X
বুধবার, ১০ আগস্ট ২০২২
২৫ শ্রাবণ ১৪২৯

ঋণ অনুপাতের গরমিল, অর্থনৈতিক অস্থিরতায় চীন

ফারাজী আজমল হোসেন
০৭ জুলাই ২০২২, ১৬:২৭আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২২, ১৬:২৭
বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে ঋণ সহায়তা দিচ্ছে চীন। সেই সঙ্গে চীনের ঋণ সহায়তার ফাঁদে পা দিয়ে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সমস্যার মধ্যে থাকা দেশের সংখ্যাও কম নয়। শ্রীলঙ্কা এবং আফ্রিকার বেশ কিছু দেশ তার সবচাইতে বড় উদাহরণ। এদিকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে ঋণ ফাঁদে জড়ানো চীন নিজেও রয়েছে অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে। কারণ, তার ঋণ অনুপাতের গরমিল ও বন্ড খেলাপি।

চলতি বছরের ১২ মে চীনের বৃহত্তম ডেভেলপার সুনাক চায়না হোল্ডিংস ৭৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বন্ড খেলাপির কথা স্বীকার করেছে। শুধু সুনাক একা নয়, চীনা বন্ডের বাজারটাই অত্যধিক ঋণে পরিপূর্ণ। সুনাক তার সর্বশেষ বড় উদাহরণ মাত্র। চীনা রিয়েল এস্টেট বা ভোক্তা সংস্থাগুলোর সকলের মধ্যেই রয়েছে মাত্রাতিরিক্ত ঋণের প্রবণতা।

চীনের দ্বিতীয় বৃহত্তম ডেভেলপার এভারগ্র্যান্ডও তাদের ৩০০ মার্কিন ডলার ঋণের কথা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে। দাতা ও বাণিজ্য সহযোগীদের সেই ঋণের টাকা ফেরত দিতে হিমশিম খাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। সিনিক হোল্ডিংস, চায়না প্রোপার্টিজ গ্রুপ এবং ফ্যান্টাসিয়াও একই সমস্যা জর্জরিত। চায়না হুয়ারং অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের গত বছর খেলাপি ঋণ ১৫.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং এর ‘ঋণ-টু-ইক্যুইটি’ অনুপাত একপর্যায়ে ১,৩৩৩ শতাংশে পৌঁছেছিল। সম্পত্তি বিষয়ক কোম্পানি কায়সা-র বন্ড খেলাপির পরিমাণ ৪০০ মিলিয়ন ডলার। চীনা ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি (সিআরএ) গুলি অর্থ-লোপাটকারী সংস্থাগুলোকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানোর কারণে খেলাপিদের এই চেহারা। এটাই এখন চীনা অর্থনীতির গভীর অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

চীনে ক্রেডিট রেটিংয়ের বিবর্তন এ ক্ষেত্রে বেশ লক্ষণীয়। ১৯৮০ সালে চীনে ক্রেডিট রেটিংয়ের ধারণা এলেও ২০০০ সালের মধ্যবর্তীতে বন্ডের বাজার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ক্রেডিট রেটিং সংস্থা মাথাচাড়া দেয়। ২০২০ সালের শেষ দিকে চীনা বন্ডের বাজার ছিল ১৯ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। গ্লোবাল বন্ড বাজারের ১৫ শতাংশই ছিল তাদের দখলে। গোটা দুনিয়ায় একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রই ছিল তাদের আগে। চীনা বন্ড বাজারে ইস্যুকারীরা ধীরে ধীরে প্রাথমিক রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন উদ্যোগ থেকে ব্যক্তিগত এবং বিদেশি উদ্যোগের পাশাপাশি বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিস্তৃত হয়েছে। সফলভাবেই চীনা বন্ড বাজার বিস্তৃতি লাভ করে। আর্থিক বাজার উন্মুক্ত করার নতুন সুযোগ নিয়ে আসে। একটি পরিপূর্ণ চীনা ক্রেডিট রেটিং সিস্টেম ধীরে ধীরে সমস্যা এবং পণ্যের বৈচিত্র্যের সঙ্গে গঠিত হয়েছে। ২০২০ সালের শেষ নাগাদ, প্রায় ৯০০টি বিদেশি প্রতিষ্ঠান চীনা বন্ড বাজারে প্রবেশ করে।

আন্তর্জাতিক বাজার খোলা রেখেও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে থাকা বন্ডের মোট পরিমাণ প্রায় ৩.৩ শতাংশ। কিন্তু চীনা কোম্পানিগুলোর অভ্যন্তরীণভাবে ইস্যু করা বন্ডের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। বেড়ে যায় খেলাপির সংখ্যা। চীনে করপোরেট ঋণের মাত্রা বৃহত্তর অর্থনীতির জন্য বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। ২০১৯ এবং ২০২০ সালে  চীনা সংস্থাগুলো ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি ঋণ খেলাপি হয়েছে। ত্রুটিযুক্ত স্থানীয় ক্রেডিট রেটিং চীনের বন্ড মার্কেটে স্বচ্ছতার বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। নয়টি স্থানীয় সিআরএ-র মধ্যে পাঁচটিই আংশিকভাবে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন। বন্ড ইস্যুকারীদের স্বচ্ছতার অভাবের জন্য এসব সিআরএ-কেও দায়ী করছেন অনেকে।

চীনের এই গভীর অস্থিরতার লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছে ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল সেটেলমেন্টস (বিআইএস)-এর তথ্যে। তাদের দেওয়া তথ্যানুসারে, চীনের মোট ঋণের পরিমাণ ২০০৮ সালের শেষে ৬.৫  ট্রিলিয়ন থেকে ২০১৯ সালের শেষের দিকে ৩৬.৮ ট্রিলিয়ন ডলার হয়েছে। অর্থাৎ চীনের মোট দেশীয় পণ্য (জিডিপি)-এর ২৫৮.৭ শতাংশের সমতুল্য হয়ে দাঁড়িয়েছে ঋণের বহর। ঋণখেলাপিদের মধ্যে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাই বেশি। ২০২০ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার ঋণ খেলাপের পরিমাণ ছিল ১১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অর্থাৎ, গোটা দেশের মোট ঋণ খেলাপের ৫১ শতাংশই সরকারি সংস্থার।

চীনা বন্ড মার্কেটে এএ- বা তার বেশি রেটিং-এর কারণে বাজার কয়েক বছর ধরে বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। ২০০৮ সালে এএ-এর উপরে রেটিং ছিল মোট বন্ডের মাত্র ৫৬ শতাংশ। কিন্তু ২০২০ সালের মধ্যে সেই অনুপাত প্রায় ৮৭ শতাংশে পৌঁছেছে। ২০১৮  সালে ৯৬ শতাংশ অ-আর্থিক বন্ড  এএ বা  তার উপরে রেটিং বহন করে। খেলাপির ক্রমবর্ধমান সংখ্যা সত্ত্বেও চীনের ক্রেডিট রেটিং এজেন্সির তৈরি চীনা ঋণগ্রহীতাদের ঝুঁকি মূল্যায়ন এখনও এএএ এবং এএ বিভাগে রয়েছে। আন্তর্জাতিক সিআরএ রেটিং করলে অবশ্য গড়ে কমপক্ষে ৬-৭ পয়েন্ট কম হবে।

চীনে সিআরএ-এর সংখ্যাও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক বেশি। এজেন্সিগুলোর মধ্যে রেটিং নিয়ে প্রতিযোগিতা চলে। আমেরিকান বাজারে ১০ শতাংশের কম বন্ড এএ এবং তার উপরে রেট দেওয়া হয়। বর্তমানে রেটিং বাধ্যতামূলক। বেশিরভাগ রেটিং এজেন্সি তাই খ্যাতির বদলে বাজার ধরার ওপর বেশি ব্যস্ত।  চীনের ঘরোয়া সিআরএ-গুলো ক্রমাগত রেটিং বৃদ্ধির দিকে পরিচালিত হয়ে ঋণের অনুপাত উল্লেখযোগ্যভাবে অবমূল্যায়নের দিকে ঠেলে দিয়েছে। উপরন্তু, সিআরএ ইস্যুকারীরা প্রায় ২ লাখ ইউয়ান বা ৩০ হাজার ৮০০ ডলার পরিষেবার জন্য অর্থ নিচ্ছে।

সিংহুয়া ইউনিভার্সিটির লিউ শিদা এবং ওয়াং হাওয়ের গবেষণা ইঙ্গিত দিয়েছে, দেশীয় রেটিং সংস্থাগুলোর প্রারম্ভিক সতর্কতা দেওয়ার ক্ষেত্রেও খুবই দুর্বল।  চীনা নিয়ন্ত্রকরা ন্যূনতম ক্রেডিট রেটিং, সাধারণত এএএ বা এএ সংস্থাগুলো পরিচালনাকারী নিয়মগুলোতে অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং সিআরএ-কে ডাউনগ্রেড ইস্যু করা থেকে নিরুৎসাহিত করেছে।  তারা গুরুত্ব দিয়েছে শুধুমাত্র বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনে।  বিআইএস-এর মতে, অভ্যন্তরীণ সিআরএ-এর এক পয়েন্ট ডাউনগ্রেড, যেমন এএএ থেকে এএ+ এ পরিবর্তন, প্রায় ৬০ বেসিস পয়েন্ট বন্ডের আকর্ষণ বৃদ্ধি করতে পারে।

চীনের এ ধরনের কাজের জন্য দায়ী করা হচ্ছে ঋণখেলাপির স্বাভাবিকীকরণ প্রক্রিয়াকে। বছরের পর বছর ধরে ঋণ পুঞ্জীভূত হওয়া এবং মহামারির প্রভাব ব্যবসায়িক কার্যক্রমের অবনতির দিকে নিয়ে গেছে। চীনের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউশন ফর ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এনএফআইডি) জানায়, ২০২০ সালের শেষের দিকে দেশের সামগ্রিক ঋণের পরিমাণ জিডিপির ২৭০.১ শতাংশ। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটির বক্তব্য অনুযায়ী ২০১৯ সালের শেষ দিকের তুলনায় ২৪৬.৫ শতাংশ বেড়েছে। ২০২০ সালে চীনের মোট বিদেশি ঋণের পরিমাণ ২.৪ ট্রিলিয়ন ডলার। ঋণের সিংহভাগই রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বা রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের। চীন গোপন করার চেষ্টা করলেও নিউ ইয়র্কের এস অ্যান্ড পি গ্লোবাল রেটিংয়ের অনুমান বলছে, ২০১৮ সালে চীনের ঋণ ৩০ থেকে ৪০ ট্রিলিয়ন ইউয়ান বা ৪.২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি।  ঋণখেলাপির সংখ্যাও অনেক বেশি। আর ঋণখেলাপিতেও চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাই এগিয়ে।

চীনের এই লাগামহীন অবস্থানের জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থার সীমাবদ্ধতাকেও দায়ী করা হচ্ছে। এস অ্যান্ড পি, মুডিজ বা ফিচ-এর মতো সম্পূর্ণরূপে বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত সিআরএ দেশিয় বাজারে চীনা ফার্মগুলোকে রেট দেওয়ার জন্য স্বীকৃত নয়। তবে তারা চীনের বাইরে আন্তর্জাতিক বাজারে চীনা সংস্থাগুলোর বন্ডকে রেটিং দিতে পারে। বিদেশি রেটিং এজেন্সিগুলোকে চীনের বন্ড মার্কেটে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হলেও সন্দেহ থাকছেই। গ্লোবাল রেটিং এজেন্সিগুলোও বাজার ধরার জন্য বেশি রেটিং প্রদানের চাপের কাছে নতি স্বীকার করতে পারে। কারণ, চীনা কোম্পানিগুলো সম্ভাব্য সর্বোচ্চ রেটিং চায়।

ইউএস-চীন ইকোনমিক অ্যান্ড সিকিউরিটি রিভিউ কমিশন 'হেয়ারিং অন চায়না কোয়েস্ট ফর ক্যাপিটাল'-এর কাছে ২০২০ সালের ২৩ জানুয়ারি সাক্ষ্য দিতে গিয়ে সম্পদ ব্যবস্থাপনা সংস্থা টিসিডব্লিউ-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডেভিড লোভিংগার এই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছিলেন। চীনের আর্থিক বাজারে বস্তুনিষ্ঠ রেটিং আদৌ সম্ভব, নাকি আর্থিক বাজারে 'তারা যেমন দেখে তাই বলে' নীতিতেই রেটিং চলছে!

চীনা রেটিং এজেন্সিগুলোর পদ্ধতিগত মূল্যস্ফীতি ঋণের ঝুঁকিকেও লুকিয়ে রাখে। শেষ পর্যন্ত চীনের নির্দিষ্ট আয়ের বাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। চীনারা যাই বলুন না কেন, বন্ড বাজারে তাদের অস্বচ্ছতা বিনিয়োগকারীদের সর্বনাশ ডেকে আনছে। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে চায়না সিকিউরিটিজ রেগুলেটরি কমিশন (সিএসআরসি) সিকিউরিটিজ মার্কেটে ক্রেডিট রেটিং ব্যবসার প্রশাসনিক নিয়ম এবং করপোরেট বন্ড ইস্যু ও ট্রেডিংয়ের জন্য সংশোধনী চূড়ান্ত করেছে। এটি পাবলিক করপোরেট বন্ড ইস্যু করার জন্য বাধ্যতামূলক ক্রেডিট রেটিংয়ের প্রয়োজনীয়তা সরিয়ে দিয়েছে এবং শুধু ইস্যুকারী রেটিং প্রয়োজন হবে।

বন্ড মার্কেটে সরকারি সংস্থার অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রতিনিধিত্ব রেটিং বণ্টনকে বাড়িয়ে দেয়। কারণ, বিনিয়োগকারীরা ধরে নেয় রাষ্ট্র-খাতের ঋণগ্রহীতারা সরকারি সহায়তা উপভোগ করেন এবং তাই ঋণের ঝুঁকি কম থাকে। ঋণ প্রদানকারীদের দুর্বলতা নিয়ে আলোচনা করার জন্য বেইজিংকে অবশ্যই সিআরএ-র ক্ষমতার ওপর শিথিল বিধিনিষেধ প্রয়োগ করতে হবে। ক্রেডিট রেটিং এজেন্সিগুলোকে প্রাসঙ্গিক থাকার জন্য সর্বশেষ উন্নয়নের ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, বন্ড বাজারে নিয়ন্ত্রণ থাকা জরুরি। শুধু বাজার দ্বারা পরিচালিত হলে বিপদ আসবেই। সেই বিপদেরই আভাস রয়েছে চীনা বন্ড বাজারে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার ট্রলারডুবি, ১৩ জেলে নিখোঁজ
বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার ট্রলারডুবি, ১৩ জেলে নিখোঁজ
হারারেতে ৪০০তম ওয়ানডে খেলার অপেক্ষায় বাংলাদেশ
হারারেতে ৪০০তম ওয়ানডে খেলার অপেক্ষায় বাংলাদেশ
ভারতে শেষ দিনে ছেলেরা হারলেও জিতেছে নারী দল
ভারতে শেষ দিনে ছেলেরা হারলেও জিতেছে নারী দল
তুরাগে ভাঙারি দোকানে বিস্ফোরণ, মৃত্যু বেড়ে ৭
তুরাগে ভাঙারি দোকানে বিস্ফোরণ, মৃত্যু বেড়ে ৭
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ