X
শনিবার, ২৫ মে ২০২৪
১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

গরু অথবা মাংস আমদানির বিকল্প কী?

আমীন আল রশীদ
১৮ এপ্রিল ২০২৪, ১৭:২২আপডেট : ১৮ এপ্রিল ২০২৪, ১৭:২২

ঈদের আগের দিন দুপুরের ঘটনা। ঝালকাঠি শহরের পশ্চিম প্রান্তে গাবখান সেতুর নিচে মহাসড়কের পাশেই একটি বড়সড় গরু জবাই হলো। তার কিছু সময় আগে থেকেই সেখানে লোকজন জড়ো হচ্ছিলেন। জবাই শেষে মাংস বিক্রি শুরু হলো ৮০০ টাকা কেজি দরে।

ঘণ্টাখানেক সেখানে দাঁড়িয়ে দেখার চেষ্টা করলাম যে দাম নিয়ে কেউ প্রতিবাদ করেন কিনা। দুয়েকজন দাম নিয়ে সামান্য প্রশ্ন তুললেও ৮০০ টাকা কেজির কারণে কেউ মাংস না কিনে ফিরে গেছেন, সেটি চোখে পড়লো না এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যে বিক্রি শেষ হয়ে গেলো। অধিকাংশই এক থেকে তিন কেজি এবং কেউ কেউ পাঁচ ছয় কেজিও কিনলেন। ভিড় ঠেলে মাংস কিনতে সক্ষম হওয়ার পরে অনেকের অভিব্যক্তি দেখে মনে হলো, তিনি বড় কোনও সাফল্য অর্জন করলেন।

একই দিন ঝালকাঠি শহরের মূল বাজারের চিত্রটা কেমন ছিল? সেখানেও মাংস বিক্রি হচ্ছিল ৮০০ টাকা কেজি দরে। কিন্তু হঠাৎ সেখানে ম্যাজিস্ট্রেট অভিযানে গেলে সঙ্গে সঙ্গে বিক্রেতারা ৬৭০ টাকা কেজি লেখা সাইনবোর্ড দোকানের সামনে টানিয়ে দেন। যতক্ষণ ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন ততক্ষণ ৬৭০ টাকা কেজি দরেই গরুর মাংস বিক্রি হয়েছে। কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেট চলে যাওয়ার পরে আবারও ৮০০ টাকায়। প্রশ্ন হলো, ৬৭০ টাকায় যারা কিনেছেন তারা কি খুব জিতেছেন? ৬৭০ টাকায় মাংস কিনেছেন এরকম দুয়েকজন ক্রেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিকেজি মাংসে হাড় ও চর্বির পরিমাণ ছিল অনেক বেশি। অর্থাৎ ম্যাজিস্ট্রেটের ভয়ে দোকানিরা ৬৭০ টাকা কেজিতে মাংস বিক্রি করলেও সেখানে মূলত ক্রেতাদের ঠকানো হয়।

এবার দেখা যাক ঈদের দিন সকালের চিত্র। ঈদের নামাজের পরে চলে যাই নতুন কলেজ মোড়ে। এক বন্ধু জানালেন সেখানে ভালো ষাঁড় গরু জবাই হয়েছে। গিয়ে দেখা গেলো সেখানেও মোটামুটি ক্রেতার জটলা এবং গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৮০০ টাকা কেজিতেই। কিন্তু এখানের চিত্রটা একটু ভিন্ন। কেননা ৮০০ টাকা কেজিতে কেনার পরেও কোনও কোনও ক্রেতা অভিযোগ করলেন হাড় ও চর্বি বেশি দেওয়া হয়েছে। এ কারণে একজন বয়স্ক লোককে দেখা গেলো তিন কেজি মাংসের দাম দেওয়ার পরও মাংস না নিয়ে টাকা ফেরত নিয়ে গেছেন। তবে ওই দোকানেও কোনও মাংস অবিক্রীত ছিল না। বরং সেখানেও অল্প সময়ের মধ্যে বিক্রি শেষ হয়ে যায় এবং দাম নিয়ে আর কোনও ক্রেতা প্রতিবাদ করেছেন কিংবা দাম বেশি বলে না কিনে চলে গেছেন—তা দেখা যায়নি।

গরুর মাংস নিয়ে সারা দেশের চিত্র কমবেশি এরকমই। এখন সাড়ে সাতশ’ টাকার নিচে কোথাও গরুর মাংস বিক্রি হয় কিনা সন্দেহ—যা আমাদের প্রতিবেশী যেকোনও দেশের চেয়ে অনেক বেশি। যে পাকিস্তানের মানুষ বাংলাদেশিদের চেয়েও বেশি গরুর মাংস খায়, সেখানেও গরুর মাংসের কেজি বাংলাদেশের চেয়ে অনেক কম।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের মহাপরিচালক এ এইচ এম সফিকুজ্জামানেরও প্রশ্ন, ভারত-পাকিস্তানে গরুর মাংসের দাম কম হলে বাংলাদেশে এত বেশি হবে কেন? গত বছরের ৩ ডিসেম্বর রাজধানীতে এক সেমিনারে তিনি বলেন, ভারত-পাকিস্তান সাড়ে ৪০০ টাকায় গরুর মাংস পাওয়া যায়। সুতরাং বাংলাদেশে গরুর মাংসের কেজি কোনোভাবেই ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা হতে পারে না, তাতে ব্যবসায়ীরা যতই যুক্তি দেন না কেন। (চ্যানেল টোয়েন্টিফোর, ০৩ ডিসেম্বর ২০২৩)।

বাংলাদেশে কী কারণে গরুর মাংসের দাম এত বেশি? মাংস বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বললে মনে হবে গরুর মাংস তারা যে ৮০০ টাকায় বিক্রি করেন, তাতেও খুব বেশি লাভ হয় না! তাদের প্রধান যুক্তি গরুর দাম বৃদ্ধি। আর গরু বিক্রেতাদের দাবি, খামার বা প্রান্তিক পর্যায় থেকে হাটে গরু নিয়ে আসার জন্য পণ্য পরিবহন ভাড়া বেড়েছে অনেক। শ্রমিকের মজুরিও বাড়তি। তার ওপর আনার পথে নানান জায়গায় চাঁদা এবং হাটের ইজারা দিতে হয়। গরুর খামারি ও প্রান্তিক চাষিদের অভিযোগ, গোখাদ্যের দাম বেড়েছে অনেক। ফলে গরু লালন-পালন করতে গিয়ে যে খরচ হয়, তা অনেক সময় উঠতে চায় না। তার মানে গরু লালন-পালনকারী থেকে শুরু করে খুচরা পর্যায়ের বিক্রেতা—প্রত্যেকের কথাতেই যুক্তি আছে। কিন্তু যুক্তি যতই থাকুক, দিন শেষে দামের ভিকটিম সাধারণ মানুষ।

এখন সারা দেশেই বড় বড় ডেইরি ফার্ম গড়ে উঠেছে। দেশীয় উদ্যোক্তাদের সহায়তা দিতে সরকারের নানান উদ্যোগও রয়েছে। তাতে ধারণা করা হয়েছিল যে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন দিয়েই দেশের মানুষের মাংস ও দুধের চাহিদা তো মিটবেই, সেইসঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক বাজার হওয়ায় দামও কমে আসবে। কিন্তু বাস্তবে হয়েছে উল্টো। গরুর মাংসের দাম গত কয়েক বছরে অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে—যা অন্য কোনও খাদ্যপণ্যের বেলায় ঘটেনি। অথচ সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের তথ্য বলছে, দেশে যে পরিমাণ মাংসের চাহিদা, উৎপাদন তার চেয়ে বেশি। অর্থনীতির সহজ সূত্র অনুযায়ী, চাহিদার তুলনায় উৎপাদন ও সরবরাহ বেশি থাকলে দাম কমবে। কিন্তু গরুর মাংসের বাজারে অর্থনীতির এই সহজ সূত্রটি কেন ব্যর্থ হয়ে যায়, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি।

দেশীয় খামারিদের স্বার্থ রক্ষায় সরকার গরু অথবা মাংস আমদানি নিরুৎসাহিত করে। কিন্তু দেশীয় খামারিদের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে যে কোটি কোটি মানুষকে গরুর মাংস খাওয়া থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে, সেটিও নির্মম বাস্তবতা।

অস্বীকার করার সুযোগ নেই, গরুর মাংস বাঙালি মুসলমানের সবচেয়ে পছন্দের খাবার। ধর্মীয় বিধিনিষেধ এবং স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে কিছু মানুষ গরুর মাংস এড়িয়ে চললেও অধিকাংশ মানুষই গরুর মাংস পছন্দ করেন এবং অন্তত সপ্তাহে একদিন গরুর মাংস খেতে চান।

স্মরণ করা যেতে পারে, যখন দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা খুব ভালো ছিল না, তখনও সাধারণ চাকরিজীবী তথা স্বল্প আয়ের মানুষও সপ্তাহে একদিন গরুর মাংস খেতে পেরেছেন। অথচ গরুর মাংস এখন নিম্ন-মধ্যবিত্তেরও নাগালের বাইরে। যেহেতু ১৮ কোটি লোকের দেশ এবং এখানে দুই কোটি মানুষের পকেটেও যদি অনেক টাকা থাকে তারপরও দোকানে কোনও পণ্য অবিক্রীত থাকবে না। আর সে কারণেই গরুর মাংসের কেজি ৮০০ টাকা হলেও তা বিক্রি হয়ে যায়। কিন্তু কিনতে পারার চেয়ে কিনতে না পারা মানুষের সংখ্যাই যে বেশি, তাতেও সন্দেহ নেই।

গরুর মাংস নিয়ে এই দীর্ঘশ্বাস ও সাংঘর্ষিক বাস্তবতায় সরকারের করণীয় কী? সরকার শুধু দেশীয় খামারিদের স্বার্থ রক্ষার কথা বলে গরু অথবা মাংস আমদানি নিরুৎসাহিত করবে নাকি দেশীয় খামারিদের স্বার্থ যাতে সংরক্ষিত থাকে এবং গরুর মাংসের দামটিও সাধারণ মানুষের নাগালের ভেতরে থাকে, সেটি নিশ্চিত করবে?

জনকল্যাণমুখী সরকার ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের স্বার্থই দেখবে। গোখাদ্যের দাম কেন বেড়ে গেলো; এখানে কোনও সিন্ডিকেট আছে কিনা, সেটি খতিয়ে দেখবে; থাকলে সেই সিন্ডিকেট ভেঙে দেবে; পরিবহন খরচ কেন বেড়ে গেলো, সেখানে সরকারের নীতির কোনও সমস্যা আছে কিনা, সেটি দেখতে হবে; পথে পথে চাঁদাবাজি হয় এটি অস্বীকার করার কোনও সুযোগ নেই। কারা এই চাঁদাবাজি করে সেটি সরকারের বিভিন্ন বাহিনী তো বটেই, সাধারণ মানুষও জানে। কিন্তু সড়ক, হাটবাজার ও ফুটপাতে চাঁদাবাজি বন্ধ হয় না। কারণ এই চাঁদাবাজরা মূলত রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়াতেই থাকে। তাদের নানাবিধ রাজনৈতিক কাজে ব্যবহার করা হয় বলে এই ধরনের চাঁদাবাজির সুযোগ দিয়ে তাদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়। সুতরাং ‍সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, এই ধরনের চাঁদাবাজি চলতে দেবে নাকি তাদের জন্য অন্য কোনও সম্মানজনক কাজের ব্যবস্থা করবে? মুশকিল হলো, সড়ক, হাটবাজার ও ফুটপাতের এই চাঁদাবাজির ভাগ অনেক বড় বড় রাজনীতিকের কাছে চলে যায় বলেও অভিযোগ আছে। সুতরাং এটি আদৌ বন্ধ হবে কিনা, সেটি বিরাট প্রশ্ন।

মুক্তবাজার অর্থনীতিতে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রধান কৌশল হলো প্রতিযোগিতা। অতএব, গরুর মাংসের দামও কেজিতে দুই থেকে তিনশ’ টাকা কমানো সম্ভব যদি গরু অথবা মাংস আমদানি করা হয়। সম্প্রতি ব্রাজিলও বাংলাদেশে গরুর মাংস রফতানির প্রস্তাব দিয়েছে। তবে অত দূরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রতিবেশী ভারত থেকেই প্রচুর গরু আমদানি করা সম্ভব। এখনও অবৈধ পথে কিছু গরু আসে। কিন্তু এটাকে বৈধ করে দিলেই গরুর মাংসের দাম অনেক কমে আসবে। অর্থাৎ সরকারকে ক্রেতার স্বার্থ যেমন দেখতে হবে, তেমনি বিক্রেতারাও যাতে ক্ষতির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

আবার নানান অজুহাত দিয়ে ব্যবসায়ীরা যাতে সিন্ডিকেট গড়ে তুলে ভোক্তাদের ঠকাতে না পারে সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। সেজন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোকে শক্তিশালী করার বিকল্প নেই।

গবাদিপশু লালন-পালনের খরচ যে বেড়ে গেছে, তাতে সন্দেহ নেই। অতএব, গোখাদ্য এবং অন্যান্য ওষুধের বাজার যারা নিয়ন্ত্রণ করেন, তাদের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ আছে কিনা—সেটিও বিরাট প্রশ্ন।

লেখক: সাংবাদিক

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
ইউনিসেফ ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিলের পরবর্তী চেয়ার মুহাম্মদ আজিজ খান
ইউনিসেফ ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিলের পরবর্তী চেয়ার মুহাম্মদ আজিজ খান
বেসরকারি মেডিক্যালের মানোন্নয়নের তাগিদ
বেসরকারি মেডিক্যালের মানোন্নয়নের তাগিদ
ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেওয়ার অপেক্ষায় নিম্নচাপ, সতর্ক মোংলা বন্দর
ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেওয়ার অপেক্ষায় নিম্নচাপ, সতর্ক মোংলা বন্দর
পালিয়ে যাওয়া রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা দেওয়ার আহ্বান জাতিসংঘের
পালিয়ে যাওয়া রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা দেওয়ার আহ্বান জাতিসংঘের
সর্বশেষসর্বাধিক