X
শনিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২২
২২ আশ্বিন ১৪২৯

২০২০ সালে কেমন ছিলেন দেশের নারী ও শিশুরা

শারমিন আকতার
১১ জানুয়ারি ২০২১, ১৬:৫৩আপডেট : ১১ জানুয়ারি ২০২১, ১৭:০৯

শারমিন আকতার ২০২০ সালে বিশ্বজুড়ে ছিল করোনা মহামারির উপদ্রব। সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও সকল ক্ষেত্রে করোনার প্রভাব লক্ষ করা যায়, নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রেও যার ব্যতিক্রম হয়নি। যদিও বিগত বছরগুলোর ধারাবাহিকতায় গত বছরেও প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে দেশে নারী-পুরুষের সমতা অর্জিত হয়েছে, তবে করোনার প্রভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় বাল্যবিবাহ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে বিশ্বে শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে থাকা বাংলাদেশে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাসে বাল্যবিবাহের হার বেড়েছে ২২০ শতাংশ। এছাড়াও করোনাকালীন সংকটে অনেক বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একেবারে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার পরিমাণও বৃদ্ধি পাবে, যার প্রভাব নারীদের কর্মসংস্থানের ওপরও পড়বে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়াও নারীর কর্মসংস্থানের সব খাতেই করোনার প্রভাব সুস্পষ্ট। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের একটি সমীক্ষায় দেখা যায়, করোনাকালীন ও এর পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক মন্দার কারণে ৫৩ শতাংশ নারী তাদের কর্ম হারিয়েছেন। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন পোশাক শিল্পে কাজ করা নারী শ্রমিকরা। ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশনের হিসাব অনুযায়ী, আগস্ট মাস পর্যন্ত প্রায় এক-চতুর্থাংশ (১ মিলিয়ন) নারী পোশাক শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। এছাড়া অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করা অনেক নারীও তাদের জীবিকা হারিয়েছেন। উইমেন চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির এক হিসাব অনুযায়ী, করোনাকালীন লকডাউনের প্রভাবে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি নারী উদ্যোক্তার ঝরে পড়ার আশঙ্কা আছে। ২০২০ সালে নারী উদ্যোক্তাদের মাস্টারকার্ড সূচকেও বাংলাদেশ বিশ্বের ৫৮টি দেশের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে। বিআইএসআর-এর একটি গবেষণায়ও দেখা যায়, করোনার প্রভাবে বেশিরভাগ নারী ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা, বিশেষ করে যারা কাপড় ও খাবার বিক্রির সঙ্গে জড়িত, তারা তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন। নারী অভিবাসনের ক্ষেত্রেও পড়েছে নেতিবাচক প্রভাব। করোনার প্রভাব শুরু হওয়ার পর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ৪০ হাজার নারী অভিবাসী (মোট নারী অভিবাসীর ৪.৪৩ শতাংশ) দেশে ফিরে এসেছেন।

করোনাকালীন বাজেটে ভিন্নতা আসায় বিগত অর্থবছরের মতো ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে নারী উন্নয়নে আলাদা করে জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেট নির্ধারণ করা হয়নি। তবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ১ হাজার কোটি টাকা (মোট প্রণোদনার ৫ শতাংশ) সরকারি প্রণোদনা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এছাড়াও দারিদ্র্যপ্রবণ ১০০টি উপজেলায় সব বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্ত নারীকে ভাতার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বছরের প্রায় প্রথম থেকেই দীর্ঘ লকডাউনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে নারী ও শিশুদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর। স্কুল বন্ধ থাকায় শিশুদের খেলাধুলাসহ অন্যান্য সামাজিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হয়, যার প্রভাবে তাদের মধ্যে মানসিক চাপ বেড়ে যায়। লকডাউনে শিশুরাসহ পরিবারের অন্য সদস্যরাও দীর্ঘ সময় বাড়িতে অবস্থান করায় বাড়তি গৃহস্থালি কর্মের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে পরিবারের নারী সদস্যদের ওপর। ইউএন উইমেন-এশিয়া অ্যান্ড প্যাসিফিক-এর তথ্যমতে, লকডাউনের সময়ে শতকরা ৬৩ শতাংশ নারীকেই বাড়তি গৃহস্থালি কর্মে অংশগ্রহণ করতে হয়। বিবাহবিচ্ছেদের হারও ছিল ঊর্ধ্বগামী, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী বিগত বছরের জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত পাঁচ মাসে ঢাকায় বিবাহবিচ্ছেদ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। এই সময়ে ঢাকা শহরে দৈনিক বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা ছিল ৩৯টি।

লকডাউনে অনেক কিছু থেমে থাকলেও থেমে ছিল না নারী ও শিশু ধর্ষণ। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর তথ্য অনুযায়ী, বিগত বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ৯৭৫ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এরমধ্যে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২০৮ জন। এছাড়া ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছেন ৪৩ জন এবং আত্মহত্যা করেন ১২ জন নারী। এই ৯ মাসে পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৪৩২ জন নারী। এরমধ্যে হত্যার শিকার হন ২৭৯ জন এবং পারিবারিক নির্যাতনের কারণে আত্মহত্যা করেছেন ৭৪ জন নারী। শিশু নির্যাতন ও হত্যার দিক দিয়েও এই ৯ মাসের পরিসংখ্যান অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এ সময়ে ১ হাজার ৭৮ জন শিশু শারীরিক নির্যাতনসহ নানা সহিংসতার শিকার হয়। এছাড়া ৬২৭টি শিশু ধর্ষণ ও ২০টি বলাৎকারের ঘটনা ঘটে।
২০২০ সালে অনেক ক্ষেত্রে নারীরা পিছিয়ে পড়লেও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে এগিয়ে ছিল বাংলাদেশ। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের জেন্ডার গ্যাপ ইনডেক্স অনুসারে, বিশ্বের ১৫৩টি দেশের মধ্যে ৫০তম স্থান নিয়ে নারীদের সামগ্রিক ক্ষমতায়নে দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষ অবস্থানে ছিল বাংলাদেশ। এরমধ্যে রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল সপ্তম। তবে রাজনৈতিক উপসূচকগুলোতে নারীর অবস্থান খুব বেশি উন্নত হয়নি, যেমন- সংসদে নারীর অংশগ্রহণের উপসূচকে বাংলাদেশ ৮৬তম এবং মন্ত্রীর সংখ্যার উপসূচকে ১২৪তম অবস্থানে ছিল।

বিগত বছরে আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশি নারীদের বেশ কিছু সাফল্যও বছরজুড়ে আলোচনার বিষয় ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী ফোর্বস সাময়িকীর ২০২০ সালে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারীর তালিকায় ৩৯তম স্থানে ছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিবিসির প্রভাবশালী ১০০ নারীর তালিকায়ও জায়গা করে নেন দুজন বাংলাদেশি নারী। করোনাভাইরাস মহামারির সময়ে যৌনকর্মীদের খাবারের বন্দোবস্ত করায় রিনা আক্তার ও রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মানবিক উন্নয়নে অবদান রাখায় রিমা সুলতানা এই তালিকায় স্থান পান। এছাড়াও বাংলাদেশের নারী বিজ্ঞানী ড. ফিরদৌসি কাদরির ২২তম ল’রিয়েল-ইউনেস্কো ফর ওমেন ইন সায়েন্স অ্যাওয়ার্ড অর্জন সবার দৃষ্টি কাড়ে। ফিরদৌসি আইসিডিডিআর,বি’র মিউকোসাল ইমুনলজি অ্যান্ড ভ্যাকসিনোলজি ইউনিট অব ইনফেকসিয়াস ডিজিসেস ডিভিশনের প্রধান। উন্নয়নশীল দেশের শিশুদের সংক্রামক রোগ সম্পর্কে গবেষণার জন্য তিনি এই সম্মাননা পেয়েছেন।

২০২০ নারী টি-২০ বিশ্বকাপে খেলার সুযোগের সুখবর নিয়ে দেশের নারী খেলোয়াড়রা বছরটি শুরু করলেও বিগত বছরে নারী খেলোয়াড়দের বড় কোনও অর্জন ছিল না। টি-২০ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের সব ম্যাচ হেরে শূন্য হাতে বিদায় নেয় নারী ক্রিকেট দল। তবে ভারতের উইমেন্স টি-টোয়েন্টি চ্যালেঞ্জে দ্বিতীয়বারের মতো অংশগ্রহণ করেন অলরাউন্ডার জাহানারা আলম এবং ট্রেইলব্লেজার্সের শিরোপা জয় করেন, যেটি ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে কিছুটা হলেও আনন্দের সঞ্চার করে।


লেখক: গবেষক, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল রিসার্চ ট্রাস্ট।

ই-মেইল: [email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
বাংলাদেশ ন্যাপে যোগ দিলেন জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা
বাংলাদেশ ন্যাপে যোগ দিলেন জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা
পদ্মা সেতু দিয়ে টুঙ্গিপাড়ায় গেলেন রাষ্ট্রপতি
পদ্মা সেতু দিয়ে টুঙ্গিপাড়ায় গেলেন রাষ্ট্রপতি
হেলাল হাফিজের জন্মদিনে আনন্দসন্ধ্যা
হেলাল হাফিজের জন্মদিনে আনন্দসন্ধ্যা
প্রশংসিত প্রদর্শনের ১৮ বছর...
প্রশংসিত প্রদর্শনের ১৮ বছর...
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ