সেকশনস

আয়শা খানম– যে দীপ নেভে না কোনোদিন

আপডেট : ০৫ জানুয়ারি ২০২১, ১৬:৩২

মাসুদা ভাট্টি এমন স্মৃতিকথা দিয়ে বছরের শুরুটা করতে হবে ভাবতেও মনটা বিষণ্ন হয়ে ওঠে, তবু যিনি চলে গেছেন তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা না জানালে নিজের কাছেই অপরাধী থাকতে হয়, আর মানুষটি যখন আর কেউ নন, আমাদের বেড়ে ওঠাকালে বাঙালি নারী-অধিকারের কথা যার মুখ থেকে সবচেয়ে বেশি শুনেছি আমরা, সেই আয়শা খানম। অসুস্থ হয়েছিলেন এ কথা জানা ছিল কিন্তু তার চলে যাওয়ার পর এমন একজন মানুষও পাওয়া গেলো না, যিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা পত্রপত্রিকার পাতায় সামান্য নিন্দা-মন্দ-সমালোচনা করেছেন আয়শা খানমকে নিয়ে। সবার একই কথা, একটি গোটা জীবন তিনি আসলে উৎসর্গ করে গিয়েছিলেন বাঙালির গণতান্ত্রিক, ন্যায্য এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনোৎসরিত অধিকার আদায়ের লক্ষ্য নিয়ে। রাজপথ থেকে বক্তৃতার মঞ্চে, কর্মে ও ব্যক্তিজীবনে সব ক্ষেত্রেই আয়শা খানম রেখে গেছেন সেই স্বাক্ষর, যেখানে দাঁড়িয়ে আজকের সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ নারীবাদী মানুষটিও স্বীকার করবেন যে তিনি যে সময়ের প্রতিনিধিত্ব করেছেন সেই সময় নারী-আন্দোলন কিংবা আধুনিক বাঙালি-জাগরণের পক্ষে যেকোনও উদ্যোগই আসলে সহজ ছিল না। বিশেষ করে পাকিস্তানি জমানায় সামরিক শাসকদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করা থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং তারপর নিজের জীবনকে পুরোপুরি ন্যস্ত করা নারী-অধিকার আন্দোলনের একজন সার্বক্ষণিক কর্মী হিসেবে– এ সত্যিই এক দুরূহ কর্মযজ্ঞ, যা আয়শা খানম করে গিয়েছেন হাসিমুখে, স্লোগাননির্ভর কিংবা রাষ্ট্রের হাত থেকে কোনও প্রাপ্তিযোগের আশা ব্যতিরেকেই।

যেখান থেকে আয়শা খানম কিংবা তার সমসাময়িক বাঙালি নারী তাদের যাত্রা শুরু করেছিলেন সেখানে দাঁড়িয়ে বেশিরভাগের পক্ষেই একথা অচিন্তনীয় ছিল যে কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হবেন কিংবা নারীর অধিকার আদায়ে পথে নামাটা আসলে সম্ভব। কিন্তু আয়শা খানম পেরেছেন, যদিও তাকে কখনও উচ্চস্বর কিংবা ডাকাবুকো ধরনের নারী বলে তার পরিচিতরা জেনেছেন বলে কেউ বলছেন না। বিশেষ করে তাকে অত্যন্ত মিষ্টভাষী এবং সহজিয়া মানুষ হিসেবেই পরিচিতরা বর্ণনা করেছেন। তার পক্ষে ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতি থেকে শুরু করে সেই রাজনৈতিক দুর্যোগকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদে নেতৃস্থানীয় কোনও আসন লাভ যথেষ্ট শক্তিশালী ব্যক্তিত্বময়ী না হলে অর্জন যে সম্ভবপর ছিল না তা বলাই বাহুল্য। পরিবারের সমর্থন কিংবা সহযোগিতা থাকলেও সব নারীর পক্ষে তখন বৃত্তের বাইরে গিয়ে নেতৃত্ব গ্রহণ করাও সম্ভব হয়নি। কিন্তু আয়শা খানম পেরেছেন, এবং তিনি প্রমাণ করেছেন যে একটি লক্ষ্যে স্থির থেকে জীবন পার করা যায় এবং তাতে সমাজ, রাষ্ট্র এবং মানুষের কল্যাণই হয়, অকল্যাণ নয়। ছাত্র রাজনীতি থেকে মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে অর্জিত বাংলাদেশে নারীর পক্ষে গলা তুলে কথা বলার জন্য আজ আমরা যাদের নমস্য মনে করি, তাদের মধ্যে অন্যতম এবং বলা দরকার যে, প্রথম সারিতেই থাকবেন আয়শা খানম এবং তার দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে গড়া প্রতিষ্ঠান মহিলা পরিষদ।

তুমুল স্নায়ুযুদ্ধকালে মহিলা পরিষদ সোভিয়েত ব্লকের আশীর্বাদ লাভ করায় ধনতান্ত্রিক ব্লক থেকে তাদের কোনও সহযোগিতা করা হয়নি, এই সময়ই আমরা দেখতে পেয়েছিলাম যে, এনজিও’র নামে বাংলাদেশে বিদেশি সাহায্যনির্ভর একেকটি প্রতিষ্ঠান রাতারাতি দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তারা পুরস্কৃত হচ্ছেন এবং বাংলাদেশের রাজনীতিরও নিয়ন্ত্রা হয়ে উঠেছেন সে সবের কর্ণধাররা। নারী স্বাধীনতার পক্ষে কথা বললেও আয়শা খানম কিংবা মহিলা পরিষদ কিন্তু এসব ক্ষেত্রে প্রায় ব্রাত্যই থেকে গিয়েছিলেন। তবু তিনি হাল ছাড়েননি। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর যখন তাদের একলা চলার দিন এসেছে তখন তারা চেষ্টা করেছেন পশ্চিমের সহযোগিতা পেতে, কতটুকু কী পেয়েছেন সে ব্যাপারে বিশদ বলার কিছু নেই এখানে, কিন্তু এটুকুও এখানে এ কারণেই বলা যে, দশকের পর দশক আসলে মহিলা পরিষদ কিংবা আয়শা খানমকে একাই এগোতে হয়েছে। তাতে তাদের অবস্থানের বিন্দুমাত্র হেরফের হয়নি, তাদের উপস্থিতিও অধিকার আদায়ের নিমিত্তে কম লক্ষ্যমান ছিল সে কথাও বলার উপায় নেই আমাদের। বরং স্বৈরশাসন পেরিয়ে স্বৈরাচারজাত রাজনীতির সঙ্গে মহিলা পরিষদ এবং আয়শা খানমের বিরোধপূর্ণ অবস্থানের কথাই আমরা জানতে পারি এবং তাদের অবস্থান মূলত গণতন্ত্রের পক্ষেই ছিল সব সময়।

কেবল বাংলাদেশে নয় বিশ্বের সর্বত্রই নারী আন্দোলন কিংবা নারীর অধিকার আদায়ের সংগ্রাম সমগ্র হতে ব্যক্তির দিকে আসতে শুরু করে মূলত নব্বই সালের পর থেকে। কারণ, পশ্চিমে নারীরা সামগ্রিকভাবে আন্দোলন দিয়ে যা অর্জন করতে পেরেছিলেন তারই ফলে ব্যক্তি নারীর উত্থানে নারীর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বড় পদপ্রাপ্তি ঘটার পর প্রাতিষ্ঠানিক আন্দোলনে ভাটা পড়ে বলে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে। এই সময়ে বাংলাদেশের মতো ছোট ও পিছিয়ে পড়া দেশেও নারীর সামগ্রিক আন্দোলন পূর্বের ধারাবাহিকতা ও গতি হারায়। এই ধীরগতির ভেতরেও আয়শা খানম এবং তার প্রতিষ্ঠান কোথাও দাঁড়িয়ে থাকেননি; বরং নির্যাতিত নারীর পাশে দাঁড়ানো থেকে শুরু করে যে কোনও আন্দোলন-সংগ্রামে সহমর্মিতা প্রকাশ এবং প্রকাশ্যে বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে নারীর পাশে থাকার দীপ্ত সাহস দেখানোতেও কখনও পিছপা না হওয়াটা আসলে আজন্ম বিপ্লবী বলেই আয়শা খানম পেরেছেন। তার প্রয়াণে তাই এই জায়গাটিতে বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হলো।

ব্যক্তিগত পরিচয় এবং সখ্য থেকেই জানি যে, মানুষ হিসেবে আয়শা খানম খুব সাধারণ জীবনযাপনেই বিশ্বাসী ছিলেন। অথচ কোনও বিষয়ে অবস্থান নিতে চাইলে তিনি খুব সহজেই হয়ে উঠতে পারতেন দৃঢ়চেতা। অসম্ভব সুবক্তা এবং গুছিয়ে বাক্যকে উদ্দেশ্য পূরণের হাতিয়ার করে তোলার ক্ষেত্রে তার সমতুল্য কাউকে পাওয়া যাবে বলে মনে করি না। মুখে হাসি রেখেও যে মানুষ তার অধিকার বুঝে নেওয়ার দাবিটি তুলে ধরতে পারেন, সেটি আয়শা খানম আমাদের শিখিয়েছেন বা শেখাতে চেয়েছেন। তিনি তার পূর্বসূরিদের কাছ থেকে সেটি শিখেছিলেন, বেগম রোকেয়া কিংবা সুফিয়া কামাল থেকে আমরা আয়শা খানম হয়ে আজকের বাঙালি নারী– এই দীর্ঘ পথে আমাদের জন্য কেউ ফুল বিছিয়ে রাখেনি, বরং রাজনীতি, সমাজনীতি এবং ধর্মের দেয়াল তুলে নারীকে কেবলই পেছনে টানতে চেয়েছে আর আয়শা খানমরা সেই পিছুটান অগ্রাহ্য করে আমাদের সামনে এগিয়ে নিতে চেয়েছেন। তার সফলতা এখানে পরিমাপের কোনও যন্ত্র নেই, কিন্তু এই যে তার উত্তরসূরি হয়ে আমি লিখতে পারছি, আরেকজন গাইতে পারছেন, আরেকজন অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখতে পারছেন, আর রাজনীতিতে কিংবা দেশ চালানোয় আমাদের সামনে একজন মহীরুহ তো আছেনই জ্বলজ্বলে উদাহরণ হয়ে। আমরা সকলেই আয়শা খানমের দেখানো পথে হাঁটি বা হাঁটছি– এটাই তার সাফল্য।

লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, দৈনিক আমাদের অর্থনীতি

[email protected]

 

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সম্পর্কিত

রাজনীতি চালু থাকুক ষড়যন্ত্র নয়

রাজনীতি চালু থাকুক ষড়যন্ত্র নয়

আগামীর পৃথিবীটা চালাবে কে?

আগামীর পৃথিবীটা চালাবে কে?

কল চালাতে ব্যর্থ কিন্তু পাটের বাজারটা ছাড়বেন না যেন!

কল চালাতে ব্যর্থ কিন্তু পাটের বাজারটা ছাড়বেন না যেন!

৭১-এর আওয়ামী লীগ: বাংলাদেশের ইতিহাস ও রাজনীতি

৭১-এর আওয়ামী লীগ: বাংলাদেশের ইতিহাস ও রাজনীতি

মোহাম্মদ নাসিমের মৃত্যু-পরবর্তী যে শিক্ষা আওয়ামী লীগ নিতে পারে

মোহাম্মদ নাসিমের মৃত্যু-পরবর্তী যে শিক্ষা আওয়ামী লীগ নিতে পারে

বর্ণবাদ-রোগের কোনও টিকা নেই!

বর্ণবাদ-রোগের কোনও টিকা নেই!

আনিসুজ্জামান: একটি বাঙালিবৃক্ষের বিদায় ও সামনের অতিকায় অন্ধকার

আনিসুজ্জামান: একটি বাঙালিবৃক্ষের বিদায় ও সামনের অতিকায় অন্ধকার

করোনাকালে জীবন ও জীবিকা: কাকে রেখে কাকে ছাড়বেন?

করোনাকালে জীবন ও জীবিকা: কাকে রেখে কাকে ছাড়বেন?

মানুষের বিভাজন ভাইরাসের সংযোজন

মানুষের বিভাজন ভাইরাসের সংযোজন

করোনাকালে মানবতাবাদ

করোনাকালে মানবতাবাদ

সর্বশেষ

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কলকাতার রূপঙ্করের গান (ভিডিও)

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রূপঙ্কর বাগচিরা গান (ভিডিও)

কলাবাগানে ধর্ষণের পর হত্যা: তদন্ত প্রতিবেদন ২১ মার্চ 

কলাবাগানে ধর্ষণের পর হত্যা: তদন্ত প্রতিবেদন ২১ মার্চ 

দুই ঘণ্টার আগুনে পুড়লো ৩০ দোকান, ক্ষতি ৫ কোটি টাকার 

দুই ঘণ্টার আগুনে পুড়লো ৩০ দোকান, ক্ষতি ৫ কোটি টাকার 

যুবককে ফাঁসাতে ভাঙা হলো ‍আশ্রয়ন প্রকল্পের ৩২ পিলার

যুবককে ফাঁসাতে ভাঙা হলো ‍আশ্রয়ন প্রকল্পের ৩২ পিলার

হোয়াইট হাউজে থাকতেই টিকা নেন ট্রাম্প ও মেলানিয়া

হোয়াইট হাউজে থাকতেই টিকা নেন ট্রাম্প ও মেলানিয়া

ট্রেনে ঘটছে ছিনতাই, থামছে না ঢিল ছোঁড়ার ঘটনা

ট্রেনে ঘটছে ছিনতাই, থামছে না ঢিল ছোঁড়ার ঘটনা

গুরুতর অসুস্থতা ৮০ শতাংশ কমাতে পারে করোনার টিকা

গুরুতর অসুস্থতা ৮০ শতাংশ কমাতে পারে করোনার টিকা

ভিক্ষুকের টাকা ছিনতাই!

ভিক্ষুকের টাকা ছিনতাই!

রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে ওআইসি বাংলাদেশের পাশে থাকবে

রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে ওআইসি বাংলাদেশের পাশে থাকবে

নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছিলেন বঙ্গবন্ধু

নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছিলেন বঙ্গবন্ধু

৮ ভূমিহীন পরিবারকে জমিসহ বাড়ি করে দেবেন হাসনাত-পারুল দম্পতি

৮ ভূমিহীন পরিবারকে জমিসহ বাড়ি করে দেবেন হাসনাত-পারুল দম্পতি

নসিমন উল্টে স্কুল শিক্ষার্থী নিহত

নসিমন উল্টে স্কুল শিক্ষার্থী নিহত

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ


[email protected]
© 2021 Bangla Tribune
Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.