X
শুক্রবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২৩
১৩ মাঘ ১৪২৯

ব্যাংকে ‘স্টুডেন্ট ফাইল’ বন্ধে হুন্ডি ব্যবসা বাড়তে পারে

সালেক উদ্দিন
১৯ নভেম্বর ২০২২, ১৮:৩৩আপডেট : ১৯ নভেম্বর ২০২২, ১৮:৩৩

দেশের প্রায় অধিকাংশ বাণিজ্যিক ব্যাংক এখন বিদেশে উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী শিক্ষার্থীদের জন্য ‘স্টুডেন্ট ফাইল’ খুলছে না। কারণ হিসেবে তার বলছেন ব্যাংকে ডলার সংকট। শিক্ষার্থীরা যারা উচ্চশিক্ষার উদ্দেশে বিদেশ যাচ্ছে তাদের বাণিজ্যিক ব্যাংকে স্টুডেন্ট ফাইল খুলতে হয়। যার মাধ্যমে অভিভাবকরা সহজেই শিক্ষার্থীদের ভর্তি ফি, টিউশন ফি, আবাসন ফি সহ অন্যান্য খরচ পাঠাতে পারেন। প্রতি বছরের মতো এবছরও প্রায় ৫০ হাজার শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এদের মধ্যে যারা ইতোমধ্যে চলে গেছে এবং স্টুডেন্ট ফাইল খোলা হয়ে গেছে তাদের ভাগ্যবান বলতে হয়।

সব সময়ের মতোই এ বছরও ব্যাংকের বিভিন্ন বাৎসরিক টার্গেট যথা- আমানত সংগ্রহ, ঋণ প্রদান, ক্রেডিট কার্ড ইত্যাদির মতো স্টুডেন্ট ফাইল খোলাও ব্যাংক কর্মকর্তাদের জন্য একটি পারফরমেন্স টার্গেট রয়েছে। অতি সহজে স্টুডেন্ট ফাইল খোলার জন্য ব্যাংকগুলো ‘স্টুডেন্ট সেন্টার’ও স্থাপন করেছে যা এখনও আছে। তবে এখন এসব সেন্টারের কার্যক্রম নেই বললেই চলে।

উন্নত বিশ্বের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মেধা তালিকায় ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও শিক্ষার্থীদের ব্যয় বহনের জন্য স্টুডেন্ট ফাইল খোলার জন্য অভিভাবকরা সংকটে পড়ে গেছেন। দু’ একটি ব্যাংক ছাড়া প্রায় সব ব্যাংকই বিশেষ করে বেসরকারি ব্যাংকগুলো স্টুডেন্ট ফাইল খুলছে না। বিষয়টি জাতীয় দৈনিক এসেছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর দু’ একটি টকশোর বিষয়বস্তু হিসেবেও আলোচনা হচ্ছে।

আমার নিজের কথাই বলি। আমার ছোট মেয়েটি কানাডার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কলারশিপ সহ ভর্তির সুযোগ পেয়েছে। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকেই তার ক্লাস শুরু হবে। ফলে ডিসেম্বরেই তাকে উড়াল দিতে হবে কানাডার উদ্দেশে। তার আবাসনের খরচ পাঠানোর উদ্দেশ্যে স্টুডেন্ট ফাইল খোলা অপরিহার্য হয়ে পড়ায় আমাকে বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংকে যেতে হয়েছিল। সবারই একই কথা– ব্যাংকে ডলার সংকট, স্টুডেন্ট ফাইল খোলা সম্ভব নয়।

কেউ কেউ বলেছেন স্টুডেন্ট ফাইল খোলা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে নিষেধ করে দেওয়া হয়েছে। তাহলে কি আমাদের ছেলেমেয়েরা সুযোগ পেয়েও বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে যেতে পারবে না? এমন প্রশ্নের জবাবে ব্যাংক ব্যবস্থাপকদের বাকহীন থাকতে দেখেছি।

নিজে ব্যাংকার ছিলাম বলেই হয়তো এত বাধার পরেও আমার মেয়েটির জন্য শেষ পর্যন্ত স্টুডেন্ট ফাইল খুলতে পেরেছি। ভাবতে বাধ্য হয়েছি কয়জন অভিভাবকের পক্ষে সম্ভব এত ‘ধরাধরি’ করে ‘স্টুডেন্ট ফাইল’ নামের এই সোনার হরিণ একাউন্ট খুলতে পারা?

একটি পত্রিকা সম্প্রতি তাদের অনুসন্ধানী রিপোর্টে উল্লেখ করেছে– যেসব বেসরকারি ব্যাংক অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদেশগামী শিক্ষার্থীদের ফাইল খুলতো, সম্প্রতি তারা আর স্টুডেন্ট ফাইল খুলছে না। কিছু ব্যাংক এখনও চালু রাখলেও প্রভাবশালীদের তদবির লাগছে। এইসব ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সাথে পত্রিকাটির প্রতিবেদক যোগাযোগ করলে ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের অনেকের বক্তব্যের সারকথা হলো, অক্টোবর মাসের শেষ দিক থেকে তারা স্টুডেন্ট ফাইল খোলা বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। একটি স্টুডেন্ট ফাইল খুললে তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত প্রতিমাসে নিয়মিত ডলার পাঠাতে হয়। দেশে এখন ডলারের তীব্র সংকট চলছে। এ কারণে আপাতত নতুন ফাইল খোলা সম্ভব হচ্ছে না।

বিভিন্ন ব্যাংকের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে পত্রিকাটি দেখেছে যে, উচ্চ শিক্ষার্থে বিদেশ যাওয়া একজন ছাত্রের প্রতিবছর ৫০ থেকে ৬০ হাজার ডলার পাঠাতে হয়। স্টুডেন্ট ফাইল খোলার দিক থেকে সামনের সারিতে থাকা ব্যাংকগুলোর বছরে দুই থেকে তিন কোটি ডলার পর্যন্ত বিদেশে পাঠাতে হচ্ছে। ডলার সংকটের কারণে ব্যাংক নতুন করে নিজেদের বৈদেশিক মুদ্রার দায় বাড়াতে চাচ্ছে না বলেই তারা স্টুডেন্ট ফাইল খোলা বন্ধ করে দিয়েছে।

প্রশ্ন হলো বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো যদি স্টুডেন্ট ফাইল না খোলে তবে কি অভিভাবকদের ব্যাংকিং চ্যানেল বাদ দিয়ে বিকল্প চ্যানেল হিসেবে ‘হুন্ডি’র মাধ্যমে টাকা পাঠানোর ব্যবস্থা নিতে হবে?  অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে তাই। যদি তাই হয় তবে আমাদের জন্য যে আরেকটি আত্মঘাতী পথ উন্মোচিত হবে তা সম্ভবত বলার অপেক্ষা রাখে না। আমাদের মতো একটি জাতির জন্য হুন্ডি এমন একটি মারাত্মক ব্যাধি যে এর অবারিত প্রসার লাভ করলে দেশের অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়বে।

দেশের আজকের যে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট দেখা দিয়েছে এর জন্য যে কারণগুলো দায়ী তার অন্যতম একটি হলো হুন্ডি। হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচার হচ্ছে। রাষ্ট্র রাজস্ব হারাচ্ছে।

আমার মতো ক্ষুদ্র মস্তিষ্কের মানুষ যদি এটা বুঝে তবে দেশের সরকার কি সেটা বুঝে না! অবশ্যই বোঝে এবং যার জন্য হুন্ডি ব্যবসায় রোধের জন্য বিভিন্ন রকমের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সরকার।

দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীরা যারা বিশ্বের বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির সুযোগ পেয়েও স্টুডেন্ট ফাইল না খোলার কারণে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি তারাই কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আগামী দিনের দেশের হাল ধরবে। তাদের অর্জিত জ্ঞানের আলোকেই একদিন এই দেশ পরিচালিত হবে। আমরা যারা বাংলাদেশকে উন্নত বিশ্বের মতো একটি দেশ বানানোর স্বপ্ন দেখি তাদের সেই স্বপ্ন পূরণে সহায়ক হবে এরাই।

বর্তমান ব্যবস্থা চালু থাকলে এদের মধ্যে খুব কম সংখ্যক শিক্ষার্থীই আমাদের দেশীয় রীতি অনুযায়ী বিভিন্নভাবে চেষ্টা তদ্বির করে স্টুডেন্ট ফাইল খুলতে পারবে আর বাকিরা হুন্ডির শরণাপন্ন হবে।

সরকার অনেক কঠিন আইন করে হুন্ডি বন্ধ করতে পারেনি। এর প্রধানতম কারণ হলো আইনের বাস্তবায়ন না থাকা। অবৈধ রাষ্ট্রবিরোধী এই হুন্ডি ব্যবসা যারা পরিচালনা করে তারা একেকজন রাঘববোয়াল। তাদের ধরা ছোঁয়া এত সোজা না এবং যারা হুন্ডির মাধ্যমে দেশ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা পাচার করে তাদের কিছু করাও এত সোজা না। আর করবেটাই বা কে? তারাই তো সব। তারা দেশের কর্ণধার, অসৎ ব্যবসায়ী, অসৎ রাজনৈতিক নেতা, অসৎ এমপি-মন্ত্রী ও আমলা। এদের আটকাবে কে! যাদের আটকানোর কথা তারা কি এদের বাইরে?

তাই যদি না হবে তবে সুইস ব্যাংকে এ দেশ থেকে যে ৮ হাজার কোটি টাকা চলে গেছে তা বন্ধ করা গেলো না কেন? এই টাকা তো একদিনে যায়নি? বা এখনও যে যাচ্ছে তাই বা বন্ধ করা যাচ্ছে না কেন?

১৬ জুন ২০২২ এ প্রকাশিত একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে এসেছে, ২০২০ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমার পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ২০৩ কোটি টাকা। সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে মাত্র বারো মাসে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণে বাংলাদেশিদের অর্থ জমা হয়েছে। এর সিংহভাগ টাকাই যে হুন্ডির মাধ্যমে পাচার হয়েছে তা অতি সহজেই অনুমেয়। এই টাকা ব্যাংকিং চ্যানেলে যাওয়ার সম্ভব নয়।

শুধু তাই নয় কানাডার বেগম পাড়ার অনেক গল্প পত্রপত্রিকায় পড়েছি। এই বেগম পাড়া যে টাকায় গড়ে উঠেছে সেটাই-বা এদেশ থেকে গেলো কীভাবে? মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম করে যারা আছেন তাদের টাকা যে এদেশ থেকেই হুন্ডির মাধ্যমে যাচ্ছে তা কি বলার অপেক্ষা রাখে!

পত্রপত্রিকায় এবং বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে বহুবার বহু প্রতিবেদনে এসেছে যে যারা হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠাচ্ছে তারা এদেশের সর্বোচ্চ প্রভাবশালীদের অন্তর্ভুক্ত এবং সর্বোচ্চ প্রভাবশালীদের আর্শিবাদ পুষ্ট।

সরকার ইতোমধ্যেই হুন্ডি ব্যবসা রোধের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার বাড়াতে হলে এসব পদক্ষেপ অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে। এর জন্য যত কঠিন হওয়া প্রয়োজন তত কঠিনই হতে হবে। এই একটি পদক্ষেপ যদি শতভাগ বাস্তবায়ন হয় তবে বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার আকাশচুম্বী না হলেও স্থিতিশীলতার মধ্যে আসবে যা এই মুহূর্তে বেশি প্রয়োজন। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ সৃষ্টির জন্য স্টুডেন্ট ফাইল খোলার জন্য ব্যাংকের যেটুকু বৈদেশিক মুদ্রা প্রয়োজন তার অভাব হবে না। হুন্ডি ব্যবসার দ্বার খুলে রেখে স্টুডেন্ট ফাইলের মতো অপরিহার্য একটি পথ রোধের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা বাঁচানো পদক্ষেপ মোটেই সঠিক নয় বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

সবশেষে যে কথাটি বলতে চাই তা হলো, বিদেশে উন্নত শিক্ষার আলোয় আলোকিত হতে যাওয়া শিক্ষার্থীরা শুরুতেই হুন্ডির মতো একটি অশিক্ষার যাঁতাকলে আর না পড়ুক সেটাই প্রত্যাশা।

লেখক: কথাসাহিত্যিক
   

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
জ্যাকুলিনের ঘরে জোড়া সুখবর
জ্যাকুলিনের ঘরে জোড়া সুখবর
কুমিল্লা ক্রিকেট কমিটির সভাপতির পদত্যাগ
কুমিল্লা ক্রিকেট কমিটির সভাপতির পদত্যাগ
রাজধানীতে অভিযান চালিয়ে ৭০ জনকে গ্রেফতার
রাজধানীতে অভিযান চালিয়ে ৭০ জনকে গ্রেফতার
সলঙ্গার হাটের চিত্র বদলালেও বিলেতি পণ্য বর্জনকারীদের স্মৃতিস্তম্ভ বসেনি
সলঙ্গার হাটের চিত্র বদলালেও বিলেতি পণ্য বর্জনকারীদের স্মৃতিস্তম্ভ বসেনি
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ