গুলশালের হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার পর জঙ্গিদের নাশকতা-নৃশংসতার বিষয়ে সাধারণ মানুষের ধারণা পাল্টে যায়। এর আগে যারা দেশে জঙ্গি থাকা, না থাকা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন, তারাও বিশ্বাস করতে শুরু করেন, জঙ্গিদের শেকড় আসলেই অনেক গভীরে। ফলে নড়েচড়ে বসেন সমালোচক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। জঙ্গি দমনে নির্ধারণ করা হয় নতুন কৌশল। সারাদেশে চালানো হয় সাঁড়াশি অভিযান। দৃশ্যমান হয় নিরাপত্তার কড়াকড়ি। এই ঘটনার পর বাংলাদেশ ভ্রমণে বিভিন্ন দেশ তাদের নাগরিকদের সতর্ক করে দেয়। কিন্তু একবছরের মাথায় তা কাটিয়ে ওঠে বাংলাদেশ। পুলিশ বলছে, জঙ্গিরা তাদের সক্ষমতা হারিয়েছে, এখন আর তারা সংগঠিত হয়ে বড় ধরনের কোনও নাশকতা চালাতে পারবে না।
রাজধানীতে জঙ্গিদের বড় ধরনের নাশকতার পরিকল্পনার কথা আগেই জেনেছিলেন গোয়েন্দারা। তবে তাদের ‘টার্গেট স্পট’ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জানা ছিল না। তাই হামলার কথা জানতে পারলেও প্রতিরোধ করা যায়নি। জঙ্গিরা কৌশলে হলি আর্টিজানে হামলা করতে সক্ষম হয়।
হলি আর্টিজানে হামলার পর সারাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চিত্র পাল্টে যায়। পুলিশ টানা ছয়মাস দেশের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে অভিযান চালায়। একে একে ধরা পড়ে গুলশান হামলায় অংশ নেওয়া জঙ্গিরা। এই হামলার শীর্ষ পরিকল্পনাকারী নব্য জেএমবির নেতা তামিম চৌধুরীসহ অনেকেই কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের অভিযানে জঙ্গি আস্তানার ভেতরেই নিহত হয়। এরপর সিটিটিসি ধারাবাহিকভাবে দেশের বিভিন্ন এলাকায় জঙ্গি আস্তানা সন্ধানে অভিযান চালায়।
পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সারাদেশের ২০টি বড় অভিযান চালায়। ৬৭ জঙ্গি নিহত হয়। এরমধ্যে সিটিটিসির সঙ্গে ৫৫ জঙ্গি, স্থানীয় থানা পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশের সঙ্গে ৫ জন এবং র্যাবের অভিযানে ৭ জঙ্গি নিহত হয়। এছাড়া জঙ্গি আস্তানায় নিহত হয় ৬ শিশু।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, জঙ্গি মোকাবিলায় পুলিশ ও র্যাবের বের সক্ষমতাও আগের চেয়ে বহুগুণ বেড়েছে। বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে এখন অনকে সন্তুষ্টের জায়গা রয়েছে। দেশের জঙ্গিদের বড় ধরনের নাশকতা ঘটনানোর মতো সক্ষমতা নেই।
শনিবার গুলশান হামলার বছর পূর্তির দিন সাধারণ মানুষের পাশাপাশি হলি আর্টিজানে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলেন বিশিষ্টজনরাও। তারা দাবি করেছেন, এমন বাংলাদেশ কখনও কেউ ভাবে না, যে বাংলাদেশে আবহমান কাল ধরে সম্প্রীতির নিদর্শন রয়েছে, সেখানে এমন হত্যাযজ্ঞ মানায় না।’
নিরাপত্তা বিশ্লেষক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বৈশ্বিকভাবেই জঙ্গিবাদের অবস্থা আগের চেয়ে অনেক দুর্বল। বাংলাদেশের জঙ্গিরা কখনও অন্যান্য দেশের জঙ্গিদের মতো সক্ষমতা অর্জন করেনি। ভবিষ্যতেও করতে পারবে বলে, আমি মনে করি না।’
একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘জঙ্গিবাদ দমনে বাংলাদেশ সফল, কিন্তু জঙ্গি নির্মূলে আদর্শিক লড়াই করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘শক্তি দিয়ে জঙ্গিবাদ হয়তো সাময়িকভাবে দমন করা যায়, কিন্তু নির্মূল করা সম্ভব নয়। জঙ্গিবাদ দমন করতে হবে আদর্শ দিয়ে। এ জন্য ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে, জামায়াতকে নিষেধ করতে হবে। ১৯৭২ সালের সংবিধান পুনঃস্থাপন করতে হবে।’
নাট্যব্যক্তিত্ব নাদের চৌধুরী বলেন, ‘সংস্কৃতিচর্চার মাধ্যমে আমাদের জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। আমরা কেবল অভিনয় করি না, অভিনয়ের মাধ্যমে মানুষকে সচেতনও করি। আমাদের দেশপ্রেমের পরিচয় স্বাধীনতার সময় সম্মুখযুদ্ধ করে প্রমাণ দিয়েছি। প্রয়োজন হলে আমরা আবার যুদ্ধ করব, মানসিকভাবে সেভাবে প্রস্তুত।’
এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী নূপুর, ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিনী, শহীদ আলীম চৌধুরীর স্ত্রী শ্যামলী নাসরীন চৌধুরী, মুনীর চৌধুরীর ছেলে আসিফ মুনীর, শহীদ বুদ্ধিজীবী শহিদুল্লাহ কায়সারের মেয়ে অভিনেত্রী শমী কায়সার প্রমুখ।
এদিকে শনিবার দুপুরে পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোখলেছুর রহমান গুলশানে বলেন, ‘ওই ঘটনা মোকাবিলা ছিল আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তাৎক্ষণিকভাবে আমরা তা মোকাবিলা করে আমাদের দু’জন সিনিয়র অফিসারকে হারিয়েছি। বাংলাদেশ যেন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি না পায়, তার জন্য সমস্ত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর পেশাদারিত্ব বজায় রেখে বাংলাদেশকে একটি নিরাপদ রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের বুকে পরিচিত করতে পেরেছি। বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের কোনও স্থান নেই। বিশ্বের বুকে বাংলাদেশের সফল অভিযানের প্রশংসা পাচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে জঙ্গি তৎপরতা সীমিত হয়ে আসছে। বিশ্বের বুক থেকে এই সব জঙ্গি সংগঠন সীমিত হয়ে আসছে, বাংলাদেশেও হবে।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে গুলশানের হলি আর্টিজানে হামলা চালায় জঙ্গিরা। এতে ২ পুলিশ কর্মকর্তা, ১৭ বিদেশি নাগরিক ও তিন বাংলাদেশি নিহত হন। নিহত বিদেশিদের মধ্যে ৯ জন ইতালি, ৭ জন জাপানি ও একজন ভারতের নাগরিক। নিহত ৭ জাপানির মধ্যে ৬ জন মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজে নিয়োজিত ছিলেন। ২ জুলাই সকালে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে পরিচালিত অপারেশন থান্ডার বোল্ট-এ পাঁচ জঙ্গি নিহত হয়। তারা হলো, মালয়েশিয়ার মোনাশ ইউনির্ভাসিটির ছাত্র নিবরাস ইসলাম, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, স্কলাসটিকার সাবেক ছাত্র মীর সামিহ মোবাশ্বের, বগুড়ার বিগিগ্রাম ডিইউ সেন্ট্রাল ফাজিল মাদ্রাসার সাবেক ছাত্র খায়রুল ইসলাম পায়েল, বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজের ছাত্র শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল। এছাড়া হলি আর্টিজানের কর্মচারী সাইফুল ইসলাম চৌকিদারও নিহত হন।
এরই মধ্যে এ হামলার সঙ্গে জড়িত শীর্ষ জঙ্গি নেতা তামিম চৌধুরী, মারজানসহ অনেকেই পুলিশের অভিযানে নিহত হয়েছে। রাজীব গান্ধী ও বড়হুজুরসহ গ্রেফতার হয়ে ১৫৭ জন।
আরও পড়ুন-
অবিন্তা নেই, বেঁচে আছে তার স্বপ্ন
তুমি কোথায়, গুলশানে জঙ্গি হামলা!
দুর্বিসহ স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছেন তারা
‘হয় আমি মরবো, না হয় ওদের মারবো’
গুলশানে এখনও কাটেনি আতঙ্কের রেশ
হলি আর্টিজান কেন বেছে নিয়েছিল জঙ্গিরা?
এসি রবিউলের সন্তানদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
অপারেশনের শুরুতে উত্তেজনায় কাঁপছিলাম
নিহত শাওনের মায়ের বিলাপে ভারি গুলশান
‘অপারেশন থান্ডার বোল্ট’ থেকে ‘সান ডেভিল’
৩ কারণে হলি আর্টিজান হামলার চার্জশিটে দেরি
পুলিশকে সেই রাতের কথা যা বলেছেন হাসনাত করিম
শরীরে স্প্লিন্টার নিয়ে বেঁচে আছেন এডিসি আব্দুল আহাদ
গুলি ও বোমার আঘাতেই মৃত্যু হয়েছিল হলি আর্টিজানের জঙ্গিদের
গুলশান হামলায় নিহতদের স্মরণে অনুষ্ঠান নিয়ে দূতাবাসগুলোয় সতর্কতা
হলি আর্টিজানের পলাতক জঙ্গিদের এক মাসের মধ্যে গ্রেফতার করা হবে: মনিরুল
হলি আর্টিজানে হামলার পরিকল্পনা রাজশাহীতে, কৌশল নির্ধারণ গাইবান্ধায়, চূড়ান্ত অপারেশন প্ল্যান ঢাকায়
/এমএনএইচ/








