X
বুধবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২১, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

সেকশনস

শুভ জন্মদিন, নির্মূল কমিটি

আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০২১, ০০:২৯

মুহম্মদ জাফর ইকবাল পুরো নাম ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’, একটি সংগঠনের জন্য নামটি যথেষ্ট লম্বা, বলতে সময় লাগে। কিন্তু গত ২৯ বছরে এটি এই দেশের জন্যে এতবার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছে যে, আজকাল আর পুরো নাম বলতে হয় না, নির্মূল কমিটি বললেই সবাই বুঝে নেয় কাদেরকে নির্মূল করার জন্য এই সংগঠন। এটি যখন জন্ম নেয়, ১৯৯২ সনের ১৯শে জানুয়ারি, আমি তখন আমেরিকায়। তখন ই-মেইল ইন্টারনেটের জন্ম হয়নি, দেশের খবরা-খবর সরাসরি পাই না, ঘুরে ফিরে পেতে হয়। যেটুকু খবর পাই শুনে মন খারাপ হয়ে যায়। কিছু একটা করার ইচ্ছে করে, কী করবো বুঝতে পারি না। সমমনা যারা আছি তারা মিলে ভাবলাম, মুক্তিযুদ্ধের পর ঠিক দুই দশক পার হয়েছে, ‘বিশ বছর পর’নাম দিয়ে একটা সংকলন বের করা যাক, যেখানে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের সব বিশিষ্ট মানুষজনের লেখা ছাপা হবে। দেশের বিশিষ্ট মানুষজনের ভেতর হুমায়ূন আহমেদ ছাড়া আমি কাউকে চিনি না, আমাকেও কেউ চেনে না, তাই আমি বললাম আমি সম্পাদনার কাজটুকু করে দেব। কেউ যেন মনে না করে সম্পাদনার কাজটুকু খুব সহজ, কারণ অনেকে নিশ্চয়ই অনুমানও করতে পারবে না, ত্রিশ বছর আগে আমেরিকাতে বাংলায় একটা বই বের করতে হলে সেই বইটি কম্পোজ করার দায়িত্বও সম্পাদকের! কাজটুকু তখন গুরুতর কঠিন কারণ, তখনও কম্পিউটারে বাংলা লেখার কাজটি মোটেও সহজ ছিল না। দায়িত্ব ঠিক আমার ঘাড়ে এসে পড়েছে, তার কারণ আমি কম্পিউটারে বাংলা লেখার একটা পদ্ধতি দাঁড়া করিয়েছি, উত্তর আমেরিকার অনেকেই সেই পদ্ধতি ব্যবহার করে তখন পত্র পত্রিকা বের করে।

সেই বইটি প্রকাশনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধা ডক্টর নুরুন নবী, আমি যেরকম জবুথবু তিনি ঠিক সেরকম কাজের মানুষ। সবার সাথে যোগাযোগ আছে, সবাইকে চেনেন! তিনি সবার কাছ থেকে লেখা বের করে আনলেন, আমি সেই লেখাগুলো টাইপ করি আর দীর্ঘশ্বাস ফেলি। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের লেখার শিরোনাম, ‘বিশ বছরের বিষ-বাষ্প’, ভিতরে লিখেছেন, “বিশ বছর পর একটি কথাই চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা করছে—বিশ বছরের বিষবাষ্পে সারা দেশ এবং জাতি আজ শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় মৃত্যুর প্রহর গুনছে।” কী ভয়ঙ্কর একটি কথা! কবীর চৌধুরীর লেখাটির শিরোনাম, “স্বাধীন বাংলাদেশের বিশ বছর: হিসাব কি মেলে?” প্রফেসর আনিসুজ্জামান এর লেখার প্রথম লাইনটিই ছিল, “বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের কুড়ি বছর পর দেশের হতশ্রী অবস্থা দেখে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, আমরা কী চেয়েছিলাম আর কী পেলাম?” হুমায়ূন আহমেদ লিখেছে যুদ্ধাপরাধী শর্ষিনার পীর এর স্বাধীনতা পদক প্রাপ্তি নিয়ে, তার লেখার শেষ লাইন, “হায়, এই দুঃখ আমি কোথায় রাখি?”

পুরো বইয়ের প্রতিটি লেখা এরকম, একটি থেকে অন্যটি বেশি মন খারাপ করা। বইটি যখন বের হয়েছে সেটি হাতে নিয়ে বিষন্ন ভাবে দেখি এর মাঝে শুধু দুঃখ, হতাশা এবং ক্ষোভ। দেশ স্বাধীন হওয়ার বিশ বছর পর কেন শুধু দুঃখ হতাশা এবং ক্ষোভ থাকবে?

ঠিক তখন দেশ থেকে একটা বিস্ময়কর খবর পেলাম, ১৯৯২ সনের ২৬শে মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গণআদালত করে সেখানে গোলাম আযমের বিচার করা হবে। আমরা কৌতূহল এবং উৎসাহ নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকি। বিচার শেষ হওয়ার পর একটু একটু করে খবর পেলাম। পুলিশ মঞ্চ করতে দেয়নি, মাইকও কেড়ে নিয়েছিল, দুটি ট্রাক পাশাপাশি জোড়া দিয়ে মঞ্চ বানিয়ে সেখানে গণআদালত করা হয়েছে। সেই গণআদালতে নাকি শুধু মানুষ আর মানুষ, বিশাল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তিল পরিমাণ জায়গা খালি ছিল না। বিচারকমণ্ডলীর সভাপতি শহীদ জননী জাহানারা ইমাম। গণআদালতের বিচারের রায়ে গোলাম আযমকে দোষী সাব্যস্ত করে তার ফাঁসির রায় দেওয়া হয়েছে। বাসা থেকে চিঠিপত্র আসছে, সেখান থেকেও খবর পাচ্ছি, একটা খবর আমার জন্য খুবই চমকপ্রদ। আমার মা গণআদালতের সেই ট্রাক দিয়ে তৈরি মঞ্চে ছিলেন, বিশাল একটা ঐতিহাসিক ঘটনায় আমাদের পরিবারেরও একটু স্পর্শ আছে। কী আশ্চর্য!

একটি বিশাল ঘটনা এমনি এমনি হয়ে যায় না। সেটি হওয়ার জন্য তার পেছনে কোনও না কোনও মানুষের কিংবা কোনও না কোনও সংগঠনের কাজ করতে হয়। এই গণআদালতের আয়োজন করেছে ৭২টি রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক সংগঠন মিলে তৈরি ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি’। এর একমাস আগে ১৯শে জানুয়ারি জন্ম নিয়েছে ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’। নির্মূল কমিটির সভাপতি শহীদ জননী জাহানারা ইমাম। আমি জাহানারা ইমামকে চিনি তার ‘একাত্তরের দিনগুলি’ বই থেকে। তিনি যে এত বড় একটা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে পারেন আমি সেটা জানতাম না।

‘বিশ বছর পর’ বইটি বের করার পর যেরকম মন খারাপ হয়েছিল, গণআদালতের পর তার অনেকটুকুই কেটে গেল। আমরা সবাই কেমন জানি উজ্জীবিত হয়ে উঠলাম। মনে হলো মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এক ধরনের উদ্দীপনা এবং রাজাকারদের নিয়ে এক ধরনের তীব্র ঘৃণা জন্ম নিতে শুরু করেছে। যুদ্ধাপরাধীর বিচারের কথাগুলো প্রায়ই উচ্চারিত হতে লাগল।

এর মাঝে একদিন জানতে পারলাম জাহানারা ইমাম নিউ ইয়র্কে আসছেন। আমাদের উত্তেজনার শেষ নেই। যখন এসেছেন একদিন আমি তার সাথে দেখা করতে গেলাম, হাতে তার লেখা ‘একাত্তরের দিনগুলি’ বইটি। খুবই মুখ কাচুমাচু করে বললাম, “আপনি আমাকে চিনবেন না, আমার বড় ভাই হুমায়ূন আহমেদ—আমার নাম মুহম্মদ জাফর ইকবাল।”

জাহানারা ইমাম আমাকে থামিয়ে বললেন, “আমি তোমাকেও চিনি, তোমার একটা বই আছে বইটার নাম কপোট্রনিক সুখ দুঃখ—”, তারপর আমার সেই বইটা সম্পর্কে খুবই দয়ার্দ্র কিছু কথা বললেন। শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম এবং সেই মুহূর্তে আমার জীবনের একটা বড় পরিবর্তন হলো। আমি একটু আধটু লেখালেখি করি, দেশে মাঝে মাঝে সেই বই প্রকাশিত হয়, বইয়ের ভালো-মন্দ জানি না, কেউ সেই বই কোনোদিন পড়ে কিনা তারও খবর পাই না, কাজেই তখন লেখালেখি নিয়ে আমার কোনও উৎসাহ বা আগ্রহ নেই। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের দয়ার্দ্র কথা শুনে আমার মনে হলো, তাঁর মতো একজন মানুষ যদি আমার বই নিজ থেকে আগ্রহ নিয়ে পড়তে পারেন তাহলে আমি কেন লিখব না? আমাকে লিখতেই হবে। যা হয় হোক, আমি লিখে যাব। সেই যে লেখালেখি শুরু করেছি আর থামিনি—এখনো লিখে যাচ্ছি!

আমি একাত্তরের দিনগুলি বইটিতে জাহানারা ইমামের অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য তার হাতে দিয়ে বললাম, “এই বইটি পড়তে আমার খুব কষ্ট হয়েছে।” জাহানারা ইমাম বললেন, “এই বইটি লিখতে আমারও খুব কষ্ট হয়েছে, আমি বুকে পাথর বেঁধে এই বইটি লিখেছি।”

শহীদ জননী জাহানারা ইমামের সাথে সেই যে আমার একটা আন্তরিক সম্পর্ক হয়ে গেল সেটি তাঁর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বজায় ছিল। আমেরিকায় গাড়ি করে যাবার সময় পেছনের সিটে তাঁর সাথে বসে কতো কী গল্প করেছি! আমি খুব অবাক হয়ে দেখতাম, যেই মানুষটি বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীর বিরুদ্ধে একটি বিশাল আন্দোলন গড়ে তুলেছেন, যার ভয়ে রাজাকার আলবদরেরা থর থর কম্পমান, সেই মানুষটি আসলে একেবারে ছোট একটি বাচ্চা মেয়ের মতো সহজ সরল!

মনে আছে, যখন আমরা টের পেলাম এই পৃথিবীতে তাঁর সময় ফুরিয়ে এসেছে তখন নিউইয়র্ক নিউজার্সি এলাকা থেকে আমরা অনেকে সারারাত গাড়ি চালিয়ে মিশিগানে তাঁর সঙ্গে শেষবারের মতো দেখা করতে গিয়েছিলাম। হাসপাতালের কেবিনে অল্প কিছক্ষণের জন্য আমরা দুইজন দুইজন করে তাঁর সাথে দেখা করতে যাচ্ছি, তখন মুখে আর কথা বলতে পারেন না। কাগজে লিখে আমাদের সাথে বক্তব্য বিনিময় করলেন। আমাদের সান্ত্বনা দিলেন, তারপর কাগজে লিখলেন, একদিন দেশের মাটিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে।

এর কয়দিন পর তিনি মারা গেলেন। বিশ্বাস করা কঠিন, তখনও তিনি খালেদা জিয়া সরকারের দেওয়া দেশদ্রোহীর মামলার আসামি! যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পর্কে তাঁর কথা অবশ্য ভুল হয়নি। প্রায় আট বছর আগে এই দেশে সত্যিই যুদ্ধাপরাধীর বিচার শুরু হয়েছে। সেই বিচারে অনেকের অপরাধ প্রমাণিত হয়ে রায় হয়েছে, শাস্তি হয়েছে, শাস্তি কার্যকর হয়েছে। বিচার শেষ হয়নি, এখনো চলছে। গণআদালত দিয়ে সেই যে মানুষের ভেতর মুক্তিযুদ্ধের জন্য ভালোবাসা এবং যুদ্ধাপরাধীদের জন্য প্রবল ঘৃণার জন্ম হয়েছিল সেটি কখনোই থেমে যায়নি। আমি বিস্ময় নিয়ে দেখি, এখন নূতন প্রজন্মের ভেতরেও সেই আবেগটুকু সঞ্চারিত হয়েছে।

১৯৯৪ সালে জাহানারা ইমামের মৃত্যুর পর নির্মূল কমিটির আন্দোলন থেমে গেলে কিংবা কমে গেলে অবাক হওয়ার কিছু ছিল না। কিন্তু সেটা হয়নি। একজনের পর একজন নেতৃত্ব দিয়ে গিয়েছেন। মনে হয় এটি সবচেয়ে দীর্ঘদিন থেকে চলমান একটি আন্দোলন। এর অনেকগুলো বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য আছে। আমার মনে হয় তার সবচেয়ে প্রথমটি হচ্ছে এর সুবিশাল ব্যাপ্তি, বাংলাদেশের বিশিষ্টজনদের প্রায় সবাই কোনও না কোনোভাবে এর সাথে জড়িত, সেই কবি সুফিয়া কামাল, কবি শামসুর রাহমান, অধ্যাপক আহমদ শরীফ, কথাশিল্পী শওকত ওসমান, অধ্যাপক কবীর চৌধুরী থেকে শুরু করে তাদের পরবর্তী প্রজন্মের প্রায় সব বিশিষ্ট কবি সাহিত্যিক পেশাজীবীরা, এরপর তার পরের প্রজন্ম, এখন তার পরের প্রজন্মের তরুণেরা এসেছে, আসছে। নামটিতে ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল’দের নির্মূলের কথা বলা হলেও এটি এই দেশে মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখা থেকে শুরু করে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তোলা, মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে আন্দোলন এর সবকিছুতে সোচ্চার। মনে হয় এই দেশের মূল আদর্শের বিরুদ্ধে পান থেকে চুন খসলেও সেটি নির্মূল কমিটির নজর এড়ায় না! তারা এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। নির্মূল সমন্বয় কমিটি আরো একটি বড় কাজ করেছিল, সেটি হচ্ছে কবি সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে গণতদন্ত কমিশন তৈরি করে দুটি অসাধারণ রিপোর্ট প্রকাশ করেছিল। জোট সরকার সংখ্যালঘুদের ওপর যে নির্যাতন চালিয়েছিল তার উপর নির্মূল কমিটি তিন খণ্ডে প্রায় তিন হাজার পৃষ্ঠার একটা রিপোর্ট প্রকাশ করেছিল, এছাড়াও হেফাজতের তাণ্ডব, মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের উপর হাজার হাজার পৃষ্ঠায় শ্বেতপত্র প্রকাশ করেছে। শুধু আবেগীয় কথায় নির্মূল কমিটির আগ্রহ নেই, তারা তথ্য প্রমান হাজির করে দেয়। এই দেশে নির্মূল কমিটি যত তথ্য প্রমাণ সংগ্রহ করেছে তার কোনো তুলনা নেই।

নির্মূল কমিটির এই বিশাল কর্মকাণ্ডে অনেকেই জড়িত, তাদের সবার কাছে এই দেশ কৃতজ্ঞ থাকবে। আমি শাহরিয়ার কবিরের নাম আলাদাভাবে মনে করিয়ে দিতে চাই, মুক্তিযুদ্ধের জন্য একজন মানুষের এত তীব্র ভালোবাসা থাকতে পারে নিজের চোখে দেখেও বিশ্বাস হতে চায় না! (তিনি শিশু-কিশোরদের জন্য খুব ভালো লিখতেন, নির্মূল কমিটির জন্য সময় দিতে গিয়ে তাদের জন্য লেখালেখি ছেড়ে দিয়েছেন! এই দেশের শিশু-কিশোরদের অনেক বড় ক্ষতি হলো!) জোট সরকারের আমলে প্রতিহিংসার কারণে শাহরিয়ার কবির জেল খেটেছেন, যেদিন জেল থেকে বের হবেন সেদিন মুনতাসির মামুনের সাথে আমি জেলগেটে হাজির ছিলাম। এই দেশকে ভালোবাসার জন্য একজন মানুষকে কত কষ্ট করতে হয় আমি নিজের চোখে দেখেছি। যুদ্ধাপরাধী শর্ষিনার পীরকে স্বাধীনতা পদক দিয়ে এই দেশকে অনেক বড় অপমান করা হয়েছে, অথচ মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য সম্মানিত করার বেলায় শাহরিয়ার কবিরকে কারো চোখে পড়ে না ভেবে আমি মাঝে মাঝে অবাক হয়ে যাই!

এই দেশের বিবেক একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি ২৯ বছরে পা দিচ্ছে। এই অসাধারণ, ঐতিহাসিক সংগঠন এবং তার সাথে জড়িত সবার জন্য অভিনন্দন।

নতুন তরুণ প্রজন্ম এই বিশাল সংগঠনটিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে আমি সেই স্বপ্ন দেখছি।


লেখক: শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞানী ও কথাসাহিত্যিক।

/এসএএস/

সম্পর্কিত

আমরা এখন একা

আমরা এখন একা

এই দুঃখ কোথায় রাখি?

এই দুঃখ কোথায় রাখি?

‘টিকা’ টিপ্পনী

‘টিকা’ টিপ্পনী

আমাদের আয়শা আপা

আমাদের আয়শা আপা

অভিবাসী শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধি জরুরি

আপডেট : ৩০ নভেম্বর ২০২১, ১৭:৩০

মো. আখতার হোসেন জীবন ও জীবিকার তাগিদে প্রতি বছর বিশ্বের অগণিত মানুষ নিজ দেশ ছেড়ে পাড়ি জমান বিভিন্ন দেশে। বিশ্ব অর্থনীতিতে অভিবাসন তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বেশিরভাগ উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটেও অভিবাসনের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। আশির দশকের শুরু থেকেই দেশের কর্মসংস্থান সংকট মোকাবিলায় ও দারিদ্র্য বিমোচনে অভিবাসন উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। কোভিড-১৯ ও লকডাউনের প্রভাবে সারা বিশ্বের অর্থনীতি যখন চরম সংকটের মুখোমুখি, তখন অনিশ্চয়তা ও শঙ্কা ভর করেছে দেশের অভিবাসন খাতেও।  

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো’র (বিএমইটি) তথ্যমতে, গত বছর প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের পরিমাণ দাঁড়ায় ২১,৭৫২.২৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। মার্চ-মে মাসে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হলেও জুন থেকে এর ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে, যা করোনাভাইরাসের অভিঘাত থেকে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। প্রবাসী শ্রমিকরা মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকার দেশসহ প্রায় মোট ১৬৮টি দেশে বসবাস করছেন। তারা মূলত বিভিন্ন ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের স্বল্পমেয়াদি চুক্তিভিত্তিক কর্মী হিসেবে কাজ করেন এবং চুক্তি শেষে দেশে ফিরে আসেন।

প্রবাস ফেরত শ্রমিকদের তথ্য সংরক্ষণের কোনও যথাযথ প্রক্রিয়া নেই বলে প্রতি বছর কতজন দেশে ফিরছেন এর সঠিক সংখ্যা বের করা বেশ কঠিন।

তবে, করোনা বৈশ্বিক মহামারি উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে অন্য যেকোনও বছরের তুলনায় গত বছর দেশে ফেরত আসা প্রবাসী শ্রমিকের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। আইওএম’র হিসাব অনুসারে, গত বছরের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর মাসে প্রায় চার লাখ প্রবাসী শ্রমিক কোভিড-১৯ এর কারণে দেশে ফেরত আসেন। কোভিড-১৯-এর বিস্তার ঠেকাতে বেশিরভাগ দেশে লকডাউন ঘোষণা করায় এবং জ্বালানি তেলের দাম ব্যাপকভাবে হ্রাস পাওয়ায় সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশ অভিবাসী শ্রমিকদের নিজ দেশে পাঠিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেয়।

এই প্রবাস ফেরত শ্রমিকদের একটি বড় অংশ ঋণদায়গ্রস্ত এবং দেশে তারা বেকার অবস্থায় জীবনযাপন করছেন। তাই, বিদেশে যেমন তারা কষ্টে দিনযাপন করছিলেন, দেশে এসেও তারা পড়েছেন এক দুর্দশাপূর্ণ পরিস্থিতিতে। আইওএম’র গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে ফেরত আসা ৭৫ শতাংশ প্রবাস শ্রমিক করোনাভাইরাস পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার বিদেশে ফেরত যেতে আগ্রহী।

সেক্ষেত্রে আমাদের দরকার প্রবাস ফেরত এই শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য একটি কাঠামোভিত্তিক রি-স্কিলিং ও আপস্কিলিং প্রোগ্রামে অন্তর্ভুক্ত করা, যেটি পরবর্তীতে দক্ষতার বিচারের মাপকাঠিতে প্রবাসে চাকরি নিশ্চিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনে সক্ষম হবে।

দক্ষতার বিচারে বাংলাদেশ থেকে সাধারণত তিন রকমের অভিবাসন হয়– দক্ষ, স্বল্প দক্ষ এবং অদক্ষ। সাধারণত আমাদের দেশের প্রবাসী শ্রমিকরা অবকাঠামো নির্মাণ সংক্রান্ত কাজ, পরিবহন, হোটেল-রেস্টুরেন্টের কাজ, স্বাস্থ্য সেবা, ঘরের কাজসহ স্বল্প দক্ষ ও নিম্ন উৎপাদনশীল কাজে নিয়োজিত থাকায় যেকোনও ধরনের অর্থনৈতিক অভিঘাতে তারা সমস্যার সম্মুখীন হন। করোনায় বেশিরভাগ দেশে এসব কাজের চাহিদা কমে যাওয়ায় অনেক প্রবাসী শ্রমিকই চাকরি হারিয়েছেন।

বিদেশ গমন করা অধিকাংশ শ্রমিকই কোনও প্রশিক্ষণ ছাড়া বিদেশে যান। অথচ ছয় মাস কিংবা এক বছরের একটি প্রশিক্ষণ বিদেশে তাদের পারিশ্রমিক দুই থেকে তিনগুণ বাড়িয়ে দিতে সক্ষম। তাই দেশে ফেরত আসা শ্রমিকরা যাতে ফের বিদেশ গমনের পর অধিক উপার্জন করতে পারেন, সেজন্য বহির্বিশ্বের শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী যেসব খাতে দক্ষ জনবল প্রয়োজন, সেসব খাতে তাদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে মনোযোগ দিতে হবে। এক্ষেত্রে মনে রাখা প্রয়োজন, করোনা পরিস্থিতি শ্রমবাজারের রূপ অনেকটাই পাল্টে দিয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে প্রযুক্তি নির্ভরতা ও উদ্ভাবন এবং নতুন দক্ষতার সুযোগ সৃষ্টি কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। কোভিড-১৯ যেমন কাজের ক্ষেত্রকে বিভিন্নভাবে পরিবর্তন করেছে, একইসাথে অনেক নতুন সুযোগও সৃষ্টি করেছে। দেশের অভিবাসী শ্রমিকদের বেশিরভাগেরই ভাষাগত দক্ষতা ও প্রযুক্তি জ্ঞান কম থাকায় তারা বিদেশে কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন রকম সমস্যার সম্মুখীন হন।

এসব ক্ষেত্রে বিদেশ ফেরত শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে শ্রম পরিস্থিতি আরও সুসংহত করা যেতে পারে। এছাড়া, অবকাঠামো নির্মাণ সংক্রান্ত কাজ, অটোমোবাইল ও ডিজিটাল খাতের কাজে বিদেশে অধিক চাহিদা থাকায়, তাদের এসব কাজ সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ প্রদান করার ব্যাপারে নজর দেওয়া যেতে পারে। আমাদের নারী প্রবাসী শ্রমিকদের একটি বড় অংশই বিদেশে ঘরের কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাদের যদি ভারতের কেরালা, ফিলিপাইন বা ভিয়েতনামের মতো নার্সিং কোর্স করানো হয়, অথবা দক্ষভাবে গৃহপরিচালনা সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়, তবে তা তাদের জন্য যেমন মঙ্গলজনক হবে, তেমনি আমাদের সমতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক কাঠামোও সুনিশ্চিত হবে।

অভিবাসীদের জন্য বৈশ্বিক মহামারি সৃষ্ট চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য সরকার কয়েক ধাপে নগদ সহায়তাসহ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করলেও এর মাত্র পাঁচ শতাংশ প্রবাস ফেরত শ্রমিকরা কাজে লাগিয়েছেন। প্রবাসীদের সহায়তার প্রক্রিয়া ও ব্যবস্থাপনায় সুফল পেতে তাই নীতিনির্ধারকদের নতুন করে চিন্তাভাবনা করা জরুরি।  আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ তৈরির ব্যাপারে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কাকে উদাহরণ বিবেচনা করা যেতে পারে। এসব দেশ, বিদেশ ফেরত শ্রমিকদের নগদ আর্থিক সহায়তা প্রদানসহ তাদের দক্ষ করে তুলতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রদানের উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারি বিভিন্ন উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে এগিয়ে আসতে পারে।

করোনাকালীন ও পরবর্তী দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে প্রশিক্ষিত দক্ষ জনবলের বিকল্প নেই। তাই, দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টি ও নতুন সম্ভাবনাময় বাজার অনুসন্ধান একসঙ্গে দুটোই চালিয়ে যেতে হবে। আর এটা করা সম্ভব হবে বহুমুখী অংশীদারিত্বের মাধ্যমেই।

লেখক: সিনিয়র সচিব, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, ‎গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সর্বশেষ

ওমিক্রন সংক্রমিত দেশ থেকে আপাতত না ফেরার আহ্বান

ওমিক্রন সংক্রমিত দেশ থেকে আপাতত না ফেরার আহ্বান

কর্মকর্তা-কর্মচারির বিভিন্ন পদে জনবল নেবে নোবিপ্রবি

কর্মকর্তা-কর্মচারির বিভিন্ন পদে জনবল নেবে নোবিপ্রবি

আমারি ঢাকায় বড়দিনের আয়োজন

আমারি ঢাকায় বড়দিনের আয়োজন

রামপুরায় ছাত্র নিহতের ঘটনাটি নিছক দুর্ঘটনা নয়: ওবায়দুল কাদের

রামপুরায় ছাত্র নিহতের ঘটনাটি নিছক দুর্ঘটনা নয়: ওবায়দুল কাদের

ট্রলারের ধাক্কায় ট্রলার ডুবি, চালকের লাশ উদ্ধার

ট্রলারের ধাক্কায় ট্রলার ডুবি, চালকের লাশ উদ্ধার

ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে মাদ্রাসা শিক্ষক গ্রেফতার

ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে মাদ্রাসা শিক্ষক গ্রেফতার

মোস্তাফিজের মতো দলহীন হয়ে থাকলেন রশিদ খান

মোস্তাফিজের মতো দলহীন হয়ে থাকলেন রশিদ খান

নথি জালিয়াতির ঘটনায় রিটকারীর বিরুদ্ধে মামলা করার নির্দেশ

নথি জালিয়াতির ঘটনায় রিটকারীর বিরুদ্ধে মামলা করার নির্দেশ

তদন্ত একতরফা: আদালতে পরীমণির অভিযোগ

তদন্ত একতরফা: আদালতে পরীমণির অভিযোগ

যুক্তরাজ্যে ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্তের সংখ্যা ২২

যুক্তরাজ্যে ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্তের সংখ্যা ২২

শতাধিক তারকা নিয়ে ১৬ দিনের মহোৎসব, উন্মুক্ত সবার জন্য

শতাধিক তারকা নিয়ে ১৬ দিনের মহোৎসব, উন্মুক্ত সবার জন্য

আজ থেকে গণপরিবহনে হাফ ভাড়া কার্যকর

আজ থেকে গণপরিবহনে হাফ ভাড়া কার্যকর

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

© 2021 Bangla Tribune