X
সকল বিভাগ
সেকশনস
সকল বিভাগ

উৎসব সন্ত্রাস

আপডেট : ০৫ জানুয়ারি ২০২২, ২০:০৩

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা এবার থার্টিফার্স্টে দেশে ছিলাম না। কিন্তু সব খবরই পাচ্ছিলাম অনলাইনে, ফেসবুকে লাইভও দেখছিলাম। হইহুল্লোড়ের মাধ্যমে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোয় আপত্তি কারও নেই। কিন্তু যেভাবে উৎসব হয়েছে, সেটা কতটা খুনে প্রকৃতির ছিল সে নিয়ে আমাদের নাগরিক ভাবনা দরকার। ইংরেজি নতুন বছর উদযাপন করতে গিয়ে ওড়ানো ফানুস থেকে রাজধানীর কয়েক জায়গায় আগুন লেগেছে। কোনও ছোটখাটো আগুন ছিল না। কিছু মানুষ যখন উৎসবের নামে ফানুস ছেড়েছে, তখন যাদের দোকান, বাড়িঘর পুড়েছে, তারা আতঙ্ক আর উদ্বেগে রাত কাটিয়েছেন।

থার্টিফার্স্টে আতশবাজিতে দূষণের রাজধানীর বায়ু আরও দূষিত হয়েছে আর বিকট শব্দে রাজধানীতে প্রাণ গেছে এক শিশুর, ফরিদপুরে ব্রেইন স্ট্রোক করে প্যারালাইজড হয়েছে এক তরুণী। এসব খবর পত্রিকায় এসেছে, তাই জানা গেছে। আরও অসংখ্য খবর হয়তো আমরা জানতে পারিনি।

ঘটা করে প্রচারণা চালিয়ে ইংরেজি নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়ার উৎসব ‘থার্টিফার্স্টে’ আতশবাজি ফাটানো-পোড়ানো ও ফানুস ওড়ানো নিষিদ্ধ করা হয়। উন্মুক্ত স্থানে তো বটেই, বাসাবাড়ির ছাদেও এমন কোনও আয়োজনে কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। কিন্তু সেই নিষেধাজ্ঞায় কোনও কাজ হয়নি। ৩১ ডিসেম্বর মধ্যরাতে ঘড়ির কাঁটা ১২টা স্পর্শ করতে না করতেই রাজধানী যেন পরিণত হয় শব্দ দানবের শহরে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে টানা ফুটতে থাকে ও পুড়তে থাকে আতশবাজি। এবার রাজধানীর বাইরেও ছিল এই আতশবাজির সন্ত্রাস।

হাজার হাজার ফানুসে ছেয়ে গিয়েছিল ঢাকার আকাশ। গত বছর বলা হয়েছিল অন্তত ৫০ কোটি টাকার আতশবাজি ও ফানুস বিক্রি হয়েছে থার্টিফার্স্ট নাইটকে কেন্দ্র করে। এবার নিশ্চয়ই এরচেয়ে বেশি হয়েছে। অথচ আইন বলে ভিন্ন কথা। জাতীয় অনুষ্ঠানগুলোর জন্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে আতশবাজি আমদানির জন্য অনুমতি দেওয়া আছে। এর বাইরে দেশে আতশবাজি আমদানি, ব্যবহার ও মজুত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এরপরেও যারা আতশবাজি বিক্রি করেন তারা চোরাইপথে অথবা অবৈধভাবে আনছেন। বোঝা যাচ্ছে সরকারি নির্দেশ উড়িয়েই চলছে দূষণের বিকিকিনি।

দূষণের সর্বোচ্চ স্তরে দাঁড়িয়ে দেশের রাজধানী ও জেলা শহরে যা ঘটেছে তা এক কথায় ছিল বাজির দূষণ ও শব্দ সহিংসতা। পেশাগত কারণে বা ব্যক্তিগত উদ্যোগে বহুবার দেশের বাইরে থার্টিফার্স্ট দেখেছি। কিন্তু এই শহরের মতো এমন লাগামহীন শব্দদূষণ করে উদযাপন দেখিনি কোথাও। বহু মানুষ অসুস্থ থাকতে পারে, ছোট্ট শিশুরা ভয় পেতে পারে, প্রাণীরা আতঙ্কিত হতে পারে, পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে, আগুন লাগতে পারে– এমন কোনও ভাবনাই ছিল না আমাদের এই নিষিদ্ধ উদযাপনে। মালদ্বীপের মতো পর্যটনবান্ধব দেশে দেখলাম, শহরের একটি নির্ধারিত জায়গায় উৎসবের আয়োজন হয়েছে, কিছুক্ষণের জন্য ফায়ার ওয়ার্কস হয়েছে এবং এরপর গান নাচ হয়েছে। লোকালয় থেকে দূরে অত্যন্ত শৃঙ্খলার সঙ্গে যারা উৎসব করতে চেয়েছে তারা অংশগ্রহণ করেছেন।

থার্টিফার্স্ট যেন বরাবর এক আতঙ্কের নাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসসহ নানা জায়গায় নারী নিগ্রহের ঘটনার পর অনেক বছর ধরে পুলিশি কড়াকড়ি ছিল। গুলশান বনানী সন্ধ্যা থেকেই কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে যায় নিরাপত্তার চাদরে। সারা শহরেও থাকে পুলিশি তৎপরতা। কিন্তু নিজেদের বাড়িতে কে কাকে আটকায়? আমাদের সব আয়োজনে একটা সহিংস ভাব না থাকলে যেন আনন্দ পূর্ণ হয় না।

আচমকা কানের কাছে তারস্বরে মাইক বাজলেই মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ে। আর পটকা বা আতশবাজি চললে তো কথাই নেই। অতিরিক্ত শব্দে মানুষের নার্ভ উত্তেজিত হয়ে পড়ে। ফলে নার্ভ সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। লাগাতার উচ্চ শব্দে বাজি-পটকা ফাটলে কানের পর্দা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে সম্পূর্ণ বধির হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে বাচ্চা এবং বয়স্ক মানুষদের সমস্যা বেশি হয়। লাগাতার কানের কাছে পটকা ফাটলে বা উচ্চস্বরে লাউড স্পিকারে গান চলতে থাকলে বধিরতা প্রায় অবধারিত। আমরা নাগরিক মানুষেরা রাতের বেলা মাইকে ওয়াজের শব্দ নিয়ে কথা বলি। তারাই কি করে শব্দদৈত্যের এমন অত্যাচার করি থার্টিফার্স্টে?

বিপদ কতখানি বাড়তে পারে, সংকট কতটা গভীর হতে পারে, তা আমাদের সম্পূর্ণ অজানা, এমন নয়। দূষণের কারণে পাশের দেশের রাজধানী দিল্লি কতখানি সংকটে, তা আমরা জানি। দীপাবলির সময়ে বাজির দূষণে সেই সংকট যে কয়েকগুণ গভীরতর হয়ে ওঠে, সে খবরও আন্তর্জাতিক শিরোনাম হয়। কিন্তু এসব জেনেও নিজেদের শহর ঢাকাকে শব্দদানব এবারও গ্রাস করলো। এটা কোনও উৎসব ছিল না, ছিল তাণ্ডব।

নিষিদ্ধ বাজির বিরুদ্ধে পুলিশি অভিযান করে কোনও ফায়দা নেই। দরকার নাগরিক সচেতনতা। নিজের বিপদটা যদি নিজে আঁচ করতে না পারি আমরা, তাহলে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনির সক্রিয়তায় কিছু হবে না। দূষণ দৈত্য আমাদের গিলছে প্রতিনিয়ত। আমাদের অসচেতনতার বহর সেটা আরও বাড়াবে। সবচেয়ে যেটা ভাবনার বিষয় তা হলো, এরকম তাণ্ডব করে আতশবাজি পোড়ানো যে অন্যের নিভৃতে থাকার অধিকার কেড়ে নেওয়া, এটা এক প্রকার সহিংসতা সেই বোধটাই কাজ করছে না নাগরিক মনে।

লেখক: সাংবাদিক

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে চলচ্চিত্র নির্মাতা গৌতম ঘোষের সাক্ষাৎ
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে চলচ্চিত্র নির্মাতা গৌতম ঘোষের সাক্ষাৎ
পাঞ্জাবকে হারিয়ে প্লে-অফের আশায় দিল্লি
আইপিএলপাঞ্জাবকে হারিয়ে প্লে-অফের আশায় দিল্লি
৪ ঘণ্টা পর ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটে ট্রেন চলাচল শুরু
৪ ঘণ্টা পর ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটে ট্রেন চলাচল শুরু
এশিয়ান কাপ ফুটবল: ছিটকে গেলেন বাংলাদেশ গোলকিপার
এশিয়ান কাপ ফুটবল: ছিটকে গেলেন বাংলাদেশ গোলকিপার
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ