X
শুক্রবার, ০১ জুলাই ২০২২
১৭ আষাঢ় ১৪২৯

বাবাদের যেন বৃদ্ধাশ্রমে যেতে না হয়

আপডেট : ২০ জুন ২০২১, ১৭:০০

সালেক উদ্দিন প্রতিবছর জুন মাস এলেই হবে হয়তো ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে বাবার কথা বারবার আসে। কেউ বলেন ‘বাবাকে বড় মনে পড়ে’। কেউ লিখেন ‘বাবাই আমার প্রথম হিরো’। কেউ কেউ বাবাকে সূর্যের সাথে তুলনা করেন। বলেন, সূর্য ডুবে গেলে যেমন পৃথিবী অন্ধকার হয়ে পড়ে তেমনই বাবা পৃথিবী ছেড়ে গেলে সন্তানের জীবনে অন্ধকার নেমে আসে। বাবার বিকল্প শুধু বাবাই। এই সত্যগুলো জুন মাসে এত বেশিবার আলোড়িত হওয়ার প্রধানতম কারণ হলো, এ মাসের তৃতীয় রবিবার ‘বিশ্ব বাবা দিবস’। সেই হিসেবে ২০২১ সালের ২০ জুন এ বছরের বাবা দিবস।

এই দিনে বিশ্বব্যাপী ১১১টির বেশি দেশে অনেক বাবাই একবারের জন্য হলেও সন্তানের স্পর্শ পেয়ে থাকেন। বৃদ্ধাশ্রমের অনেক বাবাও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। অতিবৃদ্ধ বয়সে যখন সন্তানকে কাছে পাওয়ার সন্তানের স্পর্শ নেওয়ার, সন্তানকে ছুঁয়ে দেখার আশাটি বাবাদের একমাত্র ইচ্ছায় রূপ নেয় তখনকার মতো সময়ে যান্ত্রিক বিশ্বের আর সব দেশের মতো আমাদের দেশেও অনেক বাবারই ঠিকানা হয় বৃদ্ধাশ্রমে।

‘এমনও গল্প হয়’ গ্রন্থের একটি গল্পের নাম ‘এক স্বপ্নের রাত’। সেখানে আমি লিখেছিলাম, ‘বয়সের ভারে জরাজীর্ণ বাবাকে তার একমাত্র ছেলে যখন বৃদ্ধাশ্রমের গাড়িতে তুলে দিচ্ছিলেন তখন বারান্দায় তার স্ত্রী নিজের ছেলেটিকে কোলে নিয়ে রকিং চেয়ারে দোল খেতে খেতে তা অবলোকন করছিলেন। ওদিকে বৃদ্ধাশ্রমের উদ্দেশে বিদায়ী বাবা তার ছেলেকে আকুতি করে বললেন, ‘বাবা আমি যেখানে যাচ্ছি সেটা এখান থেকে কত দূরে? যদি অনেক দূরে হয় তাহলে সেখানে পাঠাসনি বাবা। আমার যে প্রতিদিনই তোকে দেখতে ইচ্ছে করবে! অতদূরে যেতে তোর কষ্ট হবে যে বাপ।’

গল্পে বাবার এই উক্তিটি লেখার সময় আমার নিজের ছেলেটির কথা মনে হচ্ছিল এবং আমার চোখ বেয়ে নোনা পানি ঝরছিল। সেই নোনা পানি এই বাবা দিবসে কত বাবার চোখ থেকে ঝরছে– কে জানে?

যাক সেসব কথা। মূলত প্রতিটি সন্তানের জন্য প্রতিদিনই হওয়া উচিত মা দিবস, প্রতিদিনই হওয়া উচিত বাবা দিবস। তারপরেও নির্দিষ্ট করে একটি দিবস উদযাপনের মধ্য দিয়ে বাবার প্রতি মমত্ববোধ প্রকাশ করার এ এক ভালো উদ্যোগ এবং সৎকর্মই বলতে হবে।

বিশ্বব্যাপী মা দিবস পালনের প্রচলন শুরু হওয়ার বেশ পরে বাবা দিবস পালনের প্রচলন হয়েছে। অন্তর্জাল থেকে যতটা জানা যায়, ১৯১৩ সালে আমেরিকার সংসদে বাবা দিবস ছুটির দিন ঘোষণা করার জন্য একটি বিল উত্থাপিত হয়। ১৯২৪ সালে তৎকালীন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ক্যালভিন কুলিজ বিলটিতে পূর্ণ সমর্থন দেন। এরপর ১৯৬৬ সালের কথা। সে বছর প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি জনসন ‘বাবা দিবসকে’ ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করেন। এরও ৬ বছর পর প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এটিকে আইনে পরিণত করেন। আর সেই সূত্র ধরে ক্রমে ক্রমে বিশ্বের বেশিরভাগ দেশেই জুন মাসের তৃতীয় রবিবার দিনটি বাবা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।

এই বাবা দিবস প্রচলনের উদ্যোগের ব্যাপারে বেশ কয়েকটি গল্প আছে। তার একটি হলো, ওয়াশিংটনের সোনোরা স্মার্ট নামে এক কন্যাসন্তানের মা ষষ্ঠ সন্তানের জন্ম দেওয়ার সময় মারা যান। তার বাবা এই ছয়টি সন্তানকে মায়ের আদরে মায়ের মমতায় বড় করেন। মায়ের অনুপস্থিতি বুঝতে দেননি তাদের। এই স্মার্ট ১৯০৯ সালে গির্জার একটি অনুষ্ঠানে ধর্মযাজকদের মুখে শোনেন সন্তানের প্রতি মায়ের মমত্ববোধের কথা এবং মায়ের প্রতি সন্তানের দায়িত্বের কথা সর্বোপরি মাতৃ দিবসের কথা। মায়ের সঙ্গে তখন মাতৃহারা এই তরুণী তার বাবাকে তুলনা করে বাবাদের জন্যেও এমন একটি দিবস নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তার কথা ধর্মযাজককে জানান। ধর্মযাজক তার এই ধারণাটি গ্রহণ করেন এবং ১৯১০ সালের ১৯ জুন প্রথমবারের মতো তারা বাবা দিবস পালন করেছিলেন বলে অনেকেই উল্লেখ করেছেন।

আবার বাবা দিবসের ইতিহাস সম্পর্কে অনেকেই মনে করেন ভার্জিনিয়ার ভয়াবহ খনি বিস্ফোরণে ৩৬০জন শ্রমিক মারা গেলে সহস্রাধিক শিশু পিতৃহারা হয়ে পড়ে। এই করুণ কাহিনিকে স্মরণীয় করে রাখতে পশ্চিম ভার্জিনিয়া নিবাসী গ্রেস গোল্ডেন ক্লেটন নিজের বাবার জন্মবার্ষিকী ৫ জুলাই রবিবারকে বাবা দিবস হিসাবে উৎসর্গ করার জন্যে ১৯০৮ সালে অনুরোধ করেন। সেই সূত্র ধরেই পরবর্তী পর্যায়ে বিশ্ব বাবা দিবস পালনের প্রচলন প্রবর্তিত হয়।

এ তো গেলো ইতিহাস কিংবা প্রাগৈতিহাস। তবে সমাজ ব্যবস্থার বর্তমান প্রেক্ষাপট বিচার করলে বলতে হয়, বাবাকে স্মরণ করার জন্য আলাদা একটি দিবসের প্রয়োজন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে আমাদের একান্নবর্তী পরিবারের বিলুপ্তির কারণে। এখন আর দাদা-বাবা-চাচা ও তাদের সন্তানদের এক ছাদের নিচে বসবাসের উদাহরণ ভারতীয় স্যাটেলাইট টিভির সিরিয়াল ছাড়া খুব একটা দেখা যায় না। এমনকি একটি বাবার তিনটি সন্তান থাকলে তারা তাদের বিয়ে-উত্তর কিছু দিন হয়তো একই সাথে থাকে, তারপরই আসে বিচ্ছিন্নতা। একান্নবর্তী পরিবার আর থাকে না। আসে একক পরিবার। যার ফলে বাবা-মার প্রতি মমত্ববোধ এবং দায়িত্ববোধ থেকে সন্তানরা ক্রমেই দূরে সরে যায়।

সন্তানের জন্য বাবার স্বার্থহীন ভালোবাসা এবং ত্যাগ ও পরিশ্রমের সঙ্গে অন্য কিছুরই তুলনা হয় না। সন্তানের প্রতিষ্ঠার জন্য বাবাকে যে তার জীবনের স্বর্ণালি সময়ের কতদিন কত বছর বিসর্জন দিতে হয়েছে এবং কত পরিশ্রম কত ত্যাগ করতে হয়েছে সেই কথাটি স্মরণ করে দিতে বাবা দিবসের ব্যানারে বছরে অন্তত একটি দিন আসবে- সেটা অবশ্যই গুরুত্ব বহন করে। এমনও তো হতে পারে এই দিনকে স্মরণ করতে একটি সন্তান তার বাবার প্রতি অবিচারের কথা ভেবে অনুতপ্ত হবে! সেই সুবাদে বৃদ্ধাশ্রম থেকে কোনও এক বাবা নিজ বাসভবনে ফিরে আসবে! জানি না এমন একটি উদ্দেশ্য নিয়েই বাবা দিবসের প্রবর্তন করা হয়েছিল কিনা। তবে এটা সত্য যে অনুধাবনের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রত্যেকটি সন্তানের জন্য বাবা দিবস একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন।

প্রত্যাশা রইলো বাবা দিবসকে উপলক্ষ করেই সন্তানরা বাবার প্রতি আরও অনেক বেশি দায়িত্বশীল হবে।

লেখক: কথাসাহিত্যিক

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
ফুলেল শ্রদ্ধায় হলি আর্টিজানে নিহতদের স্মরণ
ফুলেল শ্রদ্ধায় হলি আর্টিজানে নিহতদের স্মরণ
‘ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে সহযোগিতা করছে না চীন’
‘ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে সহযোগিতা করছে না চীন’
বিদ্যুৎ কোম্পানিতে চাকরি, শিক্ষাগত যোগ্যতা এইচএসসি
বিদ্যুৎ কোম্পানিতে চাকরি, শিক্ষাগত যোগ্যতা এইচএসসি
টিভিতে আজ
টিভিতে আজ
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ