X
সোমবার, ০২ আগস্ট ২০২১, ১৮ শ্রাবণ ১৪২৮

সেকশনস

ঝুঁকির কাছে ফেরা

আপডেট : ০৮ মে ২০২১, ১৫:৩৩

তুষার আবদুল্লাহ ছোটবেলায় পড়া হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা গল্পের অলঙ্করণের কথা মনে পড়ছে। বাঁশির সুর শুনে জানালা দরজা, ঘুলঘুলি দিয়ে ইঁদুর পথে লাফিয়ে পড়ছে। বাঁশিওয়ালার পিছু তাদের নিতেই হবে। জ্ঞানে-অজ্ঞানে ছুটছে তারা। যেমন, এখন ছুটছি আমরা। বাসা থেকে অফিস আসার পথটি অসাধারণ। পথে উঁচু-নিচু উভয় তলার মানুষের বসতি এবং তাঁদের বিপনী-বিতান চোখে পড়ে। আসতে আসতে উভয় ক্ষেত্রেই দেখলাম মানুষ ইঁদুরের মতোই লাফিয়ে পথে নামছে। দোকানে দোকানে মানুষের জায়গা হচ্ছে না। ফুটপাতের রিকশা ভ্যান ঘিরে যেমন মানুষ, তেমনি অভিজাত বিপনী-বিতানেও। লকডাউনের ভেতরে যানজটের দৃশ্য ও অভিজ্ঞতা কম বেশি সবার হয়েছে। শুধু প্রধান সড়ক নয় গাড়ির ভিড় অলি-গলিতেও। তারপর সরকার লকডাউনের সঙ্গে কিছু শর্ত জুড়ে দিল। ঈদের ছুটি তিনদিনের বেশি হবে না। কর্মকর্তা কর্মচারিদের নিজ নিজ কর্ম এলাকায় থাকতে হবে। কিন্তু সেই কথা শুনলো কে? ফেরিঘাটে ফেরি বন্ধ করতে বাধ্য হলো কর্তৃপক্ষ। রাতের আঁধারে বাস চলাচল বন্ধ হয়নি। দিনে-দুপুরেও মানুষ বিভিন্ন পরিবহনে কৌশলে ঢাকা ছাড়ছে। আবার ঢাকার দিকেও ছুটে আসছে এক শ্রেণির মানুষ। বন্ধ হয়নি এক জেলা থেকে অন্য জেলায় যাতায়াত। সরকার লকডাউন দিয়ে করোনা আক্রান্তের হার কমিয়ে এনেছে। মৃতের সংখ্যাও কমতির দিকে। কিন্তু এই ঈদ উৎসবকে ঘিরে যে বাঁধনহারা ছুটোছুটি, সেখানে করোনার বিস্তারের ঝুঁকি রয়ে যাচ্ছে। ভারতের করোনার ভয়াবহতা বিস্তৃত হয়েছে নেপালে। শঙ্কার কারণ আছে বাংলাদেশেও। কিন্তু আমরা সমাজের কোনও শ্রেণিই করোনার আতঙ্ককে পাত্তা দিচ্ছি না। যে পরিবারে করোনো হয়েছে, বিশেষ করে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে বা মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেছেন যারা। তারাই শুধু আতঙ্কগ্রস্থ। বাকিরা উৎসব হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে বিচলিত।

দৌড় ঝাঁপের এই কাণ্ড জেলা-উপজেলা-ইউনিয়নেও ঘটছে। দোকান খুলে দেওয়ার পর থেকেই দেখা গেছে, জীবন-যাপনের প্রয়োজনীয় পণ্যের দোকানের চেয়ে বিলাসী পণ্যের দোকানেই ভিড় ছিল বেশি। এমন পরিস্থিতি এক মাসে দাঁড়ায়নি যে পোশাক ফুরিয়ে গেছে কোনও পরিবারের। কিন্তু পোশাকের দোকানে, ইলেকট্রনিক্স বা সৌখিন পণ্যের দোকানে বিপনী বিতান খুলে দেওয়া মাত্র মানুষ ভিড় করেছে। ঈদ যতো এগিয়ে এসেছে ভিড়ের মাত্রা সব জায়গাতেই বেড়ে গেছে। এই ভিড় যে শুধু সরকারি বারণ দিয়ে আটকানো যাবে এমন নয়। কারণ দেশের কোনও পেশা বা বাণিজ্যিক সেক্টরের অবকাঠামো এমনভাবে তৈরি হয়নি যে, সকল পেশা বা দিনমজুর, ভাসমান শ্রেণির মানুষের তথ্য-উপাত্ত সরকারের কাছে আছে। সরকারের কাছে তো নয়ই, কোনও শ্রমিক সংগঠনের কাছেও নেই। দোকান মালিকদের তথ্য থাকতে পারে দোকান মালিক সমিতির কাছে। কিন্তু লাখ লাখ দোকান কর্মচারির তথ্য তাদের কাছে নেই। ভাসমান হকারদের তথ্য নেই। আরো কত বিচিত্র পেশার মানুষ আছে, তাদের সম্পর্কে কোথাও কোনও তথ্য সংরক্ষিত নেই। ফলে সরকারের সামর্থ থাকলেই তাদের কাছে কোনও অনুদান পৌঁছে দেওয়া সম্ভব নয়। বেসরকারি উদ্যোগের পক্ষেও সম্ভব হবে না। এই মানুষগুলো শহরে বা রুজির জায়গায় থাকলে, তাদের জীবন যাত্রার যে খরচ তার জোগান না থাকলে, তাকে গ্রামে ফিরতে হচ্ছে। সেখানে পরিবারের সঙ্গে কোনোভাবে হয়তো বেঁচে থাকার উপায় খুঁজে নেওয়ার সুযোগ থাকে। স্থানীয় ভাবে তার আর্থিক সহায়তা পাওয়ারও সম্ভাবনা রয়ে যায়। ফলে শুধু যে ঈদ উৎসবেই মানুষ ঘরমুখো হয়েছে তেমন নয়। জীবন বাঁচাতেও শহর ছাড়তে চাইছেন অনেকে। হয়তো সরকার আগে থেকে ফেরী বন্ধ রাখলে, মহাসড়কে টহল কঠোর করলে, জনস্রোত কমানো যেতো। নিরুপায় মানুষ রুজির শহরেই রয়ে যেতো।

কিন্তু মানুষের এই তাগিদ, অসহায়ত্বকে আমরা লকডাউন পরিকল্পনায় আনিনি। মার্কেট বন্ধ করে দেওয়ার পর খোলা হয়েছে ব্যসায়ীদের চাপে, গণপরিবহন চালুও হয়েছে শ্রমিক-মালিকদের চাপে। বন্ধ ও খোলা কোন সমন্বিত চিন্তার মধ্য দিয়ে হয়নি। ভাবা হয়নি, সত্যিই কি রাজধানীর সামর্থ আছে, সকলকে ধরে রাখার, এমন কর্মহীন সময়ে? যদি না থাকে তাহলে তাদের সমন্বিত চিন্তা ও পরিকল্পনার মাধ্যমে শহর ছাড়ার বিষয়টি ভাবা যেত। বিপনী বিতান খোলার সিদ্ধান্ত না নিলে অনেকে আপাতত শহরে ফিরে আসতোও না। বলা যেত শহর ছেড়ে চলে গেছে এমন কর্মচারি না ডেকে, অল্প আয়োজনে বিপনী বিতান খোলার। জীবিকার প্রয়োজন আছে। অর্থনীতির চাকা সচলও রাখতে হবে। কিন্তু জীবিকা জীবনের জন্যই। জীবন বিপন্ন হলে জীবিকার অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। সুতরাং এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় করতে বারবার অসফল হচ্ছি বলেই, করোনা বা আতঙ্গের ঢেউ আমাদের বিধ্বস্ত করছে। করোনাকাল দীর্ঘ হবে। তাই সময় আছে , এখনও  জীবন-জীবিকার সরল গণিত মিলিয়ে নেওয়ার। শুধু ভ্যাকসিনে করোনাকাল পাড়ি দেওয়া যাবে না। পরিকল্পনা মতো পা ফেলতে হবে সামনে।

লেখক: গণমাধ্যম কর্মী

/এসএএস/

সম্পর্কিত

আইপি টিভি যন্ত্রণা!

আইপি টিভি যন্ত্রণা!

‘ফকির’ করে চলে গেলেন…

‘ফকির’ করে চলে গেলেন…

ঘুষি লাগলো কি গণতন্ত্রের বুকে?

ঘুষি লাগলো কি গণতন্ত্রের বুকে?

মৃত্যু কিনি ঘামের দামে

মৃত্যু কিনি ঘামের দামে

লকডাউনের শিথিলতা মহাবিপদের পূর্বাভাস

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০২১, ১৭:৪০
সালেক উদ্দিন ‘শিথিল হয়ে আসছে কঠোর লকডাউন’ খবরের কাগজের এমন শিরোনামকে ভয়ংকরই বলতে হবে। শুধু খবরের কাগজে, অনলাইন পোর্টালের নিউজে বলবো কেন? চোখ মেলে যা দেখছি তাতে এমনই মনে হচ্ছে। প্রতিদিনই  রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে যানবাহন বেড়ে চলছে, চেকপোস্টে গাড়ির জট বাড়ছে, পদ্মার দুই নৌ-রুটে, ফেরিঘাটে মানুষের লাইন প্রতিদিনই দীর্ঘ হচ্ছে। ঢাকার রাস্তা তো এখন প্রাইভেট কার, রিকশা, অটোরিকশা, বাইসাইকেল, মোটরসাইকেলের দখলে। রাস্তায় রাস্তায় হাজার হাজার রিকশা আর  মানুষের অবাধ চলাচল ইত্যাদি কি আর এই খবরের সত্যতা যাচাইয়ের অপেক্ষা রাখে?

ঈদের একদিন পর অর্থাৎ ২৩ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত দেশব্যাপী কঠোর লকডাউন চলছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলছেন, লকডাউন কঠোর থেকে কঠোরতর হবে।

শুরুতে দুই তিন দিন মনে হয়েছিল বোধহয় সত্যিই তাই। এখন আর সে রকম মনে হয় না। টেলিভিশনের খবর, সংবাদপত্রের খবর, রাস্তায় চোখ মেলে দেখা- যেভাবেই দেখুন না কেন এই লকডাউনও আগের লকডাউনের মতোই একই পথে হাঁটছে, যা জাতির জন্য মহাবিপর্যয়ের অশনি সংকেত।

বাংলাদেশের তো বটেই, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিপর্যয় এখন করোনার মহামারি। পৃথিবীকে স্বস্তি দিচ্ছে না এই ব্যাধি। বাংলাদেশে এখন প্রতিদিনই সংক্রমণের রেকর্ড ভাঙছে। রেকর্ড ভাঙছে মৃত্যুর। এর ফলাফল কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে কেউ জানে না। তবে কিছুটা আন্দাজ করা যেতে পারে। আর সেই আন্দাজের আলোকেই এই ঈদের আগেই বাংলা ট্রিবিউনেই ‘এবার ঈদযাত্রা বন্ধ হোক’ শিরোনামে লিখেছিলাম- ‘যদি গত রোজার ঈদের মতো কোরবানির ঈদেও লাখ লাখ মানুষ ঢাকাসহ শহর অঞ্চল থেকে গ্রামে, গ্রাম থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঈদযাত্রায় অংশ নেয় তবে তা হবে করোনার কাছে আত্মাহুতি দেওয়ার শামিল। রোজার ঈদের সময় দেশে করোনা অবস্থা নিয়ন্ত্রণে ছিল। এবার রয়েছে নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায়। এমন কঠিন অবস্থায়ও যদি এবারের ঈদযাত্রার  মানুষদের ঠেকানো না যায় তবে বলতেই হবে করোনার কাছে আত্মসমর্পণ করা ছাড়া দেশের মানুষের আর কোনও উপায় নেই।’

আমার সেই লেখাটি পাঠকদের কাছে সমালোচিত হয়েছিল। অনেক পাঠকই তাদের মতামতে নিন্দার তীরটি নিক্ষেপ করতে ভুল করেননি। কেউ কেউ আমি মুসলমান কিনা তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। সম্ভবত তারা শুধু ঈদে বাড়ি যাওয়ার কথাই ভেবেছেন। একবারও ভাবেননি মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মানুষকে মহামারি আক্রান্ত এলাকায় প্রবেশ করতে বারণ করেছেন এবং আক্রান্ত এলাকা থেকে বের না হওয়ার কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। যার ফলে ধর্মযুদ্ধে গিয়ে হজরত ওমর (রা.) যখন জানলেন সেই এলাকায় মহামারি চলছে, তখন তিনি সৈন্যবাহিনী নিয়ে আর মহামারি আক্রান্ত যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করেননি। যুদ্ধ না করে ফিরে এসেছিলেন।

সময় এসেছে ভেবে দেখার- আমরা ধর্মের নির্দেশনা মানছি কিনা?

যাহোক, তারপরও  ঈদের কারণে সরকারকে লকডাউন শিথিলের নামে মূলত লকডাউন তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা নিতে হয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে ঈদের একদিন পর থেকে ১৪ দিনের কঠোর  লকডাউনের ঘোষিতও হয়েছে। এই ঘোষণায় কিছুটা হলেও আশ্বস্ত হয়েছিলাম।

আশ্বস্ত হয়ে আরেকটি অনলাইন পোর্টালে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের দিল্লির লকডাউনের উদাহরণ টেনে লিখেছিলাম, সর্বশেষ ঘোষিত এই লকডাউন যদি দিল্লির মতো সত্যিই কঠোর থেকে কঠোরতর হয় এবং টিকার সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা যায় তবে দেশ করোনা মহামারির মহাবিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচতে পারে। আর তা না হলে করোনায় দৈনিক সংক্রমণের সংখ্যা ১২/১৩ হাজার থেকে ৫০ হাজার  ছড়ানো এবং মৃত্যু দুই শতকের ঘর থেকে হাজারের ঘর পার হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। করোনার ক্রমবর্ধমান সংক্রমণ ও মৃত্যুর বিচারে মনে হচ্ছে পরিস্থিতি সে পথেই যাচ্ছে।
 
সবাইকে মাঠ পর্যায়ে করোনার টিকা দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ, টিকা কার্যক্রমে নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ত হওয়ার নির্দেশ, ৭ আগস্ট থেকে ইউনিয়ন পর্যায়ে টিকাদান কেন্দ্রে এনআইডি কার্ড নিয়ে গেলেই টিকা দেওয়ার ঘোষণা, আগস্টের আগে শিল্প কারখানা না খোলার সিদ্ধান্ত সঠিকভাবে পালিত হলে করোনা দৌড়ের গতি কিছুটা হলেও কমবে। কিন্তু লকডাউন বর্তমানে যেভাবে চলছে যদি সেভাবে চলে অথবা আরও শিথিল হয়, তবে এতে খুব একটা কাজ হবে বলে মনে হয় না।

লকডাউন কঠোর থেকে কঠোরতর হওয়ার  প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হবে। লকডাউনে মানুষ যদি ঘর থেকে বের হতে না পারে তাহলে মানুষের কষ্ট হবে ঠিকই, কিন্তু খাদ্যাভাবে মারা যাওয়ার কথা যারা বলছেন তাদের কথা ঠিক নয়। এরও বিকল্প আছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নেতৃত্বে আগ্রহী সাধারণ মানুষদের নিয়ে পাড়ায়-মহল্লায় গ্রামগঞ্জে স্বেচ্ছাসেবক  দল গঠন করা যেতে পারে। এদের দ্বারা খাদ্য চিকিৎসাসহ সরকারি বেসরকারি খাতের সহায়তা সামগ্রী সংকটে পড়া মানুষদের দুয়ারে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। শুধু নিম্নবিত্ত নয়, মধ্যবিত্তকেও এর আওতায় আনতে হবে। মধ্যবিত্ত এমন একটি শ্রেণি, তারা কষ্টের কথা না বলতে পারে, না সইতে পারে!

প্রকৃতপক্ষে এদের একটা বিরাট অংশ বিপর্যয়ের মধ্যে রয়েছে। বিষয়টি আমাদের মাথায় থাকতে হবে।

করোনার সঙ্গে যুদ্ধে সবার আগে প্রয়োজন শতভাগ জনসচেতনতা। এ ব্যাপারে অন্তহীন প্রচেষ্টা আমরা দেখেছি। কাজ হয়নি। এখন সেই পদক্ষেপ নেওয়া দরকার যাতে কাজ হয়। বৃহত্তর স্বার্থের জন্য ক্ষুদ্রতর স্বার্থকে ত্যাগ করার কথা গুণীজনেরা বহুবার বলেছেন। করোনার রশি টেনে ধরা জাতির জন্য বৃহত্তর স্বার্থ। এতে যদি কিছু দিন মানুষকে ঘরে বসে কাটাতে হয়, খাদ্যাভাবের কষ্ট করতে হয়, তবে এই ত্যাগটুকু করতেই  হবে।

করোনা নিয়ন্ত্রণের উপায়গুলোর মধ্যে অন্যতম হলো টিকা প্রদান এবং জীবনযাত্রায় নিয়মতান্ত্রিকতা নিশ্চিত করা। এরইমধ্যে টিকার সহজলভ্যতার নিশ্চয়তা সরকার দিয়েছে। এবার নিশ্চিত করতে হবে জীবনযাত্রার নিয়মতান্ত্রিকতা। এর জন্য এই মুহূর্তে অন্তত লকডাউনের সময়টুকুতে মানুষকে ঘরে রাখার বিকল্প নেই। তারপরও মানুষ যদি ঘরে না থাকে তবে জোর প্রয়োগসহ সরকারের যা যা করা দরকার তাই করতে হবে। যতটা কঠোর হওয়া দরকার অবশ্যই ততটা হতে হবে। জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে এ নিয়ে কে কী বললো তা নিয়ে ভাবা সরকারের উচিত হবে না।

করোনা যুদ্ধে জয়ী হওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় হোক আমাদের সবার।

লেখক: কথাসাহিত্যিক
 
/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

ঈদ আনন্দে ভেসে যাক করোনার মহামারি

ঈদ আনন্দে ভেসে যাক করোনার মহামারি

ঈদযাত্রা এবারের জন্য বন্ধ হোক

ঈদযাত্রা এবারের জন্য বন্ধ হোক

দৃষ্টি এখন কঠোর লকডাউনের ওপর

দৃষ্টি এখন কঠোর লকডাউনের ওপর

বাবাদের যেন বৃদ্ধাশ্রমে যেতে না হয়

বাবাদের যেন বৃদ্ধাশ্রমে যেতে না হয়

চীনের বন্ধুত্ব, নাকি আধিপত্য

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০২১, ২০:৩৮

ফারাজী আজমল হোসেন 'পাওয়ার পলিটিকসের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। চীন কখনোই আধিপত্যকামী হবে না। প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালাবে না'- কথাগুলো শুনলে যে কারও মনে হতে পারে, বিশ্বের সবচাইতে বড় গণতন্ত্র মনস্ক ব্যক্তি এই মন্তব্যগুলো করেছেন। কিন্তু আসলে এই মন্তব্য চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের। চায়না কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) ১০০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে এসব মন্তব্য করেন তিনি। তাইওয়ানের আকাশ সীমানায় বিমান পাঠিয়ে ও সমুদ্র সীমায় যুদ্ধ জাহাজ পাঠালেও বিষয়টিকে সম্ভবত 'আধিপত্যবাদী' আচরণ হিসেবে দেখছে না চীন। একই চিত্র হংকংয়ে। সম্প্রতি চীনের বন্ধুত্বের কল্যাণে বন্ধ হয়ে গেছে হংকংয়ের গণতন্ত্রপন্থী পত্রিকা অ্যাপল ডেইলি।

চীন সমুদ্র সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি লঙ্ঘন করে দক্ষিণ চীন সাগর এবং সেখানকার কয়েকটি দ্বীপ দখলের চেষ্টা করছে। সেখানে ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, ব্রুনাইয়ের মতো দেশগুলোর আইনগত অধিকার থাকা সত্ত্বেও চীন ওই অঞ্চলকে তার একক বলেই দাবি করছে। যার জন্য বর্তমানে ওই অঞ্চলের প্রায় ২০টি দেশের সঙ্গে তার যুদ্ধাবস্থা বিরাজমান। এ ছাড়াও ইন্দো প্যাসিফিক, এমনকি বঙ্গোপসাগরেও আধিপত্য বিস্তার করাকে লক্ষ্যের মধ্যে রেখেছে চীন। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তারা মিয়ানমার থেকে পাকিস্তান ও থাইল্যান্ড থেকে শ্রীলঙ্কা পর্যন্ত তাদের নৌ-শক্তির আওতায় আনার উদ্দেশ্য নিয়েই অগ্রসর হচ্ছে। এই লক্ষ্যে ওখানকার পোর্টগুলোকে নেভাল বেইজে রূপান্তরিত করার যাবতীয় কাঠামোও তৈরি করে ফেলেছে চীন।

আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সাগর ও সাগরতলের সম্পদ সব দেশের সম্পদ হওয়ায় বিশ্বের বেশিরভাগ দেশই নৌ-শক্তিতে সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যাওয়া চীনের আগ্রাসী ভূমিকার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। চীনের এই আগ্রাসন মোকাবিলা করার জন্য অস্ট্রেলিয়া, ভারত, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত জোট কোয়াড সক্রিয় হয়ে উঠেছে। জোট হিসেবে কোয়াডের উত্থানকে তাই চীন নিজের জন্য হুমকি মনে করছে। অন্যদিকে সমগ্র বিশ্বের ধারণা হচ্ছে, দক্ষিণ চীন সাগরে চীন যে আচরণ করছে, নৌশক্তি আরও বাড়িয়ে ইন্দো প্যাসিফিকে এসেও ঠিক একই আচরণ করবে। চীনের এই নৌপথ দখল ও সামরিক আধিপত্য ঠেকাতে একমাত্র কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে চার শক্তির সামরিক জোট কোয়াড।

ভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে গঠিত কোয়াড্রিলেটরাল সিকিউরিটি ডায়লগ (কোয়াড)-এর সঙ্গে বাংলাদেশের কোনও সম্পর্ক না থাকলেও বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি অধিকার-বহির্ভূত কথা বলেছেন এ দেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত লি জিমিং।

বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয় চীনকে। এ বিষয়ে কথা বলার কোনও এখতিয়ার চীনের নেই বলেও জানানো হয়। কিন্তু চীনের পররাষ্ট্র বিভাগ জানায়, কোয়াড চীনকে বাদ দিয়ে গঠন করায় এই বিষয়ে যেকোনও মন্তব্য করার অধিকার চীনের রয়েছে (!)। বেশ অদ্ভুত এক যুক্তি!

চীনের এমন বন্ধুত্ব অবশ্য বিশ্বজুড়ে রয়েছে। আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী নেপাল, ভুটান, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও মিয়ানমার চীনের বন্ধুত্বের প্রত্যক্ষ সাক্ষী। সম্প্রতি এই বন্ধুত্বের উষ্ণতা কিছুটা অনুভব করা শুরু করেছে আফগানিস্তান।

চীন পাওয়ার পলিটিকসের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চায় শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বে। সে ক্ষেত্রে চীনের অভ্যন্তরে গড়ে ওঠা 'সুপার পাওয়ার পলিটিকস' কে ঘোচাবে? বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবে কে?

পাকিস্তানের জঙ্গিবাদী চেতনা ও আচরণ নিয়ে কখনই কোনও মন্তব্য করেনি চীন। সেই সঙ্গে চীনে উইঘুর মুসলিমদের ওপর চলমান নির্যাতন নিয়েও কখনও পাকিস্তান বিরূপ মন্তব্য করেনি। ইমরান খানের শাসনামলে পাকিস্তানের একমাত্র বন্ধু চীন। শি জিনপিং সরকারের কাছে ইমরান খানদের মোট ঋণের পরিমাণ দেশটির বার্ষিক বাজেটের প্রায় ৩ গুণ। চরম অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে থাকা পাকিস্তানে নতুন কোনও বিনিয়োগ করছে না যুক্তরাষ্ট্র। যার শতভাগ সুযোগ নিয়েছে চীন। দেশটির ঋণের বোঝার নিচে চাপা পড়ে মুসলিম নির্যাতন থেকে শুরু করে পাকিস্তানের অভ্যন্তরের বিভিন্ন বিষয়ে চীনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নগ্ন হস্তক্ষেপ নিয়েও কথা বলতে পারছেন না ইমরান খান।

একই চিত্র শ্রীলঙ্কায়। ঋণের বোঝার নিচে চাপা পড়ে শ্রীলঙ্কা তার একটি সমুদ্রবন্দর দীর্ঘ মেয়াদে চীনকে অনেকটা 'বন্ধক' দিতে বাধ্য হয়েছে, যা নিয়ে ভারতের সঙ্গেও সম্পর্কের টানাপড়েন চলছে দেশটির। মালদ্বীপের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে একসময় চীনের নগ্ন হস্তক্ষেপের ফলে ডলারের বদলে সরাসরি চীনের মুদ্রায় বাণিজ্য চলে কিছু দিন। নেপালের সীমান্তে অবস্থিত একটি গ্রাম দখল করে নিয়েছে চীন। গত বছরজুড়ে থেমে থেমে ভারতের সীমান্তেও সংঘর্ষ চালিয়ে গেছে চীন। এসব আচরণকেও হয়তো শি জিনপিং 'আধিপত্যবাদী' আচরণ হিসেবে দেখছেন না।

তবে অর্থনৈতিক এসব আধিপত্যবাদের থেকেও বড় একটি বিষয় এখন কপালে ভাঁজ ফেলছে বিশ্বনেতাদের। বিশ্বের ১৬০টি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নাক গলাতে যাচ্ছে চীন। ওই সব দেশে ক্ষমতায় থাকা সরকারের 'পাওয়ার পলিটিকস' হয়তো সহ্য করবে না চীন। আর এ কারণেই বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে সরকারি দলকে পাশ কাটিয়ে ছোট, মাঝারি অন্য দলগুলোর সঙ্গে বেশি যোগাযোগ রাখছে সিপিসি।

দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষেত্রে আরেকটি বড় শঙ্কার বিষয় আফগানিস্তান। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটি থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো। এই সুযোগে আবারও দেশটির ক্ষমতা দখলে নিতে চাইছে তালেবান। যেখানে দেশটিতে তালেবানের হাতে ক্ষমতা না দিয়ে শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে বিশ্ব, তখন জঙ্গিবাদী তালেবানদের সহায়তায় পাশে দাঁড়াচ্ছে চীন! পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মতো দুটি দেশে জঙ্গিদের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে ঘাঁটি তৈরি হলে বিষয়টি শুধু দক্ষিণ এশিয়া নয়, বরং বিশ্বের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। প্রশ্ন হলো, কোন সৎ (!) উদ্দেশ্যে চীন তালেবানের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করছে। দক্ষিণ এশিয়ায় বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হলে সেই সুযোগ সবচাইতে বেশি ভোগ করবে কোন দেশ?

তালেবানের পুনরুত্থান আফগানিস্তানকে আবার বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসছে। পরাশক্তিগুলোর নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। ভারত, চীন, রাশিয়াসহ কয়েকটি শক্তিশালী দেশকে নতুন করে হিসাব-নিকাশ কষতে হচ্ছে। দুই দশক পর আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইতোমধ্যে দেশটির নিজেদের প্রধান বিমান ঘাঁটি থেকে সেনা সরিয়ে নিয়েছে তারা। এরপরই আফগানিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলের দখল নেওয়া শুরু করেছে কট্টর ধর্মীয় গোষ্ঠী তালেবান। দেশটিতে তালেবান ক্ষমতায় এলে সংকটে পড়তে পারে কিছু দেশের স্বার্থ। তালেবানের ক্ষমতা দখলের সম্ভাবনা যত বাড়ছে, গোষ্ঠীটির সঙ্গে নানা দরকষাকষি ও বোঝাপড়া করে নিতে চাইছে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলো।

আফগানিস্তানের প্রধান কয়েকটি শহর দখলের পর বুধবার প্রথমবারের মতো তালেবানের কোনও শীর্ষ নেতা হিসেবে চীন সফর করেছেন দলটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা আবদুল ঘানি বারাদার।

দেশটির উত্তরাঞ্চলের শহর তিয়ানজিনে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই’র সঙ্গে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে ঘানি বারাদারের নেতৃত্বে নয় সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল অংশ নেন। এ সময় ওয়াং ই বলেন, ‘তালেবান আফগানিস্তানের প্রধান রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তি। দেশের শান্তি, সংহতি ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়াতেও গোষ্ঠীটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’ আফগানিস্তানের সঙ্গে প্রতিবেশী চীনের প্রায় ৮০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। ওয়াখান করিডর নামে ওই অঞ্চলটি পড়েছে চীনের উইঘুর মুসলমান অধ্যুষিত শিনজিয়াং প্রদেশের সঙ্গে। অভিযোগ রয়েছে, উইঘুরদের বিভিন্ন ক্যাম্পে আটকে রেখে নিপীড়ন চালাচ্ছে চীন। এর পরিপ্রেক্ষিতে শিনজিয়াংয়ের স্বাধীনতার দাবিতে সশস্ত্র লড়াই চালিয়ে আসছে ইস্ট তুর্কিস্তান ইসলামিক মুভমেন্ট (ইটিআইএম)।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংক ট্যাংক র‍্যান্ড করপোরেশনের বিশ্লেষক ডেরেক গ্রসম্যান ফরেন পলিসিতে প্রকাশিত এক নিবন্ধে লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র পরবর্তী আফগানিস্তানে আরেকটি কারণে নিজের অবস্থান সংহত করতে চাইছে চীন। সেটি হলো দেশটির পার্বত্যাঞ্চলে মাটির নিচে থাকা ট্রিলিয়ন ডলারের খনিজ সম্পদ। চীন এই খনিজ সম্পদ উত্তোলন করতে চায়। এ ছাড়া আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল থেকে পাকিস্তানের পেশওয়ার শহর পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত রয়েছে চীন। এটি চীন ও পাকিস্তানকে যুক্ত করবে। এর ফলে চীনের উচ্চাভিলাষী প্রকল্প ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ উদ্যোগের সঙ্গেও যুক্ত হবে কাবুল।

আফগানিস্তানে তালেবানদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে ভারতকেও এক হাত দেখে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে চীনের। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা দেশগুলো যখন আফগানিস্তানে তালেবানদের ক্ষমতা দখলের বিষয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করছে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন করলে 'তালেবানদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে না' এমন বার্তা দিচ্ছে, তখন বিনা বাক্যব্যয়ে তালেবানদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করছে চীন। কারণ একটাই। আফগানিস্তান থেকে যেন উইঘুর ও ইস্ট তুর্কেমিনিস্তানের নির্যাতিত মানুষগুলো কোনও সহায়তা না পায়। সেই সঙ্গে তালেবানদের সহায়তায় চীনের কথা না মানা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে যেন অস্থিরতা সৃষ্টি করা যায়, সেই পরিকল্পনায় হয়তো করছেন শি জিনপিং।

ইতোমধ্যে চীনের পাওয়ার হাইড্রো প্রজেক্টগুলোর কারণে পানি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বাংলাদেশ ও ভারত। সামনে কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের নামে বাংলাদেশ ও ভারতের ওপর আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে চীন। সমুদ্রসীমা, আকাশসীমা এবং প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের আন্তর্জাতিক সব নিয়ম অমান্য করে বারবার নিজ আগ্রাসনের বার্তা দিচ্ছে চীন। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর পাশাপাশি এই আগ্রাসন বিস্তৃত আফ্রিকার অনুন্নত দেশগুলো পর্যন্ত। চীনের আগ্রাসী আচরণকে হুমকি হিসেবে দেখে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করলেও কোনও পরোয়া নেই চীনের। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে হিটলারের নাৎসি বাহিনীর পর সবচাইতে সুসংহত এক যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে চীন। সেই যুদ্ধ মোকাবিলায় কতটুকু প্রস্তুত বিশ্ব?

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

বাঁধের বাধায় বন্দি চীনের ‘বন্ধুত্ব’

বাঁধের বাধায় বন্দি চীনের ‘বন্ধুত্ব’

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য পূরণেও এগিয়ে বাংলাদেশ

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য পূরণেও এগিয়ে বাংলাদেশ

বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উষ্ণ করার চেষ্টায় চীন

বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উষ্ণ করার চেষ্টায় চীন

বাংলাদেশের আছে একজন শেখ হাসিনা

বাংলাদেশের আছে একজন শেখ হাসিনা

করোনার করুণ কাহিনি: যুদ্ধে সরাসরি শরিক ও পরিবারের প্রথম শহীদ

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০২১, ১৬:২৮

মাকসুদুল হক ‘চিন্তা রোগের ওষুধ কোথাও খুঁজে পেলাম না।
চিন্তা যতই করি ততই বাড়ে গো সদাত দেয় যন্ত্রণা।।’
খোদা বকশ শাহ (১৯২৪-১৯৯০)

১. আজকের লেখার পটভূমি: আবারও যুদ্ধে যেতে হবে:

২০২০-এ মহামারি শুরু হলেও করোনা রোগের বিরুদ্ধে সম্মুখ লড়াই করার সুযোগ হয়নি। তবে এ বছর অনেক কাছের মানুষ– যেমন, আমার ব্যান্ড-এর এক তুখড় সদস্য ও তার স্ত্রী ২১ দিন কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে হাসপাতাল বন্দি, আরেক বন্ধু যিনি আমার বাংলা লেখার শব্দ বিভ্রাট রোগ ডিস্লেক্সিয়া’র কথা জেনে স্বেচ্ছায় ও নিঃস্বার্থে ভুল শুধরে দেন, তার এক মাসের ঊর্ধ্বে অসুস্থতা ও কোয়ারেন্টিন, আরেক ব্যান্ড সংগীতের কিংবদন্তি বন্ধুর স্ত্রীর কোভিড-১৯ আক্রান্ত হলে, আমি প্রতিদিন ফোনে খবর নিয়েছি ঠিকই, কিন্তু সরাসরি কোভিড-১৯ বিরোধী যুদ্ধে কেবল উৎকণ্ঠিত হওয়া ছাড়া এ অবধি কোনও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারিনি।

সবকিছু পাল্টে গেলো ৫ জুলাই ২০২১ সালে। এ বছর যুদ্ধের ময়দানে আমি শরিক।

ভাগ্য আমাকে ‘ফ্রন্টলাইন ফাইটার’-এর ভূমিকায় ঠেলে দিয়েছে। আমি গর্বিত। কারণ, এটাকে কোনোভাবেই  ‘দুর্ভাগ্য’ মনে করি না।

গেলো ৫ জুলাই থেকে ২৭ জুলাই ২০২১– এই টানা ২২ দিনে ৮৩ বছর বয়স্ক আমার শ্বশুর শেখ আলী আহমেদ সাহেবের আকস্মিক অসুস্থতা ও উদ্ভূত পরিস্থিতি খুব কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা অর্জন করলাম।

নড়াইল জেলা শহরের স্বাস্থ্যসেবার দুরবস্থা ও সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার পরিপ্রেক্ষিতে রোগীকে ঢাকাতে মুমূর্ষু অবস্থায় স্থানান্তর ও দিনরাত হাসপাতাল যাওয়া আসা শুরু হলো।

ইয়েলো জোন আইসিইউ, কোভিড নেগেটিভ হয়ে গ্রিন জোন আইসিইউ, এইচডিইউ হতে কেবিন, নিউমোনিয়ার শ্বাসকষ্ট, অক্সিজেন লেভেল ওঠানামা, রক্তের হিমোগ্লোবিন ড্রপ করা, বিবিধ ভুতুড়ে ইনফেকশন, রক্তের আবেদন, রক্ত দান করা বন্ধুদের প্রাণ ছুঁয়ে যাওয়া সহানুভূতি, ডাক্তার বন্ধুদের অকৃত্রিম ভালোবাসা ও উপদেশ। ফের আইসিইউ, ফের কেবিন– এই মহড়া ১৮ দিনে পরপর তিনবার ঘটে গিয়ে ঈদের দিন বিকালে কোভিড-১৯ পজিটিভ।

কোভিড রেড জোনের ভেতরে ও বাইরে ছোটাছুটি, নন ইনট্রুসিভ ভেন্টিলেশন (এনআইভি), অতঃপর– ২৭ জুলাই ২০২১ রাত ১টায় আমার শ্বশুর দেহ ত্যাগ করলেন।

রোগীর স্বাস্থ্যের এই ঘণ্টায় ঘণ্টায় দ্রুত পরিবর্তন, এই ভালো তো এই খারাপ, এই অভিজ্ঞতার এই নির্মম সিকুয়েন্স জীবনে এর আগে আমার কখনও হয়নি।

‘এত কঠোর রেসট্রিকশনে থাকার পর ১৫ দিনে কোভিড নেগেটিভ থেকে কোভিড পজিটিভ হয় কী করে?’

এই প্রশ্নের উত্তরে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার বললেন– ‘আমরা জানি না’!

বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে কোভিড-১৯ রোগ সম্পূর্ণ ‘ভাগ্যের জুয়া খেলা’ এবং বিজ্ঞান আমাদের ১৬  মাসে জনগণের হাজারও প্রশ্নের কোনও সদুত্তর দিতে পারেনি বা পারবে না। যতদিন বিজ্ঞান এই সহজ প্রশ্নের উত্তর দিতে ব্যর্থ ততদিন কে কোভিড ১৯-এ আক্রান্ত বা কে নয়– তা রোগী নিজে ও তার আত্মীয় স্বজনের সুচিন্তিত নির্ধারণের ওপরে নির্ভর করবে। 

এমনকি ডেথ সার্টিফিকেটে ‘কোভিড ১৯-এর কারণে মৃত্যু’– তেমনটা লেখা নেই এবং জেনেছি তা লেখা হয় না। অত্যন্ত কঠিন ইংরেজি ডাক্তারি ভাষায় লেখা– ‘অপরিবর্তনীয় হৃৎপিণ্ড সংক্রান্ত শ্বাসবন্ধ হয়ে মৃত্যু’।

স্পষ্টত করোনাতে মানুষ মরে না, করোনার আতঙ্কে সারা বিশ্বে মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। বিশ্বাসে ধ্বংস বা বিশ্বাসেই মুক্তি। আগে এই কলামে কয়েকবার বলেছি ‘অবিশ্বাসও এক ধরনের বিশ্বাস’।

হাসপাতলে মানুষের অসহায়ত্ব, কেউ মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়লে স্বজনদের চিৎকার ও কান্নাকাটির রোল- দীপ্রচিত্তে সহ্য করা ও নিজের আত্মাকে শক্ত করা ছাড়া কিছুই করার নেই।

সান্ত্বনা দেবার ভাষা আমি হারিয়ে ফেলেছি।

২. করোনা রোগীর উচ্চতর চৈতন্য ও চিন্তার বিস্তীর্ণ ব্যাপ্তি:

গেলো ১৮ জুলাই এই কলামে লিখেছিলাম, এই রোগ একটি ‘ইতিবাচক বনাম নেতিবাচক এনার্জির লড়াই’। কিন্তু যা জানতাম না– অসুস্থ রোগীর ধারে কাছে বা দূরে একটি মানুষও যদি নেগেটিভ চিন্তা বা অপায়া কথা বলে, তা সরাসরি রোগীর স্বাস্থ্যের উন্নতি বা অবনতি ঘটায়। এ যাত্রায় তার শক্ত প্রমাণ পেয়েছি।

অদ্ভুত বিষয় হলো, মুমূর্ষু কোভিড রোগীর অবচেতন চেতনাবোধের ওপরে আরেকটি উচ্চতর চৈতন্য বা ‘সুপার কনশাসনেস’ এসে তাকে নিয়ন্ত্রণ করে, তা চোখের সামনে প্রত্যক্ষ করলাম।

সেই বিস্ময়কর ‘কনশাসনেস’ রোগীকে মুহূর্তের মধ্যে পজিটিভিটি থেকে নেগেটিভিটির দিকে ধাবিত করতে খুব সহজেই পারে–  উল্টো নেগেটিভ থেকে পজিটিভ করতেও পারে।

এমনও দেখলাম রোগী যখন প্রলাপ করে তখন অতীতের কথা যেমন স্পষ্ট মনে করতে পারে, ভবিষ্যতে কী হতে যাচ্ছে তাও আকারে ইঙ্গিতে বলতে পারে।

আমার শ্বশুরের শেষ বাক্যগুলোর অনেক উদাহরণের মাত্র একটি আজ শেয়ার করছি।

যখন উনি কেবিনে তখন ওনাকে সম্পূর্ণ সুস্থ মনে হয়েছে ও স্বাভাবিক কথাবার্তা বলছেন, হঠাৎ বলে বসলেন, ‘এত মানুষ কান্না করছে কেন? তোমরা কাঁদছো কেন?’

ঠিক এক সপ্তাহ পর এই বিখ্যাত শিক্ষক তার হাজারো ছাত্রছাত্রী ও সমগ্র নড়াইলবাসীকে কান্নায় ভাসিয়ে বিদায় নিলেন।

এই প্রলাপ, এই বিলাপ ছিল তার বিদায় নেওয়ার পূর্বাভাস। যা আমরা উপস্থিত কেউ তখনও বুঝে উঠতে পারিনি।

আরও অনেক অপ্রিয় কথা বলে গেছেন, তা সত্য নাকি মিথ্যা হয়, তা বোঝা ও দেখার অপেক্ষায় থাকলাম।

আত্মীয়কুলে সবাইকে শান্ত এবং ইতিবাচক রাখা এই মুহূর্তে আমার সবচাইতে বড় চ্যালেঞ্জ।

কেউ অধৈর্য বা মৃত্যু অতঙ্কে পড়ে গেলেই আরও বিপদ ঘনিয়ে আসতে বাধ্য।

৩. করোনায় করণীয়: সম্ভাব্য প্রতিকারের ব্যবস্থা:

করোনা যেহেতু বায়ুবাহিত রোগ না, তাই একে প্রতিরোধ করতে মাস্ক ব্যবহার আদৌ কোনও কাজ করে কিনা, তা বলা এই মুহূর্ত অসম্ভব। দেখা গেছে মাস্ক পরিধান করার পরেও কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়েছেন এমন মানুষের সংখ্যাও কিন্তু কম না।

আমাদের প্রাথমিক ধারণা দেওয়া হয়েছিল এ রোগ হাঁচি দ্বারা ছড়ায়। অর্থাৎ যে হাঁচি দিলে সনাতন বলে, ‘শিব শিব জীবো জীবো’, খ্রিষ্টান বলে ‘গড ব্লেস ইউ’ আর মুসলমান বলে ‘আলহামদুলিল্লাহ’।

সারা জীবন জেনে এসেছি এক হাঁচিতে দেহ থেকে হাজারো রোগব্যাধি বিতাড়িত হয়। অথচ এখন হাঁচি হয়ে গেছে  ‘কোভিড কোভিড  করোনা করোনা’? এ কোনও রসিকতা ভাই?

হাঁচি দেওয়ার সময় মুখে হাত চেপে রাখতে হয়– এ কেবল অভদ্র মূর্খগণ বাদে সবাই জানে। কাউকে তা আলাদা করে শিক্ষা দিতে হয় না।

তাই ক’টা হাঁচি দেওয়ার কারণে যদি ঢাকা শহরে সবাই কোভিড-১৯ টেস্ট নেয়- একটা বিষয় অবধারিত যে ৮৫ থেকে ৯০ ভাগ মানুষের ‘পজিটিভ’ রেজাল্ট আসবে।

তখন ‘আমরা কি করোনা আক্রান্ত’ এই আতঙ্কে হাসপাতালের দিকে ছুটবো?

১৮ জুলাই ২০২১-এর এই কলামে ‘কান্নার কোরবানি ও প্রাণশক্তির বেলোর্মি’-তে আমি বলেছিলাম যে আত্মরক্ষার জন্য যেসব ‘পশ্চিমা অনুশাসন’ আমরা মানতে বাধ্য হচ্ছি: যথা মাস্ক, হাত ধৌতকরণ, সামাজিক দূরত্ব ইত্যাদি– সবই ফেইল করছে।

পশ্চিমা বিজ্ঞান যেকোনও জীবন রক্ষার পদ্ধতি যার সঙ্গে সরাসরি ব্যবসার সম্পৃত্ততা নেই– তা একেবারেই পাত্তা দেয় না, তা আমরা ইতোমধ্যে বুঝতে পারছি।

তবে আমাদের মস্তিষ্কগুলো এমনি ঘোলা ও নিস্তেজ হয়ে গেছে যে বিকল্প কোনও সমাধান বা এই রোগ নিয়ে বিকল্প পাঠ– তা দেখা যাচ্ছে না—বরদাশত করাও হচ্ছে না।

ধরা যাক ‘স্টিম ইনহেলাশন’ বা বাষ্প শ্বাসগ্রহণ, যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গত বছর দীর্ঘক্ষণ টেলিভিশনে বুঝিয়েছিলেন। এই অতি প্রাচীন ও সহজ গলা, নাক, কান ও শ্বাসযন্ত্র প্রতিরক্ষা পদ্ধতি জনগণ তো বহু দূরের কথা– বাংলাদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কি একটুও পাত্তা দিয়েছে বা আমলে নিয়েছে? নেয়নি, কারণ ‘মামুলি’ গরম পানি দিয়ে নাক মুখে সেঁক দেওয়া-নেওয়াতে ‘ব্যবসা বা ধান্দা’র কোনও অপশন নেই।

অথচ চীন, জাপান ও তাইওয়ানে করোনাবিরোধী রাষ্ট্রীয় প্রচারে স্টিম ইনহালেশানকে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার দিয়েছে। এর ফলে ওই দেশগুলোতে করোনার ‘অসভ্য’ বিস্তারকে রোধ করতে বিশাল ভূমিকা রেখেছে।

যেমন, জাপানে এই তথাকথিত ‘ভয়াল মহামারি’র মাঝে অলিম্পিক চলছে।

৪. প্রয়োজন পশ্চিমা নাকি গরিমা বাংলার স্বাস্থ্য সেবা?

পশ্চিমা চিন্তা, পশ্চিমা কৌশল, পশ্চিমা সমাজ ব্যবস্থা এমনকি পশ্চিমা মূল্যবোধ, ভাববাদ ও আদর্শের সঙ্গে বাঙালির মিলের চেয়ে অমিলই বেশি।

আমাদের ইতিহাস বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় যে যেকোনও সমস্যা, যেকোনও জীবন মরণের সন্ধিক্ষণে বাঙালি যখন নিজের দিকে তাকিয়েছে সে তখনই বিজয়ের বেশ ধারণ করেছে। সে তার নিজের প্রতিভার ওপরে ভর করে কার্যত ও যুগোপযোগী সমাধান উপস্থাপন করেছে।

অথচ আমি আগে কয়েকবার বলতে বাধ্য হয়েছি, ‘আমরাই আমাদের সব চাইতে বড় শত্রু’।

বিদেশিদের তোষামোদি করতে করতে আমরা কী পরিমাণ আত্মমর্যাদা হারিয়ে নিজেদের সঙ্গে অবিচার করছি তা নিজেরা কি একটুও বুঝি?

দেশে ও বিদেশে এত ‘করোনা বিশেষজ্ঞ’র ছড়াছড়ি ও তাদের সেই অতি পরিচিত ভাঙা রেকর্ড শুধুই পশ্চিমা শাশ্বত বিজ্ঞানের সুরে গান করে ও শিখিয়ে দেওয়া তোতাপাখির মতো কথা বলে।

এত ‘বিশেষ জ্ঞান’সম্পন্ন মানুষ থাকা সত্ত্বেও যদি ১৬ মাসে কার্যত সমাধান, বা আত্মরক্ষার জন্য নিদেনপক্ষে কোনও কৌশল উপস্থাপন করা হতো, তা মেনে নিতাম।

তেমন কিছুই কি হয়েছে?

এই তথাকথিত ভাইরাসের চরিত্র ও গঠন কী, তা নিয়ে যখন এতটা অস্পষ্ট ও ভাসাভাসা ধারণা থাকে– এই রোগ থেকে মুক্তি কামনা আমরা করি কোন সাহসে?

৫. কিছু প্রশ্ন ও প্রস্তাবনা: দেখা হোক চক্ষু মেলিয়া

আমাদের বুনিয়াদি সংস্কৃতি, আমাদের ঐতিহ্যগত গরিমার অফুরন্ত ভাণ্ডারে কি এই রোগ চিকিৎসা পদ্ধতি জানা নেই?

এ নিয়ে বিন্দুমাত্র চিন্তা কি করা হচ্ছে? আমাদের হাজার বছরের ইতিহাসে এটাই কি প্রথম মহামারি?

আগে কোন পদ্ধতিতে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হতো এবং মানুষ কীভাবে সুস্থ থাকতো– তা জানা, বোঝা ও প্রয়োগ করা কি এ সময়ে সব বাতিলের খাতায় চলে গেছে?

রাষ্ট্র এত এত লোকের সঙ্গে, এক্সপার্টদের সঙ্গে কথা বলছে, পরামর্শ করছে, সমাধান খুঁজছে, সেখানে আমাদের আবহমান বাংলার সংস্কৃতির লতাপাতার ভেষজ গুণ বোঝা ব্যক্তিবর্গ অনুপস্থিত কেন? কী কারণে হেকিমি, ইউনানি, আয়ুর্বেদি, বৈদ্য এমনকি হোমিওপ্যাথি বিশেষজ্ঞদের ধারে-কাছে ভিড়তে দেওয়া হচ্ছে না?

কী কারণে বিষাক্ত রাসায়নিক ও ক্ষেত্রবিশেষে অপ্রয়োজনীয় ও ক্ষতিকর ওষুধের বিজ্ঞাপন চতুর্দিকে সয়লাব অথচ ভেষজ প্রতিকারের ওষুধ উপেক্ষিত, নিরুৎসাহিত এবং এক প্রকার অলিখিত নিষেধাজ্ঞায় আবদ্ধ?

উন্নত বিশ্বে এই মহামারি রোধ করার জন্য যখন লক্ষ লক্ষ মানুষ ‘অল্টারনেটিভ অ্যান্ড ট্রাডিশনাল মেডিসিন’ বা বিকল্প ও ঐতিহ্যগত ওষুধের দিকে ঝুঁকছে তখন আমরা কেন নীরব দর্শক হয়ে দেখছি ও অলসতার হাই তুলছি?

আমাদের গরিমা সংস্কৃতির অত্যন্ত সম্মানজনক বয়োজ্যেষ্ঠ, অগ্রজ ব্যক্তিবর্গ ও মুরুব্বিগণ, যথা–দরবেশ, ফকির, সাধুগুরু, অলি এ কামেল, আউলিয়া, কুতুব ছাড়া বিভিন্ন ধর্মের স্বাস্থ্য সম্পর্কিত আধ্যাত্মিক বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে রাষ্ট্র তথা সরকার জরুরি ভিত্তিতে আলাপে বসলে আমি বিশ্বাস করি এই করোনার সমস্যা বিহিত করা সম্ভব।

আর যদি কাশি ও শ্বাসকষ্ট হয়ে থাকে তথাকথিত কোভিড-১৯ আক্রমণের প্রাথমিক নিদর্শন তা রুখে দেওয়ার মতো ভেষজ ওষুধ আমাদের বুনিয়াদি স্বাস্থ্য সেবায় অনেক আছে।

এসব কথা বিজ্ঞান বিশ্বাস করুক আর নাই করুক; আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি ও তার উপকার পাচ্ছি।

যেহেতু আমি কণ্ঠশিল্পী। গলা আর শ্বাসযন্ত্র পরিষ্কার ও সুস্থ রাখার জন্য বহু বছর ধরে ভেষজ ঔষধি ব্যবহার করছি।

৬. ভ্যাকসিন রাজনীতি ও বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য:

বাংলাদেশ সম্ভবত বিশ্বের প্রথম দেশ যে অ্যাস্ট্রাজেনেকা ভ্যাকসিন যখন আবিষ্কৃত হয়নি, পরীক্ষামূলক অবস্থায় ছিল, সেই সময়ে কয়েক মিলিয়ন ডলার খরচ করে আগাম বুকিং দিয়ে ফেলে।

সেই সুবাদে ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউট আমাদের ভ্যাকসিন সরবরাহ শুরু করলেও ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট ভারতে ছড়িয়ে পড়লে তা আসা বন্ধ হয়ে যায়।

এরপর বাংলাদেশকে ধনী রাষ্ট্রগুলো যথা আমেরিকা, ইউরোপ, চীন ও রাশিয়া কী পরিমাণ নাকানি চুবানি খাইয়েছে তা সবাই বিস্মিত হয়েই দেখেছি।

নেপথ্যে বহু বিদেশে অবস্থানরত দেশপ্রেমী বাংলাদেশিদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় কিছু ভ্যাকসিন ইতোমধ্যে এসেছে।

তাছাড়া আরও অনেক ভ্যাকসিন বাংলাদেশ অনেক চড়া মূল্যে ক্রয় করেছে নিঃসন্দেহে। তবে ভ্যাকসিন নিয়ে অনিশ্চয়তা ও বিভ্রান্তি আমাদের সহজে স্বস্তি দিচ্ছে না।

একদিকে ভূরাজনৈতিক সুপার পাওয়ারের ভ্যাকসিন কেন্দ্রিক দ্বন্দ্ব, অপর দিকে ধনী রাষ্ট্রদের প্রয়োজন অতিরিক্ত ভ্যাকসিন মজুত থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের ক্রয় ক্ষমতা থাকলেও এই কাকুতি মিনতি, দেন দরবার ভিক্ষাবৃত্তির অবলম্বন না করে তা জোগাড় করা প্রায় অসম্ভব ঠেকছে।

আর বাড়তি মানসিক চাপ হলো দুই ডোজ ভ্যাকসিন নেওয়ার পর আরেক ডোজ ‘বুস্টার’ নিতে হবে মর্মে প্রচারণা এই প্রমাণ করে যে করোনা থেকে রক্ষা পাওয়ার একমাত্র গ্রহণযোগ্য অবলম্বন ‘ভ্যাকসিন’- তা ক্রয় বা জোগাড় করতে বাংলাদেশকে আগামীতে দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হবে।

৭. অনুরোধ: সামাজিক যোগাযোগ মিডিয়ায় এই যুদ্ধের হ্যাশট্যাগ #covid19resistancebangladesh  ব্যবহার করে ফ্রন্টলাইন ফাইটারদের অনুপ্রাণিত করুন।

লেখক: সংগীতশিল্পী

 

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

করোনার করুণ কাহিনি: কান্নার কোরবানি ও প্রাণশক্তির বেলোর্মি

করোনার করুণ কাহিনি: কান্নার কোরবানি ও প্রাণশক্তির বেলোর্মি

করোনার করুণ কাহিনি: মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের পটভূমি ও  ‘বাংলাদেশ ভ্যারিয়েন্ট’

করোনার করুণ কাহিনি: মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের পটভূমি ও ‘বাংলাদেশ ভ্যারিয়েন্ট’

করোনার করুণ কাহিনি: শাটডাউন, লকডাউন ও  ‘ব্রেকডাউন’

করোনার করুণ কাহিনি: শাটডাউন, লকডাউন ও  ‘ব্রেকডাউন’

করোনার করুণ কাহিনি: সাধারণ ছুটি থেকে লকডাউন ও অতঃপর

করোনার করুণ কাহিনি: সাধারণ ছুটি থেকে লকডাউন ও অতঃপর

আইপি টিভি যন্ত্রণা!

আপডেট : ৩১ জুলাই ২০২১, ১৪:৩৪

তুষার আবদুল্লাহ করোনা প্রতিরোধ ও স্বাস্হ্য সুরক্ষার জন্য  টিকার কথা বলা হচ্ছে। সাংবাদিকতা সুরক্ষা ও অপসাংবাদিকতা রোধের জন্য এখন বলতে হচ্ছে, আইপি বা অনলাইন টিভি বন্ধ করতে। বন্ধ করতে বলার কারণ, সরকার এখনও কোনও আইপি টিভির অনুমোদন দেয়নি। অথচ দেশজুড়ে হাজার হাজার আইপি টিভি তৈরি হয়ে গেছে। ফেসবুক, ইউটিউব মহল্লায় আইপি টিভির ভিড়। সেদিন শুনলাম ব্রাহ্মনবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলাতেই নাকি ২৫টি আইপি টিভি আছে। এই পরিসংখ্যান অন্য উপজেলা এবং জেলাতে আরও বেশি থাকতে পারে। 

করোনাকালে লকডাউনে পথে বের হলে, এমন নতুন নতুন অসংখ্য টিভির দেখা পাই। ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেলে বিচিত্র নামের আইপি টেলিভিশনের স্টিকার চোখে পড়ে। গাড়ি ও গাড়িতে আসীন মানুষগুলোকে গণমাধ্যম কর্মীর মতো মনে না হলেও, তাদের গতি ও আচরণ পরিচিত টিভি চ্যানেলের কর্মীদের চেয়ে বেশি। ভাব এমন যে তারা গুরুত্বপূর্ণ খবর সংগ্রহে ব্যস্ত। 

এসব আইপি টেলিভিশনের কাজের দৌরাত্ম্য স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অফিস, ভূমি অফিস এবং ইউএনও, ডিসি অফিস। তারা নেতা-মন্ত্রীদের অন্দর পর্যন্তও ঢুকে পড়েছে। ফলে এদের দৌরাত্মে ঝাঁঝও আছে।

রাজধানীতে এই প্রকারের আইপি টিভির হাঁকডাক বাড়ছে।  সরকারি-বেসরকারি দফতর ও প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিকে তারা নিত্য ব্ল্যাকমেলিং করে।  কোথাও কোনও অপরাধ ঘটলে, অপরাধী ও ভিকটিমকে নানা রকম হয়রানির ফাঁদে ফেলছে তারা। এই প্রকার আইপি টিভির অন্যতম বাণিজ্য- পরিচয় পত্র বিক্রি। জেলা-উপজেলা, ইউনিয়ন, গ্রাম পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগের নামে তারা পরিচয় পত্র বিক্রি করে লাখ-কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। 

টাকা দিয়ে যারা আইডি কার্ড কিনছে, তারা একে নিচ্ছে বিনিয়োগ হিসেবে। ওই টাকার লাভ তুলে নিতে নিতে এলাকায় চাঁদাবাজিসহ সকল অপরাধের সঙ্গেই যুক্ত হচ্ছে এই কার্ডধারীরা। খেয়াল করলে দেখা যাবে এসব আইপি টিভির বেশিরভাগেরই নাম দেশ-বিদেশের জনপ্রিয় চ্যানেলের সঙ্গে যুক্ত বা মিলিয়ে রাখা। এতে সাধারণ মানুষ প্রথম দিকে বিভ্রান্তির মধ্যেই পড়ে যায়। বিভ্রান্তির ঘোর না কাটতেই পড়ে যান প্রতারণার ফাঁদে।

শুধু যে মানুষের সঙ্গে প্রতারণায় লিপ্ত এই আইপি টিভিগুলো তা নয়। তারা রাষ্ট্রীয় ও বিভিন্ন ঘটনায় গুজব, অপপ্রচার ছড়িয়ে দেওয়ার কাজেও লিপ্ত। নিকট ও দূর অতীতে এমন উদাহরণ আমরা দেখেছি। এসব আইপি টিভির খবর সাধারণ মানুষ প্রায়ই বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। এতে বস্তুনিষ্ঠ ও পেশাদার সাংবাদিকতার ওপর ভোক্তাদের আস্থা হারিয়ে যাচ্ছে। তারা এখন প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমে পরিবেশিত খবরেও সংশয় প্রকাশ করেন।

আইপি টিভির মালিকানা কাদের? অধিকাংশই উচ্চফলনশীল ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক কর্মীদের। তারা এসব টিভির মাধ্যমে নিজেদের বিপণন করেন। উদ্দেশ্য ক্ষমতার কাছাকাছি যাওয়া। সফল হয়েছেন অনেকেই চরমভাবে। এত চরম যে তাদের সফলতার তাপ সাধারণ মানুষতো বটেই সরকারের জন্যও অসহনীয় হয়ে ওঠে। তাই এমন আইপি টিভি মালিকের পতনও আমাদের দেখতে হয়েছে। কিন্তু পতনের আগেই এরা সরকারকে বিব্রত করাসহ সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণার শীর্ষধাপ অতিক্রম করেছে। এখন সাধারণ ভোক্তাদের পক্ষ থেকেই দাবি উঠেছে, আইপি টিভি বন্ধের। এই দাবি গণমাধ্যমের শৃঙ্খলার জন্য। তথ্যমন্ত্রী বলেছেন, নিয়ম নীতিহীন আইপি টিভির বিরুদ্ধে তিনি ব্যবস্থা নেবেন। তাঁর মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে দ্রুত সক্রিয় হয়ে উঠতে হবেই। একই সঙ্গে বলে রাখা দরকার, অনেক ওয়েব পোর্টাল, পত্রিকা তাদের ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে এই কাণ্ডে মেতে আছে। তাদের মাঝেও নিড়ানী চালানো প্রয়োজন। তথ্য, সম্প্রচার বিভাগ এদিকে একটু নজর রাখলে সাংবাদিকতার উপকার হবে।

সেই সঙ্গে একথাও বলে রাখা দরকার- এখনও ভবিষ্যতের দুনিয়ায় আইপি টিভি  গ্রাহক বান্ধব। বাংলাদেশে ইন্টারনেট গতিশীল হলে এই মাধ্যমটি জনপ্রিয় হবে। আইপি টিভি আধুনিক প্রযুক্তির বাস্তবতা। তাই আইপি টিভির পথ আটকে না রেখে নীতিমালা তৈরি করে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে নেমে আসার সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন।

/এসএএস/

সম্পর্কিত

‘ফকির’ করে চলে গেলেন…

‘ফকির’ করে চলে গেলেন…

ঘুষি লাগলো কি গণতন্ত্রের বুকে?

ঘুষি লাগলো কি গণতন্ত্রের বুকে?

মৃত্যু কিনি ঘামের দামে

মৃত্যু কিনি ঘামের দামে

রাজনীতির স্বাদ- বিস্বাদ!

রাজনীতির স্বাদ- বিস্বাদ!

বিপদ ডেকে আনছে ভারত, ঝুঁকি বাংলাদেশেরও

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০২১, ১৬:০৫

মো. জাকির হোসেন যুগে যুগে দেশে দেশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিন্দিত হয়েছে। রাষ্ট্র শাসনে ধর্মের অপব্যবহার ভয়ংকর পরিণতি ডেকে এনেছে। এসব জেনেও ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার উগ্র হিন্দুত্ববাদকে রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছে। ফলে হিন্দু ধর্মের সারকথা ‘অহিংসা পরম ধর্ম’ এখন ভারতের ত্রি-সীমানা ছেড়ে পালিয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষতা কাগুজে নীতিতে পরিণত হয়ে সংবিধানে বৃত্তাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। উগ্র হিন্দুত্ববাদ ক্রমেই গ্রাস করছে সমগ্র ভারতবর্ষকে। তৃণমূলে ছড়িয়ে পড়ছে উগ্রবাদ, জন্ম নিয়েছে ভয়ংকর মুসলিম বিদ্বেষ। ২০০৫ সালে মনমোহন সিং সরকার কেন্দ্র, রাজ্য, অঞ্চল ও জেলা স্তরে মুসলমানদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত ক্ষেত্রে বিরাজমান অবস্থার ওপর প্রতিবেদন তৈরির জন্য দিল্লি হাইকোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি রাজেন্দ্র সাচারের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করেন, যা ‘সাচার কমিটি’ নামে পরিচিত।

সাচার কমিটি কেন্দ্রীয় সরকারি দফতর, রাজ্য সরকারি দফতর থেকে তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি প্রকাশিত সংখ্যাগণিত, গবেষণাপত্র ও পুস্তকাদি থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ৪৫০ পাতার তথ্যভিত্তিক এক প্রতিবেদন তৈরি করেন। প্রতিবেদনে বিভিন্ন ক্ষেত্রে মুসলমানদের বঞ্চনা ও বৈষম্যের নৈরাশ্যজনক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, ভারতীয় মুসলমানদের অবস্থা তফসিলি সম্প্রদায় ও তফসিলি উপজাতীয়দের চেয়েও খারাপ অবস্থায় রয়েছে। দলিতরাও মুসলমানদের চেয়ে ভালো আছে। এই প্রতিবেদনে ভারতীয় মুসলমানদের ওপর পরিচালিত বৈষম্যের বিষয়টি জাতীয় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কমিটির একটি সুপারিশ ছিল, বৈষম্যের বিষয়গুলো আইনিভাবে সমাধান করার জন্য একটি কৌশল উদ্ভাবন করার লক্ষ্যে একটি ‘ইকুয়াল অপারচ্যুনিটি কমিশন’ (ইওসি) গঠন করতে হবে।

এ ছাড়াও মুসলমানদের ‘মূলস্রোতে’ নিয়ে আসার জন্য বেশ কিছু সুপারিশ করা হয় প্রতিবেদনে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় মুসলমানদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ব্যবস্থা করা, শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো, মাদ্রাসা শিক্ষার যথাযথ গুরুত্ব, ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক সংস্থায় ঋণের সুবন্দোবস্ত, সরকারি ও আধা সরকারি চাকরিতে মুসলমানদের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং পরিকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো। প্রতিবেদনে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, এই পশ্চাৎপদতা রাষ্ট্র কর্তৃক অনুসৃত বৈষম্যের নীতির ফল। রাষ্ট্র তার নীতি বদল না করলে এ পশ্চাৎপদতা দূর হতে পারে না। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এই সুবিশাল জনগোষ্ঠী যদি স্থায়ী দারিদ্র্য, অশিক্ষা ও বুভুক্ষের মধ্যে বসবাস করেন তাহলে যে কেবল বিরাট মানবসম্পদের অপচয় ঘটছে তাই নয়, একই সঙ্গে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর নিজেদের ‘আলাদা’ বলে ভাববার বাস্তব ভিত্তি থেকে যাচ্ছে। এতে জাতীয় ঐক্য বিঘ্নিত হচ্ছে এবং সমাজের রূপান্তরের পথে বাধা তৈরি হচ্ছে। অপরদিকে অন্য জনগোষ্ঠীর মানুষদের মধ্যেও মুসলমানদের সম্পর্কে নানারকম বিদ্বেষমূলক ধারণা গড়ে উঠছে।

বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে মুসলমানদের মূল স্রোতে আনার পরিবর্তে বিজেপি সরকারের উগ্র হিন্দুত্ববাদী বিদ্বেষমূলক নীতি ভারতীয় সমাজকে বিভক্ত, বিষাক্ত ও রক্তাক্ত করেছে। কল্পকাহিনির ওপর ভিত্তি করে ভারতের শাসক দলের হঠাৎ করে আমদানি করা বৈধ নাগরিকত্বের ধারণা জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) ও সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) ভারতের নাগরিক ও সমাজের বন্ধনে নজিরবিহীন ভাঙন সৃষ্টি করেছে। হিন্দু-মুসলিম বিভাজনের ফলে সৃষ্টি হয়েছে ঘৃণা, আর ঘৃণা থেকে দাঙ্গা-সহিংসতা। এর মাধ্যমে ভারতের গণতন্ত্র ও সভ্যতা লজ্জার মধ্যেই পড়ছে। ২০২০-এর ফেব্রুয়ারিতে দিল্লিতে সাম্প্রদায়িক ঘটনা তার একটি উদাহরণ মাত্র। ভারতের একটি বড় অংশে প্রায় তিনশ’ বছর রাজত্ব করেছিল মুঘল সাম্রাজ্য। প্রায় তিনশ’ বছর রাজত্ব করা মুঘল সাম্রাজ্য দেশের ইতিহাসের একটা অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভারতের বেশিরভাগ সৌধ মুঘল আমলে তৈরি হয়েছিল। মুঘল সম্রাট শাহজাহানের অনন্য সৃষ্টি তাজমহল। মুঘল শাসনামল ভারতবর্ষের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। অথচ ভারতের মহারাষ্ট্রের স্কুলের সিলেবাস থেকে পুরোপুরি বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে মুঘল আমলের ইতিহাস। মুঘল সুলতানদের ইতিহাস সরিয়ে দিয়ে সেখানে নিয়ে আসা হয়েছে হিন্দু শাসক ছত্রপতি শিবাজীর প্রতিষ্ঠিত সাম্রাজ্যের ইতিহাস। কমিটির চেয়ারম্যান সদানন্দ মোরে জানাচ্ছিলেন, ‘আমাদের ছাত্রছাত্রীরা মহারাষ্ট্রের বাসিন্দা। তাই মারাঠা ইতিহাসের সঙ্গে তাদের সরাসরি যোগ আছে। সমস্যাটা হলো বইয়ে পৃষ্ঠা সংখ্যা সীমিত। তাই দুটো ইতিহাসই রাখা কঠিন, আবার মুঘল ইতিহাস রেখে মারাঠা ইতিহাস তো সরিয়ে দেওয়া যায় না!’ ইতিহাস পাঠ্যপুস্তক কমিটি বলছে, এই সিদ্ধান্তের পেছনে ধর্মীয় বা রাজনৈতিক কোনও কারণ নেই।

প্রশ্ন হলো, মুসলমানদের ইতিহাস বাদ না দিয়ে, কয়েক পৃষ্ঠার মুঘল ইতিহাস পড়ানো হলে খুব কী ক্ষতি হয়ে যেত? কেবল স্কুলের সিলেবাসে নয়, মুসলিম বিদ্বেষের প্রভাব পড়েছে ভারতের আদালতেও। অকাট্য প্রমাণ ও প্রামাণ্য নথিপত্রের ভিত্তিতে নয়, বরং হিন্দু ধর্মের কিছু মানুষের বিশ্বাসকে মান্যতা দিয়ে বাবরি মসজিদ মামলায় ভারতের সুপ্রিম কোর্ট মসজিদের জায়গায় মন্দির নির্মাণের বিতর্কিত রায় দিয়েছেন। পরস্পরবিরোধী, পক্ষপাতমূলক রায়টি ছিল অসঙ্গতিপূর্ণ। আদালত নিজেই স্বীকার করেছেন, মসজিদের নিচে যে কাঠামোর সন্ধান মিলেছিল, তা কোনও মন্দিরেরই কাঠামো ছিল, এমনটা আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার (এএসআই)-এর রিপোর্টে স্পষ্ট হয়নি। তাহলে বিতর্কিত জায়গায় মন্দির নির্মাণের পক্ষে রায়ের ভিত্তি কী?

আদালত বলেছেন, ‘তবে ওই স্থানকে যে হিন্দুরা ভগবান রামের জন্মস্থান হিসেবে বিশ্বাস করেন, তা নিয়ে কোনও সংশয় নেই।’ আদালতের আরেকটি যুক্তি ছিল, ‘তবে বিতর্কিত জমির ওপর রামলালার অধিকার স্বীকার করে নেওয়াটা আইনশৃঙ্খলা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বহাল রাখার প্রশ্নের সঙ্গে সম্পৃক্ত।’ বাবরি মসজিদ মামলার রায়ে একটি ভয়ংকর ‘বিপজ্জনক তত্ত্ব’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যদি কেউ প্রশ্ন তোলেন যে অমুক মসজিদের নিচে মন্দির কিংবা অমুক মন্দিরের নিচে মসজিদের কাঠামো আছে, তাহলে এই রায়ের তত্ত্ব অনুযায়ী মাটির ওপর খাড়া ভবন ভেঙে পরীক্ষা করতে হবে এবং বিশ্বাসকে মান্যতা দিতে কিংবা আইনশৃঙ্খলা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বহাল রাখার স্বার্থে অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী গোষ্ঠীর পক্ষে রায় দিতে হবে, তাতে প্রামাণ্য নথিপত্র থাকুক আর না থাকুক। সুপ্রিম কোর্টের এই বিপজ্জনক তত্ত্বের প্রয়োগ শুরু হয়েছে ভারতে।

সম্প্রতি  ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের বরাবাঁকিতে যোগী আদিত্যনাথের সরকার ১০০ বছরের প্রাচীন একটি মসজিদ ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। প্রশাসন দাবি করছে, ওই মসজিদের কাঠামোটি অবৈধভাবে নির্মিত হয়েছিল এবং এলাহাবাদ হাইকোর্টের অনুমতি নিয়েই তারা সেই স্থাপনাটি ভেঙেছে। কিন্তু মসজিদের খাদেম রমজান আলি বলেছেন, তাদের বক্তব্য পেশ করার কোনও সুযোগই দেওয়া হয়নি। আইনজীবী জাফরিয়াব জিলানির মতে, নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকা অবস্থায় এই মসজিদ ভেঙে আদালতের রায়ের অবমাননা করা হয়েছে। অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ড এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, ওই মসজিদটি নিয়ে কখনও কোনও বিতর্ক ছিল না এবং সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে সেটি ধূলিসাৎ করা হয়েছে। সংস্থার সাধারণ সম্পাদক মৌলানা খালিদ সাইফুল্লা রেহমানি আরও বলেছেন, ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে মুসলিমরা সেখানে নামাজ পড়ে আসছেন– যে বক্তব্য নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যেও কোনও দ্বিমত নেই। বিবিসির প্রতিবেদন মসজিদের পাশের হিন্দু প্রতিবেশী বেণী শর্মার উদ্ধৃতি দিয়ে উল্লেখ করেছে, ‘সেই ছোটবেলা থেকে এখানে কখনও নামাজ পড়া বন্ধ হয়েছে বলে দেখিনি।’

২০১৪ সালে বরাবাঁকির মসজিদের একটি দরগা থেকেই নির্বাচনি প্রচারের সূচনা করেছিলেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। বাবরি মসজিদ ও বরাবাঁকির গরিব নেওয়াজ মসজিদ ছাড়াও আরও দুটি মসজিদ ভাঙার হুমকিতে পড়েছে। এই মসজিদ দুটি ভাঙতে সুপ্রিম কোর্টের বিপজ্জনক তত্ত্বের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। মসজিদ দুটি হলো বারানসির জ্ঞানবাপী মসজিদ বা আলমগিরি মসজিদ ও আগ্রা জামে মসজিদ বা জাহানারা মসজিদ।

সম্প্রতি ভারতের বারানসির একটি আদালত নির্দেশ দিয়েছে যে জ্ঞানবাপী মসজিদ কোনও মন্দির ভেঙে গড়া হয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ চালাতে হবে। এ ঘটনার এক সপ্তাহ পর উত্তর প্রদেশের মথুরার একটি আদালতে আরেকটি পিটিশন দায়ের করা হয়েছে। যেখানে রাজ্যটির আগ্রায় অবস্থিত জাহানারা মসজিদের নিচে হিন্দু দেবতা কৃষ্ণের মূর্তি আছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে একই ধরনের জরিপ চালানোর অনুমতি চাওয়া হয়েছে। মসজিদটি আগ্রা জামে মসজিদ নামেই বেশি পরিচিত। পিটিশনে বলা হয়েছে, মথুরা জামানস্থান মন্দিরে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে সেখান থেকে কৃষ্ণের মূর্তি নিয়ে আসেন মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেব। পরে আগ্রায় জাহানারা মসজিদের নিচে সেটিকে পুঁতে রাখেন তিনি। জ্ঞানবাপী মসজিদে প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ চালানোর বিষয়ে বারানসির আদালতের রেফারেন্স দিয়ে পিটিশনে বলা হয়েছে, জাহানারা মসজিদের নিচে দেব-দেবীর মূর্তি আছে কিনা তা খতিয়ে দেখা জরুরি।

মসজিদ ভাঙার টার্গেটের পাশাপাশি ভারতীয় মুসলিম নারীদের বিরুদ্ধে আরেকটি ভয়ংকর বিদ্বেষ ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অতি সম্প্রতি অনেক মুসলিম নারীদের অনলাইনে অবমাননাও করতে দেখা যায়।  ‘সুল্লি ডিলস’ নামে অ্যাপ ব্যবহারকারীদের উদ্দেশে বলা হয়েছে, অনলাইনে একজন ‘সুল্লি’ কেনার এখনই সুযোগ। ভারতে উগ্র হিন্দুদের অনেকে ট্রলে মুসলিম নারীদের অবমাননা করতে ‘সুল্লি’ শব্দটি ব্যবহার করে। যদিও ভারত সরকার ‘সুল্লি ডিলস’ অ্যাপ বন্ধ করেছেন। কিন্তু আশঙ্কার বিষয় হলো, হিন্দুত্ব উগ্রবাদের বিদ্বেষ তৃণমূলে পৌঁছে গিয়েছে ও ক্রমেই বেড়ে চলেছে।

মহাভারতের প্রবাদে আছে, ‘তোমারে বধিবে যে, গোকুলে বাড়িছে সে।’ মহাভারতের এই প্রবাদটির অন্তর্নিহিত অর্থ হলো, মানুষ তার কৃতকর্মের পরিণতি থেকে কোনোভাবেই রেহাই পায় না।

আফগানিস্তানে তালেবানরা ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করছে। তালেবানের সঙ্গে সুসস্পর্ক রয়েছে পাকিস্তানের। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে তালেবানরা বৈঠক করেছে। পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক বন্ধুত্বের নয়। তালেবানের পাশাপাশি রয়েছে আল-কায়েদা, হাক্কানী গ্রুপ, লস্কর-ই তৈয়্যেবা। এদিকে ‘গাজওয়াতুল হিন্দ’ বা ‘হিন্দুস্থানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’কে সামনে রেখে সংগঠিত হচ্ছে বাংলাদেশ ও ভারতের জঙ্গিরা। বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ঘোষিত দুই জঙ্গি সংগঠন জামাতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ-জেএমবি, আনসার আল ইসলাম ও ভারতের জামআতুল মুজাহিদীন ইন্ডিয়া-জেএমআই একজোট হয়ে এই অপতৎপরতা শুরু করেছে বলে খবরে প্রকাশ।

সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে গ্রেফতার হওয়া চার জঙ্গির কাছ থেকে এ তথ্য পেয়েছে ভারতের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ অবস্থায় ভারতে মসজিদ ভাঙা, মুসলিম নারীদের অপদস্থ করা তথা মুসলিম বিদ্বেষের নীতি থেকে দৃশ্যমানভাবে সরে না এলে জঙ্গি হামলার বিপদের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

অন্যদিকে, বাংলাদেশের নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হরকাত-উল-জিহাদ-আল-ইসলামির সঙ্গে তালেবানের সখ্য রয়েছে। সিলেটের বুলবুলি হুজুর নামে খ্যাত মুফতি হাবিবুর রহমান হরকাত-উল-জিহাদ-আল-ইসলামি এবং তালেবান ও আল-কায়েদার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কথা নিজেই স্বীকার করেছেন। ২০০৪ সালে ইসলামি বিপ্লব নামে একটি বুলেটিনে সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, তার সঙ্গে ওসামা বিন লাদেন ও পাকিস্তানের হরকাত-উল-জিহাদ-আল-ইসলামির সম্পৃক্ততা রয়েছে। তিনি সেই সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘হরকাত-উল-জিহাদ-আল-ইসলামির আমন্ত্রণের কারণেই আমার আফগানিস্তান ভ্রমণ সম্ভব হয়েছে। ...আমরা যারা আফগানিস্তানের যুদ্ধক্ষেত্র ভ্রমণ করেছি তারা হলেন শাইখুল হাদিস আজিজুল হক, আতাউর রহমান খান (কিশোরগঞ্জ-৩ আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপির সাবেক এমপি), চট্টগ্রামের সুলতান যাউক, ফরিদপুরের আবদুল মান্নান, নোয়াখালীর হাবিবুল্লাহ, আমি নিজে এবং আরও তিন জন।’

তিনি পাকিস্তানে অবস্থিত মুজাহিদিন প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন, সেখানে অনেক বাংলাদেশি মুজাহিদিনের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়েছে। সাক্ষাৎকারে তিনি আরও বলেছেন, ‘তালেবানের পথ ধরে খেলাফতভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই কেবল জাতির ভাগ্য পরিবর্তন সম্ভব।’ তালেবানের বিজয় বাংলাদেশের জঙ্গিদের উজ্জীবিত করবে সন্দেহ নেই। শঙ্কার কথা, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিশ্চিত করেছে যে কিছু জঙ্গি ও সন্ত্রাসী সংগঠন হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে যুক্ততা বজায় রেখে চলছে। এদের বেশিরভাগই আফগানিস্তান ফেরত। এদের মধ্যে রয়েছে হরকাতুল জিহাদ বা হুজি।

গত ২৬ থেকে ২৮ মার্চ টানা তিন দিন দেশজুড়ে হেফাজত যে তাণ্ডব চালায়, তার সঙ্গে হুজির যোগসূত্র পাওয়া গেছে। আরেকটি গোয়েন্দা প্রতিবেদন বলছে, হেফাজতের প্রায় ডজনখানেক নেতার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের।

বাংলাদেশে জঙ্গি সংগঠনগুলোর প্রধান শত্রু আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধু পরিবার। বঙ্গবন্ধু কন্যাকে যে ১৯ বার হত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে তার বেশ কয়েকটির সঙ্গে হরকাতুল জিহাদ, জামায়াতুল মুজাহিদিনসহ কয়েকটি জঙ্গি সংগঠন সম্পৃক্ত ছিল। অথচ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর ইসলামের প্রচার-প্রসারে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছেন বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সরকার। বঙ্গবন্ধুর রক্তে ছিল ইসলামের প্রচার-প্রসারের তাগিদ। আর তাই বঙ্গবন্ধু সংবিধানে মদ-জুয়া নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ইসলামের প্রচার-প্রসারের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তিনি তার সংক্ষিপ্ত শাসনামলে ইসলামের প্রচার ও প্রসারে যে অসামান্য অবদান রেখেছেন তার মধ্যে অন্যতম হলো, ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড পুনর্গঠন, টঙ্গীতে বিশ্ব ইজতেমার স্থান বরাদ্দ, হজ পালনের জন্য সরকারি অনুদানের ব্যবস্থা, সিরাত মজলিস প্রতিষ্ঠা, বেতার-টেলিভিশনে ধর্মীয় অনুষ্ঠান প্রচার, ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.), শবে কদর, শবে বরাত উপলক্ষে সরকারি ছুটি ঘোষণা, মদ জুয়া নিষিদ্ধকরণ ও শাস্তির বিধান, রাশিয়ায় প্রথম তাবলীগ জামাত প্রেরণের ব্যবস্থা, ইসলামি সম্মেলন সংস্থার (ওআইসি) অধিবেশনে যোগদান করে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে এই সংস্থার অন্তর্ভুক্ত করা। বঙ্গবন্ধুর ইসলাম প্রচার ও প্রসারের ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ইসলাম ও আলেম সমাজের জন্য যা কিছু করেছেন, অন্য কোনও সরকার তা করেনি।

বঙ্গবন্ধু কন্যার নির্দেশে দেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলায় মডেল মসজিদ নির্মাণ হচ্ছে। দেশে প্রায় এক লাখ মসজিদভিত্তিক মকতব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। খতিব-ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমদের জাতীয় স্কেলে বেতন নির্ধারিত হয়েছে। ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। আলেমদের দীর্ঘ সময়ের দাবি কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। অথচ বঙ্গবন্ধু প্রবর্তিত মদ-জুয়া নিষিদ্ধের বিধান যারা বাতিল করলেন, হজের সরকারি অনুদান বন্ধ করলেন, তারা ইসলামের সেবক বলে পরিচিত আর বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবার ইসলামবিরোধী বলে মিথ্যা অপপ্রচারের শিকার হলেন। এর দুটো কারণ হলো, স্বাধীনতাবিরোধীদের হাত ধরে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থান। পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টি করায় জঙ্গিদের টার্গেট আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবার। বাংলাদেশ সৃষ্টিতে ভারতের সক্রিয় সহযোগিতা থাকায় ভারতও জঙ্গিদের প্রতিপক্ষ। আবার ভারতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকার কারণেও আওয়ামী লীগ জঙ্গিদের শত্রুপক্ষ।

ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ ও ভারতের ভাগ্য একসূত্রে গাঁথা। উগ্র হিন্দুত্ববাদের বিদ্বেষে মসজিদ ভাঙা, মুসলিম নারীদের অবমাননা ও মুসলিম নির্যাতনের ঘটনার মাধ্যমে ভারত নিজের জন্য বিপদ ডেকে আনার পাশাপাশি বাংলাদেশকেও জঙ্গিবাদের ঝুঁকির মুখে ফেলছে, এ কথা জোর দিয়ে বলা যায়।

লেখক: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ই-মেইল: [email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের

বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের

ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যান বন্ধের সিদ্ধান্ত ও আমাদের দায়

ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যান বন্ধের সিদ্ধান্ত ও আমাদের দায়

জাতির মেরুদণ্ডের মৃত্যুদণ্ড যেন না হয়

জাতির মেরুদণ্ডের মৃত্যুদণ্ড যেন না হয়

অবৈধ ইসরায়েলের আগ্রাসন ও মুসলিম উম্মাহর নেতাদের নীরবতা

অবৈধ ইসরায়েলের আগ্রাসন ও মুসলিম উম্মাহর নেতাদের নীরবতা

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সর্বশেষ

হাওরে ওয়াইফাই হটস্পট, দ্বীপ-চরাঞ্চলে উচ্চগতির ইন্টারনেট

হাওরে ওয়াইফাই হটস্পট, দ্বীপ-চরাঞ্চলে উচ্চগতির ইন্টারনেট

২৪ ঘণ্টায় বঙ্গবন্ধু সেতুতে ৩৮ হাজার যানবাহন পারাপার

২৪ ঘণ্টায় বঙ্গবন্ধু সেতুতে ৩৮ হাজার যানবাহন পারাপার

"খিদের জন্য সবকিছু করা লাগবি, সরকার তো খাওয়াবে না"

"খিদের জন্য সবকিছু করা লাগবি, সরকার তো খাওয়াবে না"

পর্দার ‘মাশরাফি জুনিয়র’র ডাবল সেঞ্চুরি!

পর্দার ‘মাশরাফি জুনিয়র’র ডাবল সেঞ্চুরি!

সড়কে আজও যানবাহনের চাপ

সড়কে আজও যানবাহনের চাপ

পর্নোগ্রাফি থাকায় কম্পিউটার পুড়িয়ে দিলেন ম্যাজিস্ট্রেট

পর্নোগ্রাফি থাকায় কম্পিউটার পুড়িয়ে দিলেন ম্যাজিস্ট্রেট

ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের ১৫ কিলোমিটারে যান চলাচলে ধীরগতি

ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের ১৫ কিলোমিটারে যান চলাচলে ধীরগতি

রেসিপি : আরব দেশের খাবসা

রেসিপি : আরব দেশের খাবসা

পুলিশ বক্সে হামলা: আইইডি তৈরির সরঞ্জামসহ গ্রেফতার ২

পুলিশ বক্সে হামলা: আইইডি তৈরির সরঞ্জামসহ গ্রেফতার ২

চাঁদপুরে নিবন্ধন ছাড়াই টিকা পাবেন এক লাখ ৯২ হাজার মানুষ

চাঁদপুরে নিবন্ধন ছাড়াই টিকা পাবেন এক লাখ ৯২ হাজার মানুষ

রাজধানীর সড়কে মানুষের উপস্থিতি বেড়েছে

রাজধানীর সড়কে মানুষের উপস্থিতি বেড়েছে

ময়মনসিংহ মেডিক্যালে ২৪ ঘণ্টায় ২৩ মৃত্যু

ময়মনসিংহ মেডিক্যালে ২৪ ঘণ্টায় ২৩ মৃত্যু

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

© 2021 Bangla Tribune