X
সকল বিভাগ
সেকশনস
সকল বিভাগ

গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এখন সময়ের দাবি

আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০২১, ১৯:২২

ড. প্রণব কুমার পান্ডে বাংলাদেশের ইতিহাসে মার্চের গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ, একাত্তরের এই মাসে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক অস্থিরতা স্বাধীনতা যুদ্ধে পরিণত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু তাঁর ৭ মার্চের ভাষণের মাধ্যমে পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক স্বৈরশাসকের চক্রান্তের মুখে আমাদের স্বাধীনতার কূটনৈতিক ঘোষণা দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একনায়ক ভীত হয়ে পড়েছিল। কারণ, এই ভাষণটির মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু বাঙালিদের যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য প্রস্তুত হওয়ার নির্দেশনা দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ভাষণের ব্যাপকতা যাচাই করার পরে পাকিস্তানের শাসক উপলব্ধি করেছিল যে তাঁর আন্দোলন দমন করা অসম্ভব।

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেওয়ার নামে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর শাসকরা পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে একটি নোংরা রাজনৈতিক খেলা খেলে। মার্চের মাঝামাঝি সময়ে রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খান রাজনৈতিক সংকট সমাধানের পথ খোঁজার জন্য বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনা করলেও তিনি জানতেন এই আলোচনা থেকে কোনও সমাধান বের হবে না। পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যা চালানোর জন্য পশ্চিম পাকিস্তান থেকে অধিক সংখ্যক সেনাবাহিনী নিয়ে আসার জন্য কালক্ষেপণের অংশ হিসেবে তিনি মূলত আলোচনায় অংশগ্রহণ করেছিলেন।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ভয়াবহতম রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে ঢাকায় পুলিশ, ছাত্র-শিক্ষকসহ হাজার হাজার ঘুমন্ত নিরীহ বাঙালিকে হত্যা করে। এই হত্যাযজ্ঞের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল ২৬ মার্চ প্রধান প্রধান শহরগুলো দখল করে জাতীয়তাবাদী বিদ্রোহকে দমন করা। শিক্ষক, অ্যাকাডেমিক এবং সংস্কৃতিকর্মীদের হত্যা করে তারা বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দমন করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছিল। কারণ, তারা বুঝতে পেরেছিল এই শ্রেণির জনগণ পাকিস্তানি শাসকের বিরুদ্ধে অন্যান্য শ্রেণির জনগণকে প্রভাবিত করার শক্তি রাখতেন।

এই হত্যাযজ্ঞ সংগঠনের বর্বর নীতির অংশ হিসেবে তারা সব বিদেশি সাংবাদিককে দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য করেছিল। সাংবাদিকদের দেশত্যাগে বাধ্য করার মাধ্যমে তারা এই গণহত্যার সংবাদ বিদেশি মিডিয়ার মাধ্যমে যাতে বিশ্ববাসী না জানতে পারে তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছিল। এই কাল রাতে পাকিস্তানি হানাদারদের দ্বারা গণহত্যায় নিহতের প্রকৃত সংখ্যা নিশ্চিত করা কষ্টসাধ্য হলেও এ কথা স্পষ্ট করে বলা যায় যে কয়েক হাজার নিরীহ বাঙালি এই রাতে হত্যার শিকার হয়েছিলেন। পাকিস্তানি হানাদারদের শত চেষ্টার পরেও নিউ ইয়র্ক টাইমসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এই হত্যাযজ্ঞের সংবাদ পরিবেশন করে। নিউ ইয়র্ক টাইমস ১৯৭১ সালের ১ এপ্রিল তারিখে এক প্রবন্ধে উল্লেখ করে যে ২৫ মার্চ রাতে বাংলাদেশে প্রায় ৩৫ হাজার নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। অন্যদিকে, সিডনি মর্নিং হেরাল্ড তাদের ২৯ মার্চ ১৯৭১ সালের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করে যে ২৫ মার্চ রাতে  বাংলাদেশে ১০ হাজার থেকে ১ লক্ষ নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল।
তবে অনেকেই বিশ্বাস করতেন যে বিদেশি গণমাধ্যমে হত্যার যে সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে প্রকৃত সংখ্যা তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি হবে। নিহতের সামগ্রিক সংখ্যা নিয়ে ঐতিহাসিক ও সরকারি বিভাগগুলোর মধ্যে মতবিরোধ থাকলেও প্রত্যেকেই একটি বিষয় স্বীকার করেছেন যে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের অন্ধকার রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাংলাদেশের নিরীহ মানুষের ওপর গণহত্যা চালিয়েছিল। অনেক ঐতিহাসিক ঢাকার মার্চের বর্বরতাকে সোভিয়েতের পিওডাবলু, ইহুদি হলোকাস্ট এবং রোমানিয়ান গণহত্যার সঙ্গে তুলনা করেছেন।

যদিও ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বাংলাদেশে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল, আমরা আমাদের স্বাধীনতার ৫০ বছর পরেও গণহত্যা হিসেবে এই সহিংসতার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করতে পারিনি। বাংলাদেশের পূর্ববর্তী অনেক সরকার এই দিনে শহীদদের শ্রদ্ধা পর্যন্ত জানায়নি। তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিকট থেকে গণহত্যার স্বীকৃতি অর্জনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।

শেষ পর্যন্ত, শেখ হাসিনার নেতৃতে আওয়ামী লীগ সরকার ২৫ মার্চের কালো রাতের শহীদদের সম্মান জানাতে গণহত্যা দিবস হিসেবে পালন করার জন্য ২০১৭ সালের ১১ মার্চ তারিখে জাতীয় সংসদে একটি যৌথ রেজুলেশন গ্রহণ করে। তখন থেকে বাংলাদেশে দিবসটি অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে পালিত হয়ে আসছে। সেই রাতে বর্বরভাবে খুন করা শহীদদের সম্মান জানানোর প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য আমাদের অবশ্যই আওয়ামী লীগ সরকারকে ধন্যবাদ জানাতে হবে।

আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে ২৫ মার্চের এই ঘটনার প্রাসঙ্গিকতা উপেক্ষা করা যাবে না। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের মাধ্যমে দেশের জন্য জীবন বাজি রাখতে উদ্বুদ্ধ হয়েছিল, বিপরীতে, ২৫ মার্চের সহিংসতার কারণে বেসামরিক নাগরিকরা পাকিস্তানি অত্যাচারীদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে এবং তাদের বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিল।

গত ৫০ বছরে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে কেন্দ্র করে বিদেশি পরাশক্তিদের বিভিন্ন ধরনের নোংরা রাজনীতি আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। আমরা বেশ কয়েকটি পরাশক্তিকে দেখেছি যারা ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ পাকিস্তানিদের দ্বারা সংঘটিত হত্যাযজ্ঞকে গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অনীহা প্রকাশ করেছে। তবে, বর্তমান সরকারের উদ্যোগের কারণে সেই সময় বাংলাদেশে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল এ বিষয়টি তারা এখন স্বীকার করতে শুরু করেছে। বাংলাদেশ সরকার জাতিসংঘে ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার একটি প্রস্তাব উপস্থাপন করেছে ২০১৯ সালে, যাতে বিশ্ব সম্প্রদায় পাকিস্তানি শাসকের অত্যাচারের কথা স্মরণ রাখে এবং তাদের প্রতি ঘৃণা প্রদর্শন করে। তবে কয়েকটি দেশের বিরোধিতার ফলে গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এখনও অর্জিত হয়নি। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, গণহত্যার বিষয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থা, ঐতিহাসিক, শিক্ষাবিদ এবং বিদেশি সাংবাদিকদের ঐক্যমত থাকলেও আমরা এখনও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝাতে সক্ষম হয়নি।

আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি বিশ্বাস থাকতে হবে। কারণ, বাংলাদেশের বিভিন্ন অর্জন সম্পর্কে তিনি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। যদিও গণহত্যার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি এখনও আমরা অর্জন করতে পারিনি, তবে আওয়ামী লীগের যোগ্য নেতৃত্বের কারণে ইউনেস্কো একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এবং বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে বিশ্বের অন্যতম প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের স্বীকৃতি এই ভাষণকে দেশ এবং ভাষার সীমানার বাইরে বিখ্যাত করেছে।

উপরে উল্লেখ করা হয়েছে যে আওয়ামী লীগ সরকার ২৫ মার্চের গণহত্যাকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য ২০১৯ সালে জাতিসংঘে একটি প্রস্তাব উপস্থাপন করে। বিভিন্ন সময়ে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন ব্যক্তিবর্গ এই গণহত্যার সর্বজনীন স্বীকৃতি আদায়ে তাদের প্রতিশ্রুতির কথা ব্যক্ত করেছেন। এছাড়াও, গণহত্যা প্রতিরোধ সম্পর্কিত জাতিসংঘের বিশেষ কাউন্সিলর-অ্যাডামা দেইং ২০১৯ সালের ২৪ মার্চ আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎকালে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানের গণহত্যার বিষয়টিকে একটি উপযুক্ত ফোরামে যথাযথভাবে উত্থাপন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তবে বাস্তবতা হলো, কিছু মোড়লদের বিরোধিতার কারণে গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায় করা সম্ভব হয়নি।

অন্যান্য বিষয়ের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের মতো ২৫ মার্চের গণহত্যার সর্বজনীন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের জন্য বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আরও কৌশলী হয়ে অগ্রসর হতে হবে। আমরা আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করি যে এই স্বীকৃতি কেবল শেখ হাসিনার সরকারের অধীনেই অর্জিত হতে পারে। স্বাধীনতা যুদ্ধে অবদান এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের প্রাণান্তকর প্রচেষ্টার জন্য বাংলাদেশের জনগণ আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে কৃতজ্ঞ থাকবে, যেমনটি তারা রয়েছে বঙ্গবন্ধুর কাছে, বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের স্বাধীনতা উপহার দেওয়ার জন্য।

লেখক: অধ্যাপক, লোকপ্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

ইউক্রেনের জন্য ৪০ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা অনুমোদন মার্কিন সিনেটের
ইউক্রেনের জন্য ৪০ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা অনুমোদন মার্কিন সিনেটের
প্লে-অফে যেতে মোস্তাফিজদের হারের প্রার্থনায় কোহলিরা!
প্লে-অফে যেতে মোস্তাফিজদের হারের প্রার্থনায় কোহলিরা!
যুক্তরাষ্ট্রে গেছে ৪৫ কোটি টাকার সুরক্ষা সামগ্রী
যুক্তরাষ্ট্রে গেছে ৪৫ কোটি টাকার সুরক্ষা সামগ্রী
প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় মাউশি অধিদফতরের নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল
প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় মাউশি অধিদফতরের নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ