সেকশনস

মিতব্যয়িতা মূল্যবোধেরই অংশ হওয়া উচিত

আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০২০, ১৫:২৬

মামুন রশীদ ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে আমাদের ভূগোলের শিক্ষক ছিলেন প্রয়াত আবুল কাশেম স্যার। তিনি আমাদের এক সহপাঠীকে পরীক্ষার হলেই চপেটাঘাত করেছিলেন। তার অপরাধ ছিল-পরীক্ষার খাতায় বিরাট মার্জিন দেওয়া বা প্রয়োজনের অতিরিক্ত অংশ খালি রাখা। স্যার রাগতস্বরে বলেছিলেন-গরিব দেশের জনগণের করের টাকায় প্রায় বিনা পয়সায়  পড়া ছাত্র-ছাত্রীদের এতো অপচয় গ্রহণযোগ্য নয়। বরং এটি গরিব প্রজাদের অত্যাচারী জমিদারদের কথাই নাকি মনে করিয়ে দেয়। করোনাকালে আমাদের এলাকার সুপারশপ বা ফার্মেসিতে দেখেছি অনেক বড় বড় করে লিখে রাখা হয়েছে–প্যানিক বাই বা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে কোনও কিছু না কিনতে। অথচ নিজেই ঢাকার অভিজাত পাড়ায় সুপারশপ বা ফার্মেসিতে দেখেছি কেনাকাটা কাকে বলে? তিনজনের সংসারের এক বন্ধুপত্নীকে দোকানের সহায়তাকারীকে বলতে শুনেছি– ‘আমাকে ২০টি মুরগি, ১০ কেজি খাসির মাংশ, ১০ কেজি গরুর মাংস, পাঁচ ডজন টয়লেট পেপার, ২০ কেজি আলু, ২০ লিটার দুধ ইত্যাদি ইত্যাদি দাও।’ অনেকে দেখেছি নিজেই ডাক্তার হয়ে বাড়িতে  অনেক ধরনের ওষুধ মজুত করছেন। পেঁয়াজের অনুমিত আমদানি সংকটের কথা জানতে পেরে বন্ধুদের অনেকেই সম্প্রতি ২০-২৫ কেজি পেঁয়াজ কিনে মজুত রেখেছেন।

এই গরিব দেশেও অনেকেরই প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাদ্য, বস্ত্র বা অন্যান্য সামগ্রী কিনে রাখার ব্যাপারে আমি নিশ্চিত কমবেশি সবাই ওয়াকিবহাল।  কয়েক বছর আগে আমার কাছে  বহুল প্রচলিত এক ইংরেজি পত্রিকার সম্পাদক জানতে চেয়েছিলেন- বাংলাদেশে ‘অপচয়ের অর্থনীতি’র  আকার কত? শুধু প্রয়োজনের অতিরিক্ত কেনা বা মজুত নয়, যে কোনও বিয়ে বা সামাজিক অনুষ্ঠান এমনকি গরিব দেশের সরকারি কেনাকাটার ধরন দেখলেও একই ধারণা হবে।            

কিছুদিন ধরে দেখছি, অনেক বন্ধুজন ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে জানিয়ে দিচ্ছেন- কলকাতায় ইলিশ কেটে বিক্রি হয়। এটা নিয়ে  এমনকি হাসাহাসি চলছে ফেসবুকে। আমি নিশ্চিত যারা হাসছেন তারা সবাই কম বেশি ইলিশ আস্ত কিনে খাওয়া লোকজন। তারা জানেন না বাংলাদেশের কতজন লোক বা পরিবার ইলিশ কিনে খেতে পারছে।

যদি কলকাতার মতো কেটে পিস পিস করে মাছ বিক্রি হতো তাহলে আমাদের আশেপাশের স্বল্প আয়ের লোকজনগুলো একবেলা ইলিশ চেঁখে দেখতে পারতো। কত মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত  ইলিশ খেতে পারে না সে খবর কি আমরা রাখি!

যদি গাদা পেটি মাথা আলাদা করে বিক্রি হতো তাহলে দশ হাজার টাকা বেতনে কারখানায় চাকরি করা লোকটা তার বাচ্চার খাওয়ার প্লেটে একটু ইলিশ দিতে পারতো।

বাংলাদেশে এক পিস আপেল কেনা আর ভিক্ষা করা সমতুল্য। অথচ নিম্নবিত্ত  একটি আনার বা দুটো আপেল কিনতে পারলে স্বস্তি পেতো। বাংলাদেশের দোকানির কাছে এরকম ক্রেতা হয়তো স্রেফ মিসকিন হিসেবেই বিবেচিত হবে। ভারতে কিন্তু এভাবে সবাই কিনে খায়। এমনকি ধনী দেশের লোকজনও চার পিস আপেল কেনে চাহিদা অনুযায়ী।

আমার প্রায়ই কলকাতায় যাওয়া হয়। ওখানে দেখেছি ২৫০ গ্রাম মুরগির মাংস বা ২ পিছ মাছ কেনা যায়! বেশি কিনলে নষ্ট। এটা অপচয় রোধ করে। এটা কিপ্টামি না। বাসি পচা খাওয়া থেকেও এ পদ্ধতি অনেক উপকারী। কলকাতায় এক পিছ মিষ্টিরও সুন্দর কাগজের প্যাকেট আছে। ওখানে যার যতটুকু প্রয়োজন সে ততোটা নিতে পারে। এ সুবিধা খুবই ভালো।

সভ্য সমাজ প্রয়োজনের অতিরিক্ত কেনে না। ইউরোপ আমেরিকার জনগণ একটি চকলেটবার নিয়ে বন্ধুর বাসায় যায়। বন্ধু এককাপ কফিতে আপ্যায়িত করে। আমাদের মতো ৩ কেজি মিষ্টি নিয়ে হাজির হয় না আত্মীয় পরিজনের বাসায়। যার অনেকটাই ময়লার স্তূপে ঠিকানা হয়।

আতংকিত হয়ে কেনাকাটা বা মুনাফা লাভের চেষ্টা নতুন কিছু নয়। দুঃখের কারণ হচ্ছে অবাধ তথ্য প্রবাহের এই যুগেও মানুষ আদিম প্রবৃত্তি থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পরিবারের বিভিন্ন সদস্যের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের অভিযোগে  আমরা যেখানে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে পালিয়ে বেড়িয়েছি তখন দেখেছি মানুষ আপৎকালে মজুতদারি ছেড়ে বরং মানুষের কাছে এগিয়ে এসেছেন। তাহলে ২০২০ সালে এসে আমরা কেন প্রয়োজনের অনেক অনেক বেশি খাদ্যসামগ্রী বা ওষুধপত্র মজুত করে অন্যান্য ভোক্তা বা মানুষকে  বঞ্চিত করবো, বাজারে সরবরাহ বা জোগান ঘাটতি করে দাম বাড়াতে সাহায্য করবো? সমস্যার সমাধান কিন্তু সরকার বা পুলিশের হাতে নয়, আমাদের হাতে। আমাদের বিবেক বুদ্ধির কাছে।

আমার সরকারি কর্মকর্তা বাবা অবসরগ্রহণের পর মৃত্যুর আগে আমাদের এমনকি তার নাতি-নাতনিদেরও এগুলো বলতেন। বলতেন- তোমরা জানো না- বাংলাদেশে কত লোক অনাহারে- স্বল্পাহারে থাকে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত কেনাকাটা বাজারে জোগান সংকটে পণ্যের দাম বেড়ে যায় আর ভুক্তভোগী হয় দিনে কিনে দিনে খাওয়া গরিব লোকজন। আমি নিশ্চিত আমাদের অনেক শিক্ষকও একই কথা বলতেন। আমাদের সম্পদশালী অমিতব্যয়ী লোকের চাইতেও বিবেকবান এবং যুক্তিশীল লোকের বেশি প্রয়োজন।              

লেখক: অর্থনীতি বিশ্লেষক।

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সম্পর্কিত

সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে?

সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে?

আব্দুল আজিজ ও বাজেটে উদ্ভাবনী চিন্তার প্রতিফলন

আব্দুল আজিজ ও বাজেটে উদ্ভাবনী চিন্তার প্রতিফলন

মি. বিশ্বাসকে কে খুন করলো?

মি. বিশ্বাসকে কে খুন করলো?

সামাজিক অবক্ষয়ই আমাদের অগ্রগতির পথে প্রধান বাধা

সামাজিক অবক্ষয়ই আমাদের অগ্রগতির পথে প্রধান বাধা

বাংলাদেশে দুর্নীতি কমানো কি সম্ভব?

বাংলাদেশে দুর্নীতি কমানো কি সম্ভব?

দেশপ্রেমের দোহাই দিয়ে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা যাবে না

দেশপ্রেমের দোহাই দিয়ে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা যাবে না

এ খাঁচা ভাঙবো আমি কেমন করে?

এ খাঁচা ভাঙবো আমি কেমন করে?

বাংলাদেশে নাগরিক সমাজের ভূমিকা কি ফুরিয়ে গিয়েছে?

বাংলাদেশে নাগরিক সমাজের ভূমিকা কি ফুরিয়ে গিয়েছে?

শুধু বাজেটে বরাদ্দ বাড়িয়ে স্বাস্থ্যখাতের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা যাবে না

শুধু বাজেটে বরাদ্দ বাড়িয়ে স্বাস্থ্যখাতের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা যাবে না

লকডাউন তুলে নিলে কী হবে?

লকডাউন তুলে নিলে কী হবে?

করোনায় কৃষি ও দরিদ্রদের সহায়তা

করোনায় কৃষি ও দরিদ্রদের সহায়তা

বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান: কৃচ্ছ্রসাধনই এখন লক্ষ্য হওয়া উচিত

বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান: কৃচ্ছ্রসাধনই এখন লক্ষ্য হওয়া উচিত

সর্বশেষ

মিয়ানমারের সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনায় বসতে রাজি চীন

মিয়ানমারের সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনায় বসতে রাজি চীন

দেবীগঞ্জে ট্রাক্টরের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী নিহত

দেবীগঞ্জে ট্রাক্টরের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী নিহত

মটোরোলা নিয়ে এলো ‘হ্যালো স্বাধীনতা’ অফার

মটোরোলা নিয়ে এলো ‘হ্যালো স্বাধীনতা’ অফার

দুই কারারক্ষী বরখাস্ত, দুই জেলার প্রত্যাহার

কারাগার থেকে কয়েদি নিখোঁজদুই কারারক্ষী বরখাস্ত, দুই জেলার প্রত্যাহার

‘সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকলে ষড়যন্ত্রকারীরা সফল হতে পারবে না’

‘সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকলে ষড়যন্ত্রকারীরা সফল হতে পারবে না’

ঢাকায় আসছেন দক্ষিণ এশিয়ার চার শীর্ষ নেতা

ঢাকায় আসছেন দক্ষিণ এশিয়ার চার শীর্ষ নেতা

করোনার বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় নারী নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ: স্পিকার

করোনার বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় নারী নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ: স্পিকার

আপন জুয়েলার্সের মালিকের বিরুদ্ধে করা রমনা থানার মামলাটি বিচারের জন্য প্রস্তুত

আপন জুয়েলার্সের মালিকের বিরুদ্ধে করা রমনা থানার মামলাটি বিচারের জন্য প্রস্তুত

আপন জুয়েলার্সের মালিকের বিরুদ্ধে করা রমনা থানার মামলাটি বিচারের জন্য প্রস্তুত

আপন জুয়েলার্সের মালিকের বিরুদ্ধে করা রমনা থানার মামলাটি বিচারের জন্য প্রস্তুত

‘মিয়ানমারের  অনেক নাগরিক ভারতে আশ্রয় চাইছে’

‘মিয়ানমারের  অনেক নাগরিক ভারতে আশ্রয় চাইছে’

শাহীন আফ্রিদির শ্বশুর হচ্ছেন শহীদ আফ্রিদি

শাহীন আফ্রিদির শ্বশুর হচ্ছেন শহীদ আফ্রিদি

নতুন কৃষি আইন সংশোধনে প্রস্তুত আছে সরকার: ভারতের কৃষিমন্ত্রী

নতুন কৃষি আইন সংশোধনে প্রস্তুত আছে সরকার: ভারতের কৃষিমন্ত্রী

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ


[email protected]
© 2021 Bangla Tribune
Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.