X
বুধবার, ০৬ জুলাই ২০২২
২২ আষাঢ় ১৪২৯

পাকিস্তানি মদতে তালেবানের কাবুল দখলে সতর্ক বাংলাদেশ

আপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০২১, ১৭:৪৭

ফারাজী আজমল হোসেন তালেবান কাবুল দখল করায় বাংলাদেশি মৌলবাদীরা খুবই উল্লসিত। বাংলাদেশি কট্টরবাদীরা তালেবানদের জয়কে ইসলামিক শক্তির আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয় হিসেবে দেখছে। গলা ফাটিয়ে তাদের খুশিতে বলতে শোনা গেছে, ‘আলহামদুলিল্লাহ’! কিন্তু তালেবান উত্থানে আন্তর্জাতিক রাজনীতির নয়া সমীকরণ আমাদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। দেশের নিরাপত্তার জন্য ভয়ংকর বিপদ ডেকে আনতে পারে তালেবানদের কাবুল দখল। কারণ, নিরাপত্তা বাহিনীর কড়া নজরে থাকা বিভিন্ন জঙ্গিবাদী সংগঠন এখন পাকিস্তানের সহযোগিতায় নতুন করে অস্থিরতা তৈরির মতলব কষছে।

বিএনপির আমলে বাংলাদেশ থেকে অনেকে মুজাহিদিন বা তালেবান কট্টরপন্থীদের মদত জোগাতে আফগানিস্তানে গিয়েছিল। ফিরে এসে জেএমবির সহযোগিতায় বাংলাদেশে প্রচুর সন্ত্রাসী হামলা চালায় তারা। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত কট্টরবাদীরা বাংলাদেশের মাটিতে নিরাপদেই ছিল। ১৯৮০ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে বহু বাংলাদেশি আফগানিস্তানে তালেবানদের কাছ থেকে অস্ত্র প্রশিক্ষণ নেয়। এদের কেউ কেউ ১৯৯৬ সালে আফগানিস্তানে ইসলামিক আমিরাত প্রতিষ্ঠার পর ফিরে আসে বাংলাদেশে। আল কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনের সঙ্গে দেখা করে বাংলাদেশের মাটিতে শেখ আবদুস সালাম গড়ে তোলে হুজির (বি) মতো জঙ্গিবাদী সংগঠন। ১৯৮৮ সালে মুফতি আব্দুল হান্নান আফগানিস্তান যায় এবং ১৯৯৪ সালে ফিরে এসে হুজির (বি) সংগঠন শক্তিশালী করতে সক্রিয় ভূমিকা নেয়। ১৯৮৮ সালে জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)-এর প্রতিষ্ঠাতা শায়খ আব্দুর রহমানও তালেবান ও আল-কায়েদার কাজকর্মে অনুপ্রাণিত হয়েছিল।

তাই অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে সতর্ক সরকার। আফগানিস্তানে তালেবান উত্থানে পাকিস্তানপন্থীরা ফের অস্থিরতা সৃষ্টির ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, মৌলবাদীরা ফের কিছু বাংলাদেশিকে আফগানিস্তানে প্রশিক্ষণে পাঠাবে। এখনও জেএমবির হাজার দুয়েক সদস্য রয়েছে। এরা আবার আনসার আল ইসলামের হয়েও কাজ করে। কাজের ধরন এক হওয়ায় এরাই আবার কাজ করে ভারতীয় উপমহাদেশে আল কায়েদা (আকিজ) হিসেবেও। ইসলামিক স্টেটে (আইএস) অনুপ্রাণিত নব্য জেএমবি বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। ময়মনসিংহ, শেরপুর, জামালপুর, কুড়িগ্রাম, রংপুর, বগুড়া, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, লালমনিরহাট, নীলফামারী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ বহু এলাকায় তারা বেশ সক্রিয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তালেবানি ভাবধারা প্রচারকদের সতর্ক করে দিয়েছেন। সেই সঙ্গে কঠোর ভাষায় নিন্দা করেছেন পাকিস্তানপন্থী মৌলবাদীদের। জঙ্গিবাদী প্রচারের বিরুদ্ধেও দেশবাসীকে সতর্ক করেছেন।  বিএনপির আমলে বাংলাদেশের মাটিতে স্লোগান উঠেছিল,  ‘আমরা সবাই তালেবান/ বাংলা হবে আফগান’। কিন্তু বাংলাদেশ টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী জানিয়ে দেন, বাংলাদেশ সৃষ্টির মূলনীতির ওপর জোর দিয়ে তালেবান মতাদর্শের বিরুদ্ধে লড়াই করবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেন তালেবানদের কাবুল দখলের পর জানান, আফগান-প্রশিক্ষিত সন্ত্রাসীদের বিষয়ে সরকার সতর্ক রয়েছে। তাদের চিহ্নিত করে উপড়ে ফেলা হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের কর্মকর্তারা মনে করেন, জেএমবি এখন আনসার আল ইসলাম এবং নিউ-জেএমবি সংগঠনের মাধ্যমে সক্রিয় রয়েছে। আনসার আল ইসলাম আকিজ নামেও পরিচিত। তাদের দলে শ-তিনেক নারীও রয়েছে। সদস্য সংখ্যা হাজার দুয়েক। সামাজিক গণমাধ্যমে উসকানিমূলক প্রচারণাও চালাচ্ছে তারা। গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, ১২টি জেলায় বেশ সক্রিয় শায়খ আব্দুর রহমানের হাতে তৈরি সংগঠনটি। ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী বর্তমানে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। আন্তর্জাতিক দুনিয়া রোহিঙ্গা সমস্যার কোনও সমাধান করতে পারেনি।

যুক্তিসঙ্গত কারণেই আফগান শরণার্থীদের আশ্রয়ের প্রশ্নে আমেরিকার অনুরোধ রাখেনি বাংলাদেশ। তাই মৌলবাদীরা রোহিঙ্গা শরণার্থীদেরও জঙ্গিবাদী কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে।

বাংলাদেশে জঙ্গিবাদীরা বেশ কোণঠাসা। তাদের বিরুদ্ধে বেশ কিছু সাফল্য এসেছে নিরাপত্তা বাহিনীর। দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা জেএমবি, নিউ-জেএমবি, আনসার আল ইসলাম, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি), হেফাজতে ইসলাম এবং অন্যান্য জঙ্গিবাদী সংগঠনের সঙ্গে জড়িত অনেককেই গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে। ২০১৬ সালে সমকামী অধিকারকর্মী জুলহাজ মান্নান ও তার বন্ধু মাহবুব তনয়কে কুপিয়ে হত্যার অপরাধে ৩১ আগস্ট ঢাকার একটি আদালত ৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। ৬ সেপ্টেম্বর জামায়াতে ইসলামীর (জেআই) মহাসচিব মিয়া গোলাম পরওয়ার এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি ইয়াছিন আরাফাতকে তাদের ধ্বংসাত্মক কাজের জন্য গ্রেফতার করা হয়েছে। ১২ সেপ্টেম্বর সিলেট জেলা থেকে জেআই-নেতা নিজাম উদ্দিন সিদ্দিকীকে গ্রেফতার করা হয়। নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) ৪২ কর্মীকে দিনাজপুর থেকে গ্রেফতার করা হয় ১৭ সেপ্টেম্বর। সেদিনই ঢাকা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) বাসাবো থেকে গ্রেফতার করে হেফাজতে ইসলাম নেতা রেজওয়ান রফিককে। সাতক্ষীরা জেলা থেকেও জেআইর ১০ নারী সদস্যকে গ্রেফতার করা হয় একই দিনে।

২০০৫ সালে চট্টগ্রাম আদালতে বোমা হামলার ঘটনায় অক্টোবরের ৩ তারিখে চট্টগ্রাম অ্যান্টি-টেরোরিজম স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল নিষিদ্ধ জেএমবি নেতা জাহিদুল ইসলাম ওরফে বোমা মিজানকে মৃত্যুদণ্ড এবং জাবেদ ইকবাল ওরফে মোহাম্মদকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। জেএমবির বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ মিজান ওরফে কাউসার ওরফে বোমা মুন্না গত আগস্টে ভারতে গ্রেফতার হয়। ২০১৪ সালের ২ অক্টোবর বর্ধমান বিস্ফোরণে জড়িত তিনি। বুদ্ধগয়া বিস্ফোরণেও ‘বোমা মুন্না’ জড়িত ছিল। মিয়ানমারে ২০০২ সালে রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও) থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে রোহিঙ্গাদেরই জেএমবির হয়ে প্রশিক্ষণ দিতো মুন্না।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জঙ্গিবাদের প্রতি ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি শুধু মুখের কথা নয়। হেফাজতে ইসলাম এবং আফগানিস্তানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের নিয়ে গড়া তাদের উপ-দল মানহাজির বিরুদ্ধে নেওয়া কড়া ব্যবস্থা নিয়ে সেটা ফের প্রমাণ করেছে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

শেখ হাসিনার হাত ধরে আওয়ামী লীগ প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী দল হিসেবে আজ প্রতিষ্ঠিত। তার সরকারের প্রধান কাজই হচ্ছে জঙ্গিবাদকে দেশ থেকে নির্মূল করা। দক্ষিণ এশিয়া থেকে জঙ্গিবাদ নির্মূল করতে ঢাকা দ্বিপাক্ষিক, আঞ্চলিক এবং বহুমাত্রিক সমঝোতা ও সমন্বয়ে বিশ্বাসী। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭৬তম অধিবেশনে ভাইস-প্রেসিডেন্ট নির্বাচন শুধু অর্থনৈতিক বিকাশের হাত ধরেই হয়নি, সন্ত্রাস নির্মূল এবং দক্ষিণ এশীয় ও বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে স্থিরতা রক্ষায় বাংলাদেশের দায়বদ্ধতাও কাজ করেছে। আফগানিস্তান নিয়ে বাংলাদেশি মৌলবাদীরা যাই বলুন না কেন, হাসিনা সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন ৯ সেপ্টেম্বর সাফ জানিয়েছেন, ‘আমরা কিছুতেই সন্ত্রাসীদের মদত দেবো না। আমরা গণতন্ত্রের প্রতি আস্থাশীল।’

বাংলাদেশেরই শুধু নয়, তালেবানদের উত্থান আঞ্চলিক স্থিরতা ও শান্তির জন্যও বিপজ্জনক। মৌলবাদীরা নতুন করে উৎসাহিত হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে অবগত রয়েছে বাংলাদেশ সরকারও। তাই সরকারও চাইছে কড়া হাতে মৌলবাদীদের দমন করে উপমহাদেশ থেকে জঙ্গিবাদকে নির্মূল করতে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
টিভিতে আজ
টিভিতে আজ
সমর্থন আদায়ে মঙ্গোলিয়া সফরে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী
সমর্থন আদায়ে মঙ্গোলিয়া সফরে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী
রশিদ ছাড়া হাসিল আদায়
রশিদ ছাড়া হাসিল আদায়
শখ করে বন্ধুরা ফেললেন জাল, ধরা পড়লো ৩২ কেজির বাগাড়
শখ করে বন্ধুরা ফেললেন জাল, ধরা পড়লো ৩২ কেজির বাগাড়
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ