X
সকল বিভাগ
সেকশনস
সকল বিভাগ

সরকারি চাকরিতে বয়স ছাড়: সুবিচার না অবিচার?

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০২১, ১৬:৩৯

কাবিল সাদি সুদূর উহান শহর থেকে শুরু হওয়া করোনাভাইরাসের বিভীষিকার প্রভাব পড়েছে সারা বিশ্বে। তুলনামূলক সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে মানুষের আর্থ-সামাজিক জীবনে। অনেকেই হারিয়েছেন জীবন, অনেকেই হারিয়েছেন স্বজন, আবার অনেকেই হারিয়েছেন জীবিকার অবলম্বন হিসেবে একমাত্র আর্থিক সংগতিটুকুও; কেউ চাকরি হারিয়েছেন, কেউ ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, আবার কেউ হারিয়েছেন পরিবারের আয়ের প্রধান মানুষটিকে।

করোনা পূর্ববর্তী ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব হ্রাস না পেয়ে উপরন্তু বেড়েছে বেকারত্বের হার। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি তো হয়নি, উল্টো নিয়োগ প্রক্রিয়ার সমস্ত কার্যক্রম কার্যত স্থগিত থাকায় হতাশায় ভুগছেন চাকরি প্রস্তুতি নেওয়া তরুণ সমাজ। অন্যদিকে সারা বিশ্বে এখনও কোটির ওপর মানুষ চিকিৎসাধীন, নতুন করে রেকর্ড ভেঙে শনাক্ত হচ্ছে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষ। বিশ্বের বড় বড় শহরগুলোও একের পর এক লকডাউন দিতে বাধ্য হয়েছে দিনের পর দিন, কিন্তু দরিদ্র দেশসহ অনেক উন্নত দেশও তাদের নাগরিকদের এই দীর্ঘমেয়াদি লকডাউনে খাদ্য ও অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রায় ব্যর্থ হয়েছে।

এসব সামগ্রিক কারণে অধিকাংশ দেশ এই মহামারিকালীন আর্থ-সামাজিকভাবে ঘুরে দাঁড়াতে নানা কৌশল অবলম্বন করতে শুরু করেছে। যদিও করোনার ভয়াবহতা এখনও সক্রিয়, তারপরও এক প্রকার বাধ্য হয়েই ঘুরে দাঁড়াতে চাইছে কর্মমুখর এই বিশ্ব তাদের স্বাভাবিক জীবনে এবং পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে প্রতিটি দেশে টিকা প্রদানের মধ্য দিয়ে দ্রুততম সময়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার। বাংলাদেশও সম্প্রতি লকডাউন উঠিয়ে চলছে ব্যাপকভাবে টিকাদান কর্মসূচি। ফলে আমরা  আশা করতেই পারি, সব জরা ভুলে দ্রুতই স্বাভাবিক কর্মজীবনের দেখা মিলবে।

প্রথমেই বলেছি, মহামারির করাল গ্রাসে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর। ঘরবন্দি প্রায় দুটি বছর যেন হারিয়ে গেছে মানুষের স্বাভাবিক জীবন থেকে। বিশেষ করে সবচেয়ে ক্ষতি হয়েছে দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের। সব শ্রেণির শিক্ষার্থীরা হারিয়েছে তাদের মহামূল্যবান শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের দুটি গুরুত্বপূর্ণ বছর। আরও সুনির্দিষ্টভাবে বললে যারা পড়াশোনা শেষ পর্যায়ে বা শেষ করে চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, স্বপ্ন পূরণের দ্বার প্রান্তে ছিলেন, তাদের ক্ষতি  আপাতদৃষ্টিতে বেশি।

এই সংকটেও সরকার অন্যান্য দেশের মতো ঘুরে দাঁড়াবার প্রত্যয়ে লকডাউন তুলে দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পরিকল্পনা নিয়েছে। তাই এই মুহূর্তে লকডাউন না থাকায় যথারীতি খুলেছে কলকারখানা, শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং চোখে পড়ছে সরকারি-বেসরকারি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি।

করোনায় হারানো সময় পুষিয়ে নিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় নতুন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বলে গণমাধ্যমগুলো প্রকাশ করেছে, যা বেকার ও চাকরি প্রত্যাশীদের জন্য একটি আশার খবর।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো থেকে জানা যাচ্ছে, করোনাভাইরাসে সৃষ্ট পরিস্থিতির কারণে সরকারি চাকরিপ্রার্থীদের জন্য বড় আকারে বয়স ছাড়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গত বছরের ২৫ মার্চ থেকে চলতি বছরের পুরোটাই, অর্থাৎ ২১ মাস এই ছাড়ের আওতায় রাখা হয়েছে।

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গত বছরের ২৫ মার্চের পর থেকে চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে যাদের সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩০ ছাড়িয়ে গেছে বা যাচ্ছে, তারাই শুধু এই ছাড়ের সুবিধা পাবেন।

সরকারের এই সিদ্ধান্ত চলতি মহামারিতে যাদের বয়স প্রায় শেষ হয়েছিল অর্থাৎ ৩০ বছর পূর্ণ হওয়া চাকরি প্রার্থীদের জন্য অবশ্যই খুশির খবর, কিন্তু যাদের বয়স ৩০ বছর ২১ মাস বা তার বেশি আছে তাদের জন্য কোনও ফলদায়ক সিদ্ধান্ত নয়। অথচ এই মহামারিতে তারাও সমভাবে সময় ও চাকরির বিজ্ঞপ্তি ও সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

শুধু তা-ই নয়, এই মহামারিতে শিক্ষার্থীদের সব শ্রেণিতে দুই বছর হারানোরা এতে লাভবান হবে না; বরং তাদের জন্মসালে আজীবন দুই বছর ঘাটতি থেকে যাবে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে অটো প্রমোশন পেয়ে কিছুটা অগ্রগতি হলেও তাদের উচ্চশিক্ষায় ভর্তি প্রক্রিয়ার কার্যক্রম স্থগিত থাকায় সেই অর্থে বয়সের জায়গায় তাদের ক্ষতি থেকেই যাবে। অন্যদিকে যারা অনার্স পর্যায়ের শিক্ষার্থী তারাও একইভাবে বয়সের জায়গায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাবেন, যদি নতুন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়।

আরেকটু ব্যাখ্যা করে বলা যায়, যাদের বয়স ২৬ মার্চ ২০২০-এ ৩০ বছর হবে তারা ২৫ মার্চ ২০২০-এর শর্তাধীন আগামী ৩১ ডিসেম্বর, ২০২১ পর্যন্ত চাকরিতে আবেদন করতে পারবেন কিন্তু যাদের বয়স এখন ২৯ বা তার কম তাদের তো এমনিতেই আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত আবেদন করার এখতিয়ার ছিল। তারা কেউ মাঝখানে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিহীন সময়ের কোনও ছাড় পাবেন না। কারণ, এই নির্দেশনার ডেডলাইন হবে ৩১ ডিসেম্বর, ২০২১ পর্যন্ত– যা তারা এমনিতেও পারবেন। অন্যদিকে, যারা অনার্স পর্যায়ে ২ বছর সেশন জটে পড়ে আছেন, এই মহামারিতে তাদের বয়সও এই নির্দেশনা অনুযায়ী বয়সের সঙ্গে যুক্ত হবে না। অথচ তারাও ক্যারিয়ারে বয়সের ক্ষেত্রে সমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত।

এরচেয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত সবার বয়সের ক্ষতি পোষানোর চিন্তা মাথায় রেখে স্থায়ীভাবে সরকারি চাকরিতে প্রবেশসীমা অন্তত দুই বছর বাড়িয়ে ৩০-এর স্থলে ৩২ করে ক্ষতি সমন্বয় সুবিচার করা। এছাড়া বয়স বৃদ্ধির জন্য বহু আগ থেকেই বিভিন্ন শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থী সংগঠন বিভিন্ন যুক্তি উপস্থাপনের মাধ্যমে আন্দোলন করে আসছে স্থায়ীভাবে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩৫-এ উন্নীত করার জন্য। সে ক্ষেত্রে অন্তত ৩২ বা ততধিক বাড়ানোর চিন্তা যুগোপযোগী।

এছাড়াও আরও কিছু বিষয় ভাবা প্রয়োজন, ১৯৯১ সালে সরকারি চাকরিতে প্রবেশসীমা ৩০ বছর করার পর গত ৩০ বছরে আর বৃদ্ধি হয়নি অথচ গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ১১ বছর। ২০১১ সালে এসে অবসরের বয়স ৫৭ থেকে বেড়ে হয় ৫৯ আর বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য করা হয় ৬০। অবসরের বয়স যেহেতু ২ বছর বৃদ্ধি পেয়েছে সে ক্ষেত্রে চাকরিতে প্রবেশের বয়স ২ বছর বৃদ্ধি করলে সেটাও আর সাংঘর্ষিক হয় না।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) করোনা পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের চাকরি খোঁজার পোর্টালে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি পরিস্থিতি নিয়ে ২০২০ সালের একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে দেখা গেছে, এপ্রিল মাসে বাংলাদেশভিত্তিক অনলাইন জব পোর্টাল বিডিজবস.কমে আগের বছরের (২০১৯) এপ্রিলের তুলনায় ৮৭ শতাংশ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি কমেছে। করোনাকালে ক্ষতিগ্রস্ততার শিকার এই চাকরি প্রত্যাশী বেকারত্বের হার আরও বৃদ্ধি করবে।

‘ব্যাকডেট’ দেওয়ার মাধ্যমে সব বয়সী চাকরি প্রত্যাশীদের ক্ষতিপূরণ সম্ভব নয়। চাকরিতে আবেদনের বয়স স্থায়ীভাবে ২ বছর বাড়িয়ে ৩২ বছর করলে সবাই তাদের হারিয়ে যাওয়া ২ বছর ফিরে পাবেন। তাছাড়া সরকারি এই সিদ্ধান্ত অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও অনুসরণ করে থাকে। আমাদের মনে রাখতে হবে,পার্শ্ববর্তী দেশসহ পশ্চিমা উন্নত দেশগুলোতে সরকারি চাকরির প্রবেশসীমা বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি।

তাছাড়া গত তিন দশকে গড় আয়ু বেড়েছে প্রায় ১১ বছরের ওপরে, কিন্তু চাকরির প্রবেশসীমা সেই আগের জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছে।

তাই তরুণ শিক্ষার্থীদের প্রতি  শুধু মানবিক নয়, যৌক্তিক কারণেই স্থায়ীভাবে বয়স বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণ করে বয়সের সুবিচার নিশ্চিত করুন।

লেখক: নাট্যকার ও ব্যাংক কর্মকর্তা।
ইমেইল: [email protected]gmail.com

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

অস্ট্রেলিয়ার নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবেনিজ: ঐক্যের প্রতিশ্রুতি
অস্ট্রেলিয়ার নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবেনিজ: ঐক্যের প্রতিশ্রুতি
যশোরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেলো ২ জনের
যশোরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেলো ২ জনের
কুড়িগ্রামে বাড়ছে নদ-নদীর পানি, বন্যার আশঙ্কা
কুড়িগ্রামে বাড়ছে নদ-নদীর পানি, বন্যার আশঙ্কা
জুতার দাম নিয়ে কথা কাটাকাটি, ব্যবসায়ীকে ছুরিকাঘাতে হত্যা
জুতার দাম নিয়ে কথা কাটাকাটি, ব্যবসায়ীকে ছুরিকাঘাতে হত্যা
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ