X
শনিবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৪
২৯ চৈত্র ১৪৩০

তারকাদের মনোনয়ন মানেই কি বিজয় নিশ্চিত?

আমীন আল রশীদ
২৮ নভেম্বর ২০২৩, ১৭:৫২আপডেট : ২৮ নভেম্বর ২০২৩, ১৭:৫২

সোশ্যাল মিডিয়ায় নানারকম বিরূপ প্রতিক্রিয়া হলেও আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাগুরা-১ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন ক্রিকেট তারকা সাকিব আল হাসান। আর ঢাকা-১০ আসন থেকে নৌকার টিকিট পেয়েছেন চিত্রনায়ক ফেরদৌস।

প্রসঙ্গত, এবার চিত্রনায়ক রুবেল, রিয়াজ, অভিনয়শিল্পী ডিপজল, রোকেয়া প্রাচী, শাকিল খান, মাহিয়া মাহি, সিদ্দিকুর রহমানও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েছিলেন। কিন্তু বিনোদন দুনিয়ার তারকাদের মধ্যে নায়ক ফেরদৌস ছাড়া আর কারও ভাগ্যের শিঁকে ছেঁড়েনি।

বর্তমান সংসদেও বেশ কয়েকজন তারকা আছেন। যেমন প্রখ্যাত অভিনেতা আসাদুজ্জামান নূর প্রথমবার মনোনয়ন পেয়েছিলেন তারকা হিসেবেই। এরপরে একাধিকবার তিনি নির্বাচিত হয়েছেন। ফলে তিনি এখন আর শুধু তারকাই নন, পুরোদস্তুর রাজনীতিবিদ। এবারও তিনি নীলফামারী-২ আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন।

বর্তমান সংসদে আছেন বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব মাশরাফি বিন মুর্তজা (নড়াইল-২)। এবারও তিনি মনোনয়ন পেয়েছেন।

প্রখ্যাত লোকসংগীতশিল্পী মমতাজ (মানিকগঞ্জ-২) এবারও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন। তবে এবার বাদ পড়েছেন সাবেক তারকা ক্রিকেটার নাঈমুর রহমান দুর্জয় (মানিকগঞ্জ-১)।

ঢাকা-১৭ আসনেও একজন তারকা এমপি ছিলেন। চিত্রনায়ক আকবর পাঠান ফারুক। তার মৃত্যুতে আসনটি শূন্য হলে মোহাম্মদ এ আরাফত উপনির্বাচনে জয়ী হন। এবারও তিনি এই আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন।

তারকা ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত সেলিমা আহমাদ (কুমিল্লা-২), প্রখ্যাত চিকিৎসক প্রাণ গোপাল দত্ত (কুমিল্লা-৭), সিনিয়র সাংবাদিক মুহাম্মদ শফিকুর রহমান ( চাঁদপুর-৪) এবারও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন।

বর্তমান সংসদে আরও একজন খ্যাতিমান তারকা আছেন। সুবর্ণা মুস্তাফা। তিনি সংরক্ষিত মহিলা আসন-৪-এর সংসদ সদস্য।

খ্যাতিমান মানবাধিকার কর্মী আরমা দত্তও মহিলা আসনের সদস্য। এবার নতুন সংসদ গঠনের পরে তারা পুনরায় মনোনীত হবেন নাকি নতুন কোনও তারকার জায়গা হবে—সেটি এখনই বলা মুশকিল।

বস্তুত ক্রীড়া ও বিনোদন দুনিয়ার তারকাদের সংসদ সদস্য হওয়া নতুন কিছু নয়। ভারতেও এই চর্চা আছে। পার্থক্য হলো ভারতের সংসদ দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। সেখানে নন-পলিটিক্যাল তারকাদের সংসদে নিয়ে আসা যত সহজ, বাংলাদেশে এককক্ষবিশিষ্ট সংসদে সে তুলনায় অনেক কঠিন। কারণ, এখানে যারা আসনভিত্তিক রাজনীতি করেন; বছরের পর বছর ধরে দলের জন্য কাজ করেন, ত্যাগ স্বীকার করেন, জেল খাটেন, পুলিশি হয়রানির হাত থেকে বাঁচতে পালিয়ে বেড়ান, পরিবার-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকেন—সেরকম কোনও নেতাকে বাদ দিয়ে যদি শুধু তারকা পরিচয়ে কাউকে মনোনয়ন দেওয়া হয়, তাহলে ওই ত্যাগী রাজনীতিবিদরা বঞ্চিত হন। রাজনীতিতে আসার ব্যাপারে মানুষের আগ্রহ কমে যায়।

শুধু বিনোদন দুনিয়ার তারকা নন, অবসরপ্রাপ্ত আমলা, পুলিশ বা সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তার মতো নানাবিধ পেশার মানুষও যখন মাঠের রাজনীতিবিদদের টপকে মনোনয়ন পেয়ে যান—যাদের সঙ্গে মূলত দলের নেতাকর্মী এবং নির্বাচনি এলাকার মানুষের সেরকম সংযোগ নেই—তখন এটিও দলের ভেতরে অসন্তোষ তৈরি করে। দলের জন্য কাজ করতে নেতাকর্মীরা নিরুৎসাহিত হন। কেননা, তারা দেখতে পান সারা বছর দলের জন্য কাজ করলেও তার ফল ভোগ করছেন অন্য কেউ।

এসব কারণে সংসদের মূল তিনশ’ আসনে কোনও নন-পলিটিক্যাল লোককে মনোনয়ন দেওয়া উচিত নয়। আবার এটিও ঠিক যে ক্রীড়া ও বিনোদন দুনিয়ার তারকা, শিক্ষক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, লেখক, অবসরপ্রাপ্ত আমলা, পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তাদের মধ্যে যারা সংসদে যেতে আগ্রহী কিংবা যাদের জ্ঞান-দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার দ্বারা সংসদ উপকৃত হতে পারে—সেরকম মানুষের জন্যও সংসদে জায়গা রাখা দরকার। এজন্য সংসদ দ্বিকক্ষবিশিষ্ট করা যায়। তখন উচ্চকক্ষের আসনগুলোর মধ্যে একটি বড় অংশ এসব তারকা, বুদ্ধিজীবী এবং অবসরপ্রাপ্ত অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের জন্য সংরক্ষিত রাখা যাবে। তখন রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে তাদের কোনও ক্ল্যাশ বা সংঘাত তৈরি হবে না। দলের ভেতরে মনোনয়ন বঞ্চনা নিয়ে ক্ষোভ তৈরি হবে না।

স্মরণ করা যেতে পারে, আগামী নির্বাচনে লড়তে সাকিব আল হাসান ঢাকার একটি এবং মাগুরার দুটি আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপত্র কেনার পরে এ নিয়ে মাগুরাবাসীর মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। অনেকেই এই ঘটনাকে রাজনীতিতে সাকিবের ‘উড়ে এসে জুড়ে বসা’ বলে মন্তব্য করেন। মাগুরা জেলা যুবলীগের আহ্বায়ক ফজলুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সাকিব আল হাসানের সঙ্গে আওয়ামী লীগের কোনও সম্পর্ক নেই। তার পরিবারের কেউ আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নন। মাগুরার কোনও আসনে সাকিব আল হাসানের মনোনয়ন চাওয়ার বিষয়টি হাস্যকর।’ (বাংলা ট্রিবিউন, ২০ নভেম্বর ২০২৩)।

শুধু মাগুরার স্থানীয় রাজনীতিতেই নয়, সোশ্যাল মিডিয়ায়ও সাকিবের নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ড উল্লেখ করে তাকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক ফেসবুকে লিখেছেন: ‘মাশরাফি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়ার পরে সারা দেশের মানুষ উচ্ছ্বসিত হয়েছিল। অথচ সাকিব যাতে মনোনয়ন না পান, সেজন্য অসংখ্য মানুষ দাবি জানাচ্ছেন।’ কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার এসব প্রতিক্রিয়া আমলে না নিয়ে আওয়ামী লীগ থেকে সাকিব আল হাসানকে মনোনয়ন দেওয়া হলো।

প্রশ্ন হলো, আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়া মানেই কি সংসদ সদস্য হওয়া নিশ্চিত?

যেহেতু বিএনপি নির্বাচনে আসছে না, অতএব এবার জাতীয় পার্টি এককভাবে তিনশ’ আসনে হয়তো প্রার্থী দেবে। অর্থাৎ আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট করবে না। তবে জাসদ এবং বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি হয়তো শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নৌকা প্রতীকেই ভোট করবে। ফলে ২৯৮টি আসনে (কুষ্টিয়া-২ এবং নারায়ণগঞ্জ-৫ বাদে) আওয়ামী লীগ প্রার্থী ঘোষণা করলেও শেষ পর্যন্ত হয়তো শরিক দলের জন্য আরও কিছু আসন ছেড়ে দেবে।

প্রসঙ্গত, কুষ্টিয়া-২ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য জাসদের হাসানুল হক ইনু। সম্প্রতি তার দল তিনশ’ আসনে তাদের প্রার্থী ঘোষণা করেছে। শেষ পর্যন্ত তারা যে এককভাবে তিনশ’ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে না বরং আওয়ামী লীগের সঙ্গেই জোটবদ্ধ হয়ে থাকবে সে ব্যাপারে সন্দেহ কম। কেননা, এককভাবে ভোট করলে তাদের প্রার্থীরা নৌকা প্রতীকের কাছে বিপুল ভোটে হারবেন। কিন্তু আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট করলে কয়েকটা আসন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের বর্তমান এমপি আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা শামীম ওসমানের ভাই সেলিম ওসমান। যিনি গতবার জয়ী হয়েছেন জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে। ফলে এই আসনটির ব্যাপারে আওয়ামী লীগের যে চিন্তা বা সিদ্ধান্ত, সেটি হয়তো এখনই জানাতে চায় না।

আবার যে ২৯৮টি আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে যাদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে, তাদের অনেকে হয়তো বাদ পড়বেন জোটবদ্ধ দলগুলোর সঙ্গে আসন ভাগাভাগির রাজনীতিতে।

আভাস পাওয়া যাচ্ছে, এবার দলীয় প্রার্থী থাকলেও দলের অন্য কোনও নেতা যদি কোনও আসন থেকে প্রার্থী হতে চান, তাদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ কোনও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেবে না। এর একটি কারণ দলীয় প্রার্থীদের যোগ্যতার পরীক্ষা এবং সেইসাথে বেশি পরিমাণে ভোটার টানা। প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেশি হলে ভোটার বাড়বে—এই চিন্তাটি আওয়ামী লীগের মধ্যে আছে। ফলে এবার হয়তো আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতা স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করে জিতে যাবেন। তাতে একাধিক বর্তমান এমপিও বাদ পড়ে যেতে পারেন।

আবার এমনও হতে পারে, তারকা বিবেচনায় যাদের মনোনয়ন দেওয়া হলো, তাদের আসনেও যদি আওয়ামী লীগের কোনও শক্তিশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়ে যান এবং ভোট যদি সুষ্ঠু হয়—তাহলে সেই তারকারাও হেরে যেতে পারেন। অর্থাৎ আগের দুটি নির্বাচনে ব্যাপারটা যেমন ছিল যে নৌকা প্রতীক পাওয়া মানেই সংসদ সদস্য হওয়া নিশ্চিত—এবার সব আসনে সেই ঘটনাটি হয়তো ঘটবে না। এবার অনেক আসনেই নৌকাকে আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সঙ্গে লড়াই করতে হতে পারে। অতএব, মাঠের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপিকে ছাড়াই যদি এবারের নির্বাচনটি হয়, তারপরও ভোট একতরফা বা নিরুত্তাপ হবে না।

লেখক: কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর, নেক্সাস টেলিভিশন।

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
চায়ের দোকানে আ.লীগ ও যুবলীগের দুই নেতাকে গুলি
চায়ের দোকানে আ.লীগ ও যুবলীগের দুই নেতাকে গুলি
সৈকতে জনসমুদ্র!
সৈকতে জনসমুদ্র!
তলানিতে থাকা দিল্লির কাছে থামলো লখনউর জয়যাত্রা
তলানিতে থাকা দিল্লির কাছে থামলো লখনউর জয়যাত্রা
নি‌ষেধাজ্ঞা স্থ‌গিত, বান্দরবা‌নের রুমায় ঘুরতে যেতে বাধা নেই
নি‌ষেধাজ্ঞা স্থ‌গিত, বান্দরবা‌নের রুমায় ঘুরতে যেতে বাধা নেই
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ