‘যারা ওর ব্রেনওয়াশ করলো, তাদের শাস্তি হবে না?’

নুরুজ্জামান লাবু
০১ জুলাই ২০১৭, ২৩:৪৩আপডেট : ০২ জুলাই ২০১৭, ২০:০৯

 

মায়ের মোবাইলে নিব্রাসের ছবি ‘আমার ছেলেটার তো এমন পরিণতি হওয়ার কথা ছিল না।  আমি ছেলেকে সময় দেওয়ার জন্য ব্যবসা গুটিয়ে এনেছিলাম।  দিনের পর দিন ছেলেকে নিজে মাঠে নিয়ে ফুটবল খেলেয়েছি। ছেলের জন্য পুরান ঢাকার বাসা ছেড়ে উত্তরা এসেছি।  ছেলের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল আমার।  এত ভালোভাবে যত্ন নিয়ে মানুষ করাই কি কাল হলো? কারা ছেলেটার ব্রেনওয়াশ করে ভুলপথে নিয়ে গেলো? তাদের শাস্তি হবে না? আমরা ঘুর্ণাক্ষরেও টের পেলাম না।  ইস! এতটুকু যদি বুঝতে পারতাম, তাহলে আজ আমার ছেলের এমন পরিণতি হতো না।’ এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বললেন গুলশান হামলায় অংশ নেওয়া পাঁচ হামলাকারীর একজন নিবরাস ইসলামের বাবা ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম।

এক বছর আগে ঘটে যাওয়া গুলশানের সেই নৃশংস হত্যাযজ্ঞে নিজের ছেলে জড়িত ছিল এটা যেন এখনও তার কাছে অবিশ্বাস্য।  মেনে নিতে পারছেন না তিনি।  অশ্রুসজল চোখে নিবরাসের বাবা বলেন, ‘ছেলের জন্য আমি দেশবাসীর কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।  যারা এই হামলায় স্বজন হারিয়েছেন তাদের কাছেও আমি ক্ষমাপ্রার্থী।

গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার বর্ষপূর্তির একদিন আগে শুক্রবার (৩০ জুন) সকালে কথা হয় নিবরাস ইসলামের বাবা-মা আর বোনের সঙ্গে।  সকাল ১১টায় উত্তরায় ৩ নম্বর সেক্টরের ১৬ নম্বর সড়কে গিয়ে ফোন করতেই বাসা থেকে নিচে নেমে আসেন তিনি, দেখার পর জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকেন।  তিন তলায় ড্রয়িং রুমে বসে ছেলের নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেন।

অস্ত্র হাতে নিবরাস অশ্রু সংবরণ করে নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমিওতো আমার ছেলেকে হারিয়েছি।  কিন্তু যারা আমার ছেলেকে এই ভুলপথে নিয়ে গেল, যারা ওর ব্রেনওয়াশ করল, তাদের শাস্তি হবে না? তাদের প্রত্যেককে খুঁজে বের করে শাস্তি দিতে হবে।  যেন ওরা আর কোনও নিবরাসকে এমন ভুল পথে নিয়ে যেতে না পারে।’

ছেলের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমার ছেলে-মেয়ে তার্কিশ হোপ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে পড়তো।  তখন আমরা থাকতাম আমাদের পৈত্রিক বাড়ি পুরান ঢাকার ওয়ারীতে।  ছেলের স্কুলের কথা চিন্তা করে আমরা উত্তরায় চলে আসি।  ছেলে ফুটবল খেলতে খুব ভালোবাসে।  তাই আমি নিজে ওকে মাঠে নিয়ে যেতাম। প্রায় প্রতিদিন বিকালেই ফুটবল খেলতাম।  বন্ধুদের নিয়ে খেতে ভালোবাসতো নিবরাস। আমি সেই ব্যবস্থাও করতাম।  মালয়েশিয়ার মোনাস ইউনিভার্সিটিতে যখন পড়তে যায় আমি নিজে গিয়েছি।  সবকিছু দেখেশুনে তারপর ছেলেকে মোনাসে রেখে এসেছি।  সেই ছেলে আমার জঙ্গি হয়ে গেল।  কারা তাকে জঙ্গি বানালো?’

নিবরাসের বাবা বলেন, ‘দুই সেমিস্টার বাকি থাকতে ও ঢাকায় চলে আসতে চাইল।  আমি ঢাকায় এনে ব্রিটিশ কাউন্সিলের অধীনে এসিসিএতে ভর্তি করে দিলাম। বললাম— এটা শেষ করে আমেরিকা, কানাডা বা অস্ট্রেলিয়াতে গিয়ে মাস্টার্স কোরো।  কিন্তু ছয় মাসের মধ্যেই ছেলে একদিন হঠাৎ করে বাড়ি ছেড়ে চলে গেলো।

নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা সাধারণ মুসলিম পরিবার মানুষ।  নামাজ-কালাম পড়ি।  নিবরাস আগে নামাজ পড়তো না।  শুক্রবার মসজিদে নিয়ে যেতে হতো জোর করে।  কিন্তু মালয়েশিয়া থেকে আসার পর সে নিয়মিত মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়তো।  আমি ভাবলাম, নামাজ পড়ছে, ভালো।  কিন্তু তেমন কোনও লক্ষ্মণ দেখিনি। সবার সঙ্গে মিশতো।  বাড়ি ছেড়ে কোথাও গিয়ে থাকতো না।  কিন্তু ভেতরে ভেতরে যে ইন্টারনেটে কারও সঙ্গে যোগাযোগ করছে, এটা আমরা বুঝবো কী করে? আমরা বুঝতে পারিনি।  এতটুকু বুঝতে পারলে ছেলেকে কি এভাবে হারাতে হতো? মোবাইল আর ইন্টারনেটের যোগাযোগই তাকে জঙ্গিবাদের পথে নিয়ে গেছে।  মালয়েশিয়াতে কেউ তার ব্রেনওয়াশ করেছে বলে ধারণা করেন তিনি।

নিবরাসের মা লায়লা বিলকিসের সঙ্গে যখন কথা হয় তখন তার চোখও অশ্রুসজল।  পাশে বোন বুশরা ইসলাম বসে আছে চুপচাপ।  তাদের চোখে-মুখে বেদনার ছাপ। প্রথমে পাঁচ মাস ছেলে নিখোঁজ হওয়ায় পাগলপ্রায় হয়ে গিয়েছিলেন।  এখন ছেলে হারানোর তীব্র শোক তাদের মনে।  যদিও ছেলে যা করেছে তার প্রতি তীব্র ঘৃণার বহিঃপ্রকাশও দেখা গেল, তাদের কথায়।

মা লায়লা বিলকিস জানান, নিবরাস যেদিন বেরিয়ে যায়, সেদিন ব্যাগে পুরোনো কিছু কাপড় নিয়ে বেরোচ্ছিল।  দুপুর ১২টার দিকে বের হওয়ার সময় তিনি ভেবেছিলেন ক্লাসে যাচ্ছে হয়তো।  পুরানো কাপড় দেখে জিজ্ঞেস করেন এত কাপড় নিয়ে কোথায় যাও? নিবরাস উত্তরে বলেছিল, এক বন্ধুর দোকানে এইচএনএম ব্র্যান্ডের পুরানো কাপড় জমা দিলে নতুন কাপড় দেবে।  সেজন্য নিয়ে যাচ্ছে হয়তো।  একথা শুনে তিনি আরও কিছু কাপড় দিতে চান।  নিবরাস, প্রয়োজন নেই বলে চলে যায়।  এই চলে যাওয়া যে শেষ যাওয়া হবে তা তিনি ঘুর্ণাক্ষরেও টের পাননি।

নিবরাসের মা আরও জানান, ছেলে ঘরে না ফেরায় তিনি চিন্তিত হয়ে পড়েন।  পরে জানতে পারেন নিবরাসের চার বন্ধুও একসঙ্গে ঘর ছেড়েছে।  বাসায় খুঁজে পান ইংরেজিতে লেখা নিবরাসের একটি চিঠি।  তখন আর বুঝতে বাকি থাকে না তাদের।  তারপর কত চেষ্টা যে করেছেন, ছেলেকে ফেরানোর, তার কোনও শেষ নেই। প্রতিদিন ঘরের দরজা খোলা রাখতেন এই বুঝি নিবরাস ফিরে এলো।  মোবাইল ফোন বাজলেই ছুটে যেতেন— এই বুঝি নিবরাসের ফোন এলো।  কিন্তু গত বছরের ২ জুলাই সন্ধ্যায় জানতে পারেন তার ছেলে জঙ্গি হামলা করতে গিয়ে আরও কয়েকজনের সঙ্গে অনেক মানুষ মেরেছে।  অভিযানে মারা গেছে নিজেও।  একথা শুনে যেন আকাশ থেকে পড়েন তিনি।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে লায়লা বিলকিস বলেন, ‘আমার ছেলেকে কারা এভাবে ব্রেনওয়াশ করে এ কাজ করালো? তাদের ধরুন।  তাদের কঠিন শাস্তি দিন।  আর যেন কোনও ছেলে এমন ভুল পথে পা বাড়াতে না পারে।  আর যেন কোনও মায়ের বুক খালি না হয়।  হোলি আর্টিজানের মতো এরকম ঘটনা যেন আর কোনও দিন না ঘটে।’

শেষ কথা হয়েছিল বোন বুশরার সঙ্গে

গুলশান হামলায় অংশ নেওয়া পাঁচ হামলাকারীর মধ্যে একজন এই নিবরাস।  যেদিন বাসা ছেড়ে যায় সেদিনও ছোট বোনের সঙ্গে শেষ কথা বলে সে।  ছোট বোন বুশরাকে এটা-সেটা জিজ্ঞাসা করার পর বলে ভালো থাকিস।  একথা শুনে বুশরা জিজ্ঞাসা করে, এমটা বলছো কেন? তার কোনও উত্তর দেয়নি নিবরাস।  ফোন কেটে বন্ধ করে দিয়েছে।  তারপর থেকে বুশরা তার ভাইয়ের ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারে দিনের পর দিন ম্যাসেজ দিয়ে এসেছেন।  মাঝে মধ্যে সেসব ‘সিন’ দেখিয়েছে কিন্তু উত্তর দেয়নি।

বুশরা জানান, গুলশান হামলার ৩ দিন আগে ২৭ জুন নিবরাস মেসেজ দিয়েছিল।  বলেছে, শিরক করবা না।  বেশি বেশি তওবা করবা।  আমার মতো হিযরত করো।  বাবা-মাকে বলো আমার কথা না শুনলে আমার স্যাক্রিফাইস বৃথা হবে।  বুশরা তখন জিজ্ঞেস করেন, আর ইয়্যু গোয়িং টু ডাই? উত্তরে নিবরাস জানায়,‘নট ইডিয়ট’। এরপর আবার ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় সে।

বুশরা বলেন, ‘আমি অনেকবার জানতে চেয়েছি তুমি কোথায় আছো? কিন্তু সে কোনও উত্তর দেয়নি।  ভাইয়া আমাকে সবকিছু শেয়ার করতো।  বন্ধু-বান্ধবীদের সঙ্গে কখন কোথায় আড্ডা দিয়েছে, কে কী বলেছে সব বলতো।  শুধু এই বিষয়টি বলেনি।  একটু জানতে পারলেও ভাইয়াকে হয়ত ঠেকাতে পারতাম।

/এসএমএ/

আরও পড়ুন:

তোমরা বেঁচে আছো

হলি আর্টিজান এখন

অশ্রুসজল স্বজন আর স্বদেশ

দুঃস্বপ্নের রাত, মমতার ইতিকথা

অবিন্তা নেই, বেঁচে আছে তার স্বপ্ন

সেদিন আমিও ঘরে থাকতে পারিনি

তুমি কোথায়, ‍গুলশানে জঙ্গি হামলা!

দুর্বিসহ স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছেন তারা

‘হয় আমি মরবো, না হয় ওদের মারবো’

গুলশানে এখনও কাটেনি আতঙ্কের রেশ

হলি আর্টিজান কেন বেছে নিয়েছিল জঙ্গিরা?

এসি রবিউলের সন্তানদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত

অপারেশনের শুরুতে উত্তেজনায় কাঁপছিলাম

নিহত শাওনের মায়ের বিলাপে ভারি গুলশান

‘অপারেশন থান্ডার বোল্ট’ থেকে ‘সান ডেভিল’

৩ কারণে হলি আর্টিজান হামলার চার্জশিটে দেরি

পুলিশকে সেই রাতের কথা যা বলেছেন হাসনাত করিম

শরীরে স্প্লিন্টার নিয়ে বেঁচে আছেন এডিসি আব্দুল আহাদ

গুলি ও বোমার আঘাতেই মৃত্যু হয়েছিল হলি আর্টিজানের জঙ্গিদের

গুলশান হামলায় নিহতদের স্মরণে অনুষ্ঠান নিয়ে দূতাবাসগুলোয় সতর্কতা

হলি আর্টিজানের পলাতক জঙ্গিদের এক মাসের মধ্যে গ্রেফতার করা হবে: মনিরুল

হলি আর্টিজানে হামলার পরিকল্পনা রাজশাহীতে, কৌশল নির্ধারণ গাইবান্ধায়, চূড়ান্ত অপারেশন প্ল্যান ঢাকায়

  

 

 

 

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম