X
বুধবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২২
১২ আশ্বিন ১৪২৯

ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ নিয়ে বিএনপি’র রাজনীতি

বিপ্লব বড়ুয়া
১৫ আগস্ট ২০২২, ১১:৩১আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০২২, ১১:৩১

পৃথিবীর ইতিহাসে বর্বরতম আইনগুলোর একটি ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ। শুধু বর্বর বললেও এই আইনের প্রতি উপযুক্ত ঘৃণা প্রকাশ হয় না। কেননা নৃশংস হত্যাকাণ্ড বা অন্য কোনও ঘৃণ্য অপরাধকে আমরা বর্বর বলে থাকি, কিন্তু একটি রাষ্ট্রের স্থপতি, জাতির পিতাকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যার পর যদি আইন করে সে হত্যার বিচার রুদ্ধ করে দেওয়া হয় তাহলে এরূপ আইনকে বিশেষায়িত করতে কী উপযুক্ত শব্দ ব্যবহার করবেন? কী ছিল এই আইনে?

ইতিহাসের ঘৃণ্য ঘাতক জিয়া-মোশতাক খুনিচক্র জাতির পিতার খুনিদের সুরক্ষা দিতে ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর ইতিহাসের ঘৃণিত-বর্বরোচিত কালো আইন ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে। পরবর্তী সংসদে (১৯৭৯) পেশকৃত সংক্ষিপ্ত বিলে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত সামরিক আইন এবং যে সকল বিধি-বিধান জারি করা হয়েছে তা বৈধ বলে উল্লেখ করা হয়। বিলটি সংসদে পেশ করায় সে সময়ের আওয়ামী লীগ নেতা, সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা আসাদুজ্জামান, কর্নেল (অব.) শওকত আলী, সালাউদ্দিন ইউসুফ, মিজানুর রহমান চৌধুরী, মহিউদ্দিন আহমেদ, সুধাংশু শেখর হালদার, রাশেদ মোশাররফ, জাতীয় লীগের আতাউর রহমান খান, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের রাশেদ খান মেনন, দৈনিক সংবাদ সম্পাদক আহমদুল কবীর (স্বতন্ত্র) বিরোধিতা করেন।

মোশতাকের জারি করা ইনডেমনিটি অধ্যাদেশটি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বৈধতা দেওয়া না হলে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল সামরিক আইন প্রত্যাহারের সঙ্গে সঙ্গেই ১৫ আগস্টের খুনিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যেতো। জিয়াউর রহমানই ব্যবস্থা নিতে পারতো। কিন্তু তিনি ব্যবস্থা নেওয়া তো দূরে থাক, ভবিষ্যতে কেউ যাতে ব্যবস্থা না নিতে পারে সে আইনি ব্যবস্থা করে দিলো এবং ওই সময়ে একটি প্রপাগান্ডা ছড়িয়ে গেলো যে, যেহেতু এটি সংবিধানের অংশ হয়ে গেছে এটি আর পরিবর্তন করা যাবে না। এই দোহাই দিয়েই জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পরও বিচারপতি আবদুস সাত্তার, এইচ এম এরশাদ এবং ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এলেও ইনডেমনিটি অধ্যাদেশটি বাতিল বা রহিত করেননি। ফলে দায়মুক্তি পেয়ে আত্মস্বীকৃত খুনিরা ১৫ আগস্টের হত্যার সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা প্রকাশ্যেই বলে বেড়াতো। যা জাতি হিসাবে আমাদের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক ছিল।

জিয়া যদি সত্যি নির্দোষ হয়ে থাকে, তার অবস্থান যদি হত্যা-ক্যু’য়ের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা বদলের বিপক্ষে হয়ে থাকে, সে যদি আইনের শাসনের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে থাকেন, তাহলে তো তার উচিত ছিল খুনিদের আইনের আওতায় আনা। কিন্তু বাস্তবে কী হলো?  সে সেনাপ্রধান হওয়ার এক মাস দুই দিন পর জিয়া- মোশতাক চক্রের মিলিত চক্রান্তে ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর হত্যাকারীদের সুরক্ষার জন্য ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করা হলো। এটা কি বিশ্বাসযোগ্য যে সেনাপ্রধানের গ্রিন সিগন্যাল বা অনুমোদন ও পরামর্শ ছাড়া মোশতাক ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করেছিলো? বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই এই কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারির আদ্যোপান্ত না জানার সুযোগ নিয়ে বিএনপির নেতা-কর্মী-সমর্থক-অনুসারীরা প্রচার করে, খন্দকার মোশতাক ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করেছে, এতে পরবর্তী সময়ে বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের দায় কোথায়? তাই যদি না হবে, তবে কেন জিয়ার শাসনামলে ১৯৭৯ সালের ৯ জুলাই বাংলাদেশ সংবিধানের ৫ম সংশোধনীর পর সংশোধিত আইনে এ আইনটি বাংলাদেশ সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হলো? ভুলে গেলে চলবে না, ১৯৭৬ সালের ১৮ অক্টোবর সামরিক সরকার এক চিঠি দিয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিকে জানায় যেহেতু আওয়ামী লীগের জমাকৃত দলিলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম রয়েছে সেহেতু আওয়ামী লীগ এদেশে রাজনীতি করার অযোগ্য। আমাদের সংবিধানে বঙ্গবন্ধুর মহত্ব নির্ধারিত ছিল। অথচ আওয়ামী লীগের ঘোষণাপত্র থেকেও বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলার এক গভীর চক্রান্ত শুরু করে।

আমরা যদি ইতিহাসের পাতায় ফিরে তাকাই তাহলে দেখতে পাই, আব্রাহাম লিঙ্কনকে হত্যার তিন মাসের কম সময়ের মধ্যে বিচার সম্পন্ন হয়েছিল। ভারতে ইন্ধিরা গান্ধী হত্যাকাণ্ডের চার বছরের কম সময়ের মধ্যে ও মহাত্মা গান্ধীকে হত্যার ২ বছরের কম সময়ের মধ্যে বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর দীর্ঘ ২১ বছর বিচারের বাণী নিরবে নীভৃতে কেঁদেছিল, বিচারহীনতার অপসংস্কৃতি জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেছিল। বিশ্ব সভ্যতায় ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাঙালি জাতির ললাটে এঁকে দিয়েছিল কলঙ্ক তিলক। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচার শুরু করতেই আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে দীর্ঘ ২১ বছর এবং ৩৪ বছর পর কার্যকর হয়েছে রায়।

আইনে একটি প্রচালিত রীতি আছে ‘ When there is a murder you have to point the finger at the beneficiary of the act.’ জিয়াউর রহমানের পরবর্তী কর্মকাণ্ড প্রমাণ করে বঙ্গবন্ধু হত্যার নেপথ্যের কুশীলব ছিল জিয়াউর রহমান।

বঙ্গবন্ধুর খুনিদের আইন, বিচার ও সংবিধানের প্রতি কোনও প্রকার সম্মান ছিল না, সব কিছু ছিল তাদের বন্দুকের নলের মুখে জিম্মি। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোনও কারণে দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে উপ-রাষ্ট্রপতি কিংবা স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। অথচ খন্দকার মোশতাক তো বাণিজ্য মন্ত্রী ছিলেন, উপ-রাষ্ট্রপতি কিংবা স্পিকার ছিলেন না। সে সময় উপ-রাষ্ট্রপতি ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম আর স্পিকার ছিলেন আব্দুল মালেক উকিল। খুনিরা উপ-রাষ্ট্রপতি ও স্পিকারকে রাষ্ট্রপতি না করে সংবিধানকে লঙ্ঘন করে মোশতাককে অবৈধভাবে রাষ্ট্রপতি করলো। একইভাবে ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের ৯ দিন পর সেনাপ্রধান শফিউল্লাহকে সরিয়ে জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধান করা হলো। খুনিদের পছন্দ জেনারেল শফিউল্লাহ নয় কেন? কিংবা সামরিক বাহিনীর অন্য কোনও কর্মকর্তা নয় কেন? জিয়াউর রহমানই কেন খুনিদের পছন্দ? জিয়া উপ-সেনাপ্রধান ছিলেন সেই নিয়মের কারণে? তাহলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে নিয়ম অনুযায়ী উপ-রাষ্ট্রপতি ও স্পিকার নয় কেন?

এমন অসংখ্য প্রশ্ন সামনে চলে আসে। যদি প্রশ্ন করি, ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত করে জিয়া যে অন্যায় করেছে তার অনুসারীরা কি সে অপরাধ অনুধাবন করে? যদি করে, তাহলে ইনডেমনিটি পাসের ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর যেদিন ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ রহিত করার জন্য সংসদে আইন পাস হয়, সেদিন বিএনপি ও জামায়াতের সংসদ সদস্যরা সংসদে অনুপস্থিত ছিল কেন? খুনিদের বাঁচাতে ইনডেমনিটি বাতিলের বিরুদ্ধে ওইদিন হরতাল আহ্বান করেছিলো কেন?

ইনডেমনিটি আইন বাতিলকে চ্যালেঞ্জ করে ১৯৯৭ সালে খুনি শাহরিয়ার রশিদ উচ্চ আদালতে যে রিট দায়ের করেছিলেন সে মামলায় শাহরিয়ার রশিদের আইনজীবী ছিলেন খালেদা জিয়া সরকারের-মন্ত্রী অ্যাডভোকেট কোরবান আলী। এ মামলায় আদালত বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব উদ্দীন আহমেদকে নিরপেক্ষ পরামর্শ দেওয়ার জন্য আদালতের মিত্র তথা অ্যামিকাস কিউরি নিয়োগ দিয়েছিলেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে তিনি ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে বৈধ আইন হিসেবে যুক্তি তুলে ধরেন। তার মানে পরোক্ষভাবে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যাকে তিনি বৈধ মনে করেন। এ থেকেই বোঝা যায় বিএনপি শুধু বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বেনিফিসিয়ারিই নয়– তারা ১৫ আগস্টের মতো নারকীয় গণহত্যার মতো দেশবিরোধী মানবতাবিরোধিতা অপরাধকে রাজনৈতিকভাবে লালন-পালন করে; হত্যার রাজনীতিকে আদর্শ মনে করে। তাই কথায় কথায় ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পুনরাবৃত্তির হুমকি শুনি বিএনপি ও জামায়াত নেতাদের মুখে। এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, ‘১৫ আগস্ট এবং ২১ আগস্ট এগুলো কোনও বিষয় না, এরকম দুর্ঘটনা হতেই পারে। এটা নিয়ে সারাজীবন কান্নাকাটির কী আছে?’ এসব ঘটনা প্রমাণ করে ইনডেমনিটির বিষয়ে জিয়ার অনুসারীদের অবস্থান ও জিয়া পরিবারের অবস্থানের কোনও পরিবর্তন হয়নি। পরবর্তীতে জাতীয় শোক দিবসের দিনে বেগম জিয়ার ভুয়া জন্মদিন পালন সেটাই প্রমাণ করেছে।

সংবিধান লঙ্ঘন করে নিযুক্ত ১৯৭৫ সালের অবৈধ রাষ্ট্রপতির প্রতি জিয়া কেন আনুগত্য প্রকাশ করলো? সেনাপ্রধান হিসাবে সংবিধান সমুন্নত রাখা তার কি দায়িত্ব ছিল না? কোনও সভ্য মানুষ কি ১৫ আগস্টের মতো ঘৃণিত গণহত্যার বিচার চাওয়া যাবে না, এমন পাশবিক চিন্তা পোষণ করতে পারে? ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে সমর্থন করতে পারে? অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় আমাদের দেশে এমন পাশবিক চিন্তার মানুষের সংগঠিত অপশক্তি এখনও সক্রিয়। 

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের তদন্তে যুক্তরাজ্যে যে অনুসন্ধান কমিশন গঠিত হয়েছিল তার সদস্য ব্রিটিশ পার্লামেন্টের এমপি জেফরি টমাস ও তার সহকারিকে ১৯৮১ সালে বাংলাদেশে আসতে বাধা দেয় জিয়াউর রহমান।

এমনকি বিদেশে থাকায় বেঁচে যাওয়া বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যাকে আশ্রয় দেওয়ার কারণে জার্মানিতে নিযুক্ত তৎকালীন রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীকে ওএসডি করা হয়।

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর তার কন্যাদের দেশে আসতে দেয়নি জিয়াউর রহমান। বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানার মেয়াদ উত্তীর্ণ পাসপোর্ট যাতে নবায়ন করা না হয় তার জন্য লন্ডন দূতাবাসকে অফিসিয়ালি নির্দেশ দেওয়া হয়। জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনার পাসপোর্ট নবায়ন করায় ভারতে নিযুক্ত সেই সময়ের রাষ্ট্রদূতকে চাকরিচ্যুত করা হয়।

রাষ্ট্রপতি হিসেবে মোশতাকের দায়িত্ব গ্রহণ ছিল সংবিধান লঙ্ঘন। কাজেই সংবিধান লঙ্ঘন করে জোর করে রাষ্ট্রপতি বনে যাওয়া অবৈধ রাষ্ট্রপতি মোশতাক কর্তৃক খুনিদের বাঁচানোর জন্য ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি ছিল সম্পূর্ণ বেআইনি। রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশের মাধ্যমে ইচ্ছাখুশি যে কোনও বিধান জারি করতে পারেন না। সংবিধানের ৯৩(১) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ প্রণয়নের ক্ষমতা বিষয়ে বলা হয়েছে, ‘সংসদ ভাঙ্গিয়া যাওয়া অবস্থায় অথবা উহার অধিবেশনকাল ব্যতীত, কোন সময়ে রাষ্ট্রপতির নিকট আশু ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি বিদ্যমান রহিয়াছে বলিয়া সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হইলে তিনি উক্ত পরিস্থিতিতে যেরূপ প্রয়োজনীয় বলিয়া মনে করিবেন, সেইরূপ অধ্যাদেশ প্রণয়ন ও জারী করিতে পারিবেন এবং জারী হইবার সময় হইতে অনুরূপভাবে প্রণীত অধ্যাদেশ সংসদের আইনের ন্যায় ক্ষমতাসম্পন্ন হইবেঃ তবে শর্ত থাকে যে, এই দফার অধীন কোন অধ্যাদেশে এমন কোন বিধান করা হইবে না, (ক) যাহা এই সংবিধানের অধীন সংসদের আইন-দ্বারা আইনসঙ্গতভাবে করা যায় না’। কোন বিধান সংসদের আইন-দ্বারা আইনসঙ্গতভাবে করা যায় না সে বিষয়ে সংবিধানের ৭ ও ২৬ অনুচ্ছেদে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত আছে। ৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনও আইন যদি সংবিধানের সাথে অসামঞ্জস্য হয়, তাহলে সে আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হবে। অন্যদিকে, ২৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সংবিধানে বর্ণিত মৌলিক অধিকারের সাথে অসামঞ্জস্য আইন বাতিল। ২৬(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্র সংবিধানের মৌলিক অধিকারের সাথে অসামঞ্জস্য কোনও আইন প্রণয়ন করবেন না এবং অনুরূপ কোনও আইন প্রণীত হলে তা মৌলিক অধিকারের কোনও বিধানের সাথে যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হয়ে যাবে।

বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর সামরিক আইন জারি করে খুনিচক্র। তারপরও যেহেতু সংবিধানকে বাতিল করা হয়নি সেহেতু সংবিধানের প্রদত্ত মৌলিক অধিকারগুলো বিদ্যমান ছিল। সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে মৌলিক অধিকার হিসেবে প্রত্যেকের আইনের আশ্রয়লাভ নিশ্চিত করা হয়েছে, সে বিধানগুলো তখনও বলবৎ ছিল। ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে প্রদত্ত মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী হওয়ায় তা শুরু থেকেই স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বাতিল ছিল। অন্যদিকে, বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনায়, রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হিসেবে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং সুবিচার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ সংবিধানে বর্ণিত আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার লাভের নিশ্চয়তার সঙ্গে সুস্পষ্টভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিধায় সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী শুরু থেকেই অসাংবিধানিক ও বাতিল ছিল। খুনি মোশতাকের অসাংবিধানিকভাবে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা দখল করায় সে ছিল অবৈধ রাষ্ট্রপতি। একজন অবৈধ রাষ্ট্রপতি কর্তৃক জারিকৃত সংবিধানবিরোধী অধ্যাদেশ ছিল আইনের ভাষায় অস্তিত্বহীন ও অবৈধ। বিএনপি নেতারা বলে থাকে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ মোশতাক জারি করেছে, এখানে জিয়াকে জড়ানো ইতিহাস বিকৃতি। প্রশ্ন হলো, মোশতাক খুনের সহযোগী ছিল তাই ইনডেমনিটি দরকার ছিল খুনিদের ও প্রকারান্তরে নিজেকে বাঁচানোর জন্য। কিন্তু সামরিক আইনের আওতায় এই অবৈধ অধ্যাদেশকে জোর করে বহাল রাখা হলেও ১৯৭৯ সালে সামরিক আইন প্রত্যাহারের সঙ্গে সঙ্গেই অধ্যাদেশটি কার্যকারিতা হারায়। সে সময়ের রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ইচ্ছা করলে ১৫ আগস্টের খুনিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে পারতো। কিন্তু জিয়া খুনিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দূরে থাক, অন্য কেউ যাতে ব্যবস্থা নিতে না পারে সেজন্য দায়মুক্তিকে আরও পাকাপোক্ত করতে অস্তিত্বহীন, অবৈধ অধ্যাদেশকে সংসদে আইনের মর্যাদা দেয়। পরবর্তীতে সংবিধানের ৫ম সংশোধনীর মাধ্যমে মানবতা, মানবাধিকার, সভ্যতা, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচাবিরোধী এই ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে জিয়া সংবিধানের অংশে পরিণত করে অনেক ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত পবিত্র সংবিধানকে কলংকিত করে। জিয়া কেন, কার স্বার্থে অবৈধ রাষ্ট্রপতির অবৈধ আইন যা অসাংবিধানিক ও আইনের ভাষায় অস্তিত্বহীন ছিল, যা সামরিক আইন প্রত্যাহারের সঙ্গে সঙ্গে অকার্যকর হয়ে গিয়েছিল, সেই আইনকে সংসদে নিয়ে সংসদের আইনের মর্যাদা দিলো ও পরে তা সংবিধানের ৫ম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের অংশে পরিণত করলো? খুনিদের বাঁচাতে হত্যার বিচার চাওয়ার পথ সাংবিধানিকভাবে রুদ্ধ করতে কী স্বার্থ ছিল জিয়ার? কী দায়বদ্ধতার কারণে যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও জিয়া খুনিদের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিলো? কী কারণে খুনিদের প্রতি জিয়ার এ ভালোবাসা, সহানুভূতি? অবশ্য খুনিদের জবানবন্দীতে বলা হয়েছে-বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডে জিয়াই মাস্টার মাইন্ড।

পঞ্চম সংশোধনীকে বৈধতা না দিলে জিয়াউর রহমানের আমলে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার করা যেত কিন্তু জিয়াউর রহমান তা করেনি। এই সামরিক জান্তা বরং খুনিদের সুবিধা দিয়ে বিদেশে চাকরি দিয়েছিলো। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিচারপতি আবদুস সাত্তার, এইচ এম এরশাদ এবং ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এলেও ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল বা রহিত করা হয়নি। ফলে দায়মুক্তি পেয়ে খুনিরা হত্যার কথা গৌরবের সাথে প্রকাশ্যে বলে বেড়াতো।

বাংলাদেশে মোট তিনবার এধরনের ইনডেমনিটি আইন পাস করা হয়, যার দুইবারই জিয়া ও বেগম জিয়ার পাপ মোচনের হাতিয়ার। ২০১০ সালে এসব অধ্যাদেশকে দেশের উচ্চ আদালতে অবৈধ ঘোষণা করা হয়। এ ইনডেমনিটি ছিল এমন একটি আইন যা ইতিহাসে অত্যন্ত লজ্জাজনক। বঙ্গবন্ধু ছাড়াও আব্রাহাম লিংকন, মহাত্মা গান্ধী, রাজিব গান্ধী, ইন্দিরা গান্ধী, বেনজির ভুট্টো, বন্দর নায়েককে গুলি করে হত্যা করা হলেও সেসব দেশে ইনডেমনিটি আইন জারি করা হয়নি কিন্তু বাংলাদেশে এমনটি করা হয়েছিল।

পৃথিবীর কোনও সংবিধানে লেখা নেই যে, খুনিদের বিচার করা যাবে না। বাংলাদেশেই প্রথম ঘটেছিল এমনকি বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর ২০ বছর পার হলেও কোনও রাষ্ট্রপতি বা সরকারপ্রধান সেটি বাতিল না করে উল্টো নিজেদের সুবিধা নেওয়ার জন্য ইনডেমনিটি বহাল রাখে। মানুষ কতটা নিকৃষ্ট মনের হলে, আক্রোশ পরায়ণ হলে ১৫ আগস্টের মতো বর্বরোচিত গণহত্যাকে সমর্থন করতে পারে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে সমর্থন করতে পারে!

যদি ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ৩২ নম্বরে থাকতেন কিংবা জাতির পিতার প্রতি কিছু কৃতঘ্ন বাঙালির বিশ্বাসঘাতকতার অভিমানে রাজনীতি থেকে দূরে সরে যেতেন, তাহলে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ আজও কি সংবিধানের অংশ হয়ে থাকতো না? জাতির পিতাকে হত্যা করে হত্যার বিচারের পথ আইন করে রুদ্ধ করে দেওয়ার কলঙ্কের দায় আজও কি আমাদের বয়ে বেড়াতে হতো না?

 

লেখক: ব্যারিস্টার; দপ্তর সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
আমরা এখন সস্তা বিনোদন খুঁজি: নওয়াজুদ্দিন
আমরা এখন সস্তা বিনোদন খুঁজি: নওয়াজুদ্দিন
শেখ হাসিনার ৭৬তম জন্মদিন আজ
শেখ হাসিনার ৭৬তম জন্মদিন আজ
মহান পিতার সুযোগ্য কন্যা
মহান পিতার সুযোগ্য কন্যা
দুবাইয়ে সিরিজ জয় বাংলাদেশের
দুবাইয়ে সিরিজ জয় বাংলাদেশের
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ