থিতির শিকার নয়, বরং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা এখনও তাদের রয়েছে।

তেহরান মিউনিসিপ্যালিটির কট্টরপন্থি পত্রিকা হামশাহরি দাবি করেছে, ইরানের এই প্রতিক্রিয়া সমীকরণকে তাদের নিজেদের এবং ‘প্রতিরোধ অক্ষ’-এর পক্ষে ঘুরিয়ে দিয়েছে। আইআরজিসির পরিচালিত তাসনিম নিউজ এজেন্সি এটিকে প্রতিরোধ শিবিরের জন্য ‘এক ধাপ অগ্রগতি’ বলে বর্ণনা করেছে।

বাব আল-মানদাব: আরেকটি হরমুজ প্রণালি?

তেহরান এখন দেশীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মহলকে এটি বিশ্বাস করাতে চায় যে তারা তাদের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছে। আর এই প্রচারণায় ইয়েমেনের উত্থান বিশেষভাবে নজর কেড়েছে।

গত সোমবার আইআরজিসির কুদস ফোর্সের কমান্ডার ইসমাইল কায়ানি ইয়েমেন থেকে ইসরায়েলের দিকে ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রশংসা করে এটিকে প্রতিরোধ শিবিরের বুদ্ধিমত্তা ও সমন্বয়ের প্রমাণ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘প্রয়োজন হলে অন্যরাও সামনে এগিয়ে আসবে এবং ইসরায়েল ও আমেরিকার যেকোনও পদক্ষেপের জবাব দেবে এই ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্ট।’

এর আগে এক বিবৃতিতে কায়ানি ‘হরমুজ প্রণালি থেকে বাব আল-মানদাব এবং পারস্য উপসাগর থেকে লোহিত সাগর’ পর্যন্ত একটি ‘প্রতিরোধের নিরাপত্তা বলয়’ গড়ে তোলার দূরদর্শী পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন। ইরানি কর্মকর্তারা এখন লেবানন, ইয়েমেন, ইরাক বা উপসাগরীয় অঞ্চলকে আলাদা না দেখে একটি একক কৌশলগত যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে বর্ণনা করছেন। ইয়েমেনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং বাব আল-মানদাবের প্রসঙ্গ টেনে কুদস ফোর্সের কট্টরপন্থি এই কমান্ডার মূলত ভৌগোলিক বিস্তৃতির সেই নেটওয়ার্ককে জাহির করছেন, যা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় খরচের কারণ হতে পারে।

এই বার্তার মূল উদ্দেশ্য হলো বিশ্বকে সতর্ক করা যে ভবিষ্যৎ যুদ্ধ কেবল নির্দিষ্ট সীমানায় আটকে থাকবে না, বরং তা বিশ্ব জ্বালানি বাজার ও বৈশ্বিক অর্থনীতিকে বড় ঝুঁকিতে ফেলবে।

কূটনীতিতেও অনড় অবস্থান

সামরিক কমান্ডাররা যখন কঠোরতম জবাবের হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন, ঠিক তখনই ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সোমবার এক্সে দেওয়া পোস্টে জোর দিয়ে বলেছেন, ইরান যুদ্ধক্ষেত্র কিংবা আলোচনার টেবিল কোনোটিই ত্যাগ করেনি।

তিনি কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা উভয়কেই জাতীয় শক্তির দুটি প্রধান স্তম্ভ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এর মাধ্যমে বারবার সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনার পথ খোলা রাখার চেষ্টা করছে তেহরান।

এই ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন ইরানের মূল নীতি। একদিকে সামরিক শক্তির মাধ্যমে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও আঞ্চলিক মিত্রদের রক্ষা করা, অন্যদিকে অর্থনৈতিক চাপ কমাতে এবং একটি বিধ্বংসী ও ব্যাপক যুদ্ধ এড়াতে আলোচনার দরজা খোলা রাখা হয়েছে। তেহরানের নীতিনির্ধারকদের বিশ্বাস, সাম্প্রতিক এই সংঘাত ওয়াশিংটনের সঙ্গে চলমান আলোচনারই অংশ এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ব্যবস্থার লড়াইয়ে ইরানের প্রভাব বলয় এখন একটি অবিচ্ছেদ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।

তবে ইরানের ঘোষিত এই ‘নতুন সমীকরণ’ কতদিন টিকবে, তা নিয়ে খোদ দেশটির ভেতরেই সংশয় রয়েছে। সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সঙ্গে যুক্ত নূর নিউজ স্বীকার করেছে যে এই অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি এখনও অস্পষ্ট। তাদের মতে, অঞ্চলটি এখন একটি ‘উত্তেজনাপূর্ণ অচলাবস্থার’ মধ্যে প্রবেশ করেছে, যেখানে সবপক্ষই বড় যুদ্ধ এড়িয়ে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। কারণ একটি প্রতিরোধ নীতি তখনই কার্যকর হয় যখন সবপক্ষই এর সীমাবদ্ধতা মেনে নেয়। তেহরান হয়তো তাদের আঞ্চলিক প্রতিপক্ষকে বোঝাতে পেরেছে যে মিত্রদের ওপর হামলাকে আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা হবে না; কিন্তু ইসরায়েল এই নীতি মেনে নেবে নাকি নতুন করে পরীক্ষা করবে, তা-ই নির্ধারণ করবে এই নতুন বাস্তবতা কতদিন স্থায়ী হবে।

সূত্র: আল-মনিটর

/এএ/এমওএফ/
টাইমলাইন: ইরানে ইসরায়েলের হামলা
১০ জুন ২০২৬, ১৮:০০
মধ্যপ্রাচ্যে কি নতুন সামরিক কৌশলের পরীক্ষা করছে ইরান
সম্পর্কিত
এখন কী করবেন নেতানিয়াহু
ইসরায়েলের নির্বাচনে বিরোধী প্রার্থীদের ওপর হামলা
কে হচ্ছেন ইসরায়েলের নতুন প্রধানমন্ত্রী
সর্বশেষ খবর
এখন কী করবেন নেতানিয়াহু
এখন কী করবেন নেতানিয়াহু
নেতার জানাজার পরপরই মিছিল নিয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা-লুটপাট
নেতার জানাজার পরপরই মিছিল নিয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা-লুটপাট
ইসরায়েলের নির্বাচনে বিরোধী প্রার্থীদের ওপর হামলা
ইসরায়েলের নির্বাচনে বিরোধী প্রার্থীদের ওপর হামলা
কে হচ্ছেন ইসরায়েলের নতুন প্রধানমন্ত্রী
কে হচ্ছেন ইসরায়েলের নতুন প্রধানমন্ত্রী
সর্বাধিক পঠিত
এ বছর শীতের তীব্রতা কেমন হবে
এ বছর শীতের তীব্রতা কেমন হবে
২১ লাখ ফলোয়ার, ভোট পেলেন মাত্র ৩৩টি
২১ লাখ ফলোয়ার, ভোট পেলেন মাত্র ৩৩টি
প্রথম স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে শ্যালিকাকে বিয়ে, এরপর যা ঘটলো মাসুদের সঙ্গে
প্রথম স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে শ্যালিকাকে বিয়ে, এরপর যা ঘটলো মাসুদের সঙ্গে
জেলেদের কাছ থেকে উদ্ধার ৯০ কেজি ইলিশ এতিমখানায় বিতরণ
জেলেদের কাছ থেকে উদ্ধার ৯০ কেজি ইলিশ এতিমখানায় বিতরণ
‘আপনাদের সম্মানি দিচ্ছি, ভিডিওগুলো ডিলিট করে দেন’
‘আপনাদের সম্মানি দিচ্ছি, ভিডিওগুলো ডিলিট করে দেন’