X
বুধবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৪
৩ বৈশাখ ১৪৩১

‘আশ্চর্যজনক সুযোগ’ কি কাজে লাগাতে পারবেন ডা. সামন্ত লাল সেন?

আমীন আল রশীদ
১২ জানুয়ারি ২০২৪, ২২:০৭আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০২৪, ২২:০৭

রাজধানীর বাড্ডায় ইউনাইটেড মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে খতনা করাতে গিয়ে যেদিন আয়ান নামে ৫ বছরের এক শিশুর মৃত্যু হলো, তার দুদিন পরেই নতুন সরকারের মন্ত্রিসভায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে নাম আসে প্রখ্যাত চিকিৎসক ডা. সামন্ত লাল সেনের। স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার এই ঘটনাকে তিনি ‘আশ্চর্যজনক সুযোগ’ বলে মন্তব্য করেছেন। প্রশ্ন হলো, এই সুযোগ তিনি কীভাবে কাজে লাগবেন বা আদৌ কাজে লাগাতে পারবেন কি না?

তার আগে শিশু আয়ানের ‍মৃত্যুর খবরে চোখ বুলানো যাক। গণমাধ্যমের খবর বলছে, গত ৩১ ডিসেম্বর সুন্নতে খতনা করানোর জন্য আয়ান নামে ওই শিশুকে রাজধানীর সাঁতারকুল বাড্ডার ইউনাইটেড মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান অভিভাবকরা। সেখানে অভিভাবকদের অনুমতি ছাড়াই তাকে ফুল অ্যানেস্থেশিয়া (জেনারেল) দিয়ে সুন্নতে খাতনা করান চিকিৎসক। খতনা শেষ হওয়ার পর আয়ানের জ্ঞান না ফেরায় তাকে সেখান থেকে পাঠানো হয় গুলশান-২ এর ইউনাইটেড হাসপাতালে। সেখানে পিআইসিইউতে (শিশু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। এর সাতদিন পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। শুধু তাই নয়, প্রথমে ১০ হাজার টাকার প্যাকেজে অপারেশনের কথা থাকলেও বিল ধরিয়ে দেওয়া হয় প্রায় ছয় লাখ টাকার। (ইত্তেফাক, ০৯ জানুয়ারি ২০২৪)।

প্রশ্ন হলো, এই মৃত্যুটিকে দেশের চিকিৎসা খাতেরে একটি ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ হিসেবে দেখা হবে নাকি বছরের পর বছর ধরে এই খাতে যে নৈরাজ্য, যে অপেশাদারি এবং দুর্নীতির কালো ছায়া কারেন্ট জালের মতো বিস্তার করে আছে, এই মৃত্যু তারই বাইপ্রোডাক্ট?

এরকম বাস্তবতায় সরকারের নতুন স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ডা. সামন্ত লাল সেন বলেছেন, ‘সুযোগটা আমার জন্য আশ্চর্যজনক। কিছুক্ষণ আগে জানতে পারলাম আমাকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সামনের দিনগুলোতে কীভাবে কী করবো, তা ঠিক করার আগে আমাকে মন্ত্রণালয়ে যেতে হবে। তারপর আমি জানাতে পারবো, কীভাবে কী কাজ সামনের দিনগুলোতে করবো।’ (বাংলা ট্রিবিউন, ১১ জানুয়ারি ২০২৪)।

প্রসঙ্গত, ডা. সামন্ত লাল সেন বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারিতে দেশের পরিচিত মুখ। আগে তিনি শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের প্রধান সমন্বয়ক ছিলেন। বলাই বাহুল্য, ঢাকা মেডিক্যালের একটি ইউনিট যে এখন একটি বিরাট ইনস্টিটিউট, তার নেপথ্য কারিগর এই সামন্ত লাল সেন। ৭৫ বছর বয়সেও যেভাবে এখনও তিনি অগ্নিদগ্ধ মানুষের চিকিৎসায় ছুটে যান; কোনও দুর্ঘটনায় বার্ন ইনস্টিটিউটে দগ্ধ মানুষের সংখ্যা বেড়ে গেলে এই প্রবীণ চিকিৎসক যেভাবে নিজ হাতে তাদের চিকিৎসনা দেন—সেটি আমাদের আশাবাদী করে। অনুপ্রাণিত করে।

প্রশ্ন হলো, এরকম একজন চিকিৎসক স্বাস্থ্যমন্ত্রী হয়েছেন বলেই কি দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বদলে যাবে? যে ঘটনায় শিশু আয়ানের মৃত্যু হলো, এই ধরনের ঘটনা যেসব কারণে ঘটে, তিনি কি সেই সিস্টেম পরিবর্তন করতে পারবেন?

বাংলাদেশের চিকিৎসা খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা সম্ভবত চিকিৎসকদের ওপর মানুষের অনাস্থা বা অবিশ্বাস—যেটি বছরের পর বছর ধরে নানা ঘটনায় তৈরি হয়েছে। বলাই হয়, মানুষ সবচেয়ে বেশি প্রতারিত হয় বা ঠকে বেসরকারি হাসপাতালে জটিল কোনও রোগের চিকিৎসা করাতে গিয়ে। এমনকি সরকারি হাসপাতালেও উপযুক্ত চিকিৎসা না পেয়ে মৃত্যু কিংবা গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গহানির ঘটনাও কম নয়।

ধরা যাক হার্টে রিং পরানো। অপারেশন থিয়েটারে আপনার বাবা, মা কিংবা কোনও প্রিয়জন। এনজিওগ্রাম করার পরে চিকিৎসক জানালনে হার্টে রিং পরাবেন। বেসরকারি হাসপাতাল তো বটেই, সরকারি হাসপাতালেও রিং পরাতে অনেক টাকা লাগে। ডাক্তার আপনাকে বললেন যে রোগীর হার্টে এক বা একাধিক ব্লক আছে। অতএব রিং না পরালে তার জীবন সংকটে পড়বে। আপনার আমার আশেপাশে এরকম মানুষের সংখ্যা অগণিত, যারা তাদের প্রিয়জনের হার্টের রিং পরানোর জন্য জায়গা-জমিও বিক্রি করেছেন। কিন্তু লাখ লাখ টাকা দিয়ে হার্টে রিং পরানোর কয়েক মাস পরেও কি অগণিত মানুষের মৃত্যু হয়নি? আদৌ তার হার্টে রিং পরানো হয়েছে কিনা কিংবা যেই দামের রিং পরানোর কথা ছিল, সেটি পরানো হয়েছে কিনা—এটা আপনি কীভাবে প্রমাণ করবেন? কেউ কি এটা প্রমাণ করতে যায়? মৃত্যুর পরে কেউ কি তার প্রিয়জনের বুক চিরে দেখতে চায় যে হার্টে সত্যিই রিং পরানো হয়েছিল কিনা? কেউ দেখে না। কারণ এটা বিশ্বাসের বিষয়। একজন রোগী তার ডাক্তারকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করেন এবং অনেক সময় এই বিশ্বাসের সুযোগ নেন আমাদের চিকিৎসকরা, হাসপাতালের মালিকরা।

শুধু হার্ট নয়, অন্য আরও অনেক জটিল রোগ, বিশেষ করে কিনডি ডায়ালাইসিস করাতে গিয়ে কত শত পরিবার নিঃস্ব হয়েছে, তা আপনি আপনার আশেপাশে খোঁজ নিলেই জানতে পারবেন। অসংখ্য মানুষের সারা জীবনের সঞ্চয় শেষ হয়ে গেছে একজনের চিকিৎসা করাতে গিয়ে। কিন্তু তাতেও শেষরক্ষা হয়নি। যখন টাকা ফুরিয়ে গেছে তারপরে ওই রোগীরও প্রাণপ্রদীপ নিভে গেছে। এরকম লোকের সংখ্যা অগণিত।

প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে লাখ লাখ মানুষ ভারত-থাইল্যান্ড-সিঙ্গাপুরসহ নানা দেশে চিকিৎসার জন্য যান। কেন? যে দেশে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে পারে, যে দেশ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সারা পৃথিবীতে এখন রোলমডেল, সেই দেশের মানুষ চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাবেন কেন? সেই দেশের ব্যবসায়ী এমনকি নীতিনির্ধারকরাও কেন বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা নেন? দেশের চিকিৎসায় তাদের ভরসা নেই? কেন নেই? নতুন স্বাস্থ্যমন্ত্রী এই প্রশ্নের উত্তর জানেন। কিন্তু তিনি কী করবেন বা করতে পারবেন?

দেশের চিকিৎসা খাত কে নিয়ন্ত্রণ করে, সরকার না ওষুধ কোম্পানিগুলো? এটি খুব তিক্ত প্রশ্ন। কিন্তু এর উত্তর ডা. সামন্ত লাল সেনও জানেন। হাসপাতালের ভেতরে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের দৌরাত্ম্যও নতুন কোনও খবর নয়। ডাক্তারের চেম্বার থেকে বের হলেই রোগীর হাতে থাকা প্রেসক্রিপশন দেখার ঘটনা বন্ধ হচ্ছে না। অথচ প্রেসক্রিপশন একজন রোগীর অতি গোপনীয় জিনিস। এটা দেখা অনৈতিক শুধু নয়, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার লঙ্ঘনহেতু এটি ফৌজদারি অপরাধও বটে। অথচ এই অপরাধ বন্ধের কোনও উদ্যোগ নেই। কেন তারা রোগীর প্রেসক্রিপশন দেখতে চান? তারা দেখতে চান ডাক্তার মহাশয় তাদের কোম্পানির ওষুধ লিখেছেন কিনা—যে কোম্পানির কাছ থেকে তারা নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা পান। অথচ একটি পরিপত্র জারি করে কিংবা শুধুমাত্র মৌখিক আদেশ দিয়েই প্রেসক্রিপশন দেখা বন্ধ করে দেওয়া সম্ভব। কিন্তু এটা বন্ধ হচ্ছে না। ডা. সামন্ত লাল সেন কি দায়িত্ব গ্রহণের পরেই এটা বন্ধের একটা আদেশ জারি করতে পারেন?

ঘুম থেকে ওঠার পরে রাতে ঘুমানোর আগ পর্যন্ত যাপিত জীবনের প্রয়োজনীয় সকল জিনিসপত্র, ঘরের আসবাব, বিলাসদ্রব্য, বিদেশ ভ্রমণের টিকিট, দেশে-বিদেশে দামি রিসোর্টে অবকাশ যাপনসহ আরও যেসব সুযোগ-সুবিধা চিকিৎসকদের বিরাট অংশ ওষুধ কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে গ্রহণ করেন, সেটি কি বন্ধ করা একজন স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পক্ষে সম্ভব? আর চিকিৎসকরা যখন ওষুধ কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে এই ধরনের সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করবেন, তখন তারা কি তাদের রোগীদের প্রেসক্রিপশনের ছবি তোলার বিরুদ্ধে নৈতিকভাবে দাঁড়াতে পারেন কিংবা যেসব কোম্পানির কাছ থেকে তারা সুবিধা নেন, সেইসব কোম্পানির ওষুধ খুব প্রয়োজন ছাড়াও কি তারা লিখতে বাধ্য হন না? ডাক্তাররা রোগীর সমস্যা অনুযায়ী ওষুধ লিখবেন, এটিই স্বভাবিক। কিন্তু যতটুকু প্রয়োজন, যতগুলো প্রয়োজন, তার বাইরেও কি তারা রোগীদের অনেক ওষুধ খেতে বাধ্য করেন না? তারা ওষুধ কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে সুবিধা না নিতেন তাহলে তারা কি এইসব অপ্রয়োজনীয় ওষুধ লিখতেন? এ বিষয়ে নতুন স্বাস্থ্যমন্ত্রী কী করবেন বা করতে পারবেন?

ওষুদের দাম ও মান নিয়ে গণমাধ্যমে খুব বেশি রিপোর্ট হয় না। কারণ অনেক বড় বড় ওষুধ কোম্পানির মালিক একইসঙ্গে গণমাধ্যমপ্রতিষ্ঠানেরও মালিক। তাদের অনেক ক্ষমতা। ফলে অর্থনীতি ও অপরাধের নানা বিষয়ে অনেক অনুসন্ধানী রিপোর্ট হলেও ওষুধের দাম ও মান এবং ওষুধ কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে ডাক্তারদের অনৈতিক সুধিা গ্রহণ বিষয়ে খুব বেশি সংবাদ ও বিশ্লেষণ চোখে পড়ে না। কালেভদ্রে দুয়েকটি রিপোর্ট হলে তা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় তোলপাড় হয়। এটুকুই। এগুলো বন্ধে কোনও সরকার বড় কোনও উদ্যোগ নিয়েছে, এ কথা বলার সুযোগ নেই। ডা. সামন্ত লাল সেন কি এই প্যান্ডোরার বাক্সে হাত দিতে পারবেন?

একজন নীতিবান ও সৎ মানুষ হিসেবে এই ইচ্ছেটা হয়তো তার মনেও আছে। চিকিৎসা খাতের কোথায় কোথায় অসুখ, সেটি তিনি আর দশজন মানুষের চেয়ে অনেক ভালো জানেন বোঝেন। এমনকি বিগত দিনে যারা স্বাস্থ্যমন্ত্রী হয়েছেন, তাদের অনেকের চেয়েই এই খাতের অনিয়ম দুর্নীতি ও নৈরাজ্য সম্পর্কে তিনি অনেক বেশি জানেন। কিন্তু তিনি একা কী করবেন?

চিকিৎসকদের সংগঠন, তার প্রশাসন এবং স্বাস্থ্য খাত নিয়ন্ত্রণকারী রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা যদি তাকে সহযোগিতা না করেন; এই খাতের অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধে যদি তারা সত্যিই আন্তরিক না হন, একা স্বাস্থ্যমন্ত্রী কী করবেন? যেখানেই হাত দেবেন, সেখানেই দেখবেন কোনও না কোনও প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী তাকে চোখ রাঙাচ্ছে। তিনি হয়তো সেই চোখ রাঙানি উপেক্ষা করবেন। কিন্তু উপেক্ষা করে কাজটি কি শেষ পর্যন্ত করতে পারবেন বা পুরো সিস্টেম কি তাকে সেই কাজটি করতে দেবে?

তিনি যেহেতু ব্যক্তিজীবনে একজন সৎ মানুষ হিসেবে পরিচিত, ফলে এটি বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে তিনি অর্থের কাছে নিকেজে বিকিয়ে দেবেন না। কিন্তু না বিকিয়েই বা তিনি কতক্ষণ টিকে থাকবেন? নাকি টিকতে না পেরে দায়িত্ব ছেড়ে দেবেন? এটি চূড়ান্ত পর্যায়ের হতাশার কথা। আমরা বরং আশাবাদী হতে চাই এ কারণে যে, রাষ্ট্র চাইলেই যে যেকোনও বড় সংকট বা দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত সমস্যারও সমাধান হতে পারে, তার বড় উদাহরণ ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর দখল। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা ছিল বলে বুড়িগঙ্গার তীর থেকে অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তির স্থাপনা গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে—একসময় যেটি অনেকের কাছেই ছিল স্বপ্নের মতো।

বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতা ছাড়া পদ্মা সেতুর মতো অব্কাঠামোও গড়ে তোলা গেছে। নানা সমালোচনার মুখে মেট্রোরেল এখন বাস্তব সত্য। নানা খাতেই পরিবর্তনগুলো দৃশ্যমান। অতএব রাষ্ট্র যদি চায়, সরকারের যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে, তাহলে স্বাস্থ্য খাতের নৈরাজ্য বন্ধ করা খুব কঠিন নয়।

আমরা অনেকে হয়তো নতুন স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছ থেকে চমক প্রত্যাশা করি। কিন্তু চমক দেখানো কোনও কাজের কথা নয়। চমক দেখিয়ে গণমাধ্যমের শিরোনাম বা সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া সহজ। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এইসব চমকের কোনও প্রভাব থাকে না। কিছুদিন পরে মানুষ এইসব ভুলে যায়। অতএব নতুন স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে আমরা কোনও চমক বা ম্যাজিক প্রত্যাশা করি না। আমরা চাই তিনি ধীরে ধীরে এই খাতের সমস্যাগুলো সমাধানে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কাজ করবেন। ওষুধ কোম্পানির কারখানায় অভিযান চালিয়ে বন্ধ করে দেওয়া; প্রাইভেট হাসপাতাল ক্লিনিকে অভিযান চালিয়ে বন্ধ করে দেওয়ার সংবাদমূল্য অনেক। মানুষকে এটা বোঝানোও সহজ যে নতুন মন্ত্রী দারুণ কাজ করছেন। কিন্তু এর মধ্যে দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কী উন্নতি হবে? অতএব প্রয়োজন নীতি ঠিক করা এবং যেখানে যেখানে প্রয়োজন নীতিগুলোর সংশোধন করা।

সরকারের কাজ হলো মানুষের জীবনমান সহজ করতে জনবান্ধব নীতি ও পরিকল্পনা গ্রহণ করা এবং সময়ে সময়ে সেই নীতি ও পরিকল্পনা সংশোধন করা। স্বাস্থ্য খাতের সমস্যাগুলো আমাদের চেয়ে অনেক ভালো জানেন সামন্ত লাল সেন। অতএব তিনি যদি শারীরিকভাবে সুস্থ থাকেন এবং পাঁচ বছর এই পদে থাকতে পারেন, তাহলে তার উচিত হবে একটি জনবান্ধব স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার শুভসূচনা করা।

পাঁচ বছরেই দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা বদলে যাবে, কিংবা তিনি আশ্চর্যজনকভাবে সবকিছু বদলে ফেলবেন, সেটি প্রত্যাশা করা উচিত নয়। কিন্তু তিনি অন্তত যদি শুরুটা করতে পারেন এবং যেসব সমস্যার সমাধান করা দ্রুতই সম্ভব, সেখানে যদি তিনি হাত দেন; সরকারি হাসপাতালগুলোর অপারেশন থিয়েটার ও পরীক্ষা নিরীক্ষার ল্যাবগুলো যদি চালু রাখতে বাধ্য করেন; খুব জরুরি ও জটিল রোগ ছাড়া মানুষকে যাতে জেলা বা বিভাগীয় শহর থেকে ঢাকায় আসতে না হয়, সেজন্য স্থানীয় পর্যায়ের হাসপাতালের বিদ্যমান অবকাঠামো সচল রেখে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দিয়ে সেগুলো কার্যকর রাখতে পারেন, তাতেও চিকিৎসা খাতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে। এর জন্য অনেক বেশি বাজেট লাগে না। শুধু আন্তরিকতা এবং সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছাই যথেষ্ট। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকরা যদি ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক স্বার্থটা একটু কম দেখে মানুষের সেবাকেই জীবনের ব্রত হিসেবে নিতে পারেন, তাহলে অর্ধেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

বেসরকারি হাসপাতালগুলো ব্যবসা করবে, কিন্তু তাদের কাছে ব্যবসার চেয়ে মানুষকে সেবা দেওয়াটা যদি গুরুত্বপূর্ণ না হয়; রোগী ভর্তি হলেই তারা যদি প্রতি ঘণ্টায় টাকার হিসাব করতে থাকে; ১০ হাজার টাকার চুক্তিতে খতনার জন্য ভর্তি করিয়ে যদি ৬ লাখ টাকার বিল ধরিয়ে দেয়; আইসিইউর বিল বাড়ানোর জন্য যদি বিনা প্রয়োজনেও রোগীকে সেখানে ভর্তি করে রাখে অথবা মৃত্যুর পরেও আইসিইউতে রেখে দেয়—তাহলে সেইসব হাসপাতালকে আদৌ হাসপাতাল বলার সুযোগ নেই। অতএব ডা. সামন্ত লাল এইসব নৈরাজ্য বন্ধে যদি কিছু করতে পারেন, সেটি হবে তার চিকিৎসক জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য। আমরা তার সাফল্য কামনা করি। আমরা চাই না স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে তিনি ব্যর্থ হন।

গত কয়েক বছর ধরে, বিশেষ করে করোনা শুরুর পর থেকে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে যেসব বিতর্ক ও সমালোচনা হয়েছে, সেইসব বিতর্ক ও সমালোচনার মুখে ডা. সামন্ত লাল সেনের মতো একজন মানুষকেও পড়তে হবে না—এই প্রত্যাশা।

লেখক: কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর, নেক্সাস টেলিভিশন।

 

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
নারিনকে ছাপিয়ে বাটলার ঝড়ে রাজস্থানের অবিশ্বাস্য জয়
নারিনকে ছাপিয়ে বাটলার ঝড়ে রাজস্থানের অবিশ্বাস্য জয়
সুনামগঞ্জে বজ্রপাতে দুই কৃষকের মৃত্যু
সুনামগঞ্জে বজ্রপাতে দুই কৃষকের মৃত্যু
ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস আজ
ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস আজ
অপরাধে জড়িয়ে পড়া শিশু-কিশোরদের সংশোধনের উপায় কী
অপরাধে জড়িয়ে পড়া শিশু-কিশোরদের সংশোধনের উপায় কী
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ