X
শনিবার, ২৫ জুন ২০২২
১১ আষাঢ় ১৪২৯

সেই যে আমার নানা রঙের ঈদগুলো

আপডেট : ০৩ মে ২০২২, ১৫:০৭

রুমিন ফারহানা ঈদ এলেই নস্টালজিক হয়ে পড়ি আমি। কেবলই মনে পড়ে ফেলে আসা অপূর্ব সেই দিনগুলোর কথা। যখন ঈদ মানে সত্যিই ছিল আনন্দ, হাসি, নতুন জামার গন্ধ, ফিরনি, সেমাই আর পায়েস রান্না। ঈদ মানে ছিল বন্ধুদের সঙ্গে সারা দিন বেড়ানো, উচ্ছ্লতা আর আনন্দে পরিপূর্ণ একটি দিন। সালামি তোলা আর একটু পর পর গুনে দেখা জমলো কত আর ঈদ শেষে সালামি দিয়ে কী কী করবো তার একটা পরিকল্পনা। ঈদ মানে তো কেবল একটি দিন নয়, একটি লম্বা সময়জুড়ে আনন্দ, উত্তেজনা আর হরেক রকম পরিকল্পনার মেলা।

শৈশবের ঈদ আনন্দ আসলে শুরু হতো ঈদ আসার অনেক আগে থেকেই। শবে বরাতের ঘোষণাই জানিয়ে দিত ঈদ আসছে। শবে বরাতের রাতে তারাবাতি জ্বালানো আর বাসায় বাসায় নানান রঙের হালুয়া বিলির আনন্দ ঈদের দিনের আনন্দের চেয়ে কম ছিল না কোনও অংশেই। এখন শহুরে ব্যস্ততার জীবনে বাসায় বাসায় হালুয়া দেওয়ার সেই সংস্কৃতি প্রায় নেই বললেই চলে। ফেসবুকের কালে ছবি দেখেই বুঝে নিতে হয় কার বাসায় রান্না হলো কয় পদের হালুয়া।  ঘ্রাণে নয়, দর্শনেই এখন অর্ধভোজন।

আমাদের ছোটবেলায় ফ্ল্যাটবাড়ি বা অ্যাপার্টমেন্টের কথা আমরা জানতাম না। ধানমন্ডিতে বেড়ে ওঠা আমি আশপাশে এক/দোতলা বাড়ি দেখেই বড় হয়েছি। বাড়ি আলাদা হলেও সম্প্রীতি আর সম্পর্ক ছিল অটুট। এখন তাই একই বাড়ির পাশের ফ্ল্যাটের মানুষকে না চিনলেও তখন পাড়ার সবার সঙ্গেই পরিচয় ছিল কম-বেশি। সময় তখনও এমন মহামূল্যবান হয়ে ওঠেনি। তাই আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীর বাড়ি যাওয়া হতো নিয়মিত বিরতিতেই। ঈদও কাটতো তাদের সবাইকে নিয়ে।

সময়ের আপেক্ষিকতা ভালোভাবে টের পেতাম রোজার শেষ দিকে। রীতিমতো দিন গুনতাম, ঈদের বাকি আছে আর কয় দিন। সেই সময়ের প্রতিটা দিন যেন আর কাটতে চাইতো না। তবে ওই সময় আনন্দের মূল উপলক্ষ ছিল কেনাকাটা। সমবয়সীদের তুলনায় পরিবার থেকে অনেক ক্ষেত্রে বেশি সুবিধাপ্রাপ্ত আমি এই ক্ষেত্রেও সুবিধাপ্রাপ্ত ছিলাম। বান্ধবীদের অনেককে যখন বাবা-মায়ের পছন্দে পোশাক কিনতে হতো, আমার ক্ষেত্রে ছিল সেটা ব্যতিক্রম। বাবা-মা ঈদ শপিংয়ে নিয়ে যেতেন। মা চাইতেন সবকিছু আমার পছন্দে না হোক, তাদের পছন্দও থাকুক। চাইলেই দিতে হবে সেটি মা মানতে নারাজ ছিলেন। কিন্তু বাবা আমাকে দিতেন সীমাহীন প্রশ্রয়। যা চাইতাম, বিনাবাক্য ব্যয়ে কিনে দিতেন সেটাই। এখন বুঝি আমার ঈদের আবদার মেটানোর জন্য হয়তো বছরজুড়েই একটু একটু করে টাকা জমিয়ে রাখতেন বাবা। কিছুতেই যেন আমার কোনও খুশিতে ‘না’ বলতে না হয় তাঁকে।           

ঈদের জামা কেউ দেখে ফেললে পুরনো হয়ে যাবে এই আতঙ্কে বাসায় এসে নতুন জামার প্যাকেটই খোলা হতো না বহু সময়। তবে হ্যাঁ, সুযোগ পেলে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে চুপচাপ মাঝেমধ্যেই হাত বুলিয়ে আসতাম নতুন জামাগুলোর গায়ে। কী যে উত্তেজনা ভেতরে তখন। এই বুঝি কেউ দেখে ফেললো। নতুন জুতা, রঙিন ফিতা, হাতের চুড়ি সবটা ঘিরেই খুশি আর উত্তেজনা। বাবা-মায়ের এক সন্তান হওয়ায় তাদের সবটুকু আনন্দ ছিল আমাকে ঘিরে। একেক ঈদে কয়েকটা জামা ছিল বরাদ্দ। সঙ্গে খালা, ফুপু, চাচারা মিলে জমে যেত আরও অনেক কাপড়। ঈদের সকালে মা সব বের করে খাটে ছড়িয়ে দিতেন, যেটা খুশি যেন পরতে পারি। কোনটা সকালে, কোনটা বিকালে সেটা নিয়ে আবার আরেক দফা উত্তেজনা। 

কোনও কোনও ঈদের আগে এক অপ্রত্যাশিত আনন্দ নিয়ে আসতো যদি হঠাৎ জানা যেত ২৯ রোজার পরেই ঈদ হবে। ২৯ রোজার ইফতারের পর সবাই এসে বসতেন টিভি’র সামনে, চাঁদ উঠেছে কিনা সেই খবর দেখতে। কোনও বছর সেটা ঘটে গেলে আমরা উল্লাসে ফেটে পড়তাম, যদিও মায়েরা পড়তেন সমস্যায়, ঈদের সব ব্যবস্থাপনার জন্য একটা দিন কম পেলেন বলে। ওঠার পর চাঁদ দেখতে যাওয়াও ছিল অসাধারণ এক আনন্দের ঘটনা। দলবেঁধে মাঠে যেতাম সবাই চাঁদ দেখতে। চাঁদ দেখা শেষে বাসার বাগানে বসতাম সব বন্ধুরা মিলে, অনেক রাত পর্যন্ত চলতো চাঁদ রাতের আড্ডা, হাতে মেহেদি আঁকা। তখনও ঢাকা শহর এখনকার মতো উঁচু উঁচু ইমারতের নিচে চাপা পড়ে যায়নি। চাইলেই তখন আকাশ দেখা যেত। দুই পাশে বড় বাগান ঘেরা বাড়ি, সামনে খেলার মাঠ এখন এই ঘিঞ্জি ফ্ল্যাটবাড়িতে বসে ভাবলে স্বপ্ন মনে হয়। অথচ কী অপূর্ব সুন্দর শৈশব ছিল আমাদের।      

আমার মা ছিলেন ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজের প্রিন্সিপাল। আমরা থাকতাম প্রিন্সিপালের কোয়ার্টারে। সকালে কলেজের মসজিদে নামাজ পড়ে মায়ের কলিগরা আসতেন তার সঙ্গে দেখা করতে। তাদের আপ্যায়ন করতে না করতেই আশপাশের বাড়ি থেকে আমার খেলার সাথীরা সব জড়ো হয়ে যেত আমাদের বাসায়। হৈ হট্টগোল চলত প্রায় সারা দিন। আমরা বন্ধুরা সব ব্যস্ত নতুন জামা জুতো দেখাতে। মা বাবা ব্যস্ত অতিথি আপ্যায়নে।

মা ছিলেন ব্যস্ত মানুষ। কিন্তু ঈদের রান্নাটা সবসময়ই করতেন নিজ হাতে। মায়ের হাতের টিকিয়া, কাবাব,  চিংড়ি আনারস, মুরগির কোরমা, গরুর ভুনা কিংবা চটপটি, দৈ-বড়া আর কোথাও খেয়েছি বলে মনে পড়ে না। সবার কাছেই যার যার মায়ের হাতের রান্নার কোনও তুলনা চলে না, কিন্তু আমার ক্ষেত্রে ঘটনাটি একটু ভিন্ন। মা খুব কম রাঁধতেন বলেই এই উৎসবগুলোর আর একটা অন্যতম আকর্ষণ ছিল মায়ের হাতের রান্না। ঈদের আগের দিন অনেক রাত পর্যন্ত জেগে রান্না করতেন মা। ঘর গুছিয়ে, রান্না সামলে মা যখন ঘুমাতে আসতেন তখন অনেক রাত। সারা দিনের পরিশ্রমে ক্লান্ত কিন্তু মুখে তৃপ্তির হাসি।

আমার ছোটবেলায় উদযাপন করা ঈদের সঙ্গে এখন সবচেয়ে লক্ষণীয় পার্থক্য হচ্ছে ঈদ এখন আর সামাজিক উৎসব নেই। সত্যি বলতে ‘সমাজ’ বিষয়টি এখন প্রায় অস্তিত্বহীন। বৃহত্তর সমাজের মানুষ দূরেই থাকুক, যে ‘বাক্সবাড়ি’তে আমরা থাকি সেখানে পাশের বাসার মানুষটির সাথেও আমাদের থাকে না ন্যূনতম যোগাযোগ। উৎসবের কথা বাদই দেই, একে অপরের বিপদে-আপদে-জরুরি প্রয়োজনেও আমরা থাকি না পাশে। এই বিচ্ছিন্নতার কালে শিশুদের ঈদ করা দেখে ভাবি ওরা তো আদৌ পেলো না সত্যিকারের ঈদের স্বাদ।          

গত কয়েক বছরে নতুন এক ট্রেন্ড চালু হয়েছে- ঈদের ছুটিতে দেশের বাইরে চলে যাওয়া কিংবা নিদেনপক্ষে দেশের ভেতরেই কক্সবাজার বা কোনও রিসোর্টে পরিবারের স্বামী-স্ত্রী বাচ্চাদের ঈদ উদযাপন। বুঝি, ব্যস্ততম এই নগর জীবনে মানুষ একটু শ্বাস নেওয়ার আকুলতায় মানুষ ঈদের এই অল্প কয়েকটা ছুটির দিন একটু নিজের মতো করে কাটাতে চায়। কিন্তু তারপরও ঈদ আমার কাছে ধর্মীয় এবং সবচেয়ে বড় সামাজিক উৎসব। তাই এই সময়টা আত্মীয়, পরিজন, বন্ধু, স্বজন, প্রতিবেশী নিয়ে একসঙ্গে কাটানোই সবচেয়ে আনন্দময় বলে মনে হয়।  

লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট। সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপি দলীয় হুইপ।

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
‘পদ্মা সেতু বিশ্বকে দেখিয়ে দিলো আমরা বীরের জাতি’
‘পদ্মা সেতু বিশ্বকে দেখিয়ে দিলো আমরা বীরের জাতি’
সুধী সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
সুধী সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
এখন ঢাকা থেকে ভোলায় গিয়ে নাশতা করাও সম্ভব: তৌসিফ মাহবুব
গৌরবের পদ্মা সেতুএখন ঢাকা থেকে ভোলায় গিয়ে নাশতা করাও সম্ভব: তৌসিফ মাহবুব
পদ্মা সেতুর উদ্বোধন উপলক্ষে ডিএমপির র‌্যালি
পদ্মা সেতুর উদ্বোধন উপলক্ষে ডিএমপির র‌্যালি
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ