X
সোমবার, ০৪ জুলাই ২০২২
২০ আষাঢ় ১৪২৯

বিরোধী দলের দুর্বলতার দায় কার?

আপডেট : ২৭ মে ২০২২, ১৯:০৩

১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর ভারতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেলেও পাকিস্তানের এখন পর্যন্ত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিক আকার ধারণ করেনি। স্বাধীনতার পর থেকেই সেনাবাহিনীর দুর্দান্ত প্রতাপে পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বারবার হোঁচট খেয়েছে। আর এই কারণেই স্বাধীনতার পরে দেশটির ১০ বছর লেগেছিল একটি সংবিধান প্রণয়ন করতে।

পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক সরকারের নিষ্পেষণে নিষ্পেষিত পূর্ব বাংলার মানুষের মুক্তির জন্য বঙ্গবন্ধু তরুণ বয়স থেকেই চিন্তা করতে থাকেন। বিভিন্ন চড়াই-উতরাই পেরিয়ে তাঁরই নেতৃত্বে ১৯৭১ সালের ১৬  ডিসেম্বর বাংলাদেশ কাঙ্ক্ষিত বিজয় অর্জন করে পৃথিবীর বুকে জায়গা করে নেয়। পরে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে দেশে ফিরে দেশকে একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর দাঁড় করাতে যা যা প্রয়োজন তা সব পদক্ষেপ গ্রহণ করা শুরু করেছিলেন। একই সাথে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে গড়ে তুলবার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু পাকিস্তানপন্থী হায়েনার দল মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে তাঁকে সপরিবারে হত্যার মাধ্যমে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করে।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর খুনি মোশতাক ক্ষমতা দখল করলেও ১৯৭৫ পরবর্তী সময়ে সব সরকারের সময় সেনাবাহিনী পেছন থেকে কলকাঠি নেড়েছে। পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে নিজেকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার জন্য হাস্যকরভাবে হ্যাঁ/না ভোটের আয়োজন করে সামরিক শাসনের মাধ্যমে দেশ পরিচালনা করতে থাকেন। বিএনপির পক্ষ থেকে জিয়াউর রহমানকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা বলা হয়। কিন্তু হ্যাঁ/না ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতাকে সুসংহত করে  গণতন্ত্রকে গলাটিপে হত্যা করার দায় থেকে তাকে মুক্তি দেওয়ার কোনও সুযোগ নেই।  আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল যেন কোনোভাবেই ঘুরে দাঁড়াতে না পারে সে জন্য যা যা পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন ছিল তার সবই নেওয়া হয়েছিল তখন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফিরে ভঙ্গুর এবং বিভক্তপ্রায় আওয়ামী লীগের হাল ধরলে এই দলকে দুর্বল করার  পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি।

জিয়াউর রহমানের পর জেনারেল এরশাদ ক্ষমতা দখল করলে একই প্রক্রিয়ায় সামরিক কায়দায় দেশ পরিচালিত হয়। দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে বিরোধী দলের ওপর দমন ও নিপীড়ন চালানোর মাধ্যমে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার প্রয়াস অব্যাহত থাকে। ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে বিরোধী দলকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় কোণঠাসা করে রাখার প্রয়াস অব্যাহত ছিল। ফলে, বিরোধী দল সংসদে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে পারেনি। পরে গণ আন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালে এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি ক্ষমতায় থাকলেও আওয়ামী লীগ সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে নিজেদের ভূমিকা পালন করেছে। একইভাবে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরে বিএনপিও সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে অবস্থান করেছিল। তখন পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরোধী দলের অবস্থান শক্তিশালী ছিল। ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, গত ২০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরোধী দলের অবস্থান এত দুর্বল হলো কেন?

২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে ক্ষমতার শেষের দিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে বিতর্কিত করার জন্য প্রধান বিচারপতির বয়স ৬৫ থেকে ৬৭ বছর করে। পরবর্তী পর্যায়ে বিএনপির রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ওপর থেকে মানুষের আস্থা অনেকাংশেই উঠে যায়। ফলে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে বিতর্কিত করার ক্ষেত্রে বিএনপির দায় অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই। সেই সময় যদি প্রধান বিচারপতির বয়স ৬৫ থেকে ৬৭ বছর করা না হতো তবে  ২০০৬ সালে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে অনাকাঙ্ক্ষিত দ্বান্দ্বিক অবস্থা তৈরি হয়েছিল তা হতো না।

পরবর্তী সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের সাংবিধানিক বিভিন্ন বিধান উপেক্ষা করে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদ যেসব বিতর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন তারই পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনা সমর্থিত এক বিশেষ ধরনের সরকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। যদিও প্রথমদিকে তারা বলেছিল যে একটি সুষ্ঠু এবং অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর করাই তাদের মূল লক্ষ্য। কিন্তু ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হবার পর তারা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করবার জন্য বিরাজনীতিকরণ নীতি বাস্তবায়নের কাজে মনোনিবেশ করেন।

২০০৭ সালের প্রথম দিকে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী অসুস্থ বৌমাকে দেখতে যুক্তরাষ্ট্রে গেলে তাঁর দেশে ফেরা আটকাতে তৎকালীন সরকার ব্যাপক চেষ্টা করে। এমনকি সেই সময় বেগম খালেদা জিয়াকেও দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয় সরকারের তরফ থেকে।  কিন্তু সরকারের সব রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে শেখ হাসিনা ২০০৭ সালের ৭ মে দেশে ফিরে এসে আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করে নির্বাচনের দাবি উত্থাপন করতে থাকেন। এই দুই বছরে দেশে যে অগণতান্ত্রিক শাসন চলেছিল তাতে দেশে বিরোধী দলের ভূমিকা রাখার কোনও সুযোগ ছিল না।

পরে ২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসে। সেই নির্বাচনে বিএনপি মাত্র ৩২টি আসনে জয়ী হতে পারে। তাদের পরাজয়ের মূল কারণ ছিল ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের সময়কালে বিএনপি'র অপশাসন। মানুষ বিএনপির প্রতি এতটাই বিক্ষুব্ধ হয়ে ছিল যে ব্যালটের মাধ্যমে তারা দলটির প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপন করেছিল সেই সময়। সেই থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বিরোধী দল দুর্বল হতে শুরু করে। পরবর্তীতে ২০১৪ সালের নির্বাচন বয়কট করার মাধ্যমে বিএনপি বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরোধী দলের অবস্থানকে আরও দুর্বল করেছে।

সংসদে বিরোধী দলকে সরকারি দলের মতোই গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়। বিরোধী দলের দায়িত্ব থাকে সরকারের সব ভুল এবং খারাপ কাজের সমালোচনা করা। সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল যদি না থাকে তবে সংসদ কখনোই কার্যকর হবে না। এমনকি একটি শক্তিশালী বিরোধী দল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিক করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে বিরোধী দলের শূন্যতা দেখা যাচ্ছে। সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দলের অনুপস্থিতির বিষয়টি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন সময় উল্লেখ করেছেন। সংসদে যেহেতু বিরোধী দলের অবস্থান নেই, অতএব রাজনীতির মাঠেও বিরোধী দলের অবস্থান দিনের পর দিন দুর্বল হচ্ছে। এর দুর্বলতার কারণে ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি খুব বাজে ফলাফল করেছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকার কারণে দলের সমর্থকদের দলের প্রতি উদাসীনতা লক্ষ করা যাচ্ছে, যা একদিকে যেমন দলের অস্তিত্বের জন্য হুমকি, ঠিক অন্যদিকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য একটি চরম হুমকি।

দেশের বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো যত দুর্বল হচ্ছে ভোটের রাজনীতির প্রতি জনগণের এক ধরনের উদাসীনতা লক্ষ করা যাচ্ছে, যা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য কখনও সুখকর নয়।  এই অবস্থা সৃষ্টির পেছনে বিরোধী জোটের পক্ষ থেকে সরকারের ওপরে দায় চাপানো হলেও প্রকৃতপক্ষে দায় বিরোধী দলকেই নিতে হবে। কারণ, নির্বাচন প্রক্রিয়ায় তাদের অনুপস্থিতি বর্তমান ক্ষমতাসীন দলকে তাদের অবস্থান শক্তিশালী করতে সহায়তা করেছে। নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতি ৫ বছর পর ক্ষমতার পরিবর্তন হবে- এটিই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া। কিন্তু বিরোধী দলগুলোর নির্বাচন প্রক্রিয়ার প্রতি অনাস্থা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিক করার জন্য একটি বড় হুমকি। নিজেদের ব্যর্থতার দায় ঢাকতে নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে অন্যান্য শক্তির ওপর নির্ভর করে ক্ষমতায় আসার বিরোধী জোটের যে পরিকল্পনা তা বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষাপটে বাস্তবে রূপ লাভ করার সম্ভাবনা খুব কম।

ফলে, ২০২৩ সালে  অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সব বিরোধী দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা শক্তিশালী হবে- এটিই সবার প্রত্যাশা। সব রাজনৈতিক দলের উচিত জনগণকে আস্থায় নিয়ে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার চেষ্টা করা। জনগণ ব্যতীত অন্য কোনও শক্তি কোনও রাজনৈতিক দলকে বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে ক্ষমতায় আনতে পারবে না- এই বিষয়টি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে যত দ্রুত সম্ভব উপলব্ধি করতে হবে। এই সত্যটি উপলব্ধি করলে একদিকে যেমন তাদের অবস্থান শক্তিশালী হবে, অন্যদিকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া আরও সুসংহত হবে।

একই সাথে সরকারের পক্ষ থেকে বিরোধী দলকে নির্বাচনে আনার জন্য যা যা করা প্রয়োজন তা করতে হবে। কিছু দিন আগে বাংলাদেশে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছে। যাদের নিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছে তারা কেউই বিতর্কিত ব্যক্তি নন। যেহেতু এই নির্বাচন কমিশনের অধীনে আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, সব বিরোধী রাজনৈতিক দলের উচিত এই নির্বাচন কমিশনকে আস্থায় নেওয়া। কারণ, নির্বাচন কমিশন কখনোই সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে পারবে না, যদি রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন কমিশনকে আস্থায় নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে। ফলে, সব দলের উচিত নির্বাচন কমিশনকে আস্থায় নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সুসংহত করা।

   

লেখক: অধ্যাপক, লোক-প্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
শুটিংয়ের সময় মারধর করতেন বানসালি!
শুটিংয়ের সময় মারধর করতেন বানসালি!
৫২ জনকে চাকরি দেবে বুয়েট
৫২ জনকে চাকরি দেবে বুয়েট
আবারও বৃষ্টিতে দুর্ভোগ বেড়েছে বানভাসিদের
আবারও বৃষ্টিতে দুর্ভোগ বেড়েছে বানভাসিদের
বজ্রাঘাতে প্রাণ গেলো ২ জেলের
বজ্রাঘাতে প্রাণ গেলো ২ জেলের
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ