X
রবিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২
৯ আশ্বিন ১৪২৯

হায় মধ্যবিত্ত!

রেজানুর রহমান
০৭ আগস্ট ২০২২, ২১:০১আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০২২, ২১:০১

বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত নামে নিরীহ টাইপের একটা মনুষ্য শ্রেণি আছে। উচ্চবিত্তের নিচে মধ্যবিত্ত, তার নিচে নিম্ন মধ্যবিত্ত। একেবারে নিচে নিঃস্ব অসহায় মানুষ। মজার ব্যাপার হলো, উচ্চবিত্ত শ্রেণির অনেকে দিল খুলে সাহায্য দেয়। নিম্ন মধ্যবিত্ত, অসহায় মানুষ তা সানন্দে গ্রহণ করে। মধ্যবিত্ত শুধু চেয়ে চেয়ে দেখে। নিরীহ টাইপের মধ্যবিত্ত শ্রেণি কারও কাছে কিছু নিতে চায় না, কাউকে দেওয়ার সামর্থ্যও রাখে না। ফলে যেকোনও দুঃখ-দুর্দশার প্রথম শিকার হয় মধ্যবিত্ত শ্রেণি। দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়লে এই শ্রেণিটাই বেশি অসহায়বোধ করে। বাড়ি ভাড়া বাড়লে চোখে সর্ষে ফুল দেখে। কিন্তু কাউকে এ নিয়ে কিছু বলার বা প্রতিবাদ করার সাহসও পায় না। মাছের রাজা ইলিশ কিনতে গিয়ে এক পা এগিয়ে দু’পা পেছায়। তেলের দাম বেড়েছে, কিনতে গিয়ে ভাগ্যকেই দোষারোপ করে। ২৫০ টাকার কাঁচা মরিচ কিনতে গিয়ে ভাবে মরিচ না খেলে কী হয়? বাসের ভাড়া বেড়েছে তবু নিশ্চুপ থাকে। ভাবে আজ থেকে আর বাসে চড়বো না। হেঁটেই গন্তব্যে যাবো, হেঁটেই ফিরবো। বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত সমাজ মোটামুটি এমন ধারণায় দিন কাটায়। ‘দিন আনে দিন খায়’ আর ভাগ্যকেই দোষারোপ করে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যবিত্ত নামের এই মনুষ্য শ্রেণির অবস্থা খুবই নাজুক। হঠাৎ  দেশে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় জীবনযাত্রার কঠিন চ্যালেঞ্জ পড়েছে মধ্যবিত্ত সমাজ। টিকে থাকার বড় চ্যালেঞ্জ এখন মধ্যবিত্তেরই বেশি। কারণ, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি পাওয়ায় ইতোমধ্যে পরিবহন সেক্টরে বাস ভাড়া বেড়েছে। বাজারে নিত্যপণ্যের দামও উত্তাপ ছড়াতে শুরু করেছে।

রফিক সাহেব মধ্যবিত্ত মানুষ। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। সীমিত আয়ে ৫ সদস্যের সংসার চালাতে তার অনেক কষ্ট হয়। এক ছেলে এক মেয়ে। দু’জনই সরকারি স্কুলে পড়ে বলে রক্ষা। বেতন কম। কিন্তু ঝামেলাটা বাধে পরিবহন ভাড়া নিয়ে। রফিক সাহেবের বেতন বাড়ে না। কিন্তু পরিবহন ভাড়া মাসে, তিন মাসে হঠাৎ করেই বাড়ে। রাতে একটু আগেই ঘুমিয়েছিলেন রফিক সাহেব। তাই জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির খবরটা শোনেননি। সকালে স্কুলগামী মেয়ের কথায় অবাক হলেন। অফিসে যাবার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। মেয়ের মা প্রতিদিন মেয়েকে স্কুল নিয়ে যায় স্কুল শেষে নিয়ে আসে। ছেলেটির স্কুল বাসার পাশেই। কাজেই ওর রিকশা ভাড়া লাগে না। মেয়ের স্কুল দূরে, তাই রিকশায় যেতে হয়। প্রতিদিন মেয়ের জন্য রিকশার খরচ বাবদ ১২০ টাকা বরাদ্দ। আজ মেয়ে এসে বিরক্ত কণ্ঠে বললো, বাবা ১২০ টাকা হবে না। ১৪০ টাকা দাও। রফিক সাহেব একটু অবাক হলেন। মেয়েক মৃদু ধমক দিয়ে বললেন, ২০ টাকা বেশি চাচ্ছিস কেন? কী সমস্যা?

মেয়ের মা এসে বলেন, কোনও রিকশাওয়ালাই ৭০ টাকার কমে যেতে চাচ্ছে না। যেতে যখন ৭০ টাকা লাগছে আসতেও নিশ্চয়ই একই টাকা লাগবে। রফিক সাহেব প্যান্ট পরেছেন। গেঞ্জির ওপর শার্টটা চাপিয়ে দিয়ে গজরাতে গজরাতে বাসার বাইরে বেরিয়ে আসেন। রিকশাওয়ালাকে ধমক দেন। ওই মিয়া আজ রিকশা ভাড়া বেশি চাচ্ছ কেন? রিকশাওয়ালা তরমুজের বিচির মতো ময়লা দাঁত বের করে অযথাই হাসতে হাসতে বলে, স্যার তেলের দাম বাড়ছে। কাজেই ভাড়া ১০ টাকা বেশি দিতে হবে।

রফিক সাহেব তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠেন। রিকশাওয়ালাকে ধমক দিয়ে প্রশ্ন করেন– তেলের দাম বাড়ছে মানে? কখন বাড়লো।

রিকশাওয়ালা বিজয়ীর ভঙ্গিতে হাত নেড়ে নেড়ে বলে, ক্যান আপনি জানেন না। গত রাইতে সরকার তো দাম বাড়াইয়া দিছে।

তাই নাকি? বলেই রিকশাওয়ালার দিকে তাকান রফিক সাহেব। ধমক দিয়েই বলেন, অয় মিয়া তেলের দাম বাড়লে তোমার কী? তুমি কি তেল দিয়ে রিকশা চালাও?

রিকশাওয়ালা সাথে সাথে জবাব দেয়, আপনি শিক্ষিত মানুষ হইয়া এইটা কী বললেন স্যার। তেলের দাম বাড়া মানে জিনিসপত্রের দাম বাইড়্যা যাওয়া। যে ডিম ১২০ টাকা ডজন ছিল সেই ডিম ১৪০ টাকা হইয়া গেছে স্যার। কাঁচা মরিচ ২৬০ টাকা। আপনারা যদি আমার রিকশা ভাড়া না বাড়ান তাইলে আমি আমার পরিবার বাঁচবে কীভাবে?

অকাট্য যুক্তি। রফিক সাহেব মেয়ের হাতে ১৫০ টাকা তুলে দিলেন। মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার সময় স্ত্রী স্বামীর হাতে একটা বাজার ফর্দ ধরিয়ে দিলেন। অফিস শেষে বিকালে মতিঝিল এলাকার রাস্তায় ভ্রাম্যমাণ বাজারে ঢুকলেন রফিক সাহেব। কোনও পণ্যেই হাত দেওয়া যাচ্ছে না। কাঁচা শাক, সবজির দাম বেড়েছে। মাছের দাম বেড়েছে। কাঁচা মরিচ নিয়ে রীতিমতো লড়াই চলছে। স্ত্রীর দেওয়া ফর্দ অনুযায়ী সবকিছু কিনতে পারলেন না রফিক সাহেব। রাস্তার বাজারে একটা বোয়াল মাছ বেশ পছন্দ হয়েছিল। দাম শুনে ঘামতে শুরু করেছেন রফিক সাহেব। হঠাৎ কোট-টাই পরা এক ভদ্রলোক ঝড়ের গতিতে এসে ঝড়ের গতিতেই মাছটা কিনে নিয়ে চলে গেলেন। রফিক সাহেব চেয়ে চেয়ে দৃশ্যটা দেখলেন। তার চোখে-মুখে বিস্ময়ের ঘোর কাটছে না। মাছের দোকানি তার কাছে বোয়াল মাছটির দাম চেয়েছিল ৩২শ টাকা। কিন্তু কোট-টাই পরা ভদ্রলোকের কাছে ৪২শ’ টাকা দাম চাওয়া সত্ত্বেও উচ্চবিত্ত ওই ক্রেতা কোনও দরদাম করলেন না। ৪২শ’ টাকা দিয়েই বোয়াল কিনে নিয়ে চলে গেলেন। মধ্যবিত্ত রফিক সাহেব শুধু চেয়ে চেয়ে দেখলেন আর দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।

বাসায় ফেরার পথে বাসের কন্ডাকটরের সাথে দ্বিতীয় দফা তর্ক হলো। সকালে বাসে আসার সময় ভাড়া অন্যদিনের তুলনায় ৭ টাকা বেশি নিয়েছে। ফেরার সময় ১০টাকা বেশি চাইলো। এটা কি মগের মুল্লুক নাকি? রফিক সাহেব ৭ টাকার বাইরে একটা কানাকড়িও বেশি দেবেন না সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু পারলেন না। কন্ডাকটর তার কাছে প্রায় জোর করে ১০ টাকা বেশি নিলো। বাসায় ফিরে নতুন সংকটের মুখোমুখি হলেন রফিক সাহেব। বাড়িওয়ালা লোক পাঠিয়েছিল। আগামী মাস থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা বাড়ি ভাড়া বেশি দিতে হবে। রফিক সাহেব ভাড়া বাড়াতে না চাইলে বাসা ছেড়ে দিতে হবে। খাবার টেবিলে বসে আরেক দুঃসংবাদ পেলেন রফিক সাহেব। একটা ছুটা কাজের বুয়া বাসায় কাজ করে, তাকে মাসে সাড়ে ৪ হাজার টাকা বেতন দিতে হয়। সে নোটিশ দিয়েছে সামনের মাস থেকে ৫০০ টাকা বেতন না বাড়ালে কাজ করবে না।

রাতে ঘুম হলো না রফিক সাহেবের। মনে মনে হিসাব করে দেখলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় বিভিন্ন খাতে তার সংসারের বাজেট যেভাবে বেড়েছে তাতে তাকে মাসে প্রায় ১০-১২ হাজার টাকা বেশি ইনকাম করতে হবে। রফিক সাহেবের কাছে এই টাকা অনেক টাকা। অসহায় রফিক সাহেব শুধুই নিজেকে ধিক্কার দিতে থাকলেন।

প্রিয় পাঠক, রফিক সাহেব একজন নন। এই দেশে অসংখ্য রফিক আছেন জ্বালানি তেলে মূল্য বৃদ্ধি তাদের অসহায় করে তুলেছে। টিকে থাকার চ্যালেঞ্জ শিরোনামে দেশের একটি দৈনিক লিখেছে, ডিজেল কেরোসিনের মতো জ্বালানিকে বিবেচনা করা হয় জীবনযাত্রার খরচের সংক্রামক পণ্য হিসেবে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সংসারের খরচের পারদও চড়তে থাকে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জ্বালানি তেলের রেকর্ড দাম বাড়ায় খরচের নিচে চাপা পড়বে সাধারণ মানুষ অর্থাৎ মধ্যবিত্ত শ্রেণি। মধ্যবিত্তের টিকে থাকার লড়াই শিরোনামে একটি শীর্ষ দৈনিক পত্রিকা লিখেছে, মধ্যবিত্তের নতুন লড়াই শুরু হলো। অকটেন, পেট্রোল, ডিজেল, কেরোসিনের মূল্য বৃদ্ধিতে বড় ধরনের দুশ্চিন্তায় পড়েছেন দেশের গরিব ও সীমিত আয়ের মানুষেরা। মধ্যবিত্তের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়েছে...।

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় শুধু মধ্যবিত্ত শ্রেণি নয়, দেশের সাধারণ মানুষের মনে অজানা ভয় ও আতঙ্ক শুরু হয়েছে। এই ভয় কাটানোর দায়িত্ব সরকারের। বিশ্ব পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে চলার মানসিকতা অনেকটাই রপ্ত করেছে দেশের সাধারণ মানুষ। তবে হঠাৎ জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধিতে একটু যেন হতাশ তারা। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণির হতাশা স্পষ্ট। এর থেকে পরিত্রাণের উপায় কী?

 

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক- আনন্দ আলো  

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
পরীক্ষায় বসে ফেসবুকে লাইভ, দুই শিক্ষার্থী বহিষ্কার
পরীক্ষায় বসে ফেসবুকে লাইভ, দুই শিক্ষার্থী বহিষ্কার
দুই গ্রুপের কোন্দলে মধ্যরাতে উত্তপ্ত ইডেন কলেজ
দুই গ্রুপের কোন্দলে মধ্যরাতে উত্তপ্ত ইডেন কলেজ
রামনাথ বিশ্বাসের বসতভিটা পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণে ১০০ নাগরিকের বিবৃতি
রামনাথ বিশ্বাসের বসতভিটা পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণে ১০০ নাগরিকের বিবৃতি
এতদিন কোথায় ছিলেন রহিমা?
এতদিন কোথায় ছিলেন রহিমা?
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ