X
রবিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২
৯ আশ্বিন ১৪২৯

কলকব্জায় আটকে যাওয়া সিনেমা-গান

বিধান রিবেরু
১১ আগস্ট ২০২২, ১৮:৫৩আপডেট : ১২ আগস্ট ২০২২, ১২:৩০

বিবাচন বা কর্তন (censorship) সবসময়ই রাজনৈতিক ভাবাদর্শ ভিত্তিক নীতি-পুলিশের কাঁচি হাতে নিয়ে রাখে। যখনই কোনো কিছু শাসকগোষ্ঠীর ভাবাদার্শ অথবা রাজনৈতিক আদর্শের বাইরে যায়, তখনই সেটার ওপর বিবাচন অস্ত্রোপচার চালায় কিংবা হিমঘরে পাঠিয়ে দিয়ে সূর্যের আলো দেখা বন্ধ করে দেয়। ফরাসি ভাবুক লুই আলথুসার এই তৎপরতার নামই দিয়েছেন ইডিওলজিক্যাল স্টেট অ্যাপারাটাস (আইএসএ) বা রাষ্ট্রের ভাবাদর্শিক যন্ত্র। এই যন্ত্রের মাধ্যমে রাষ্ট্র তথা শাসকগোষ্ঠী নিজেদের ক্ষমতা অটুট রাখতে সর্বদা সচেষ্ট থাকে।

সম্প্রতি মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ‘শনিবার বিকেল’ নিয়ে নতুন করে আলাপ উঠেছে। ২০১৯ সালে ছাড়পত্র পাওয়ার জন্য বিবাচন পরিষদের (সেন্সর বোর্ড) কাছে জমা দিলেও এখনও পর্যন্ত তা পাওয়া যায়নি। অথচ তিন বছর হতে চলল। কথিত আছে, ছবিটি গুলশানে সংঘটিত সন্ত্রাসী হামলা নিয়ে করা। যেহেতু চলচ্চিত্রটি শুধু বিবাচন পরিষদের সভ্যরা দেখেছেন, তারাই বলতে পারবেন এই ছবিতে কোন ধরনের ‘সমস্যা’ আছে।

একটি ঘটনার ওপর চলচ্চিত্র হলেই কী আর না হলেই বা কী! মানুষ গল্প-উপন্যাস-চলচ্চিত্র তো চারপাশের ঘটনা থেকেই বানাবে। সেখানে কোনও অংশ নিয়ে আপত্তি বা সমালোচনা থাকলে সেটা করার পথ তো খোলাই আছে। কিন্তু কেউ লিখলে তার বই প্রকাশ করতে না দেওয়া বা ছবি বানালে মুক্তি আটকে রাখার চর্চা গণতান্ত্রিক নয়। আলাপ আসলে একটি ছবি নিয়ে করতে চাই না। ‘শনিবার বিকেল’ উপলক্ষ্য মাত্র, আমার লক্ষ্য রাষ্ট্রের কলকব্জার সামান্য সমালোচনা করা।

মার্কসবাদী চিন্তাবিদ আলথুসার রাষ্ট্রের আরেকটি যন্ত্রের কথা বলেছিলেন, যা দিয়ে সে ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখে। সেটি হলো রিপ্রেসিভ স্টেট অ্যাপারেটাস বা রাষ্ট্রের দমনমূলক যন্ত্র। সরকার, আইন-আদালত, পুলিশ, সশস্ত্র বাহিনী ইতি ও আদি এই যন্ত্রের উদাহরণ। এগুলোও ভীষণভাবে রাজনৈতিক ভাবাদর্শকে ধারণ করে।

কিছুদিন আগে বাংলাদেশের সুপরিচিত ও বিতর্কিত আধেয় নির্মাতা (কন্টেন্ট ক্রিয়েটর) হিরো আলমকে ডিবি পুলিশ উঠিয়ে নিয়ে যায় এবং তাকে রবীন্দ্র ও নজরুলসংগীত গাওয়া থেকে বিরত থাকতে বলার পাশাপাশি পুলিশের পোশাক পরে আধেয় নির্মাণের ব্যাপারে সতর্ক করে দেয়। শেষ পর্যন্ত এগুলোর কোনোটাই আর তিনি করবেন না বলে মুচলেকা দিয়ে হাফ ছেড়ে বাঁচেন ‘শুধু আলম’। হিরো আলম নামটাও পরিবর্তন হয়ে শুধু আলম হয়েছে পুলিশের আপত্তির কারণে! আলমের কাজ যদিও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ভেতরে পড়ে এবং এটিকে শাসন করা একেবারেই দমনমূলক যন্ত্রের এখতিয়ার নয়, তারপরও আমরা ঘটনাটি ঘটতে দেখলাম। রিপ্রেসিভ স্টেট অ্যাপারাটাস বা আরএসএ সাধারণ অর্থে বল প্রয়োগকারী সংস্থা। তারা সহিংস জিনিস, যেমন রাজপথের আন্দোলন ও সংগ্রামকে ঠেকানোর কাজে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু মজার বিষয় হলো, শুধু আলম রাজপথে রাজনৈতিক কর্মসূচি করতে যাননি। বেচারা নিজের ইউটিউব চ্যানেলে দুটো-তিনটে রবীন্দ্র-নজরুল গেয়ে মার্কিন ডলার আয় করছিলেন। অর্থাৎ দেশের ডলারের মজুদে কিঞ্চিত ভূমিকা রাখছিলেন। কিন্তু দেখা গেলো, নীতিপুলিশের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলো ডিবি পুলিশ। অর্থাৎ আলথুসার বর্ণিত আইএসএ’র কাজ করে দিচ্ছে আরএসএ। এখানেও শুধু আলম উপলক্ষ্য মাত্র।

আলথুসার যদি বেঁচে থাকতেন, তিনি নিশ্চয়ই ভিন্ন সূত্রায়নের পথে হাঁটতেন এই দশা পর্যবেক্ষণের পর। তবে এটা আপাতত বলা যায়, কোনও দেশের শাসকগোষ্ঠী যখন সব বিরোধী শক্তিকে নিশ্চিহ্ন শুধু নয়, প্রায় সব প্রথাগত বুদ্ধিজীবীকেও (ট্র্যাডিশনাল ইন্টেলেকচুয়াল) চুপ করিয়ে কিংবা আপন বুদ্ধিজীবী (অর্গানিক ইন্টেলেকচুয়াল) করে নিতে পারে, তখন তার প্রকৃত অর্থে অনেক কাজ কমে আসে। ভাবাদর্শিক কলকব্জা কোনও চাপ অনুভব করে না, কারণ দমনমূলক কলকব্জারও তো তখন চাপ কম, যেহেতু রাজপথ শীতল, তখন দমনমূলক যন্ত্রগুলো ভাবাদর্শিক যন্ত্রের কাজ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে করে দেয়। শুধু আলম এক চমৎকার উদাহরণ।

ফিরে আসি চলচ্চিত্রে। চলচ্চিত্র এমন এক শিল্পচর্চা, যা করতে কেবল মেধা ও অমানুষিক শ্রম দিলেই হয় না, প্রচুর টাকা-কড়িও লাগে। বাংলাদেশে আমরা দেখেছি–ডিপজল অভিনীত অতি জঘন্য গালাগাল থাকার পরও চলচ্চিত্র ছাড় পেয়েছে, অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ নাচের মুদ্রা সংবলিত চলচ্চিত্র ছাড়পত্র পেয়েছে, এমনকি অতি নিম্নমানের গল্প ও নির্মাণের চলচ্চিত্রও মুক্তি পেয়েছে। এর কারণ শাসকগোষ্ঠী যে রাজনৈতিক ভাবাদর্শ ধারণ করে, ওগুলো তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়নি। কিন্তু আপনি যতই মেধা-শ্রম-অর্থ দিয়ে ছবি বানান না কেন, সেটি যদি নিছক হয় অর্থাৎ শাসকগোষ্ঠীর ছকের বাইরে হয়, তখনই কর্তনের কাঁচি সক্রিয় হয়ে ওঠে। প্রশ্ন হলো, এই কর্তন দিয়ে কি আদৌ চিন্তার কর্তন করা যায়? উত্তর খুঁজতে পড়ে নিন জর্জ ওরয়েলের ‘১৯৮৪’। একই নামে মাইকেল রেডফোর্ড একটি চলচ্চিত্রও বানিয়েছেন। সেটাও দেখে ফেলা যেতে পারে।

আধুনিক যুগে বিবাচনের ধারণা বাতুলতার সমান। মাথার ওপর দিয়ে কেউ বল ছুড়ে মারলে তাকে ধরবেন কোন ছাঁকনি দিয়ে? এই মাথার ওপর দিয়ে ছুড়ে মারার আরেক নাম হয়েছে ওটিটি (ওভার দ্য টপ)। এখন যে ছবি বিবাচনের ছাঁকনিতে আটকে দেওয়া হচ্ছে, সেটি যদি দেশে বা বিদেশের ওটিটি মঞ্চে মুক্তি দেওয়া হয়, তখন? তখন কি এই নীতি-পুলিশের কর্তৃত্ব খাটবে? অন্তর্জালের যুগে মানুষ কি সেই আটকে দেওয়া ছবি না দেখে থাকবে? চৌকস শাসকগোষ্ঠী যা করে তা হলো, আধেয়ের ভেতর যদি আপত্তিকর কিছু থাকেও, তারা সেটি উপেক্ষা করে না দেখার ভান করে।  মানুষও একটা সময় পরে ভুলে যায়। কিন্তু যখন সনাতনী শাসকগোষ্ঠী কোনোকিছুর ওপর বলপ্রয়োগ করে তখন বিষয়টিকে নিয়ে মানুষের আগ্রহ বাড়ে এবং মানুষ আলাপ করতে শুরু করে। চ্যাংড়া ইংরেজিতে যাকে বলে ‘বাজ ক্রিয়েট’ হয়। সবচেয়ে অবাক করা বিষয়, সনাতনী শাসকগোষ্ঠী নিজেও বোঝে না তার আইএসএ এবং আরএসএ দিয়ে সেই জনপ্রিয় ধারার কিছু বা কাউকে যখন বাধা প্রদান করে তখন সেই ব্যক্তি বা আধেয়ের দ্বিগুণ প্রচার হয়ে যায়। অর্থাৎ হিতে বিপরীত। তখন শাসকগোষ্ঠীর ভালো করতে গিয়ে বিপত্তি আরও বাড়ে বৈ কমে না। আইনি নোটিশ ও পুলিশি তৎপরতার কারণেই শুধু আলম পরবর্তী সময়ে বিবিসিসহ অন্য আন্তর্জাতিক মাধ্যমের খবর হয়ে উঠলো। বাইরের বিশ্বে এই বার্তাই গেলো, বাংলাদেশে লোকে নিজের মতো করে গলা ছেড়ে গানও গাইতে পারে না, তার গলা চেপে ধরা হয়। একই ঘটনা ঘটলো ‘শনিবার বিকেল’ ছবিটির ক্ষেত্রে। এই ছবির পোস্টার এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বন্যার মতো ছড়িয়ে পড়েছে।

কোনও চলচ্চিত্র রাজনৈতিক বিপ্লব ঘটাতে পারে না। চলচ্চিত্র পাশার দান উল্টে দিতেও সক্ষম নয়। একজন মানুষের বেসুরো গলার অত ক্ষমতা নেই যে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা কাজী নজরুল ইসলামের মতো ব্যক্তিত্বকে খর্ব করে দেবে। আর সবার গলায় কি সুর থাকে? সুর না থাকলে কি গান গাওয়া যাবে না? এই কথাগুলো কে কাকে বোঝাবে?

লেখক: চলচ্চিত্র সমালোচক; বিচারক, ফিপরেস্কি, কান চলচ্চিত্র ৭৫তম উৎসব

/এসএএস/জেএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
এতদিন কোথায় ছিলেন রহিমা?
এতদিন কোথায় ছিলেন রহিমা?
আ.লীগ সব সময় জনগণের ভোটেই ক্ষমতায় আসে: প্রধানমন্ত্রী
আ.লীগ সব সময় জনগণের ভোটেই ক্ষমতায় আসে: প্রধানমন্ত্রী
মহরতে স্মৃতিকাতর প্রযোজক অপু বিশ্বাস (ভিডিও)
মহরতে স্মৃতিকাতর প্রযোজক অপু বিশ্বাস (ভিডিও)
আজ মহালয়া, দেবীপক্ষের শুরু
আজ মহালয়া, দেবীপক্ষের শুরু
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ