X
বৃহস্পতিবার, ০৭ জুলাই ২০২২
২৩ আষাঢ় ১৪২৯

চিকিৎসা নিতে কেন বিদেশমুখী?

আপডেট : ১৯ ডিসেম্বর ২০২১, ১৮:০৬
স ম মাহবুবুল আলম বাংলাদেশের রোগীদের চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা ক্রমবর্ধমান। এর কী কারণ? বিদেশ থেকে ফেরা রোগীদের বর্ণনা থেকে যে প্রধান কারণগুলো স্পষ্ট হয়,তা হলো–

১. বিদেশে স্বল্পমূল্যে চিকিৎসা করানো যায়।
২. উচ্চমানের চিকিৎসা সুবিধা পাওয়া যায়। দ্রুত রোগ নির্ণয় ও সঠিক চিকিৎসা হয়, এবং
৩. চিকিৎসকরা আন্তরিক ব্যবহার করেন। পর্যাপ্ত সময় ও মনোযোগ প্রদান করেন।

রোগ নিরাময়ের জন্য, কষ্ট লাঘবের জন্য রোগীরা দেশের ভেতরে এক চিকিৎসক থেকে আরেক চিকিৎসকের কাছে, এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে দৌড়াতে থাকেন। নিরুপায় মানুষ অপচিকিৎসা  বা বিকল্প চিকিৎসা যেমন ঝাড়-ফুঁক, কবিরাজের দ্বারস্থ হয়। ক্যানসার ধরা পড়ার পরে বা দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত রোগীদের বিশেষায়িত চিকিৎসার খোঁজ করা প্রত্যাশিত। অত্যাধুনিক প্রাগ্রসর (হাই-এন্ড) চিকিৎসা সেবা এখনও আমাদের দেশে অপ্রতুল। যতটুকু গড়ে উঠেছে তা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। অত্যাধুনিক প্রাগ্রসর চিকিৎসা গ্রহণের জন্য তাই আমাদের দেশের রোগীদের প্রায়ই বিদেশে যেতে হয়। বিদেশের তালিকায় প্রথমত পড়ে ভারত, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া। যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের মতো উন্নত দেশও আছে অতি ধনীদের পছন্দের তালিকায়। বিদেশগামী বাংলাদেশি রোগীদের সবচেয়ে বড় গন্তব্য পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত। উচ্চমানের চিকিৎসা সুবিধার পাশাপাশি এর কারণ বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের স্থলপথে যোগাযোগ। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল থেকে ঢাকায় যেতে যত সময় লাগে, ভারতে যেতে তার চেয়ে কম সময় লাগে। ভারত ও বাংলাদেশের মানুষের খাবার-দাবার,  ভাষা এবং সংস্কৃতির রয়েছে অনেক মিল। এক হিসাবে দেখা গেছে, ২০১৭ সালে বাংলাদেশ থেকে ২ লাখ ২১ হাজার ৭৫১ রোগী চিকিৎসার উদ্দেশে ভারতে গেছেন। তারা খরচ করেছেন আনুমানিক পাঁচ হাজার কোটি টাকা। প্রতি বছর বাংলাদেশি রোগীদের ভারতমুখী স্রোত বেড়েই চলেছে। এর কারণ দেশের চিকিৎসা সেবায় জনগণের আস্থাহীনতা, অরাজক অবস্থা, নিম্নমানের সেবা ও উচ্চ খরচ।

বাংলাদেশের রোগীরা ভারতে যান জটিল হার্ট সার্জারি, ক্যানসারের চিকিৎসা, অঙ্গ প্রতিস্থাপন, বন্ধ্যত্ব চিকিৎসা, অস্থি ও অস্থিসন্ধির অপারেশন, স্নায়ুরোগ, কিডনি রোগ, মেডিক্যাল চেকআপ প্রভৃতির জন্য।

একটু কি আশ্চর্যান্বিত করছে না! স্বাস্থ্যসেবার বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশের চেয়ে ভারত পিছিয়ে। মা ও শিশুমৃত্যু হ্রাসের লক্ষ্য পূরণে সমর্থ হয়নি ভারত। অথচ সেই দেশটি দিনে দিনে চিকিৎসা পর্যটনের কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে!  কোনও এক দেশ থেকে অন্য আরেক দেশে সুলভ মূল্যে সুচিকিৎসার আশায় ভ্রমণ করাকে বলা হয় চিকিৎসা পর্যটন। কোনও একটি দেশ নিজেকে চিকিৎসা পর্যটনের গন্তব্যে পরিণত করতে চাইলে প্রথম শর্ত হলো দেশটিকে সুলভ মূল্যে উন্নত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে হবে। ভারত সেই কাজটি করতে পেরেছে। শুধু বাংলাদেশি রোগী নয়, ইউরোপ, আফ্রিকা, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়া থেকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ রোগী ভারতে চিকিৎসা নিতে আসেন। সঙ্গত কারণে আমাদের দুর্বলতা অনুধাবন করতে শুধু ভারতকেই আলোচনায় রাখা হয়েছে।

ভারতে যেভাবে সফল চিকিৎসা পর্যটন গড়ে উঠেছে:

সুলভ মূল্যে স্বাস্থ্যসেবা: গত শতাব্দীর শেষ দশকে ভারত সরকার অর্থনৈতিক উদারীকরণ নীতি গ্রহণ করে। এর আওতায় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও করপোরেট বিনিয়োগে ভারতে দ্রুত বেসরকারি হাসপাতাল গড়ে উঠতে শুরু করে।  রাষ্ট্রের কাছ থেকে নামমাত্র মূল্যে জমি ও কর সুবিধা নিয়ে ভারতের করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তোলে লাভজনক দৃষ্টিনন্দন অজস্র হাসপাতাল। চিকিৎসা সামগ্রী আমদানিতে ভারতে করের পরিমাণ মাত্র ১২ শতাংশ (বাংলাদেশে এই করের হার ৪৫%)। একই পণ্য আমদানি বা ক্রয়=বিক্রয়ের জন্য মাত্র একবার ভ্যাট দিতে হয়। বাংলাদেশের মতো বারবার ভ্যাট দিতে হয় না।  ভারতের হাসপাতালগুলো বহু ক্ষেত্রেই নিজস্ব প্রযুক্তি, নিজস্ব উৎপাদিত চিকিৎসা সামগ্রী ব্যবহার করে থাকে।  উন্নত ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে বিপুল সংখ্যক রোগীকে তারা আকৃষ্ট করে একই অবকাঠামো ব্যবহার করে। তারা বিপুল সংখ্যক পরীক্ষা, সেবা, যন্ত্রপাতির সর্বোচ্চ ব্যবহার করে চিকিৎসা সামগ্রীর পুনর্ব্যবহার ও জনশক্তি সাশ্রয় করে। যার ফলে তারা সুলভ মূল্যে চিকিৎসা সেবা দিতে সমর্থ হয়। ভারতের অর্থনীতিতে চিকিৎসা পর্যটনকে রফতানি পণ্য হিসেবে গণ্য করা হয়। এবং রফতানি খাতের আয় হিসেবে সব আর্থিক সুবিধা পায়।

প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর: ভারতে সরকার ও করপোরেটের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় ও বিপুল বিনিয়োগে বেসরকারি হাসপাতালগুলো উন্নত অবকাঠামো নির্মাণ, ভেতরের চাকচিক্যপূর্ণ সাজসজ্জা, গ্রাহক যত্ন পরিষেবা, নিয়মিত চিকিৎসা সরঞ্জাম উন্নতকরণ এবং সর্বদা শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শনের প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে। এসব হাসপাতাল জেসিআই বা এনএবিএইচ স্বীকৃত। তা তাদের উন্নত মান নিশ্চিত করছে ও গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করছে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও চিকিৎসা সেবাকে তারা দ্রুততম সময়ে প্রচলন করতে পেরেছে। রোগীকে সেবা দেওয়ার পূর্ণাঙ্গ ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তারা গড়ে তুলেছে।

দক্ষ চিকিৎসকের উৎস: ভারতের চিকিৎসা  শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আন্ডার গ্রাজুয়েট, গ্রাজুয়েট, ইন জব প্রশিক্ষণ ইত্যাদি শিক্ষা কার্যক্রমে ধারাবাহিক মান বজায় রাখতে এবং উন্নত করতে সক্ষম হয়েছে। এইমস, পিজিআই চন্দ্রীগড়ের মতো প্রধান চিকিৎসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ভারতের স্বাস্থ্যসেবার বাতিঘর হয়ে কাজ করছে। চিকিৎসা প্রশিক্ষণার্থীদের নানা সহায়ক পরিবেশে প্রশিক্ষণ প্রদান তাদের অনেক বেশি দক্ষ ও উন্নত করে তৈরি করছে। ভারতে বর্তমানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা ৩ লাখের অধিক। সেখানে তারা সাব স্পেশালিস্ট ও সুপার স্পেশালিস্ট হওয়ার সুযোগ পায়। যা তাদের দক্ষতাকে আরেক ধাপ উঁচুতে নিয়ে যায়। ভারতে স্বাস্থ্যকর্মীর তীব্র ঘাটতি সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় ডাক্তাররা উন্নত দেশে মাইগ্রেট করে। এ মুহূর্তে ৬৯ হাজারেরও বেশি ভারতীয় মেডিক্যাল গ্রাজুয়েট পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কাজ করছেন। তারা করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর উচ্চ বেতনের কারণে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করে দেশে ফিরছেন। এসব চিকিৎসক অনেক বেশি কেতাদুরস্ত। ভারতীয় চিকিৎসকরা রোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে সুদক্ষ। ভালো ব্যবহার ভারতীয় চিকিৎসকদের নিছক ভালোমানুষী বা মানবিকতার বহিঃপ্রকাশ নয়, এটি তাদের করপোরেট সংস্কৃতির বাধ্যবাধকতা। ভারতের চিকিৎসকদের জবাবদিহি করতে হয়। চিকিৎসা অবহেলার অভিযোগ আমলে নেওয়ার সময় মেডিক্যাল কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া রোগীবান্ধব অবস্থানে থাকে। যা চিকিৎসকদের ভুল করা থেকে সতর্ক থাকতে ও চিকিৎসায় প্রমাণভিত্তিক অনুশীলনে বাধ্য করে।

স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি সরকারি সার্বিক সহায়তায়, বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান, যেমন- বিমান পরিচালনা সংস্থা, হোটেল, হাসপাতাল, সেবার মূল্য ইত্যাদি যথাযথ সমন্বয়ের মাধ্যমে ভারত নিজেকে চিকিৎসা পর্যটনের গন্তব্যে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছে। এছাড়া সোশ্যাল মিডিয়া এবং অন্যান্য অনলাইন মাধ্যম ভারতীয় করপোরেট হাসপাতালগুলোর সুখ্যাতি ও তথ্যে সয়লাব। ইন্টারনেট মার্কেটিংসহ অসংখ্য এজেন্সি কাজ করছে বাংলাদেশ থেকে ভারতের রোগী নিয়ে যাওয়ার জন্য। ভারতের বিভিন্ন হাসপাতাল চেইনের সঙ্গে তাদের সংযোগ আছে। সব ধরনের চিকিৎসা ব্যবস্থা দ্রুত ও সহজে করানো ছাড়াও তারা মেডিক্যাল ভিসা সহায়তা ও এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে। ভিসাপ্রাপ্তিও সহজ করেছে দেশটি।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে পশ্চাৎপদতার স্বরূপ: বাংলাদেশে সুসংগঠিত বেসরকারি স্বাস্থ্য খাত এখনও গড়ে ওঠেনি। ভারতের দেখাদেখি এখানেও কেউ কেউ স্বপ্ন দেখেছে চাকচিক্যে ভরা করপোরেট হাসপাতাল গড়ে উঠবে। সরকার ও করপোরেটের সেই প্রণোদনা, বিনিয়োগ ও ট্যাক্স ছাড় নাই। অনেক আমদানিকৃত দ্রব্য ভায়া ভারত আসে। ব্যবস্থাপনার সংকট তুঙ্গে। তাই বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা মূল্য কমাতে পারছে না। একই অবকাঠামোয় বিপুল সংখ্যক রোগীকে আকৃষ্ট করতে পারলে স্বল্প মূল্যে সেবা দেওয়া যায়। একই যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে সর্বোচ্চ সংখ্যায় সেবা (সার্জারি, প্রসিডিউর, পরীক্ষা) দেওয়া সম্ভব হয় তখন।  আবার স্বল্প মূল্য হলেই বেশি ভোক্তা আসবে। চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি, ল্যাব রিএজেন্ট, ভ্যাকসিনের জন্য আজও আমরা পুরোপুরি আমদানি নির্ভর দেশ। দেশ নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করতে পারেনি। নিজস্ব উৎপাদিত চিকিৎসা সামগ্রীর ব্যবহার সেবামূল্য কমাতে পারতো। সরকারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা কিছু নির্বোধ, অদক্ষ ও দুর্নীতিগ্রস্ত লোকজনের দখলে। যা অনেক সেবার অবিশ্বাস্য মূল্য তৈরি করছে। উদাহরণ হিসেবে PET/CT স্ক্যান উল্লেখ করা যেতে পারে- যে পরীক্ষা প্রায় সকল ক্যানসার রোগীর জন্য প্রয়োজন। ভারতে বেসরকারিতে ১২ হাজার টাকায় সম্ভব হলেও বাংলাদেশ তা ৫০ হাজার টাকার ওপরে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, সরকারি খাতের মতো বাংলাদেশের বেসরকারি খাতও ব্যাপকভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত।

বিগত বছরগুলোতে আন্ডার গ্রাজুয়েট, পোস্ট গ্রাজুয়েট ভর্তিতে সীমাহীন দুর্নীতি স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল, অনৈতিক জনশক্তি সৃষ্টি করেছে। একই সময় চিকিৎসা শিক্ষার মানের ভয়ংকর অবনমন, মানহীন মেডিক্যাল কলেজের অপরিমিত সংযোগ হয়েছে। তারা স্বাস্থ্য খাতে ঝুঁকি তৈরি করেছে। উন্নত প্রাগ্রসর চিকিৎসা সেবার জন্য সুপার স্পেশালিস্ট, সাব-স্পেশালিস্ট তৈরি করা প্রয়োজন। তা তৈরি ও ধারণ করার মতো কাঠামো গড়ে ওঠেনি দেশে। তরুণ চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ ও পোস্ট গ্রাজুয়েট ডিগ্রি অর্জনের জন্য অবিশ্বাস্য প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়। বৈদেশিক প্রশিক্ষণের সুযোগ শূন্যের কোঠায়। এখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা অনেক কম। আবার যারা খ্যাতি অর্জন করেছেন তাদের কাছেই রোগীরা যেতে চান। তাই তারা রোগীকে সময় দিতে পারেন খুবই কম। চিকিৎসকদের রোগীর সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে পেশাদার এবং সংবেদনশীল যোগাযোগ দক্ষতার ঘাটতি তীব্র। রোগীর তুলনায় দেশের হাসপাতালে শয্যা, চিকিৎসক ও নার্সের সংখ্যা কম।

অত্যাধুনিক প্রাগ্রসর ও দক্ষতানির্ভর ডায়াগনস্টিক পরীক্ষাসমূহে ঘাটতি স্পষ্ট। ল্যাবরেটরি পরীক্ষার নির্ভুলতা নিশ্চিতে মান নিয়ন্ত্রণ কাঠামো অত্যন্ত দুর্বল। ডায়াগনস্টিক পরীক্ষার উচ্চমূল্য চিকিৎসা সেবাকে ব্যয়বহুল করছে।

যা কিছু উন্নত চিকিৎসা সেবা তা এখনও ঢাকা কেন্দ্রিক, ঢাকায় আসতে হয়। তা হয়তো অভ্যন্তরীণ মেডিক্যাল ট্যুরিজিমের পর্যায়ে পড়ে। কিন্তু ঢাকায় পার্শ্ববর্তী দেশের মতো থাকা, খাওয়া অন্যান্য সহ-প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি হয়নি। একই ছাদের নিচে সব সেবা পাওয়া যায় না, খণ্ডিতভাবে বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে নিতে হয়।

তারপরেও দেশের স্বাস্থ্যসেবায় বেসরকারি খাতের দাপট জোরালো। তবে বিশেষভাবে দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনশক্তির অভাব, চিকিৎসা সেবার উচ্চমূল্য, নিম্নমানের সেবা ও দুর্বল ব্যবস্থাপনা বেসরকারি খাতে পূর্ণাঙ্গ বিশ্বমানের হাসপাতাল তৈরির প্রতিবন্ধক হয়ে আছে।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের সংকট: আমাদের সংকটের জায়গাটি বোঝার আগে, ভারতের বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাতের সমৃদ্ধির প্রভাবটা একটু ফিরে দেখা যাক।

বাংলাদেশের মধ্যবিত্তরা দু’একবার ভারতের করপোরেট হাসপাতাল ঘুরে এসে মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। তারা জানেন না যে ভারতের উন্নত হাসপাতালগুলোতে তাদের ৮০ শতাংশ জনগণের সেবা গ্রহণের আর্থিক সক্ষমতা নেই। ভারতের গরিব মানুষকে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে জমিজমা, ঘটিবাটি বিক্রি করতে হয়। ভারতের সরকারি হাসপাতালগুলোর অবস্থা বাংলাদেশের চেয়ে আলাদা কিছু নয়। ওখানেও প্রচুর অব্যবস্থাপনা, ভুল চিকিৎসা, হাসপাতালের মেঝেতে রোগী শুয়ে থাকা এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ বিরাজ করে। ভারতের করপোরেট চিকিৎসা পর্যটনের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আহরণ আর অর্থনৈতিক ভিত শক্তিশালী হওয়ার জয়গান করছে। আদতে ভারতের স্বাস্থ্যসেবা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। একদিকে ভারতের বেসরকারি ব্যয়বহুল স্বাস্থ্য অবকাঠামো দেশের সীমিত সংখ্যক ধনী ও বিদেশি রোগীদের সেবা দিচ্ছে। অন্যদিকে দরিদ্র জনগণের বিপুল অংশ মৌলিক স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকছে। প্রবৃদ্ধি বাড়াতে ভারতীয় সরকার চিকিৎসা পর্যটনে ভর্তুকি ও ছাড় দিতে গিয়ে উপেক্ষিত রাখছে প্রয়োজনীয় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা খাত।

ভারতীয় চিকিৎসকদের ব্যাপক হারে বিদেশ গমনে একসময় ‘মেধা পাচার’ঘটেছে। বেসরকারি খাতের সমৃদ্ধিতে তাদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে চমৎকার বিপরীত ইতিবাচক অবস্থা মনে হতে পারে। প্রকৃত অর্থে তারা দেশে বসেই বিদেশি আর ধনীদের চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন। সরকারি চাকরির বদলে ভারতীয় চিকিৎসকরা আকর্ষণীয় করপোরেট হাসপাতালে যোগ দিচ্ছে। সরকারি খাতে ও গ্রামীণ অঞ্চলে সংকট সৃষ্টি হচ্ছে দক্ষ চিকিৎসকের। ভারতের নবসৃষ্ট শক্তিশালী বেসরকারি খাত বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে গণমুখী সরকারি খাতের বিকাশে, সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জনে। ভারতীয় সরকারের করপোরেট হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায় প্রণোদনায় ভারতীয় জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত না লাভবান হলো, সেটা ভারতীয় জনগণ বুঝুক।

তবে চাকচিক্যে বিভ্রান্ত না হয়ে আমাদের সঠিক পথে চলতে জানতে হবে ভারতীয় স্বাস্থ্যসেবার গতিপথ। স্বাধীনতার ৫০তম বছরে এসে বাংলাদেশের মানুষের চিকিৎসা নিতে এই বিদেশ যাত্রা পরিতাপের বিষয়। এই লেখার শুরুতে উল্লেখিত তিনটি কারণকে সাদা দৃষ্টিতে চিকিৎসকদের কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে। প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশের চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অন্তহীন অভিযোগ। তারা রোগীদের সময় দেন না। অবহেলা ও দুর্ব্যবহার করেন। অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় টেস্ট করতে বলেন, পরীক্ষার রিপোর্ট ভুল আসে, একই টেস্টর রিপোর্ট একেক ডায়াগনস্টিকে একেক রকম আসে, ডায়াগনস্টিকে পরীক্ষা না করে রিপোর্ট দেওয়ার অভিযোগ। চিকিৎসকরা প্রেসক্রিপশনে অতিরিক্ত ওষুধ লেখেন। তারা ওষুধ কোম্পানি, ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কাছ থেকে কমিশন পান। সারাদেশে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা ক্লিনিকে অপ্রয়োজনীয় সার্জারি, সার্জারির নামে প্রতারণা, রোগীদের কাছ থেকে যেনতেন প্রকারে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। সংবাদপত্রের প্রিয় খবর ভুল চিকিৎসায়, চিকিৎসকের অবহেলায় রোগীর মৃত্যু। রোগী বা আত্মীয়-স্বজনের নিজেদের জীবনের গল্প-অভিজ্ঞতায় দেশে চিকিৎসা নিতে গিয়ে করুণ পরিণতি, জীবন ঝুঁকি, মৃত্যু এবং অন্যদিকে বিদেশে গিয়ে ভালো চিকিৎসা পেয়ে ফিরে আসার গল্প। চিকিৎসায় রোগীর দুর্দশাগ্রস্ত পরিণতি দেখে ক্ষুব্ধ স্বজনেরা চিকিৎসকদের আক্রমণাত্মক ভাষায় কসাই, লোভী, অর্থ উপার্জনের মেশিন বলে অভিহিত করছেন। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকদের অনিয়ম, স্বাস্থ্যকর্মীর অনুপস্থিতি, দুর্ব্যবহার, অরাজক, অস্বাস্থ্যকর ও ভোগান্তির চিত্র এই লেখায় অপ্রাসঙ্গিক।

রোগীরা যা দেখতে পাচ্ছেন সেখান থেকে তাদের সংক্ষুব্ধতার প্রতিটি শব্দই নির্দয়ভাবে সঠিক। তাদের ওপরের প্রতিটি অনুভূতিকে বিবেচনায় নিয়েই আমরা ভুক্তভোগী রোগীদের মানসিক অবস্থা বোঝার চেষ্টা করি। কোনও একটা রোগের সূচনায় রোগীরা  তাদের রোগকে ধর্তব্যের মধ্যে আনতে চান না। এবং কোনও খরচ করতেও প্রস্তুত থাকেন না। তারা বাড়ির কাছের ফার্মাসি থেকে স্থানীয় চিকিৎসকদের কাছে ঘুরতে থাকেন। রোগীর কাছে ওষুধ, পরীক্ষা সবকিছু তখন বিরাট বোঝা মনে হয়। মাত্রাতিরিক্ত খরচ মনে হয়। দেশের ভেতরেই উন্নত কেন্দ্রে যাওয়ার কথা মনে করতে পারে না। রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা দুটোই তখন অসম্পূর্ণ। দেশের চিকিৎসার প্রতি চূড়ান্ত আস্থাহীনতা থেকে পার্শ্ববর্তী দেশে যাওয়ার কথা ভাবেন– তখন তিনি প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করেন, সঠিক হাসপাতালের তথ্য সংগ্রহ করে পুরোপুরি আত্মসমর্পণের মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে যায়।

আধুনিক সমাজ দর্শনে ভোক্তাই সঠিক। চিকিৎসকের আত্মপক্ষ সমর্থন কাজে আসবে না। একজন ডা. কামরুল একা হাতে এক হাজার কিডনি প্রতিস্থাপনের অবিশ্বাস্য মাইল ফলক স্পর্শ করলেও তা নিভৃতে থেকে যায়। আমরা কি জানি, কী অবিশ্বাস্য অধ্যবসায়ে শূন্য থেকে দেশে ইমার্জেন্সি কার্ডিয়াক প্রসিডিউর, সার্জারিতে সক্ষমতা গড়ে দেশের চিকিৎসকরা প্রতিদিন কত রোগীকে নিশ্চিত মৃত্যুমুখ থেকে ফিরিয়ে আনছেন!তারপরও এ মুহূর্তে সবচেয়ে অজনপ্রিয় ব্যক্তি চিকিৎসক। সারাদেশ থেকে প্রতিদিনই চিকিৎসকদের সঙ্গে রোগীর স্বজনদের বাদানুবাদের খবর আসে।  হাসপাতালে ভাঙচুর চলে। চিকিৎসকরা শারীরিক লাঞ্ছনার শিকার হন। এমনকি ঘটে চিকিৎসক খুন। পত্রিকার পাতায় যা আসে তার চেয়ে অনেক বেশি সহিংসতার শিকার দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের চিকিৎসকরা।

ভোক্তা ও সেবা প্রদানকারী দুই পক্ষই আজ মনোজাগতিক দুই মেরুতে, নিজেদের অবস্থানে অনড়।

মানুষের রোগে, জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে যে চিকিৎসকরা সবার আগে রোগীর পাশে থাকেন, তারা কেন এমন বিদ্রূপ, নিগ্রহ আর আক্রমণের শিকার হচ্ছেন? কে দায়ী-চিকিৎসক, রোগী না চিকিৎসা ব্যবস্থা?

শেষ পর্যন্ত একটি দেশের জনগণকে তার চিকিৎসা সেবার জন্য তার নিজ দেশের চিকিৎসকের কাছেই ফিরতে হয়। সাম্প্রতিক করোনাকালে নিজ দেশের চিকিৎসক, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতি এত অনাস্থা, ঘৃণার পরেও ব্যবসায়ী,  বিত্তবান, সরকারি কর্মকর্তা বা রাজনীতিবিদ নিজ দেশের হাসপাতালের দ্বারস্থ হয়েছেন। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে আমাদের সংকটের গভীরে যেতে হবে।

সরকারের সাম্প্রতিক নিজস্ব গবেষণা বলছে, সরকারি হাসপাতাল থেকে মাত্র তিন শতাংশ রোগী ওষুধ পেয়ে থাকেন, আর ১৫ শতাংশ রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়। দেশে প্রায় ৩ কোটি মানুষ তাদের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসকের কাছে যাচ্ছে না। স্বাস্থ্যসেবা অর্থায়ন কৌশলপত্রে সরকার (২০১২-২০৩২) স্বাস্থ্যসেবা পেতে ২০৩২ সালে ব্যক্তির নিজস্ব ব্যয় ৩২ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। ২০১২ সালে বাংলাদেশে রোগীর নিজ পকেট থেকে ব্যয় ছিল ৬৪ ভাগ। ২০১৭ সালের প্রকাশিত তথ্যে এ খরচ না কমে বেড়ে দাঁড়ায় ৬৭ ভাগ। স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বিনিয়োগ তার প্রতিশ্রুতি পূরণের পথে না এগিয়ে উল্টোমুখে হাঁটা দিয়েছে।

কোন পথে উত্তরণ? বাংলাদেশের চিকিৎসকদের দক্ষতা আগের যেকোনও সময়ের চেয়ে বর্তমানে অনেক উঁচুতে পৌঁছেছে। কিন্তু আমাদের সার্বিক চিকিৎসা সেবা পার্শ্ববর্তী দেশের করপোরেট হাসপাতালগুলোর চেয়ে এখনও অনুন্নত, দুর্দশাগ্রস্ত ও অপ্রতুল। আমাদের চিকিৎসা সেবায়  উচ্চ ব্যয় কমাতে না পারলে ও সেবার মান উন্নত করতে না পারলে দেশের রোগীদের চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়া ঠেকানো যাবে না এবং সুস্থ বেসরকারি চিকিৎসা সেবা খাতও গড়ে উঠবে না।

বাংলাদেশে চিকিৎসা সেবা উন্নয়নের জন্য ভারতের করপোরেট হাসপাতালগুলো আমাদের আদর্শ হতে পারে না, কারণ তারা তাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষকে চিকিৎসা সুবিধা দিতে অসমর্থ।  পৃথিবীর দেশে দেশে এমনকি পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোর অভিজ্ঞতাও বলছে, কেবল শক্তিশালী সরকারি বা গণ খাত সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে, স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে অসমতা দূর করতে পারে। বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার যুক্তিযুক্ত  মূল্য এবং গুণমান নিশ্চিত করতেও প্রয়োজন শক্তিশালী সরকারি বা গণস্বাস্থ্য খাত। উন্নত চিকিৎসা সেবা দেওয়া বা রোগীর কষ্টে সহমর্মিতা একজন চিকিৎসকের আপাত ব্যক্তিগত দক্ষতার স্বাক্ষর হতে পারে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে চিকিৎসকরা সমষ্টিগতভাবে অগ্রগামী হয়ে এক্ষেত্রে করণীয় পালন করতে সক্ষম না। লাভজনক প্রাইভেট সেক্টর নিজে থেকে জনবান্ধব পথে হাঁটার ক্ষমতা রাখে না। এটা এখন প্রমাণিত যে মুক্তবাজার অর্থনীতি ও প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থার মধ্যে একটি দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর সার্বিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা অসম্ভব। একটা দেশের স্বাস্থ্য পদ্ধতি কেমন হবে, কীভাবে কাজ করবে তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে সেই দেশটির নেতৃবৃন্দের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর। স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কীভাবে নির্মিত হচ্ছে তার ওপর নির্ভর করে চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী এবং পুরো সিস্টেমের আচরণ। অতএব, নীতিনির্ধারক ও জনগণের অগ্রগামী অংশকে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। পারস্পরিক দোষারোপ বা আত্মপক্ষ সমর্থনে সমাধান নাই। আমাদের দুর্বলতার জায়গাগুলো চিহ্নিত করতে হবে। সঠিক নীতিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে গড়ে তুলতে হবে শক্তিশালী স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা। প্রয়োজন দক্ষ জনশক্তি ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য যথাযথ বিনিয়োগ।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা পূরণের লক্ষ্যে আমরা আশু কিছু পদক্ষেপ নিতে পারি, যা নতুন যাত্রাপথের সূচনা করতে পারে:

১. স্বাস্থ্য খাতের সব সেবা ও চিকিৎসা সামগ্রীকে কোডিংয়ের আওতায় আনতে হবে। স্বাস্থ্যসেবায় দ্রুত পরিবর্তন আনতে প্রয়োজন হবে জাতীয় স্বাস্থ্য ডাটাবেস। তারও প্রস্তুতির জন্য প্রথম প্রয়োজন প্রতিটি স্বাস্থ্যসেবা সামগ্রীর কোডিং।

২. একটি জাতীয় চিকিৎসা সেবামূল্য নির্ধারণ কমিশন গঠন করতে হবে। যে কমিশন সব স্বাস্থ্যসেবার যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ করবে এবং সময়ে সময়ে তার পুনর্মূল্যায়ন করবে। কমিশন তদন্ত করে দেখবে কী কারণে পার্শ্ববর্তী দেশের চেয়ে আমাদের দেশের স্বাস্থ্যসেবার মূল্য বেশি এবং তা দূর করার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নেবে। আমাদের স্বাস্থ্যসেবা খরচ প্রতিযোগিতামূলক না হলে উন্নত দেশগুলোতে প্রচলিত প্রাগ্রসর স্বাস্থ্যসেবাসমূহ আমাদের দেশে প্রচলন করা সম্ভব হবে না।

৩. চিকিৎসা-সামগ্রী, ল্যাব-রিএজেন্ট, ভ্যাকসিন ইত্যাদি উৎপাদনে আমাদের দেশকে সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। নতুন প্রযুক্তি বা পণ্য উদ্ভাবনে আমাদের ঘাটতি দূর করতে শিল্প ও শিক্ষা-গবেষণা প্রতিষ্ঠানের যৌথ গবেষণা ও উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে হবে।

৪.  বিএসএমএমইউ, জাতীয় ক্যানসার, জাতীয় হৃদরোগ, জাতীয় অর্থোপেডিক, জাতীয় নিউরো সায়েন্স, জাতীয় কিডনি রোগ ও ইউরোলজি ইনস্টিটিউট- প্রভৃতি পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ও বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানকে নন-প্র্যাকটিসিং ঘোষণা করতে হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোর ঘাটতি চিহ্নিত করে অবকাঠামোয় পরিবর্তন ও শিক্ষাক্রমকে সময়োপযোগী করে দক্ষ জনশক্তি তৈরির বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠানে উন্নীত করার জন্য বিনিয়োগ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে এইমস বা পিজিআই চন্দ্রীগড়কে রোল মডেল ধরে প্রতিষ্ঠানগুলো বদলানো শুরু করতে পারে।

৫. আমাদের চিকিৎসা শিক্ষাক্রমে যোগাযোগ দক্ষতাকে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দিয়ে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। চিকিৎসকরা যেন রোগীর বোধগম্য ভাষায় কথা বলতে শিখেন।

৬. সরকারি-বেসরকারি অনুদানপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান, যেমন- বারডেম, হার্ট ফাউন্ডেশন, কিডনি ফাউন্ডেশন, শিশু হাসপাতাল প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানে ক্রমাগত আধুনিকায়ন করতে হবে। তাদের উন্নয়ন ও সার্বিক কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা আনতে হবে। তারা যাতে আরও বেশি রোগীকে সাশ্রয়ী মূল্যে সেবা দিতে পারে তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ ও সরকারি সহায়তা দিতে হবে।

৭. চিকিৎসকদের বাইরে অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা সহায়ক কর্মী, যেমন- নার্স, হেলথ টেকনোলজিস্ট, ওয়ার্ড বয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। তাদের দক্ষতা ও গুণগত মান বৃদ্ধির জন্য বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনা প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক মর্যাদা উন্নত করতে হবে।

৮. ডায়াগনস্টিক প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসকদের কমিশন দেওয়া বন্ধ করতে হবে।  চিকিৎসক ও ওষুধ কোম্পানিগুলোর অস্বাস্থ্যকর জোট ভাঙতে হবে। এ জন্য সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহ ও ডায়াগনস্টিক পরীক্ষাসমূহ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করতে পারলে সিংহভাগ অসৎ প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

৯. বাংলাদেশ মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কাউন্সিলকে পুনর্গঠন ও শক্তিশালী করতে হবে। যাতে রোগীরা তাদের অভিযোগ নিয়ে সেখানে যেতে পারে । চিকিৎসা সেবাদানের ক্ষেত্রে অনিয়ম ও অপরাধের ঘটনায় মেডিক্যাল কাউন্সিলকে দ্রুত ও সঠিক ব্যবস্থা নিতে হবে। অভিযোগের সন্তোষজনক নিষ্পত্তির মাধ্যমে সংক্ষুব্ধ রোগীদের আস্থা অর্জন বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবা খাতের ভবিষ্যৎ বিকাশের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল। সিনিয়র কনসালটেন্ট ও ল্যাব কো-অর্ডিনেটর, প্যাথলজি বিভাগ, এভার কেয়ার হাসপাতাল।
/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
বেড়েছে লাগেজ ‘লেফট-বিহাইন্ড’, প্রবাসীদের ঈদ মাটি
বেড়েছে লাগেজ ‘লেফট-বিহাইন্ড’, প্রবাসীদের ঈদ মাটি
পুতিনের সাহায্য চাইলো শ্রীলঙ্কা
পুতিনের সাহায্য চাইলো শ্রীলঙ্কা
জেলের জালে ৩১ কেজির বাগাড়
জেলের জালে ৩১ কেজির বাগাড়
ঈদে বাড়ি ফেরার পথে মোটরসাইকেল আরোহী নিহত
ঈদে বাড়ি ফেরার পথে মোটরসাইকেল আরোহী নিহত
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ