X
শুক্রবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২ আশ্বিন ১৪২৮

সেকশনস

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষকতা

আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৮:০৮

ড. মোহাম্মদ সামসুল আরেফিন

শিক্ষকতার সর্বোচ্চ স্তর হলো বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষকতা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের  কাজ মূলত নতুন জ্ঞান সৃষ্টি এবং তা যথাযথ বিতরণের মাধ্যমে যোগ্য মানবসম্পদ তৈরি করা। নতুন জ্ঞান সৃষ্টির জন্য প্রয়োজন গবেষণা। গবেষণার কাজ একজন শিক্ষককে যোগ্য শিক্ষক হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করে,একইসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম বাড়াতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ কারণেই বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবিধানে শিক্ষকদের বিভিন্ন কাজের মধ্যে গবেষণার বিষয়টি আলাদাভাবে উল্লেখ করা থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়, তা ব্যক্তির উদ্যোগে বা সমষ্টিগত যেভাবেই করা হোক না কেন। কনফারেন্স, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, ওয়ার্কশপ ইত্যাদির আয়োজন গবেষণা কাজের অংশ। এসবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে এবং বাইরে স্বাভাবিকভাবেই অনেক সম্মানিত। তাছাড়া এ কথা তো সত্যি, দেশের এবং বিশ্বের যেকোনও সমস্যা সমাধানে বিশ্ববিদ্যালয়ের  শিক্ষকদেরকে গবেষণার মাধ্যমে এগিয়ে আসতে হয়। তাদের গবেষণালব্ধ ফলাফল দেশ এবং বিশ্বের সমস্যা সমাধানে সহায়ক হয়। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের মানসম্পন্ন গবেষণা যে কতটুকু কার্যকর হতে পারে, তার প্রমাণ দেশের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকদের গবেষণালব্ধ ফলাফল। যার বাস্তব প্রয়োগ  প্রিয় মাতৃভূমিকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ধীরগতিতে হলেও গবেষণার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে শুরু করেছে, যা আমাদের জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো— তাদের অর্জিত জ্ঞান ও গবেষণা ছাত্রছাত্রীদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া। এ কাজ করতে পেরে একজন শিক্ষক সর্বোচ্চ তৃপ্তি লাভ করেন। এ কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক যখন কোনও বিষয়ে পাঠদান করেন, তখন তা এমনভাবে উপস্থাপন হওয়া প্রয়োজন, যাতে সেই উপস্থাপনার মধ্যে নতুনত্বের অস্তিত্ব আছে বলে সবার কাছে, বিশেষত ছাত্রছাত্রীদের কাছে প্রতীয়মান হয়, তা যতই জানাশোনা বিষয় হোক না কেন। এ ধরনের উপস্থাপনার জন্য প্রয়োজন যথাযথ প্রয়াস এবং নিজের উদ্ভাবনী ক্ষমতাকে কাজে লাগানো। শুধু কোনও বই বা অন্য কোনও সোর্স থেকে তথ্য নিয়ে সেগুলো সরাসরি উপস্থাপন একজন বিশ্ববিদ্যালয়  শিক্ষকের আদর্শ শিক্ষাদান পদ্ধতি হতে পারে না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের হতে হয় আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী। আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বসম্পন্ন শিক্ষকরা বক্তৃতা, টিউটোরিয়াল, আলোচনা, সেমিনার, হাতে-কলমে প্রদর্শন এবং  কর্মশিবিরের মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনা এবং গবেষণায় আগ্রহী করে তোলেন।  তাদের ব্যক্তিত্বের কারণেই ছাত্রছাত্রীরা তার প্রদত্ত উপস্থাপনার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে। ছাত্রছাত্রীরা যাতে লার্নিংয়ের ক্ষেত্রে প্রো-অ্যাক্টিভ ভূমিকা পালন করতে পারে, সে উদ্যোগ  শিক্ষকদেরই নিতে হবে। এ পদ্ধতিতে একজন শিক্ষকের ভূমিকা হবে ডিক্টেটরের পরিবর্তে ফ্যাসিলিটেটরের, যেখানে ছাত্রছাত্রীরা শিক্ষক কর্তৃক নির্ধারিত বিষয়গুলো ক্লাসের আগেই দেখে আসবেন। ক্লাসে টপিকগুলোর ওপর আলোচনা হবে এবং কঠিন বিষয়গুলো শিক্ষক পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দেবেন। এটি  বর্তমান বিশ্বে বহুল প্রচলিত  শিক্ষা পদ্ধতি এবং বর্তমান প্যান্ডেমিক পরিস্থিতিতে খুবই সময় উপযোগী। ছাত্রছাত্রীদের ক্লাসে আরও বেশি ইন্টারেক্টিভ হওয়ার ক্ষেত্রেও আমাদের শিক্ষকদের ভূমিকা রাখতে হবে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এখনও পর্যন্ত আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষাদান পদ্ধতি একমুখী, যেখানে একজন শিক্ষক লেকচার প্রদান করেন এবং ছাত্রছাত্রীরা লেকচার শুনে, কিছু ক্ষেত্রে তারা কিছু নোট নেয় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা ক্লাসে অ্যাক্টিভলি পার্টিসিপেট করে না। শিক্ষাদানের এ পদ্ধতি থেকে আমাদের দ্রুত বের হয়ে এসে ছাত্রছাত্রীদের অ্যাক্টিভ লার্নিংয়ে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

শিক্ষকতার ক্ষেত্রে চাপ প্রয়োগের পরিবর্তে মোটিভেট করার মাধ্যমে, ছাত্রছাত্রীদের আগ্রহী করার মধ্যেই একজন শিক্ষকের সর্বোচ্চ সফলতা। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষকতায় ছাত্রছাত্রীদের চাপ সৃষ্টি ও বাধ্য করার মতো বিষয়গুলো থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে।  এমন পরিবেশ সৃষ্টি করা প্রয়োজন, যাতে ছাত্রছাত্রীরা নিজ থেকেই শিখতে আগ্রহী হয়। অনিচ্ছা সত্ত্বেও  ছাত্রছাত্রীরা শিক্ষকদের দেখামাত্রই  দাঁড়িয়ে যাবে। স্যার বলে সম্বোধন করবে। এ বিষয়গুলোর মাঝে কোনও শিক্ষক কখনও গৌরব অনুভব করেন না। মনভরা ভালোবাসা থাকলে কোনও ছাত্রছাত্রী আমাকে স্যার না ডেকে প্রফেসর বা ডক্টর নামে ডাকুক, বা আমাকে দেখে বসে থাকুক, এর মাঝেই আমি গর্ব অনুভব করবো। এর অন্যথা হলে শিক্ষক হিসেবে আমার অনেক কিছু করার বাকি আছে, একথা নির্দ্বিধায় বলতে পারি। শিক্ষকরা তা তারা যে পর্যায়েই শিক্ষকতা করুন না কেন, তাদের হতে হয় বন্ধুবৎসল, যাতে ছাত্রছাত্রীরা তাদের যাবতীয় সমস্যা শেয়ার করতে পারে। বাস্তবতা হলো, বিষয়গুলো থেকে এখনও আমরা অনেক দূরে, যদিও ধীরে ধীরে অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে। 

একজন শিক্ষককে তার ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন, রাষ্ট্রীয় জীবন, আন্তর্জাতিক জীবন এবং অর্থনৈতিক জীবনকে সমন্বয় করে চলতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক হবেন যেকোনও ব্যাপারে স্পষ্টভাষী এবং রাগ-বিরাগের বশবর্তী না হয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এ মানদণ্ড মেনে চলতে সক্ষম হচ্ছি কিনা, তা ভেবে দেখার সময় হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মাঝে সুস্থ প্রতিযোগিতা থাকতে কোনও দোষ নেই, বরং অনেক ক্ষেত্রেই তা প্রশংসার দাবিদার, বিশেষত তা যদি হয় গবেষণা  পরিচালনা, মানসম্মত কনফারেন্স, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ইত্যাদির আয়োজন বা এমন কোনও শিক্ষাদান পদ্ধতির প্রয়োগ, যার দ্বারা ছাত্রছাত্রী, সহকর্মী, বিশ্ববিদ্যালয়, এমনকি জাতি তথা বিশ্ব উপকৃত হয়। এর পরিবর্তে ছোটখাটো কিছু পদ-পদবির লোভে যদি শিক্ষকদের মাঝে বিভাজন সৃষ্টি হয়, তা অত্যন্ত দুঃখজনক। কে কোন পদের জন্য যোগ্য, কাকে কোন পদে নিয়োগ দিলে বিশ্ববিদ্যালয় তথা দেশের মঙ্গল হবে,এই বিষয়গুলো ভাবার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং দেশের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিজ্ঞজনের। এক্ষেত্রে কোনও অনুরাগ-বিরাগের বশবর্তী না হয়ে যথোপযুক্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভিসি, প্রো-ভিসি, ট্রেজারারসহ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পদস্থ ব্যক্তিবর্গ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমাদের শিক্ষকদের মধ্য থেকেই নিয়োগ প্রদান করা হয়ে থাকে। কাজেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা-গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনাসহ অন্যান্য অধিকাংশ বিষয়ের সফলতা-ব্যর্থতা আমাদের শিক্ষকদের ওপরই বর্তায়। একজন সফল প্রশাসক একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য যে কত বড় সম্পদ, তার প্রমাণ করোনাকালে আমাদের কিছু স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত উপাচার্যরা রেখে চলেছেন, যাদের গতিশীল নেতৃত্বে এই সময়েও সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষা-গবেষণাসহ অন্যান্য কার্যক্রম সুন্দরভাবে পরিচালিত হচ্ছে। কিছু দিন আগে বাংলাদেশের একটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের  সভাপতিত্বে একটি আন্তর্জাতিক কনফারেন্সের টেকনিক্যাল প্রোগ্রাম কমিটির একটি সভায় উপস্থিত ছিলাম। ওই সম্মানিত উপাচার্য  একটি প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ দায়িত্বে থাকা সত্ত্বেও তার নিজস্ব গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা, দেশের প্রতি তার ভালোবাসা এবং দায়িত্ববোধ, তার দৃষ্টিভঙ্গি, উদ্যোগ এবং দূরদৃষ্টি বিশ্ববিদ্যালয়টিকে একসময় বিশ্বের প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তালিকায়  স্থান দেবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। আমি এও বিশ্বাস করতে চাই, আমাদের অধিকাংশ উপাচার্য  তাদের মেধা, মনন এবং দূরদৃষ্টির মাধ্যমে নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয়কে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট যোগ্যতাসম্পন্ন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বিশ্বমানে উন্নীতকরণের যাবতীয় উদ্যোগ গ্রহণের কোনও বিকল্পও তাদের আছে বলে আমি মনে করি না। কারণ, এ গুরুদায়িত্ব সরকার তাদের ওপর অর্পণ করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বিশ্বমানে উন্নীতকরণের ক্ষেত্রে যেকোনও উপাচার্যের যেকোনও পদক্ষেপের সঙ্গে কোনও শিক্ষক কখনও দ্বিমত পোষণ করতে পারেন, তা আমি ভাবতেই পারি না, তিনি যে মত বা পথেরই হোন না কেন।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শত প্রতিকূলতা থাকা সত্ত্বেও এখনও পর্যন্ত মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে পারাটা অত্যন্ত গর্বের ব্যাপার হিসেবে প্রতীয়মান। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া এখনও মেধা তালিকার প্রথম দিকের ছাত্রছাত্রীরাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পায়। এ তরুণ শিক্ষকদের জন্য আমাদের যথাযথ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা একান্ত জরুরি, যাতে তারা শিক্ষাদান ও গবেষণা কার্যক্রমে যথাযথ মনোনিবেশ করতে পারেন। তাহলে আমাদের নবীন এবং প্রবীণ শিক্ষকদের সম্মিলিত প্রয়াসে  বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষা ও গবেষণায় একদিন বিশ্বের উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাতারে শামিল হবে। উচ্চশিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের  জন্য যথাযথ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা অতীব জরুরি। কারণ, উচ্চশিক্ষা অর্জন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। অন্তত যতদিন পর্যন্ত আমরা পিএইচডি বা সমমানের ডিগ্রিধারীদের শিক্ষক হিসেবে যোগদান নিশ্চিত করতে  না পারি। আমাদের  দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর  স্নাতকোত্তর প্রোগ্রামকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে যাবতীয় উদ্যোগ গ্রহণে আর কোনও দেরি করার সুযোগ নেই। এ প্রোগ্রামগুলোতে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তরুণ শিক্ষকরাসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা তাদের স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষকে যথাযথ বৃত্তির ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তারা দেশের বাইরে যাওয়ার পরিবর্তে দেশেই ডিগ্রি করতে আগ্রহী হয়।  আমাদের জানামতে, অন্যান্য অনেক পেশায় উচ্চশিক্ষার জন্য যে  পরিমাণ বৃত্তির ব্যবস্থা রয়েছে, সে তুলনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য বৃত্তির পরিমাণ অনেক কম। এ ক্ষেত্রে আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুততম সময়ে যথাযথ উদ্যোগ আশা করি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যেখানে জয়েন করেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, তারা প্রায় দীর্ঘ ৩০-৪০ বছর একই প্রতিষ্ঠানে থাকেন। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মাঝে একটি আত্মিক বন্ধন তৈরি হয়।  তাই তো তারা অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল, সিন্ডিকেট, ফিন্যান্স কমিটি, ডিসিপ্লিনারি কমিটিসহ বিভিন্ন অফিসিয়াল ফোরামে জোরালোভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে ভূমিকা রাখার জন্য তীব্র মতপার্থক্য করলেও মিটিং শেষে হাসিমুখে হাতে হাত ধরে বের হয়ে আসতে পারেন। শিক্ষকরাই বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনও নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলে সর্বপ্রথম প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠেন, তা তার যতদিনের জানাশোনা সহকর্মীর ব্যাপারেই হোক না কেন। এগুলোই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষকতার মাহাত্ম।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিয়ে ইদানীং অনেক রকম কথাবার্তা, যেমন তারা ক্লাস নেন না, ঠিকমতো অফিসে আসেন না, বাইরে ক্লাস নেন বা কনসালটেন্সি করেন  ইত্যাদি। এর কিছুটা ঠিক এবং অধিকাংশই অমূলক, কল্পনাপ্রসূত।  আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে যে  স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির বিষয় রয়েছে, সেগুলো সম্পর্কে অনেকে পুরোপুরি অবগত না থাকায় এ ধরনের সমালোচনা করছেন। একটা কথা সবার মাথায় রাখা দরকার, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সর্বদাই নিজের বিবেকের কাছে, ছাত্রছাত্রীদের কাছে, সমাজের কাছে, এমনকি সবার কাছে জবাবদিহি করতে হয়, যা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে।

তাই সবাইকে বিনীত অনুরোধ, শিক্ষকদের বিষয়ে পরিপূর্ণভাবে না জেনে, কোনও নেতিবাচক মন্তব্য না করে কীভাবে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশ্বমানে উন্নীত করা যায়, সেটা মাথায় রেখে সবাইকে স্বীয় অবস্থান থেকে একযোগে কাজ করি। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো  বিশ্বমানে উন্নীত করার বিষয়ে ভূমিকা রাখি। সমাজে এবং রাষ্ট্রে বিশ্ববিদ্যালয় তথা সব পর্যায়ের শিক্ষকদের যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করি। মহান সৃষ্টিকর্তা আমাদের সহায় হোন। 

লেখক: অধ্যাপক, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও কৌশল বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)

/এপিএইচ/এমওএফ/

সম্পর্কিত

ফেসবুকের পক্ষপাতমূলক আচরণ কেন?

ফেসবুকের পক্ষপাতমূলক আচরণ কেন?

অস্তিত্ব সংকটে আফগান নারীরা?

অস্তিত্ব সংকটে আফগান নারীরা?

চাপ নয়, শিক্ষা হোক আনন্দের

আপডেট : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৬:৩৬

প্রভাষ আমিন আমার প্রথম স্কুল চাঁদগাও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি আমাদের বাড়ির লাগোয়া। লাগোয়া মানে কখনও কখনও আমাদের বাগান ছিল স্কুলের শিক্ষার্থীদের খেলার মাঠ। আবার স্কুলের সামনের মাঠটিও ছিল আমাদের সারাবছরের খেলার মাঠ। এখন তো প্লে, কেজি ইত্যাদি করে ক্লাস ওয়ানে উঠতে তিন বছর লেগে যায়। আমাদের সময় বয়স পাঁচ হলে সরাসরি ক্লাস ওয়ান। বাড়ির লাগোয়া বলে স্কুলকে ঠিক স্কুল মনে হতো না। তো ক্লাস ওয়ানে থাকতেই একবার স্কুলে গিয়ে কিছুক্ষণ পর ফিরে এলাম। আম্মা জানতে চাইলেন, ফিরে এলাম কেন? আমি বললাম, স্কুলে জায়গা নেই। আম্মা কিছু বললেন না, খালি খাটের সঙ্গে বেধে আমাকে দিলেন বেদম পিটুনি। তারপর থেকে আর কখনও স্কুলে জায়গার অভাব হয়নি। হাইস্কুলে উঠে একবার রাষ্ট্রপতি প্রার্থী জেনারেল ওসমানীকে দেখতে স্কুল ফাঁকি দিয়েছিলাম। এছাড়া বরাবরই স্কুল ছিল আমাদের আনন্দের উৎস। 

আমার প্রাইমারি স্কুল দুটি। বাবার চাকরির সুবাদে চট্টগ্রামের মুরাদপুর এলাকার মোহাম্মদিয়া প্রাইমারি স্কুলেও কিছুদিন পড়েছি। প্রথম স্কুল বাড়ির লাগোয়া হলেও হাইস্কুল ছিল বেশ দূরে। গৌরিপুর সুবল আফতাব উচ্চ বিদ্যালয়ে যেতে আমাদের বাসে প্রথমে গৌরিপুর যেতে হতো। পরে রিকশা বা হেঁটে যেতে হতো স্কুলে। প্রাইমারি স্কুলের মতো আমার হাইস্কুলও দুইটা। মামার শিক্ষকতার আমি এসএসসি পাস করেছি চৌদ্দগ্রামের মুন্সীরহাট হাইস্কুল থেকে, যেটি বাড়ি থেকে প্রায় ১০০ মাইল দূরে। আমি খুবই সৌভাগ্যবান, আমার দুটি হাইস্কুলের ক্যাম্পাসই ছিল বড়, খোলামেলা, একাধিক বড় মাঠ ছিল। কারণে-অকারণে শিক্ষকদের মার খেয়েছি প্রচুর। তবে বন্ধুদের সাথে আড্ডা, খেলাধুলা, বিতর্ক, মারামারি, খুনসুটি- সব মিলে স্কুল ছিল মজার জায়গা।

শিশুদের সেই আনন্দের জায়গাটাই আমরা কেড়ে নিতে চেয়েছিলাম। ঢাকার ফ্ল্যাট বাড়ির স্কুলগুলো শিশুদের আনন্দের জায়গা হতে পারেনি। কারও কারও জন্য স্কুল মানেই যেন জেলখানা। আগের মতো এখন আর শিক্ষকদের পিটুনির ভয় নেই বটে, তবে স্কুল মানেই পড়াশোনার অনন্ত চাপ; ক্লাস, কোচিং, পরীক্ষা; দম ফেলার ফুরসত নেই কারও। দেড়বছর পর স্কুলে যেতে পেরে সবাই এখন উৎফুল্ল। কিন্তু পরীক্ষার চাপ এলেই সেই উচ্ছ্বাসটা হারিয়ে যেতে পারে। শহরের একটা ছেলের রুটিন দেখলে আমার কান্না পায়। ভোরে ঘুম থেকে উঠে যুদ্ধ শুরু। ঘুম চোখেই নাস্তা সারতে হয়; তাও নিজের পছন্দে নয়, মায়ের পছন্দে। তারপর ব্যাগ নিয়ে দৌড়। সেই ব্যাগেও থাকে নিজের নয়, মায়ের পছন্দের টিফিন। স্কুল ছুটি হয় দুপুর ২ টায়। দৌড়ে বাসায় এসে গোসল-খাওয়া শেষ করতে করতে কোচিংয়ের সময় হয়ে যায়। ৩টা থেকে ৬টা কোচিং খোয়াড়ে বন্দী। সেখান থেকে বাসায় ফিরে স্বাভাবিক হতে হতে দিনের ১২ ঘণ্টা শেষ। তারপর হোমওয়ার্ক। হোমওয়ার্ক করতে করতে একেটা শিশু ক্লান্তিতে ঢলে পড়ে। 

ছুটির দিনেও মাফ নেই। শুক্রবার সকালে কোচিং, যেদিন কোচিং থাকে না, সেদিনও বাসায় টিচার আসে। তাদের রুটিনে খেলা নেই, গান নেই, আউট বই পড়ার সুযোগ নেই। শুধু ছুটে চলা। কিসের পেছনে? আমি নিশ্চিত নই। পড়াশোনা? আসলে কি পড়াশোনা; নাকি নিছক রোল নম্বর আর সার্টিফিকেট? আসলে কোনটা সাফল্য, কোনটা ব্যর্থতা, আমি নিশ্চিত নই। তাহলে আমরা কিসের পেছনে ছুটছি, সন্তানদের ঠেলে দিচ্ছি কিসের রেসে। সাফল্য মানে আসলে কী?  আমরাই তো সন্তানদের শৈশব থেকে আনন্দ কেড়ে নিয়ে সেখানে ভর্তি করে দিচ্ছি অনন্ত চাপ। সাফল্য চাই, আরো সাফল্য। বোঝো আর না বোঝো সব মুখস্ত করতে হবে। তারপর পরীক্ষার খাতায় সব উগড়ে দিতে হবে। অমুক কেন তোমার চেয়ে ভালো, তমুক কেন নম্বর বেশি পেলো। 

যে হতে পারতো গানের পাখি, আমরা তাকেই বানাতে চাই তোতা পাখি। হাজার হাজার তোতা পাখি কিচির মিচির করছে আমাদের চারপাশে। আমরা বলি, শুধু পড়ো আর পড়ো। আমরা জানতে চাই না বা জানাতেও চাই না, আমাদের সন্তান গান শুনতে চায় কিনা, ফুল ভালোবাসে কিনা, প্রকৃতি তাকে টানে কিনা, শীতের সকালে শিশিরে পা ভেজাতে চায় কিনা, বৃষ্টিতে ভিজতে তার কেমন লাগে, গাছপালা-নদীনালার সৌন্দর্য্য আবিষ্কারের আনন্দ সে পেতে চায় কিনা। পরীক্ষায় ভালো করতে হবে; গোল্ডেন জিপিএ ৫ না পাওয়া বিরাট ব্যর্থতা। সুমনের গানের মতো ‘একটু পড়া, অনেক খেলা/গল্প শোনার সন্ধ্যাবেলা’ আর কারও জীবনে আসে না।

নীতি-নির্ধারকদের ধন্যবাদ। তারা শিশুদের এই পরীক্ষার চাপ থেকে মুক্তি দিতে যাচ্ছেন। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। কথায় কথায় আমরা বৈপ্লবিক পরিবর্তন বলি বটে, কিন্তু শিক্ষা ব্যবস্থার এই পরিবর্তন সত্যিই বৈপ্লবিক। ২০২৩ সাল থেকে ধাপে ধাপে নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার কথা। এতদিন একটি শিশু বোঝার আগেই তার ওপর চেপে বসতো পরীক্ষার চাপ। নতুন পরিকল্পনায় তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত কোনও পরীক্ষাই থাকছে না। আর দশম শ্রেণির আগে কোনও পাবলিক পরীক্ষা হবে না। এতদিন পঞ্চম শ্রেণিতে পিইসি আর অষ্টম শ্রেণিতে জেএসসি নামে দুটি চাপের পাহাড় ছিল শিশুদের কাঁধে। সেই পাহাড় দুটি সরিয়ে দিলে তারা একটু মাথা উঁচু করে, মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারবে। আর দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা হবে অভিন্ন বিষয়ে। সায়েন্স, আর্টস, কমার্সের বিভাজনটা শুরু হবে একাদশ শ্রেণি থেকে। একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির দুটি পরীক্ষার ভিত্তিতে দেওয়া হবে এইচএসসির ফল। তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পরীক্ষা না থাকলেও শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে। চতুর্থ শ্রেণির পর প্রথম পরীক্ষা শুরু হলে গুরুত্ব বেশি থাকবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক মূল্যায়নের ওপরই। সব মিলিয়ে পরীক্ষায় যেনতেনভাবে ভালো করার চাপের বদলে নিয়মিত ক্লাসরুমের পারফরম্যান্স গুরুত্ব পাবে বেশি। শিক্ষার্থীরা আনন্দের সঙ্গে নিজেদের মতো পড়াশোনা করবে। শিক্ষকরা তাদের মূল্যায়ন করবেন।

নতুন পরিকল্পনা অবশ্যই উচ্চাভিলাসী। তবে শিশুদের স্বার্থে এই পরিকল্পনার সুষ্ঠু বাস্তবায়ন জরুরি। তবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জও আছে। যেহেতু শিক্ষকদের মূল্যায়নের গুরুত্বটাই সবচেয়ে বেশি। তাই তাদের যোগ্যতা, দক্ষতা বাড়ানোটা জরুরি। তারচেয়ে বেশি জরুরি শিক্ষকদের নৈতিক মান বাড়ানো। শিক্ষকদের ধারাবাহিক মূল্যায়নই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে, এটা শোনার পর আমি রীতিমত আতঙ্কিত হয়েছি। শিক্ষকদের কাছে প্রাইভেট না পড়লে ক্লাস পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেওয়ার হুমকি বা ফেল করিয়ে দেওয়ার উদাহরণ ভুরি ভুরি। এই বিষয়টার প্রতি খেয়াল রাখতে হবে সবচেয়ে বেশি। প্রশিক্ষণ দিয়ে শিক্ষকদের যোগ্যতা, দক্ষতা হয়তো একটা পর্যায় পর্যন্ত বাড়ানো যাবে। কিন্তু শিক্ষকদের নৈতিকতার মানদণ্ড রক্ষা করাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। শিক্ষার্থীরা স্কুলে শুধু পাঠ্যবই শিখতে যায় না। সেখানে তাদের জীবন শেখানো হয়। তাই শিক্ষকদের কাছ থেকে নৈতিকতা শিখবে, মূল্যবোধ শিখবে। প্রাইভেট-কোচিংয়ের ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করতে হলে শিক্ষকদের বেতন কাঠামো নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। শিশুদের জন্ম নেয় নিষ্পাপ হিসেবে। আমরা তাদের নানা প্রতিযোগিতায় ঠেলে দেই। ফাঁস হওয়া প্রশ্ন পয়সা দিয়ে কিনে সন্তানের হাতে তুলে দেই। কীভাবে পাশের বন্ধুকে ল্যাং মেরে সামনে এগিয়ে যেতে হবে, আমরা সন্তানদের সেই শিক্ষা দেই। গাইড বই, নোট বই আমরাই কিনে তাদের জাতে তুলে দেই। তারা শিখে যায়, ফল ভালো করতে হলে অমুক শিক্ষকের কাছে কোচিং করতে হবে। এভাবে ঘরে-বাইরে, স্কুলে শিশুদের অনৈতিকতা শেখাই। তাদের ভবিষ্যৎ গড়ার বদলে শৈশবেই তা ধ্বংস করে দেই। 

চ্যালেঞ্জ আছে বলে থেমে থাকা যাবে না। সামনে যত বাধাই আসুক শিশুদের স্বার্থে সব বাধা পেরিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। আমরা চাই আমাদের প্রতিটি সন্তান মানুষের মতো মানুষ হোক। তারা শিক্ষায়, জ্ঞানে, মানবিকতার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। কেউ কাউকে ল্যাং মেরে এগিয়ে যাবে না। সবাই সবার পাশে থাকবে, একসাথে এগিয়ে যাবে। তাদের জীবনটা যুদ্ধের না হোক, হোক আনন্দের, সৃষ্টিশীলতার। দেশের ভবিষ্যতটা তো তাদেরই হাতে। তাই তাদের পেছনেই আমাদের সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করতে হবে।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

/এসএএস/

সম্পর্কিত

‘চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনি’

‘চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনি’

‘সভ্য সমাজে এগুলো হতে পারে না’

‘সভ্য সমাজে এগুলো হতে পারে না’

১৫ আগস্টের দায় কেন বিএনপির?

১৫ আগস্টের দায় কেন বিএনপির?

‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই, তবে...’

‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই, তবে...’

আমি কেন তালেবানকে সমর্থন করি না?

আপডেট : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৫:২৩

মো. জাকির হোসেন দীর্ঘ দুই দশক পর তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতায় পুনরায় ফিরে আসার পর বিশ্বের নানা প্রান্তে তাদের পক্ষে-বিপক্ষে নানা বক্তব্য-বিতর্ক চলছে। ইয়েমেনসহ কিছু দেশে জিহাদিরা তালেবানের বিজয়ে আতশবাজি পুড়িয়েছে, সোমালিয়ায় মিষ্টি বিতরণ করেছে, দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের ইসলামপন্থী সংগঠনগুলো এ ঘটনাকে স্বাগত জানিয়েছে। বাংলাদেশের কিছু মানুষ তালেবানে এতটাই মজেছে যে, পারলে কিছু তালেবান ভাড়া করে এখনই সরকারকে বিদায় করে দেয়। 

আমি তালেবানের সমর্থক নই। আবার তালেবানের বিরুদ্ধে যারা সোচ্চার তাদের পক্ষেও নই। যেসব কারণে আমি তালেবানকে সমর্থন করতে পারছি না, তা হলো – এক. ইসলামি শরিয়া আইন বাস্তবায়নের নামে তালেবান নিজেরাই কোরআন-হাদিসের বিধান লঙ্ঘন করছে। আমি কয়েকটি উদাহরণ উল্লেখ করছি। তালেবানের ভয়ে মানুষ দেশ ছেড়ে পালাতে মরিয়া। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ রাসুল (সা.) উদ্দেশ করে বলেন, ‘আল্লাহর অনুগ্রহে আপনি তাদের প্রতি কোমল হৃদয় হয়েছেন। যদি আপনি তাদের প্রতি রূঢ় ও কঠোরচিত্ত হতেন, তবে তারা আপনার পাশ থেকে সরে যেত।...’ (সুরা আল ইমরান: ১৫৯) 

রূঢ় ও কঠোরচিত্ত তালেবানের নৃশংসতা, নিপীড়ন, নির্যাতনের ভয়ে মানুষ নিজ মাতৃভূমি ছেড়ে যেতেও কুণ্ঠিত নয়। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে কোনও ভাই যেন তরবারি দিয়ে তার ভাইয়ের প্রতি ইঙ্গিত না করে। কেননা, তোমরা জান না, শয়তান তার মধ্যে হাত রেখে টানতে থাকে, তারপর সে জাহান্নামের গর্তে পড়ে যায়। (মুসলিম, ৬৫৬২)। 

পাঞ্জশির তালেবান যোদ্ধাদের দখলে এই খবর শোনার পর কাবুলের তালেবানেরা ফাঁকা গুলিবর্ষণের মাধ্যমে বিজয় উদযাপন করে। এতে অন্তত ১৭ জন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৪১ জন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘…যে ব্যক্তি নরহত্যা অথবা পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কাজ করার দণ্ডদান উদ্দেশ্য ছাড়া কাউকে হত্যা করে, সে যেন পৃথিবীর সব মানুষকেই হত্যা করলো। আর কেউ কারও প্রাণ রক্ষা করলে সে যেন পৃথিবীর সব মানুষের প্রাণ রক্ষা করলো ।… (সুরা মায়েদাহ: ৩২)। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে: ‘দুনিয়া ধ্বংস করার চেয়েও আল্লাহর কাছে ঘৃণ্যতর কাজ হলো মানুষ হত্যা করা।’ (তিরমিযি, ১৩৯৫)। অন্য এক হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যদি আকাশ ও পৃথিবীর সবাই মিলেও কোন মু’মিন হত্যায় অংশগ্রহণ করে তবু আল্লাহ তা’আলা তাদের সবাইকে মুখ উপুড় করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন।’(তিরমিযি, ১৩৯৮)। 

আল্লাহ বলেন, “প্রত্যেকে নিজ নিজ কর্মের জন্য দায়ী থাকবে। কেউ অন্যের (পাপের) বোঝা বহন করবে না।…।”(সুরা আনআম: ১৬৪)। তালেবানদের প্রতিপক্ষকে সহায়তা করার অপরাধে অভিযুক্ত আফগান নাগরিককে না পেয়ে পরিবারের সদস্যদের হত্যা করেছে তালেবান, যা কোরআনের বিধানের লঙ্ঘন। পাঞ্জশিরে আফগানিস্তানের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট আমরুল্লাহ সালেহর ভাই রুহুল্লাহ আজিজীকে হত্যার পর পরিবারকে তার দেহ দাফন করতে দেয়নি তালেবান। তারা বলেছে, তার শরীর পচা উচিত। অথচ রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘একজন মুসলমানের ওপর অন্য মুসলমানের ছয়টি হক আছে।’ এর একটি হলো, ‘মৃত্যুবরণ করলে তার জানাজায় উপস্থিত হওয়া।’ (মুসলিম, ৪০২৩) শান্তি, সম্প্রীতি, ক্ষমা, সহনশীলতা ও ভালোবাসার নাম ইসলাম। উগ্রতা, বিদ্বেষ, প্রতিহিংসা, প্রতিশোধপরায়ণতা, সাম্প্রদায়িকতা ইসলাম নয়। অবিশ্বাসীরা রাসুল (সা.)-কে নানাভাবে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করেছে, নামাজরত অবস্থায় তাঁর মাথায় উটের পচা-গলিত নাড়িভুঁড়ি ও আবর্জনা নিক্ষেপ করেছে, তাঁর চলার পথে কাঁটা বিছিয়ে রেখেছে, তাঁকে পাথর দিয়ে আঘাত করেছে। মাতৃভূমি ত্যাগ করতে যারা বাধ্য করেছিল, মুসলমানদের ঘরবাড়ি থেকে যারা বিতাড়ন করেছে, লুটপাট করেছে, মুসলমানদের সম্পত্তি দখল করে নিয়েছে, রাসুল (সা.)-এর চাচা হামজা (রা.)-এর কলিজা যে চিবিয়েছে, উহুদের যুদ্ধে শহীদ সাহাবাগণের মৃতদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে যারা খণ্ড-বিখণ্ড-বিকৃত করেছে, মক্কা বিজয়ের পর হাতের কাছে পেয়েও তিনি তাদের কোনও প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। বরং সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে সবাইকে উদারতা ও ক্ষমার চাদরে ঢেকে দিয়ে বলেছিলেন, আজ তোমাদের ওপর আমার কোনও অভিযোগ নেই, তোমরা মুক্ত। 

চাচা আবু তালিব ও স্ত্রী খাদিজার (রা.) মৃত্যুর পর কুরাইশরা রাসুলের ওপর অত্যাচার ও নির্যাতনের মাত্রা আরও বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছিল। মক্কার মাটিতে তিনি আর টিকতেই পারছিলেন না। তিনি তায়েফবাসীর কাছে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে গিয়েছিলেন। দীর্ঘ ১০ দিন পর্যন্ত তিনি ঘুরে ঘুরে ইসলামের আহ্বান জানাতে থাকেন। কিন্তু তারা তাঁর কথায় কোনোই কর্ণপাত করলো না; বরং তারা রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করছিল। অবশেষে তারা সন্ত্রাসী দুষ্ট যুবকদের লেলিয়ে দিলো। যুবকরা রাসুল (সা.)-কে পাথরের আঘাতে জর্জরিত করে তুললো। রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁর জীবন-আশঙ্কা দেখা দিলো। মহানুভব রাসুল (সা.) তায়েফবাসীদের এহেন আচরণ সত্ত্বেও আল্লাহর কাছে তাদের জন্য ক্ষমা ও করুণা প্রার্থনা করেন। 

অথচ তালেবান কাবুল দখলের পর প্রতিশোধ নিতে বেশ কয়েকজনকে হত্যা করেছে, সাংবাদিকদের পিটিয়ে মারাত্মক জখম করেছে। 

দুই. ইসলামে জিহাদ ইবাদত। ইবাদত কবুলের অন্যতম শর্ত হলো উপার্জন হারাম হতে পারবে না। একাধিক রিপোর্টে প্রকাশ, তালেবান বেশিরভাগ অর্থ সংগ্রহ করেছে মাদক বিক্রি, চাঁদাবাজি ও অপহরণের পর মুক্তিপণ থেকে। স্পেশাল ইন্সপেক্টর জেনারেল ফর আফগান রিকন্সট্রাকশন (সিগার)-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, মাদক ব্যবসা এবং চোরাচালানের মাধ্যমে বছরে ১০০ থেকে ৪০০ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে তালেবান। রিপোর্ট অনুযায়ী, তালেবানের বার্ষিক রাজস্বের প্রায় ৬০ শতাংশ আসে এ খাত থেকে। ইসলামে এর সবই হারাম। 

তিন. শরিয়া আইনের বিধান রাতারাতি কার্যকর করতে চায় তালেবান। শরীরে জটিল অসুখ হলেও সেরে ওঠতে সময় লাগে। আর অন্তরের অসুখ তো ভয়ংকর, তা দূর করতে সময় দরকার। শত শত বছর ধরে মানুষ ইসলাম থেকে দূরে সরে গেছে। বহু শতাব্দী ধরে ইহুদি, নাসারা, মুশরিক, অবিশ্বাসীদের জীবনযাপন, সভ্যতা-সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে যে অন্তর, তা কী চাবুক মেরে তাৎক্ষণিক পরিবর্তন করা যাবে? কোরআন-হাদিসে নবী-রাসুলদের ঘটনা সাক্ষ্য দেয়, তাঁরা যুগ যুগ ধরে মানুষকে আল্লাহর পথে আহ্বান করেছেন। তা সত্ত্বেও কোনও কোনও নবী-রাসুলের আহ্বানে হাতে গোনা কয়েকজন সাড়া দিয়েছেন। এমনকি কোনও নবীর আহ্বানে একজনও সাড়া দেননি। 

আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত: একদিন রাসুল (সা.) বললেন, ‘আমার কাছে সব উম্মতের লোকদের পেশ করা হলো। আমি দেখলাম, কোনও নবীর সঙ্গে মাত্র সামান্য কয়জন (৩ থেকে ৭ জন অনুসারী) লোক রয়েছে। কোনও নবীর সঙ্গে একজন অথবা দুই জন লোক রয়েছে। কোনও নবীকে দেখলাম তাঁর সঙ্গে কেউই নেই!...।’ (বুখারি, ৫৭০৫; ৩৪১০; তিরমিযি, ২৪৪৬; মুসনাদে আহমাদ, ২৪৪৪)। 
মক্কায় আল্লাহর আইন চালু করতে না পেরে রাসুল (সা.) মদিনায় গিয়ে সফল হন। মদিনার সংহতির চিন্তা করে রাসুল (সা.) সেখানকার অধিবাসীদের নিয়ে তথা পৌত্তলিক, ইহুদি, খ্রিষ্টান এবং মুসলিমদের মধ্যে এক লিখিত সনদ বা চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এ সনদকেই ‘মদিনা সনদ’ বলা হয়। মদিনা সনদে বলা হয়, স্বাক্ষরকারী ইহুদি, খ্রিষ্টান, পৌত্তলিক ও মুসলিমরা মদিনা রাষ্ট্রে সমান নাগরিক অধিকার ভোগ করবেন এবং একটি জাতি (উম্মাহ) গঠন করবেন। সব শ্রেণির লোক নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করতে পারবেন। 

চার. তালেবান নারী শিক্ষা নিয়ে গড়িমসি করছে। নারীরা শিক্ষা বঞ্চিত হলে নারীদের জন্য নারী ডাক্তার, নারী শিক্ষক কীভাবে তৈরি হবে? পর্দা বজায় রেখে শিক্ষাগ্রহণ কি ইসলামে নিষিদ্ধ? 

পাঁচ. জোর করে চাপিয়ে দিয়ে, ভয় দেখিয়ে ইসলামি শাসন কায়েম করতে চায় তালেবান। রাসুল (সা.) যখন পৃথিবীতে আসেন তখন জাহেলি তথা অন্ধকারের যুগ ছিল, তাগুতের শাসন ছিল। রাসুল (সা.) কি এই অবস্থা পরিবর্তনের জন্য জোর করে, নেতিবাচক পন্থায়, নৈরাজ্য ও ধ্বংসাত্মক পন্থা অবলম্বন করেছিলেন, না সুন্দর ব্যবহার, উত্তম চরিত্র, আল্লাহর পথে আহ্বান, আত্মগঠন ও সমাজ-সংস্কারের মাধ্যমে পরিবর্তন ঘটিয়েছিলেন? তালেবান তাহলে কার অনুসরণ করছে? আল্লাহর আইন বা ইসলাম প্রতিষ্ঠার কাজ করতে হলে তা শুধু আল্লাহর কোরআন ও রাসুল (সা.)-এর দেখানো পথেই করতে হবে। ইসলামের নামে কোনও শায়খের খামখেয়ালিপনা কিংবা ইসলামের শিক্ষা ও আদর্শবিরোধী পন্থায় ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। পিটিয়ে, আঘাত করে, ভয় দেখিয়ে, নিষ্ঠুরতা বা নৃশংসতার মাধ্যমে নয়, বরং দাওয়াতের ভিত্তিতে মদিনার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ ইসলামি জীবন ব্যবস্থা মেনে নিয়েছিলেন, এবং রাসুল (সা.)-কে তাদের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। 

আল্লাহ তা’আলা রাসুল (সা.)-কে বলেন: “আপনি মানুষকে দাওয়াত দিন আপনার রবের পথে হিকমত ও উত্তম কথার মাধ্যমে এবং তাদের সঙ্গে তর্ক করুন উত্তম পদ্ধতিতে।…” (সুরা নাহল: আয়াত ১২৫)। উত্তম তর্ক হচ্ছে- কোমলতা ও দয়ার মাধ্যমে, ইসলামের বুনিয়াদি দিকগুলো তুলে ধরা। অবশ্যই নম্রতার সঙ্গে মানুষকে আল্লাহর পথে দাওয়াত দিতে হবে। এমনকি মহান রব মুসা (আ.) ও তাঁর ভ্রাতা হারুন (আ.)-কে পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম অত্যাচারী শাসক নিজেকে আল্লাহ বলে দাবিকারী ফিরাউনকে পর্যন্ত নম্রতার সঙ্গে দাওয়াত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, “তোমরা উভয়ে ফিরাউনের নিকট যাও, সে তো সীমা লঙ্ঘন করেছে। তোমরা তার সঙ্গে নম্র ভাষায় কথা বলবে, হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভয় করবে।” (সুরা ত্বহা: আয়াত ৪৩-৪৪)। 

বাস্তব জীবনে কোনও কিছুর ভিত তৈরি হয়ে পূর্ণতা পেতে যেমন সময়, পরিশ্রম ও ধৈর্যের প্রয়োজন তেমনি মানুষের অন্তরগুলো গড়ে তুলতে এবং সেগুলোকে সত্যের পথে নিয়ে আসতে সময়, ধৈর্য ও ত্যাগের প্রয়োজন। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘…যাকে মানুষ তাদের জান ও মালের জন্য নিরাপদ মনে করে সে-ই প্রকৃত মুমিন।’ (তিরমিযি,২৫৫১; নাসাঈ, ৪৯০৯)। অন্য হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘কেবল হতভাগ্য ব্যক্তির হৃদয় থেকেই দয়া তুলে নেওয়া হয়।’ (তিরমিযি, ১৯২৩)। 

ছয়. চীন সরকার উইঘুর মুসলিমদের নামাজ-রোজা পালনে বাধা দিচ্ছে, হারাম খাদ্যগ্রহণে বাধ্য করাসহ নিষ্ঠুর নির্যাতন করছে। অথচ তালেবান তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তুলছে। ইসলামে সব অমুসলিমের সঙ্গে বন্ধুত্ব নিষিদ্ধ নয়। এমন অমুসলিমের সঙ্গে বন্ধুত্ব বা মেলামেশা করা যাবে, যে ইসলামকে কটাক্ষ করে না, উপহাস করে না, কটূক্তি করে না, মুসলিমকে দ্বীন থেকে দূরে সরিয়ে নিতে চায় না। কিন্তু তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করা যাবে না যে ইসলামের বিরুদ্ধে কথা বলে, কাজ করে। মহান আল্লাহ তা’আলা বলেন, “…আল্লাহ কেবল তাদের সাথে বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করেন, যারা ধর্মের ব্যাপারে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, তোমাদের দেশ থেকে বহিষ্কৃত করেছে এবং বহিষ্কারকার্যে সহায়তা করেছে। যারা তাদের সাথে বন্ধুত্ব করে তারাই জালেম।” (সুরা মুমতাহিনা: ৮-৯)।

তালেবান শরিয়া আইন চালুর কথা বলছে। মুসলমান হিসেবে আমার অবশ্যই এর বিরোধিতা করা উচিত নয়। পবিত্র কোরআনের সুরা মায়েদার ৪৪নং আয়াতে বলা হয়েছে, “আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী যারা বিধান দেয় না, তারাই কাফির।” পরবর্তী ৪৫নং আয়াতে বলা হয়েছে, “আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী যারা বিধান দেয় না, তারাই জালিম।” এর পরবর্তী ৪৭নং আয়াতে বলা হয়েছে, “আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী যারা বিধান দেয় না, তারাই ফাসিক (পাপাচারী)।” ইবন আব্বাস (রা.) বলেন, ‘যে কেউ আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তা অস্বীকার করবে সে অবশ্যই কাফের হয়ে যাবে। আর যে কেউ তা স্বীকার করবে, কিন্তু বাস্তবায়ন করে তদানুসারে বিধান দিবে না সে জালেম ও ফাসেক হবে’ (তাবারি)। 

তালেবান মুখে শরিয়া আইনের কথা বললেও তাদের অনেক কর্মকাণ্ড কেবল ইসলামের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণই নয়, কিছু ক্ষেত্রে তা কোরআন-হাদিসের বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। শরিয়ার বিধান চালুর নামে কোনও শায়খের খামখেয়ালিপনা কিংবা ইসলামের শিক্ষা ও আদর্শবিরোধী পন্থা সমর্থনযোগ্য নয়।

লেখক: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ই-মেইল: [email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

পরীমণি, ‘সরি মণি’

পরীমণি, ‘সরি মণি’

রাজনীতি ও ইতিহাসের ভুল পাঠ ও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে শত্রুতা

রাজনীতি ও ইতিহাসের ভুল পাঠ ও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে শত্রুতা

বিপদ ডেকে আনছে ভারত, ঝুঁকি বাংলাদেশেরও

বিপদ ডেকে আনছে ভারত, ঝুঁকি বাংলাদেশেরও

বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের

বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের

বিষয়টি ‘কথার কথা’ নয়

আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৮:৩৪

রেজানুর রহমান আমার আজকের লেখাটা একটু অন্যরকম। সবার পছন্দ নাও হতে পারে। কারণ, সংস্কৃতি নিয়ে আলাপ-আলোচনা আমরা অনেকেই পছন্দ করি না। গানবাজনা, নাটক, চলচ্চিত্র, শিল্পকলা এসব নিয়ে কথা বলার কী কোনও মানে হয়? শুধু শুধু সময় নষ্ট। যারা এমনটা ভাবেন, আমার ধারণা তারা একটু স্বার্থপর। একটু খেয়াল করলেই দেখবেন, দেশের সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সংস্কৃতি কর্মীরাই ছিল প্রথম সারির সৈনিক। যেকোনও সংকটকালেই তাদের প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু প্রয়োজন শেষ, আর সংস্কৃতি কর্মীদের কথা মনে থাকে না।

এই করোনাকালের কথাই ধরি। গত দেড় বছর অন্যান্য সেক্টরের মতো দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনও ঝিমিয়ে ছিল। সিনেমা হল বন্ধ, নাটকের মঞ্চায়ন বন্ধ। সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে তালা ঝুলেছে। সবার একটাই প্রত্যাশা ছিল, নিশ্চয়ই আবার সবকিছু স্বাভাবিক হবে। আবার জমবে মেলা, বটতলা হাটখোলায়। আশার কথা, করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় দেশের সবকিছুই এখন স্বাভাবিক গতিতে চলমান হওয়ার চেষ্টা করছে। তবে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অবস্থা খুবই করুণ। দীর্ঘ দেড় বছরের বিরতি দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে এতটাই কাহিল করে তুলেছে যে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়। একটা ছোট্ট উদাহরণ দেই। খেয়াল করলেই দেখবেন, রাজনৈতিক, সামাজিক, এমনকি পারিবারিক অনুষ্ঠানেও আমরা শিল্পীদের ডেকে আনি। নাচ গান, বিশেষ করে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছাড়া কোনও কিছুই জমে না। সে কারণে যেকোনও আয়োজনের আগে শিল্পীরা হয়ে ওঠেন অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর কারও কারও কাছে আদরের শিল্পীরাই হয়ে ওঠেন অনেক ঝামেলার। ‘আরে ভাই এত টাকা টাকা করেন কেন? টাকা দিবো না এ কথা বলেছি নাকি? চিন্তা করবেন না। কাল, পরশু টাকা পেয়ে যাবেন...’।

এখন প্রশ্ন হলো শিল্পীদের কি সংসার নেই? তাদের কি খেতে হয় না? তাদের কি বাড়ি ভাড়া দিতে হয় না? এই করোনাকালে নাটক, সিনেমা ও সংগীতাঙ্গনের মানুষরাই সীমাহীন বিপাকে পড়েছে। আয় রোজগারের পথ বন্ধ থাকায় বাধ্য হয়ে ভিন্ন পেশা বেছে নিয়েছেন অনেকে। একটাই আশা ছিল, করোনার সংক্রমণ কমে গেলে নিশ্চয়ই সবকিছু আবার স্বাভাবিক হবে। রাষ্ট্র নিশ্চয়ই শিল্পীদের পাশে দাঁড়াবে। কিন্তু তার তো কোনও লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। নাটকের মঞ্চ খুলে গেছে। সিনেমা হল খুলে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমরা কি জানি এই সেক্টরের মানুষগুলো কতটা আর্থিক বিপদে আছেন? সাংস্কৃতিক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানগুলোর কথাই বলি। গত দেড় বছরে অনেকে ভাড়া দিতে না পারায় অফিস ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। ফলে নাটকের সেট, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সরঞ্জামাদি, যেমন- হারমোনিয়াম, তবলা ইত্যাদি নষ্ট হয়ে গেছে। আর্থিক সংকটে আবার ঘুরে দাঁড়াবার শক্তি পাচ্ছে না অনেক সাংস্কৃতিক ও নাট্য সংগঠন। তাই দাবি উঠেছে আর্থিক প্রণোদনার। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির ৩টি মিলনায়তন ঢাকার নাট্যকর্মীদের অনেক আস্থার জায়গা। কর্তৃপক্ষ মিলনায়তনগুলো খুলে দিয়েছেন। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে অনেক সংগঠনের পক্ষে এখন  নিয়মিত নাটক করা সম্ভব হবে না। এটাই চরম বাস্তবতা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মঞ্চপাড়ায় হল ভাড়া মওকুফ অথবা বিশেষ প্রণোদনার দাবি উঠেছে। দেশের শীর্ষ সারির দুটি নাট্য সংগঠন যথাক্রমে ঢাকা থিয়েটার ও আরণ্যক সাফ জানিয়ে দিয়েছে, হল ভাড়া মওকুফ অথবা বিশেষ প্রণোদনা না পেলে তারা বরাদ্দপ্রাপ্ত তারিখে মঞ্চ নাটক করবে না!

ঢাকা থিয়েটার-এর প্রধান নাসির উদ্দিন ইউসুফ বলেছেন, ঢাকাস্থ শিল্পকলা একাডেমি ও সারাদেশে শিল্পকলা একাডেমির হল ভাড়া মওকুফ করা ও সব সাংস্কৃতিক সংগঠনকে করোনা প্রণোদনা না দেওয়ার প্রতিবাদে আমরা ১৭ সেপ্টেম্বর শিল্পকলায় নাটক করবো না। তিনি আরও বলেছেন, করোনা মহামারির কারণে দেশের প্রায় সব সাংস্কৃতিক সংগঠনই আর্থিক সংকটে পড়েছে। এ ব্যাপারে সরকারের দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন।

শিক্ষার পরেই আমরা সংস্কৃতির কথা বলি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার ক্ষেত্রে আমরা যে ধরনের আন্তরিকতা দেখিয়েছি, তার ছিটেফোঁটাও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে না। যদিও শিক্ষার সঙ্গে সংস্কৃতির এমন তুলনা করা ঠিক হয়। কিন্তু শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে সংস্কৃতিরও উন্নয়ন তো জরুরি। অনেকেই হয়তো ব্যাপারটা খেয়াল করছেন না। অথবা খেয়াল করলেও দেখেও না দেখার ভান করে এড়িয়ে যাচ্ছেন। সমস্যা বাড়িয়ে তুলেছে আকাশ সংস্কৃতি। মোবাইল ফোন সংস্কৃতির আগ্রাসন ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আকাশ সংস্কৃতিই ভেসে আসছে মোবাইল ফোনে। আমাদের ভালো সিনেমা নেই, সাংস্কৃতিক চর্চা নেই, মঞ্চ নাটক নেই। ফলে প্রায় প্রতিটি পরিবারে আকাশ সংস্কৃতিই প্রভাব ফেলছে। আমাদের তরুণ প্রজন্ম ভিনদেশের তারকাদের যেভাবে চিনে নিজ দেশের তারকাদের সেভাবে চিনে না! তরুণ প্রজন্মের মধ্যে দেশের চেয়ে বিদেশি সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ দিনে দিনে বাড়ছে। এমন একটা নাজুক পরিস্থিতিতে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বলিষ্ঠ ভূমিকা দরকার। কিন্তু সেটা কীভাবে সম্ভব? কথায় আছে, অভাব দেখা দিলে গভীর প্রেমও দরজা-জানালা দিয়ে পালিয়ে যায়। করোনা দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে মারাত্মক আর্থিক সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। কাজেই আর্থিক প্রণোদনা ছাড়া বোধকরি সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে জাগিয়ে তোলা যাবে না। এটা ‘কথার কথা’ এমন বিষয় না। জরুরি ভেবে দেখার বিষয়।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক: আনন্দ আলো।

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

স্কুল যেন এবার আনন্দের হয়

স্কুল যেন এবার আনন্দের হয়

এক হাত পরীর, অন্য হাত কার?

এক হাত পরীর, অন্য হাত কার?

দেশের বড় সেতুগুলোর নিরাপত্তা কি আছে?

দেশের বড় সেতুগুলোর নিরাপত্তা কি আছে?

মডেল মানেই কি রাতের রানি?

মডেল মানেই কি রাতের রানি?

কাজের কথা

আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৬:১৭

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা মাথা তুলছে বেকারত্ব, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ। করোনার বিধিনিষেধ উঠে যাওয়ায় অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের গতি বাড়ছে। শহর, উপ-শহর ও গ্রাম– সারা দেশেই কাজের গতি এসেছে। কিন্তু মানুষের জন্য কাজ তৈরির পথ এখনও মসৃণই হয়নি। কর্মসংস্থানের ছবিতে অর্থনীতির গতির প্রতিফলন কম। খেটে খাওয়া মানুষ যদিওবা কিছু একটা করে টিকে থাকছে, বেশি বিপদে পড়েছে শিক্ষিত জনগোষ্ঠী।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস)-এর এক জরিপে উঠে এসেছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলো থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের ৬৬ শতাংশ অর্থাৎ দুই-তৃতীয়াংশই বেকার থাকছেন। ২১ শতাংশ শিক্ষার্থী স্নাতক কিংবা স্নাতকোত্তর শেষ করে চাকরি পান। ৭ শতাংশ শিক্ষার্থী এখনও অন্য কোনও বিষয়ে স্নাতকোত্তর বা কারিগরি শিক্ষা গ্রহণ করছেন কিংবা প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। ৩ শতাংশ স্ব-উদ্যোগে কিছু করছেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজগুলোতে এখন মোট শিক্ষার্থী আছেন ২০ লাখের মতো।

ছবিটা উদ্বেগজনক। যোগ্য চাকরি জোগাড় করা দুরূহ কাজ। কিন্তু উপরোক্ত চিত্র জানিয়ে দেয় যে উপযুক্ততা অনেক দূরের ব্যাপার, একটা কাজই জোগাড় হচ্ছে না বেশিরভাগ তরুণ-তরুণীর। সমস্যাটি কেবল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নয়। অন্যান্য পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যারা স্নাতক সম্মান ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েছেন, তাদের চাকরির বাজারও ভালো নয়।

বিআইডিএস প্রসিদ্ধ প্রতিষ্ঠান। তার গবেষণার মূল্য এবং গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন নেই। সেই সংস্থা যখন এমন তথ্য দেয়, তখন তাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হয়। বাংলাদেশে বেকারত্বের হার সাধারণত শিক্ষিতদের মধ্যেই বেশি হয়ে থাকে। এখানেই শিক্ষা আর কাজের সম্পর্ক নিয়ে আমাদের ভাবতে হয়। অর্থনীতির আলোচনায় কর্মসংস্থানের সমস্যা নিয়ে যে আলোচনা হয়, সেখানে নীতি-নির্ধারকদের দিক থেকে যতটা প্রতিশ্রুতি থাকে, ততটা থাকে না সমাধানের ইঙ্গিত। সম্পদ আর কর্মসংস্থান সৃষ্টিই অর্থনৈতিক পরিকল্পনার আসল উদ্দেশ্য।

বাংলাদেশ এখন উচ্চ প্রবৃদ্ধির দেশ। মানুষের মাথাপিছু আয়ও বেশি। সেই বাস্তবতায় কর্মসংস্থানে সাফল্যই প্রত্যাশিত। বিসিএস দিয়ে সরকারি চাকরি পেতে তরুণ সমাজের মধ্যে আকাঙ্ক্ষাই বলে দেয় কর্ম সৃজনের জন্য যে শক্ত ব্যক্তি খাত প্রয়োজন, সেটা আমরা গড়ে তুলতে পারিনি কিংবা যেটুকু গড়ে উঠেছিল সেটা নষ্ট করেছি।

বেকারত্ব কমানোর সরকারি প্রচেষ্টা থাকবে, সেটাও ঠিক। কিন্তু বিআইডিএসের গবেষণা-ফল বলে দিচ্ছে, বাংলাদেশে এখন শিক্ষার সঙ্গে চাকরি বা কর্মসংস্থানের সম্পর্কগত ধারণা বদলে যাচ্ছে। শিক্ষিত হলেই কাজ মিলবে, এমন ধারণা আর থাকছে না। অ্যাকাডেমিক জীবনে ভালো ফল করলেই ক্যারিয়ার-গ্রাফ ভালো হবে, এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই। যে যে বিষয়ে পড়ছে, সে বিষয়ে কাজ পাচ্ছে না বা সেই ক্যারিয়ার তার কাছে আকর্ষণীয় লাগছে না। তাই প্রকৌশলী বা চিকিৎসক বিসিএস দিয়ে যাচ্ছেন পররাষ্ট্র দফতরে, প্রশাসনিক বা পুলিশ ক্যাডারে।

প্রাণিবিজ্ঞানে পড়ালেখা করে কাজ করছেন ব্যাংকে বা বিমা খাতে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে কর্মের কোনও সাযুজ্য নেই। অথচ শিক্ষার আসল উদ্দেশ্যই এই সাযুজ্য, উপযুক্ত সম্মান এবং যোগ্যতা অনুসারে অর্থ উপার্জন নিশ্চিত করা। কর্মসংস্থানের জন্য দেশের সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাণিজ্যশাস্ত্রের জয়জয়কার। প্রচুর ছেলেমেয়ে বিবিএ আর এমবিএ করে বের হচ্ছে প্রতিবছর। তাদের প্রায় সবাই চায় চাকরি। আত্মকর্মসংস্থান, অর্থাৎ ব্যবসা-বাণিজ্য করতে যে ধরনের ব্যক্তিগত অবকাঠামো প্রয়োজন, সেখানেও সমস্যা আছে।

বিআইডিএস বলছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করে যারা বেকার থাকছেন, তাদের অধিকাংশই ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের বাইরে অন্যান্য বিষয়ে পড়াশোনা করা। অর্থাৎ ব্যবসায় প্রশাসনে পড়া শিক্ষার্থীরাই তুলনামূলক বেশি চাকরি পাচ্ছেন। নিজস্ব উদ্যোগে কাজ করার ক্ষেত্রেও ব্যবসায় প্রশাসনের শিক্ষার্থীরা এগিয়ে রয়েছেন। শঙ্কার বিষয় হচ্ছে, শিক্ষিতদের বড় একটা অংশ যদি উন্নয়ন প্রক্রিয়ার বাইরে থাকে, তাহলে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। এত রাষ্ট্রীয় ও পারিবারিক বিনিয়োগের পর একটি ছেলে বা মেয়ে বেকার থাকলে তা শুধু কষ্টদায়ক নয়, বরং বলতে হবে সম্পদের অপচয়।

এত এত উচ্চশিক্ষিত প্রতিবছর সৃষ্টি করে উপকার কী হচ্ছে, সে প্রশ্ন নিশ্চয়ই উঠতে পারে। এত শিক্ষিত জনগোষ্ঠী থাকার পরও আমাদের করপোরেট-জগতে বিপুল বিদেশিকে ডেকে আনতে হচ্ছে উচ্চ বেতনে। এ বিষয়টা ভাবা দরকার। কেন এমন হচ্ছে সেই কারণ খুঁজে বের করা দরকার।

আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখছি, গরিবেরা বেকার থাকে না। দরিদ্রদের মধ্যে বেকার কম। বেকার সমস্যা বলে সচরাচর যাকে আমরা চিনি, তা আসলে যারা শিক্ষিত এবং তারাই আসলে কাজ পান না। আর বড়লোকদের বেকার হওয়ার সুযোগই নেই। ভাবনা মধ্যবিত্তকে নিয়ে, যাদের কাজের সুযোগ প্রসারিত হচ্ছে না। কারিগরি বিদ্যায় দক্ষ একজন বড় বেতনের কাজ পায়, তার কাজের অভাবও হয় না; কিন্তু তার কোনও সামাজিক মর্যাদা সৃষ্টি হয় না। আর এভাবেই শিক্ষিত বেকার তৈরি হয়। শিক্ষিত বিশাল এক জনগোষ্ঠীর অকারণ অযোগ্য উচ্চাশা উচ্চারিত আকাশে-বাতাসে।

এত মানুষ, অথচ উদ্যোক্তারা বলেন, তারা চাকরিপ্রার্থী লাখ লাখ পেলেও সত্যিকারের কাজের লোক পান না। ভালোভাবে বুঝতে হবে কেন বিভিন্ন ধরনের কাজে শ্রমের বাজারে চাহিদা আর জোগানে মিল থাকছে না। পরিকল্পনায় যারা আছেন, তারা শিক্ষা নিয়ে ভাবুন, ভেবে ঠিক করুন দেশে শিক্ষিত বেকারের জোগান বাড়বে, নাকি এমন শিক্ষা ব্যবস্থা হবে, যেখান থেকে সত্যিকারের কর্মী বাহিনী সৃষ্টি হবে।

লেখক: সাংবাদিক

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

স্কুল যখন খুলছে

স্কুল যখন খুলছে

৪৩ বছরে বিএনপি

৪৩ বছরে বিএনপি

জনপ্রতিনিধি ও জনপ্রশাসক

জনপ্রতিনিধি ও জনপ্রশাসক

আমেরিকার মিশন ইমপসিবল

আমেরিকার মিশন ইমপসিবল

ফেসবুকের পক্ষপাতমূলক আচরণ কেন?

আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৮:০৭
লীনা পারভীন বর্তমানে গোটা বিশ্বে সামাজিক যোগাযোগের এক নাম্বার মাধ্যম হচ্ছে ফেসবুক। আমেরিকার তৈরি এই এক ফেসবুকের মাধ্যমে একদিকে যেমন কোটি কোটি মানুষ বিশ্বব্যাপী যুক্ত হচ্ছে, আবার এর মাধ্যমে চলে নানা রকম বাণিজ্যও। আধুনিক বিশ্বে তাই ফেসবুকের অস্তিত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। বাংলাদেশে মোট ১৭ কোটি মানুষের মধ্যে প্রায় ১০ কোটি ইন্টারনেটের মাধ্যমে যুক্ত। ডিজিটাল মিডিয়ার যুগে বাংলাদেশ ফেসবুকের মতো একটি মাধ্যমের জন্য বিশাল সম্ভাবনার বাণিজ্য। অথচ এই মিডিয়ার ওপর বাংলাদেশের কোনও কর্তৃপক্ষের নেই নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা।

অন্যান্য দেশের মতো ফেসবুক এখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনেক বড় ভূমিকা রাখে। যেকোনও ইস্যুতেই পাবলিক অপিনিয়নের একটি বৃহত্তর প্ল্যাটফর্ম এই ফেসবুক। অতি অল্প সময়ে বেশি সংখ্যক মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের এমন সহজ মাধ্যম এখনও সৃষ্টি হয়নি। বাংলাদেশে শত শত কোটি টাকার বাণিজ্য চলে এই ফেসবুককে কেন্দ্র করে, যাকে এফ কমার্স বলা হয়। অথচ উপকারী এই মাধ্যমটির বিরুদ্ধে এরইমধ্যে উঠেছে নানা অভিযোগ। ফেসবুকের জনপ্রিয়তার সুযোগ নিয়ে নানা সময়ে বিভিন্ন ধরনের গুজব বা ফেইক সংবাদ প্রচার করে দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাকে অস্থির করে তোলার চেষ্টাও দেখেছি। ফেসবুকে বিভিন্ন ধরনের পেইজ বা গ্রুপের মাধ্যমে চলছে ব্যক্তি, সরকার বা রাষ্ট্রবিরোধী বিভিন্ন ধরনের হেইট স্পিচ। মিথ্যা সংবাদকে অতি দ্রুত বেশি সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম এখন ফেসবুক। কোটাবিরোধী আন্দোলন বা সাম্প্রতিক এমন অনেক আন্দোলনের সময় আমরা সেসবের উদাহরণ পেয়েছি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা থেকে শুরু করে সাকিব আল হাসানের মতো ব্যক্তিত্বদের নিয়েও সরাসরি আক্রমণমূলক বক্তব্য ও ভিডিও ফেসবুকের বুকে ঘুরেছে অহরহ, কিন্তু এসবের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ না নিয়েছে ফেসবুক, না নিতে পেরেছে আমাদের সরকার বা কর্তৃপক্ষ। সরাসরি হত্যার হুমকিও দেওয়া হচ্ছে সেখানে। বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালগুলোর সংবাদ যখন শেয়ার হয়, সেখানে কমেন্ট সেকশনগুলোতে গেলে রীতিমতো আতঙ্কিত হতে হয় যে এটা কোন দেশ? অথচ সেখানে ফেসবুকের কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড কাজ করে না। রিপোর্ট করেও কোনও সুরাহা পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে যারা লেখালেখি করছেন বা বিভিন্ন সময়ে মৌলবাদ জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে যারা পোস্ট করেন, এমন অনেকের লেখাকে কেন্দ্র করে কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড ভঙ্গের নামে আইডি রেস্ট্রিক্ট করা হচ্ছে। কারও পোস্ট রিচ কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে, এমনকি বিভিন্ন মেয়াদে ব্যান দেওয়া হয়েছে।

ফেসবুকের কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড আসলে কী? এই স্ট্যান্ডার্ডের উদ্দেশ্য কী? এর উদ্দেশ্যই হচ্ছে সব ব্যবহারকারীর মধ্যে একটি স্বচ্ছ যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। তারাই বলছে এই স্ট্যান্ডার্ড দেশ বা সীমা নির্বিশেষে সবার জন্য প্রযোজ্য। সহিংসতা তৈরি করতে পারে এমন সব ধরনের কনটেন্টকে তারা নিয়ন্ত্রণ করবে। বাস্তবে আমরা কী দেখছি? ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের সময়কার গণহত্যার ছবি পোস্ট দিলে সেটাকে স্ট্যান্ডার্ডের অজুহাতে সরিয়ে ফেলা হচ্ছে, মৌলবাদ বা জঙ্গিবাদ নিয়ে কোনও লেখা দিলে সেখানে তারা স্ট্যান্ডার্ডের নীতি দেখাচ্ছেন, কিন্তু কাউকে সরাসরি মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া ভিডিও বা পোস্ট থেকে যাচ্ছে অনায়াসে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক দিন ধরেই কাজ করছে একজন ব্লগার অমি রহমান পিয়াল। সম্প্রতি তিনি লিখিত একটি কলামে ফেসবুক নিয়ে যে অভিযোগ এনেছেন সেটি মারাত্মক। মাসের পর মাস তাকে ব্যান করে রাখা হচ্ছে কেবল মুক্তিযুদ্ধ বা সরকার পক্ষীয় পোস্টের জন্য। তিনি অভিযোগ করেছেন, অনেকবার অ্যাপ্লাই করার পরও তাই আইডি ভ্যারিফাইড হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে না। লাখো ফলোয়ারের আইডি হয়েও তার সব লেখা ফলোয়ারদের কাছে পৌঁছায় না। এমনকি কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ডের অজুহাতে তার মেসেঞ্জারকেও ব্লক করে দেওয়া হয়েছে অথচ মেসেঞ্জার কিন্তু পাবলিক স্পেস না। মেসেঞ্জারে একজন ব্যবহারকারী অনেক ধরনের মেসেজ আদান-প্রদান করেন, যা মূলত ওয়ান টু ওয়ান হয়ে থাকে। এ বিষয়টি অত্যন্ত ভয়ংকর। ফেসবুক ঘোষণা দিয়ে থাকে তাদের ডাটা প্রাইভেসি আছে। একজনের মেসেঞ্জারে কী আদান-প্রদান হয় সেটি নিশ্চয়ই কেউ রিপোর্ট করেনি বা কারও অনুভূতিতে আঘাত করেনি। তার মানে ফেসবুক নিজেই এটি মনিটরিং করছে এবং নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এখানে ডাটা প্রাইভেসি কোথায়? মেসেঞ্জারের তথ্য যে কোথাও পাচার হচ্ছে না সেই বিশ্বাস কিন্তু এখন প্রশ্নবিদ্ধ।

অভিযোগ উঠেছে ফেসবুকের নিয়োগকৃত এ অঞ্চলের বাংলাদেশি মডারেটরদের বিরুদ্ধে। মূলত ফ্যাক্ট চেকিংয়ের নামেই এসব করছে তারা। আমি নিজেও এর ভিকটিম। একটি অত্যন্ত সাধারণ পোস্টের অজুহাতে আমাকে ব্যান করা হয়েছিল, এমনকি বর্তমানে আমি কোনও লাইভ স্ট্রিমিং চালাতে পারি না। কেন এই দ্বিচারিতা? বহুবার আমাদের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে এগুলো নিয়ে, কিন্তু তিনি অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন।

রাষ্ট্রের ক্ষমতার কাছে কি ফেসবুক এতটাই শক্তিশালী হয়ে গেলো? ফেসবুকের বিরুদ্ধে এমন পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠেছিল ভারতেও। এমনকি আমেরিকার নির্বাচনের সময় তো তুলকালাম ঘটেছিল। কই, সেসব দেশ তো ফেসবুকের পরোয়া করেনি। ফেসবুক ঠিকই সেসব দেশের নিয়ম শ্রদ্ধা করতে বাধ্য হয়েছে। তাহলে আমাদের জন্য কেন সেটা প্রযোজ্য হবেনা? অন্তত ফেসবুকের এ দেশীয় যেসব ফ্যাক্ট চেকার আছে তাদের ব্যাকগ্রাউন্ড তো সরকার চেক করতেই পারে। তারা কারা? কী তাদের রাজনৈতিক বিশ্বাস বা তারা যে পক্ষপাতিত্ব করছে, এর প্রমাণ তো আমাদের কাছে প্রচুর আছে। সেসব নিয়ে কেন আমরা ফেসবুক কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানাতে পারছি না? ভূরি ভূরি ভিডিও/পেইজ/গ্রুপ আছে যারা অহরহ কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড ভঙ্গের মতো কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে, অথচ সেগুলোর বিরুদ্ধে রিপোর্ট করলেও অগ্রাহ্য হচ্ছে।

সামনে নির্বাচন। আমার আশঙ্কা মৌলবাদ বা উগ্রবাদীরা এর সুযোগ নিতে শুরু করেছে। অনলাইনে ফাইটারদের কোণঠাসা করে দেওয়া হচ্ছে। গুজব ছড়িয়ে দেশে যেকোনও সময় একটি অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করতে পারে। সরকারের উচিত এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় আনা। অন্যথায়, সরকারের অন্যতম সফল ডিজিটাল বাংলাদেশের ফলাফল তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবহৃত হবে। 
/এমওএফ/

সম্পর্কিত

অস্তিত্ব সংকটে আফগান নারীরা?

অস্তিত্ব সংকটে আফগান নারীরা?

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষকতা

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষকতা

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সর্বশেষ

রাশিয়ার পার্লামেন্ট নির্বাচনে ভোট গ্রহণ শুরু

রাশিয়ার পার্লামেন্ট নির্বাচনে ভোট গ্রহণ শুরু

মাদকবিরোধী অভিযানের রাজধানীতে ৭৮ জন গ্রেফতার

মাদকবিরোধী অভিযানের রাজধানীতে ৭৮ জন গ্রেফতার

নিয়ন্ত্রণে আসছে না ডেঙ্গু, দিনে ৩০০ রোগী

নিয়ন্ত্রণে আসছে না ডেঙ্গু, দিনে ৩০০ রোগী

যা আছে প্রধানমন্ত্রীর সফরসূচিতে

যা আছে প্রধানমন্ত্রীর সফরসূচিতে

৩ দেশের চুক্তি চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা: চীন

৩ দেশের চুক্তি চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা: চীন

১৮ রোহিঙ্গাকে পুলিশে দিলো স্থানীয়রা

১৮ রোহিঙ্গাকে পুলিশে দিলো স্থানীয়রা

মৃত্যু কমছে না ময়মনসিংহ মেডিক্যালে

মৃত্যু কমছে না ময়মনসিংহ মেডিক্যালে

মুগদায় রিকশাচালকের ঘরে মিললো জামালপুরের নিখোঁজ ৩ মাদ্রাসাছাত্রী

মুগদায় রিকশাচালকের ঘরে মিললো জামালপুরের নিখোঁজ ৩ মাদ্রাসাছাত্রী

জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রীর ঢাকা ত্যাগ

জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রীর ঢাকা ত্যাগ

নবনীতার গান দিয়ে নতুন সিজন শুরু

নবনীতার গান দিয়ে নতুন সিজন শুরু

আদালতের ক্যান্টিনে সংঘর্ষ, কারাগারে বাদী-বিবাদী পক্ষের ৬ জন 

আদালতের ক্যান্টিনে সংঘর্ষ, কারাগারে বাদী-বিবাদী পক্ষের ৬ জন 

তিন মাস পর ফের মৃত্যুহীন চট্টগ্রাম 

তিন মাস পর ফের মৃত্যুহীন চট্টগ্রাম 

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

© 2021 Bangla Tribune