X
সোমবার, ০৩ অক্টোবর ২০২২
১৭ আশ্বিন ১৪২৯

জলবায়ু সম্মেলনে কী হচ্ছে?

আনিস আলমগীর
০২ নভেম্বর ২০২১, ১৬:০১আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০২১, ১৬:০১

আনিস আলমগীর জলবায়ু সম্মেলন কপ-২৬-এর নিউজ কাভার করতে দেশের শতাধিক সাংবাদিক গ্লাসগোতে গেছেন। আরও একদল যাওয়ার পথে। এত বড় একটি সম্মেলন হচ্ছে, তা বাংলাদেশের জন্য যতটা গুরুত্বপূর্ণ, সংবাদমাধ্যমে তার ছোঁয়া তেমনটা নেই। আবার এই সম্মেলন এবং জলবায়ুর পরিবর্তন নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের উদ্বেগ-উৎসাহও কখনও চোখে পড়ে না। কিছু এনজিও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে ‘চিল্লাপাল্লা’ করে টাকা কামাই করে সত্য, কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে দেশের মানুষ কতটা সচেতন আমার সন্দেহ আছে।

তাহলে বলতে হয়, জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়টি আসলে কী? খুব সহজ করে বললে, আপনি যেখানে বাস করছেন সেই জায়গায় বছরের পর বছর ধরে আবহাওয়া গড়ে যেমন আছে তাকেই বলা হয় জলবায়ু। আর আবহাওয়ার সেই চেনাজানা ধরন বদলে যাওয়াকেই বলা হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন। এই পরিবর্তনের ফল হচ্ছে, পৃথিবীর কোনও কোনও অঞ্চল বিপজ্জনক মাত্রায় গরম হয়ে পড়বে, এবং সেই সঙ্গে বরফ গলে সমুদ্রের পানি বেড়ে বহু এলাকা প্লাবিত হবে। ফলে সেসব জায়গা বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে। বাংলাদেশসহ ৪৮টি দেশ এমন বিপদের মুখে আছে।

শুধু মানুষ নয়, আবহাওয়া বদলের জেরে অনেক প্রাণী নতুন জায়গায় চলে যাবে বা যাওয়ার চেষ্টা করবে। জলবায়ুর এই পরিবর্তন এত দ্রুত ঘটছে যে অনেক প্রজাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। যেমন, বরফ গলতে থাকায় পোলার বিয়ার বা উত্তর মেরুর শ্বেত ভালুকের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি, আটলান্টিক মহাসাগরের স্যামন মাছ বিপন্ন হবে। কারণ, যেসব নদীতে ঢুকে তারা ডিম পেড়ে বাচ্চার জন্ম দেয়, সেগুলোর পানি গরম হয়ে যাচ্ছে। সমুদ্রের প্রবাল-প্রাচীর উধাও হয়ে যেতে পারে। কারণ, বায়ুমণ্ডলের অতিরিক্ত কার্বন ডাই অক্সাইড সাগরের পানিতে মিশে পানির অ্যাসিডের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে।

তাহলে এখন প্রশ্ন আসবে কেন এই জলবায়ুর পরিবর্তন? উত্তর হচ্ছে, প্রাকৃতিক কারণে জলবায়ুতে স্বাভাবিকভাবেই কিছু পরিবর্তন হয়। কিন্তু যে মাত্রায় এখন তাপমাত্রা বাড়ছে তার জন্য মানুষের কর্মকাণ্ডই প্রধানত দায়ী। মানুষ যখন থেকে কলকারখানা এবং যানবাহন চালাতে বা শীতে ঘর গরম রাখতে তেল, গ্যাস এবং কয়লা পোড়াতে শুরু করলো সেই সময়ের তুলনায় পৃথিবীর তাপমাত্রা এখন ১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গেছে। বায়ুমণ্ডলে অন্যতম একটি গ্রিন হাউজ গ্যাস কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ ঊনবিংশ শতকের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেড়ে গেছে। গত দুই দশকে বেড়েছে ১২ শতাংশ।

আর যেসব দেশ বাতাসে বেশি কার্বন নিঃসরণ ঘটাচ্ছে তার মধ্যে সবার শীর্ষে রয়েছে চীন এবং এটি দ্বিতীয় স্থানে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ কার্বন নিঃসরণ ঘটাচ্ছে। এরপরে রয়েছে যথাক্রমে ভারত, রাশিয়া, জাপান, জার্মানি, ইরান, দক্ষিণ কোরিয়া, সৌদি আরব, কানাডা, ইন্দোনেশিয়া। আর সম্মিলিতভাবে ইইউ দেশগুলো কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাস নিঃসরণে ভারতের ওপরে অবস্থান করছে।

ব্যক্তিগতভাবে আপনি জলবায়ু পরিবর্তন রোধে কী ভূমিকা পালন করতে পারেন? আপনি গাড়ির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সাইকেল বা জনপরিবহনের ব্যবহার বাড়াতে পারেন, বাড়িতে যাতে গরম বা ঠাণ্ডা কম ঢোকে তার ব্যবস্থা নিতে পারেন, মাংস এবং দুগ্ধজাত খাবার কমাতে পারেন, বিমান ভ্রমণ কমাতে পারেন। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিল্প বিপ্লব শুরুর আগে বিশ্বের যে তাপমাত্রা ছিল তার থেকে বৃদ্ধির মাত্রা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখা গেলে বড় ধরনের বিপদ এড়ানো যাবে। তা না পারলে বিপজ্জনক হয়ে পড়বে প্রকৃতি, পরিবেশ এবং মানুষের জীবন। আর এর উপায় এবং কৌশল নিয়েই বিশ্বের ১২০টির বেশি দেশের নেতারা যুক্তরাজ্যের স্কটল্যান্ডে গ্লাসগো শহরে জাতিসংঘের জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১ নভেম্বর ২০২১ এই শীর্ষ সম্মেলন যোগ দিয়েছেন বিশ্বনেতাদের সঙ্গে। এটাকে বলা হচ্ছে কপ-২৬। কপ-এর মানে হচ্ছে কনফারেন্স অব দ্য পার্টিস। ১৯৯৪ সালে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশনের (ইউএনএফসিসিসি) অধীনে একটি চুক্তিতে যেসব দেশ স্বাক্ষর করেছিল তারা এই সম্মেলনে যোগ দেয়।

এবারের সম্মেলন উদ্বোধন করে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বলেছেন, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে মানবজাতির সামনে ‘সমূহ বিপর্যয়’ হাজির হয়েছে। পৃথিবীর ভাগ্য নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের পটভূমিতে এই শীর্ষ সম্মেলনকে ‘লাস্ট, বেস্ট হোপ’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস গ্রিনহাউজ গ্যাসের নিঃসরণ কমাতে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।

তবে সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন না চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। শি জিনপিংয়ের জলবায়ু বিষয়ক বিশেষ দূত হিসেবে বেইজিংয়ের প্রতিনিধিত্ব করছেন শি জেনহুয়া। তিনি ২০০৭ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে প্রধান জলবায়ু বৈঠকে চীনের প্রধান আলোচক হিসেবে কাজ করছেন এবং ২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তি এগিয়ে নিতে সাহায্য করেছিলেন বলে মনে করা হয়। তুরস্কও যোগ দিচ্ছে না সম্মেলনে।

আগেই বলেছি, বিশ্বের তিন বৃহত্তম কার্বন নির্গমনকারী দেশ চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলনে সবসময় অতিরিক্ত মনোযোগ আকর্ষণ করে এবং কয়লা ও বন উজাড়ের মতো বিষয়ে তাদের প্রতিশ্রুতি আরও কঠোর করার জন্য চাপের সম্মুখীন হয়, যদিও এরা প্রতিশ্রুতি রাখে না।

চীন কী করবে সেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বিশ্বের কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমনের প্রায় ২৮ শতাংশের জন্য দায়ী চীন। সম্মেলনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ আশাব্যঞ্জক। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক্ষমতায় এলে যুক্তরাষ্ট্রের এই সম্মেলনে থাকা নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। কিন্তু ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে প্যারিস চুক্তিতে ফিরে আসা জো বাইডেনের নির্বাচনি অঙ্গীকার ছিল।

দায়িত্ব গ্রহণের পর জো বাইডেন পূর্বসূরি ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্যারিস চুক্তি থেকে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত বাতিল করেন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম কার্বন নির্গমনকারী। তাই সম্মেলনে তাদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম কার্বন নিঃসরণকারী হওয়া সত্ত্বেও ভারত তার নেট-জিরো-বর্ষ ঘোষণা করেনি বা প্যারিস চুক্তি অনুযায়ী প্রতি পাঁচ বছরে কার্বন-হ্রাস উচ্চাকাঙ্ক্ষাসহ একটি আপডেট জলবায়ু পরিকল্পনা (এনডিসি) জাতিসংঘের কাছে জমা দেয়নি। অনেকেই আশা করছেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গ্লাসগোতে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দিতে প্রস্তুত হবেন।

ছয় বছর আগে ২০১৫ সালে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে বৈশ্বিক উষ্ণতা দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসে নামিয়ে আনতে ১৯০টিরও বেশি দেশ চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। সেখানে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নামিয়ে আনার চেষ্টার কথা বলা হয়েছিল। এই পরিকল্পনা যদি সফল না হয় তাহলে উষ্ণ তাপমাত্রায় পুরো পৃথিবী যেমন বিপর্যয়ের মুখে পড়বে, তেমনি সমুদ্রসীমা বেড়ে অনেক দেশ পানির নিচে তলিয়ে যাবে। জাতিসংঘের মতে, বর্তমানে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ২.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁতে চলেছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে প্যারিসে স্থিরকৃত লক্ষ্য অর্জনে ২০৩০ সালের মধ্যে নির্গমনকে অর্ধেকে নামিয়ে আনতে হবে।

কপ২৬ সম্মেলনে অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় বিবৃতিতে চারটি প্রস্তাব পেশ করেন। প্রথম প্রস্তাবে তিনি বলেন, উন্নত দেশগুলোকে অবশ্যই তাদের জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (এনডিসি) ঘোষণা এবং জাতীয় কার্বন নিঃসরণ হ্রাস এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব অভিযোজন বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রধান নির্গমনকারীদের অবশ্যই তাদের উচ্চাভিলাষী এনডিসি পেশ এবং সেগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে।

দ্বিতীয় প্রস্তাবে তিনি বলেন, উন্নত দেশগুলোর উচিত অভিযোজন এবং প্রশমনের মধ্যে ৫০:৫০ ভারসাম্য রেখে বার্ষিক ১০০ বিলিয়ন ডলার প্রদানের প্রতিশ্রুতি পূরণ করা। তৃতীয় প্রস্তাবে বলেন, উন্নত দেশগুলোর উচিত সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোতে সাশ্রয়ী মূল্যে পরিচ্ছন্ন ও সবুজ প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেওয়া এবং সিভিএফ দেশগুলোর উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তাও বিবেচনা করা। চতুর্থ প্রস্তাবে বলেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙন, বন্যা এবং খরার কারণে বাস্তুচ্যুত জলবায়ু অভিবাসীদের জন্য বিশ্বব্যাপী দায়বদ্ধতা ভাগ করে নেওয়াসহ লোকসান ও ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি অবশ্যই সমাধান করতে হবে।

উল্লেখ করা দরকার, জলবায়ু সম্মেলনে পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ-সমাবেশ সম্মেলনের আরেকটি দিক। দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার পরিবেশবাদী সেখানে ভিড় করেন। কট্টর পরিবেশ আন্দোলনকারীদের আক্রমণ থেকে বিশ্বনেতাদের রক্ষা করতে নিরাপত্তা জোরদার করতে হয়, যেমনটা এবার পুলিশের ১০ হাজার সদস্যকে গ্লাসগোতে মোতায়েন করা হয়েছে। গ্লাসগোতেও একই চিত্র। নানা দেশ থেকে বিভিন্ন ব্যানারে কয়েক হাজার আন্দোলনকারী সেখানে জড়ো হচ্ছে। শহরের বিভিন্ন জায়গায় হঠাৎ হঠাৎ জড়ো হয়ে খণ্ড খণ্ড বিক্ষোভ করছেন তারা। স্লোগান দিচ্ছেন, গান গাইছেন, সরকারগুলোকে গালিগালাজ করছেন। যে তিন দিন বিশ্বনেতারা শহরে থাকবেন, এসব আন্দোলনকারী বেশি সরব থাকবেন। পুলিশ যদি বাধা দেয় তাহলে পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে এখনও বলার সময় হয়নি।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত। [email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
২৪ ঘণ্টার মধ্যে আসামিদের গ্রেপ্তারের আলটিমেটাম
জাপা নেতাকে কুপিয়ে পা বিচ্ছিন্ন২৪ ঘণ্টার মধ্যে আসামিদের গ্রেপ্তারের আলটিমেটাম
আগামী প্রজন্মের জন্য পরিকল্পিত নগরায়ণের বিকল্প নেই : রাষ্ট্রপতি
আগামী প্রজন্মের জন্য পরিকল্পিত নগরায়ণের বিকল্প নেই : রাষ্ট্রপতি
শান্ত হত্যা মামলায় শোন অ্যারেস্ট ছাত্রলীগ নেতা অনিক
শান্ত হত্যা মামলায় শোন অ্যারেস্ট ছাত্রলীগ নেতা অনিক
তেলের উৎপাদন কমাচ্ছে ওপেকপ্লাস, দাম বাড়ার আশঙ্কা
তেলের উৎপাদন কমাচ্ছে ওপেকপ্লাস, দাম বাড়ার আশঙ্কা
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ