X
মঙ্গলবার, ০৫ জুলাই ২০২২
২১ আষাঢ় ১৪২৯

মুখবইয়ে আড়াল গ্রন্থাগার!

আপডেট : ১৫ মার্চ ২০২২, ২০:৪৩

আমীন আল রশীদ বাংলা ট্রিবিউনে ১০ মার্চ একটি সংবাদ শিরোনাম ছিল– ‘স্মার্টফোনে ব্যস্ত পাঠক, একের পর এক বন্ধ হচ্ছে গ্রন্থাগার।’

খবরে বলা হয়, দীর্ঘ ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে পাঠক আসেন না ১৬৬ বছরের পুরনো বরিশাল পাবলিক লাইব্রেরিতে। স্থানীয়দের দাবি, পূর্ববঙ্গ, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও উড়িষ্যার প্রদেশের মধ্যে সবচেয়ে পুরনো পাঠাগার হচ্ছে বরিশাল পাবলিক লাইব্রেরি। শুধু এই লাইব্রেরিটিই নয়, বরিশাল জেলার ৫৫টি লাইব্রেরির অধিকাংশই পাঠকশূন্যতায় এখন তালাবদ্ধ। সাত-আটটি ছাড়া বাকি সব লাইব্রেরি বন্ধ রয়েছে। যেগুলো খোলা আছে সেগুলোতেও পাঠক নেই। এর কারণ হিসেবে স্থানীয় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, বই ছেড়ে স্মার্টফোনে ব্যস্ত মানুষ।

আরও কিছু গণমাধ্যমের সংবাদ শিরোনামে চোখ বুলানো যাক:

১. অর্থসংকটে খুঁড়িয়ে চলছে দেশের অন্যতম পুরনো পাঠাগার মৌলভীবাজার গণগ্রন্থাগার, প্রথম আলো ১৮ জানুয়ারি ২০১৭।

২. পাঠক সংকটে পঞ্চগড় গণগ্রন্থাগার, সময়ের আলো, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯।

৩. দিনাজপুর গণগ্রন্থাগারে পাঠক আছে, জায়গা নেই, বাংলা ট্রিবিউন, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২।

৪. পুরান ঢাকার পরিপাটি ২ লাইব্রেরিতে পাঠক নেই কেন? চ্যানেল আই অনলাইন, ১ জুন, ২০১৮।

অনলাইনে সার্চ করলে এরকম আরও অসংখ্য সংবাদ পাওয়া যাবে, যেখানে সারা দেশেই গণগ্রন্থাগারের সংকট এবং বই পড়ায় মানুষের আগ্রহের ঘাটতি ফুটে উঠবে। ২০১৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বিবিসির একটি খবরেও বলা হয়, প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে পাঠাগারে গিয়ে মানুষের বই পড়ার প্রবণতা কমছে। পাঠক যদি না-ই যায়, তাহলে সেই লাইব্রেরি রেখেই বা কী লাভ! একটি অবকাঠামো কিছু কাগজের ভার নিয়ে নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে থাকবে, লাইব্রেরির উদ্দেশ্য সেটি নয়।

যদি সত্যিই বইয়ের পাঠক কমতে থাকে, লাইব্রেরিগুলো বন্ধ হতে থাকে, তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ কী? লাইব্রেরি বন্ধ হওয়ার খবরগুলোর মধ্য দিয়ে কি এটাই প্রমাণিত হচ্ছে যে আমরা স্মার্টফোনে আসক্ত আত্মপ্রচারমুখী, অসহিষ্ণু, দলবাজ, তেলবাজ এবং যেকোনও উপায়ে ধনী হওয়ার মানসিকতাসম্পন্ন একটা প্রজন্ম গড়ে তুলছি?

প্রশ্ন উঠতে পারে, লাইব্রেরি ছাড়া অন্য কোথাও, যেমন- বাসা, অফিস, চলার পথে যানবাহনে মানুষ কি পড়ে না? হয়তো পড়ে। কিন্তু সেই সংখ্যা অতি সামান্য। চলার পথে যারা পড়ে, তারাও পড়ে আসলে মুখবই (ফেসবুক); যে প্ল্যাটফর্মটি মূলত ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন, কাদা ছোড়াছুড়ি, বিষোদ্গার, প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিক শিবিরে বিভক্ত করার কাজেই ব্যবহৃত হয়।

লাইব্রেরিতে পাঠক কমে গেলে সেখানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরও কমে যায়। সেই লাইব্রেরির সংস্কার বা সমৃদ্ধ করার কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয় না। ধীরে ধীরে লাইব্রেরিটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে। আবার অনেক সময় লাইব্রেরিটি কোন জায়গায় অবস্থিত, সেটিও পাঠক ধরে রাখার ক্ষেত্রে জরুরি। বিচ্ছিন্ন কোনও স্থানে অনেক ভালো লাইব্রেরি গড়ে তুললেও পাঠকরা সেখানে যেতে আগ্রহী হয় না।

যেমন, বাংলা ট্রিবিউনের খবরে বলা হয়, ১৯৮৫-৮৬ সালের দিকে ৫৪ শতাংশ জমির ওপর দোতলা ভবন নির্মাণ করে বরিশাল পাবলিক লাইব্রেরি সরিয়ে নেওয়া হয় বান্দ রোডে। সেখানে ইতিহাস-ঐতিহ্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন মূল্যবান ৩০ হাজার বই ছিল। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বহু মূল্যবান বই লাইব্রেরি থেকে উধাও হয়ে যায়। নষ্টের তালিকায় রয়েছে ১০ হাজারের বেশি বই। অথচ যেসব বই নষ্ট হয়েছে সেগুলো দুর্লভ।

খবর বলছে, পঞ্চগড় জেলা সদরে ডা. জহির উদ্দিন সরকারি গণগ্রন্থাগারে হাজার হাজার বই থাকলেও নেই পাঠক। দিনে মাত্র ৬-৭ জন পাঠক এখানে আসেন। অথচ এই গ্রন্থাগারের আশপাশে বেশ কিছু সরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা রয়েছে।

আরেকটি খবর পুরান ঢাকার গ্রন্থবিতান ও আজাদ মুসলিম পাবলিক লাইব্রেরি নিয়ে। যেখানে বলা হয়, কয়েক বছর ধরেই এ দুটি লাইব্রেরিতে পাঠক সংখ্যা কমতির দিকে। যে ৮-১০ জন নিয়মিত আসেন, তারা মূলত পত্রিকার পাঠক। বই পড়া পাঠকদের সংখ্যা নেই বললেই চলে। লাইব্রেরি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগে বেশ কিছু তরুণ পাঠক নিয়মিত আসতেন। কিন্তু মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের কারণে তাদেরও আর দেখা যায় না। আজাদ মুসলিম পাবলিক লাইব্রেরির গৌরবময় ইতিহাস থাকলেও বর্তমানে এর অবস্থা খুবই শোচনীয়। পাঠকের আনাগোনা নেই বললেই চলে। উপরন্তু দীর্ঘদিন মেরামতের অভাবে ভবনটিও ঝুঁকিপূর্ণ। ভবনের সঙ্গে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ লেখা সাইনবোর্ডও টানানো রয়েছে।

লাইব্রেরিগুলোর টিকতে না পারার পেছনে অর্থ সংকটও বড় বাধা। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ষাটের দশকে চালু হওয়া মৌলভীবাজার গণগ্রন্থাগারটি টাকার অভাবে নতুন বই কিনতে পারছে না। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বেতন-ভাতাও নিয়মিত পাচ্ছেন না। প্রায় দুই লাখ টাকা বিদ্যুতের বিল বাকি। বাকি থাকে পত্রিকার বিলও।

বই পড়ার প্রতি মানুষের আগ্রহ কমছে বলেই লাইব্রেরিতে ধুলো জমছে। আর বই পড়ার প্রতি মানুষের আগ্রহ কমছে। কারণ, রিডিং ফর প্লেজার থিওরিতে যারা আনন্দের জন্য বই পড়বেন, তাদের আনন্দে প্রধান উৎস এখন স্মার্টফোন ও সোশাল মিডিয়া। কাগজের বইয়ের দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকা নয়, বরং তারা মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে কখনও বিস্ময়ে, কখনও সংশয়ে, কখনও ভয়ে তাকিয়ে থাকেন। তাকে আনন্দিত, শিহরিত, পুলকিত, ক্ষুব্ধ সবই করে এই স্মার্ট ফোন ও সোশাল মিডিয়া। ফলে বইয়ের চেয়ে মুখবইতেই তার বেশি স্বাচ্ছন্দ্য। অতএব, বই এখন শুধু তারাই বেশি পড়েন, যাদের প্রয়োজন হয়। যারা চাকরি খোঁজেন, যারা গবেষণা করেন কিংবা এমন চাকরি করেন যেখানে পড়তেই হয়। এর বাইরে সাধারণ মানুষের যে বিরাট অংশ লাইব্রেরিতে যেতেন মনের আনন্দে, সেই জনগোষ্ঠীর বিশাল অংশকেই গ্রাস করেছে স্মার্টফোন ও সোশাল মিডিয়া—এ নিয়ে বোধহয় সংশয় কম।

ভোগবাদী সমাজে মানুষ সবকিছুতে নগদ লাভ খোঁজে। অর্থাৎ কোনও কাজ শুরুর আগেই সে হিসাব কষে দেখতে চায় এই কাজে তার লাভ কতটুকু? বই পড়ে যদি তাৎক্ষণিক কোনও লাভ না পাওয়া যায়, তাহলে সে কেন এর পেছনে সময় ব্যয় করবে? তার চেয়ে বরং সোশাল মিডিয়া একটা স্ট্যাটাস দিয়ে সে অপেক্ষা করতে পারে তার প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য। একটা সুন্দর ছবি আপলোড করার পরে তাতে যদি অনেকে ‘লাইক’ দেন, সেটা বরং তার মনে এক ধরনের আনন্দের অনুভূতি তৈরি করে। কিন্তু বই পড়েও তো আনন্দের অনুভূতি লাভ করা যায়, সেই ভাবনাটিই বোধহয় ক্রমহ্রাসমান। যদিও বই পড়ার আনন্দের সঙ্গে মুখবইয়ের লাইক পাওয়ার আনন্দে ঢের তফাৎ।

আমরা যখন গ্রন্থাগার বন্ধ বা সেখানে নানারকম সংকটের কথা পড়ি, তখন আমাদের চারপাশে তাকালে দেখি অব্যাহতভাবে বাড়ছে শৌখিন খাবারের দোকান। বিশেষ করে রাজধানীর বনানী, সাতমসজিদ রোড, পান্থপথ এলাকায় মূল রাস্তার দুই পাশে যে পরিমাণ খাবারের স্টল, ফুড চেইন শপ, রেস্টুরেন্ট, বিরিয়ানির দোকান— তাতে এই শহরে কোনও আগন্তুক পা রাখলে মনে করতে পারেন, ঢাকা শহরের মানুষের বোধহয় খাওয়া ছাড়া আর কোনও কাজ নেই।

অস্বীকার করার উপায় নেই, শহুরে মানুষের রেস্টুরেন্টে খাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। এটি মানুষের আয়বৃদ্ধির একটি সূচক। তবে ১৭ কোটি মানুষের দেশে কত শতাংশ মানুষের ওপর নির্ভর করে এসব খাবারের দোকান টিকে আছে—সেটি গবেষণার বিষয়। শুধু খাবারের দোকান বৃদ্ধিই নয়, বরং আমরা এমন একটা ভোগবাদী সমাজ গড়ে তুলছি, যেখানে লাইব্রেরি বন্ধ হয়ে যায়; খেলার মাঠ দখল হয়ে সেখানে বহুতল ভবন ওঠে; আবার কোনও কোনও মাঠ চলে যায় নির্দিষ্ট ক্লাবের মালিকানায় এবং সেখানে ওই ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত ছাড়া বাকি সবার প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়ে যায়।

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, বইয়ের পাঠক যদি কমতেই থাকে, তাহলে রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় গণগ্রন্থাগারটি আরও বড়, আধুনিক ও ডিজিটালাইজ করা হচ্ছে কেন? যদি পাঠক না থাকে, যদি মানুষের পড়ার অভ্যাস কমতে থাকে, যদি মানুষ কাগজের বই বাদ দিয়ে ডিজিটাল বই কিংবা ফেসবুক বা মুখবই পড়তেই বেশি উৎসাহী হয়, তাহলে লাইব্রেরি এত বিশাল বানানোর প্রয়োজন কী? এই লাইব্রেরিতে কারা আসবেন? শুধু সরকারি চাকরির প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য শিক্ষার্থীরাই এটা ব্যবহার করবেন?

লাইব্রেরিতে পাঠক কমে যাওয়ার প্রবণতা আরও আগেই শুরু হয়েছে। এর পেছনে শুধু যে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটই এককভাবে দায়ী, সেই উপসংহারে পৌঁছানোও কঠিন। আরও অনেক কারণ থাকতে পারে। আরও অনেক কারণেই মানুষের পাঠাভ্যাস কমেছে। যদিও আশার কথা, বইমেলায় বই বিক্রি কমেনি। কারণ, পড়া ছাড়া আরও নানা কারণেই মানুষ বই কেনে। ড্রয়িংরুমে সাজিয়ে রাখা, উপহার দেওয়া এবং পরিচিত লেখকদের চাপে পড়েও যে অনেক মানুষ এখনও বই কেনেন, তাও মন্দ না। তবে মোদ্দা কথা, কোনও একটি জনপদে গণহারে লাইব্রেরি বন্ধ হয়ে যাওয়া ভালো লক্ষণ নয়। এটি একটি অশনি সংকেত।

লেখক: কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর, নেক্সাস টেলিভিশন। 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
বিদ্যুৎস্পৃষ্টে প্রাণ গেলো মৎস্য ঘেরের ২ কর্মচারীর
বিদ্যুৎস্পৃষ্টে প্রাণ গেলো মৎস্য ঘেরের ২ কর্মচারীর
যুক্তরাষ্ট্রের মেয়েদের কোচ হলেন চন্দরপল
যুক্তরাষ্ট্রের মেয়েদের কোচ হলেন চন্দরপল
দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া পারাপার হবে স্বস্ত্বির, চলবে ২১ ফেরি 
দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া পারাপার হবে স্বস্ত্বির, চলবে ২১ ফেরি 
সিলেটে বন্যাদুর্গতদের পাশে ব্র্যাক ব্যাংক
সিলেটে বন্যাদুর্গতদের পাশে ব্র্যাক ব্যাংক
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ