ধর্মীয় অনুভূতি’র ‘মালিকানা’ কার?

জোবাইদা নাসরীন
১৪ ডিসেম্বর ২০২৫, ১৮:২০আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫, ১৮:২০

‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ কিংবা ‘ধর্ম অবমাননা’র অভিযোগ বাংলাদেশে মোটেই নতুন নয় বরং বিভিন্ন ফোরাম থেকে চর্চিত বিষয়। এই অভিযোগে অতীতে বিভিন্ন সরকারের সময় যেমন অনেকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, অনেককেই গ্রেফতার করা হয়েছে, আবার কারও কারও ক্ষেত্রে দেশ ত‍্যাগে বাধ‍্য করার মতো ঘটনাও ঘটেছে। সেই সত্তরের দশকেই কবি দাউদ হায়দারকে দেশত‍্যাগ করতে হয়েছে এই অভিযোগে। তিনি আর দেশে ফিরতে পারেননি। তসলিমা নাসরিনের ক্ষেত্রেও হয়েছে আরও ভয়বাহ অবস্থা। কিন্তু সব সরকারই এসব ক্ষেত্রে অভিযোগকারীদের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার মধ‍্য দিয়ে আসলে রাজনীতিতে ধর্মকে ব‍্যবহারের পথকে আরও প্রশস্ত করেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বাউল শিল্পী আবুল সরকারসহ অনেকের বিরুদ্ধেই ‘ধর্ম অবমাননা’র মামলা করা হয়েছে। মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে  তিনি ‘ইসলাম ধর্মের বিশ্বাসের অবমাননা করে এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার উদ্দেশ্যে কটূক্তি করে অবমাননামূলক অট্টহাসি দিয়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে উসকানি দেয়ার অপরাধ’ করেছেন। (বিবিসি  বাংলা, ২১ নভেম্বর ২০২৫)।

গণমাধ‍্যম সূত্রে আরও জানা যায় যে গত ২৩ নভেম্বর তার মুক্তির দাবিতে হওয়া মানববন্ধনে হামলা চালায় ‘মানিকগঞ্জ জেলার সর্বস্তরের আলেম-ওলামা ও তৌহিদি জনতা’। এই হামলায় তিন ভক্ত-অনুরাগীসহ মোট চারজন আহত হয়েছেন। এর কয়েকদিন পরেই ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে মামলা হয় ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী মায়ের ডাকের সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম তুলির বিরুদ্ধে। তার অপরাধ তিনি ইসলাম ধর্মে বিয়ে ইস্যু নিয়ে অবমাননাকর বক্তব্য দিয়েছেন। কেউ কেউ বলছেন তিনি ইসলাম ধর্মকে অপমান করেছেন। শুধু তাই নয় এই বক্তব‍্যের মধ‍্য দিয়ে মুসলমানদের ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাত করেছেন যা বাংলাদেশের দণ্ডবিধির ২৯৫ (ক) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

গত ২৮ এপ্রিল নজরুল ইসলাম নামের একজন দৈনিক পত্রিকা প্রথম আলোর সম্পাদক, প্রকাশক ও গ্রাফিক্স ডিজাইনারের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন। এর হিসেবে উল্লেখিত হয়েছিল যে সে পত্রিকায় প্রকাশিত ঈদ শুভেচ্ছা কার্টুনে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতেই ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে কলামিস্ট,  সংগঠক ও শিল্পী কল্যাণ ট্রাস্টি বোর্ডের ট্রাস্টি নাহিদ হাসানের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করা হয়।  

গত দেড় দশক ধরে হিসেব করলে দেখা যাবে অনেকগুলোই মামলাই হয়েছে ‘ধর্ম অবমাননা’র অভিযোগে। ২০১৩ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে এই একটি অভিযোগেই ১৮ জন ব্লগার, অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট, প্রকাশক, লেখককে হত‍্যা করা হয়। এর আগে ২০০৪ সালে এই অভিযোগেই একটি গোষ্ঠীর আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ‍্যালয়ের শিক্ষক এবং লেখক অধ‍্যাপক হুমায়ন আজাদ।

‘ধর্ম অবমাননার’ বিষয়টি গত এক দশক জুড়েই বিশেষ একটি কায়দায় অনেক বাংলাদেশে বেশি পরিচিতি লাভ করে এবং সেখান থেকে সূত্রপাত ঘটে সাম্প্রদায়িক হামলার। আর সেটি হলো ফেসবুকে কোনও একজন সংখ‍্যালঘুর নামে ফেক আইডি খুলে সেখান থেকে দেওয়া হয়’ ইসলাম অবমাননার’র পোস্ট। তাতে ক্ষিপ্ত হয়ে হামলা এবং ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়। বেশিরভাগ তদন্তে বের হয়ে আসছে যে, যার নামের ফেসবুকে আইডি থেকে পোস্ট দেওয়া হয়েছে, তিনি হয়তো জানেনও না এমনকি একবার একজন ফেসবুকে পোস্টদাতার তথ‍্য অনুসন্ধান করে জানা গেলে তিনি একজন জেলে এবং তিনি জানেন না কীভাবে অনলাইনে ফেসবুক চালাতে হয়। এখন এই প্রক্রিয়ায় অনেকটাই অনুকরণীয় হয়ে গেছে। প্রায় প্রতিবছরই ফেসবুকে পোস্টে ধর্ম অবমাননার অজুহাতে হামলা করার কায় কারবার চলে।

এখন পর্যন্ত আমরা যা দেখেছি তা হলো এই ধর্ম অবমাননার বিষয়টি নিরীহ কোনও বিষয় নয়। এটি একটি রাজনৈতিক বিষয়।  কেন এমনটি মনে হচ্ছে? কারণ সবার জন‍্য এই ‘ধর্ম অবমাননা’র অভিযোগ কি প্রযোজ‍্য হচ্ছে? কে কার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ তুলছে? আমরা যদি খুব সচেতনতার সাথে এবং যত্ন নিয়ে অভিযোগকারী এবং অভিযুক্তের ক্ষমতা কাঠামো বিশ্লেষণ করি এবং তাদের মধ‍্যকার রাজনৈতিক আদর্শের পার্থক‍্যকে বিবেচনায় আনি তাহলে বিষয়টি অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শুধু তাই নয় কেন তারা এই ধরনের অভিযোগ উত্থাপন করছেন সেটিও দাগবিহীনভাবেই স্বচ্ছ হয়ে ওঠে। আমরা কি সবার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ করি? না করি না। কিন্তু কেন করি না সেই প্রশ্ন কি নিজেদের করেছি কখনও?

পাঠক লক্ষ‍্য করুন, অনেকেই ধর্মকে ব‍্যবহার করে রাজনৈতিক ঘুড়ি ওড়াতে চান। কিন্তু সেগুলো নিয়ে কেন ধর্ম অবমাননার অভিযোগ হয় না? যেমন এই কিছুদিন আগেই গত নভেম্বর মাসে চট্টগ্রাম-১৫ (লোহাগাড়া-সাতকানিয়া আংশিক) আসনে জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত সংসদ সদস‍্য প্রার্থী এবং যিনি কিনা আবার দলের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্যও, সেই শাহজাহান চৌধুরী বলছেন: ‘আল্লাহ তায়ালা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছেন জামায়াতে ইসলামিকে ক্ষমতায় দেবেন’। তার এই বক্তব‍্য ভাইরাল হয়। কিন্তু কেউ এটি নিয়ে মামলা করেনি। বলেনি এটাতেও ধর্মীয় অবমাননা হয়। 

এছাড়া জামায়াতকে ভোট দিলেই বেহেশত নিশ্চিত, এমন বক্তব‍্যও এসেছে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত একজন প্রার্থীর কাছ থেকে। কিন্তু প্রশ্ন হলো এগুলো কোনও বিচারে ধর্ম অবমাননার আওতায় পড়ছে না। তার মানেই হলে ধর্ম অবমাননার বিষয়টি একেবারেই রাজনৈতিক এবং কাউকে রাজনৈতিকভাবে হেয় করতে এটি ব‍্যবহার করা হয়।

আরকেটি প্রশ্ন এখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ, আর তা হলো ধর্মীয় অবমাননা বা ধর্মীয় অনুভূতি কি শুধু মুসলমানদের? আর কারও সেই অনুভূতি নেই, বা থাকতে নেই? কিন্তু সেই অনুভূতিকে কি কখনও আমলে নেওয়া হয়? হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান এক‍্য পরিষদের তথ‍্য অনুযায়ী ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট থেকে এ বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত ১১ মাসে দেশে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর ২ হাজার ৪৪২টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।  তার মধ‍্যে রয়েছে হত্যা, নারী নির্যাতন, ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্মীয় উপাসনালয়ে ভাঙচুর, ধর্ম অবমাননার অভিযোগে গ্রেফতার জোর করে বাড়ি ও ব্যবসা দখল, ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর হামলা এবং আরও রয়েছে  জোর করে পদত্যাগ করানোর মতো ঘটনাও।

এছাড়া গত জুন রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকায় অস্থায়ী দুর্গা মণ্ডপ ভেঙ্গে ফেলা হয়। এর ফলে সেখানে থাকা প্রতিমাগুলোও ভাঙ্গা হয়। পরেরদিন বেলা বারোটার মধ‍্যে মন্দির সরানোর আলটিমেটামও দেওয়া হয়। এর প্রতিবাদ করে মানববন্ধনের আয়োজন করেছিলেন হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের নেতারা। সেই মানববন্ধনের বিরুদ্ধে আবারও আনা হয় ধর্ম অবমাননার অভিযোগ।

শুধু এবারই নয় আমরা প্রায় প্রতিবছরই দেশে কোনও না কোনও স্থানে প্রতিমা ভাংচুরের খবর প্রকাশিত হয়। তখন কিন্তু কেউ বলে না হিন্দু ধর্মের অবমাননা হচ্ছে কিংবা হিন্দুদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা হচ্ছে।

তাই যখনই ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত বা ধর্মীয় অবমাননার বিষয়টি হয় তখনই আমাদের বুঝতে হবে এটি স্পষ্টই একটি ক্ষমতা প্রদর্শণের রাজনীতি এবং ধর্মকে ব‍্যবহার করেই এটি করা হচ্ছে। এবং একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীই এটা করছে। তারা নিজেরা ধর্মকে ব‍্যবহার করে অনেক কিছু বলে, তাতে ধর্মের অবমাননা হয় না, কিন্তু অন‍্যদেরকে ঘায়েল করার জন‍্য এগুলোকে হাজির করা হয় এবং এমন প্রক্রিয়ায় এটি হয় যে তাদের অবমাননা নিয়ে কেউ কথা বলতে না পারে। অর্থাৎ ধর্মীয় বিষয়ে কথা বলার একমাত্র মালিকানা তাদের হাতে রয়েছে এবং এটিকে যেমন খুশী তেমন ব‍্যবহার করতে পারবে।

অন‍্য ধর্মালম্বীরা অনুভূতির দিক থেকে নির্বোধ? তাদের অনুভূতির মাটি চাপা দিতে হয়। কারণ কোনটি অবমাননা হবে আর কোনটি হবে না সেটি ঘোষণা করার একমাত্র ক্ষমতা যেন আমরা দিয়ে রেখেছি শুধুমাত্র কয়েকজনের কাছে।

লেখক: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ‍্যালয়।

ইমেইল: [email protected]

 

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
যেখানে সকালে বারান্দায় এলেই দেখা মেলে জোড়া রংধনুর
যেখানে সকালে বারান্দায় এলেই দেখা মেলে জোড়া রংধনুর
সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের আড়ালে কী
সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের আড়ালে কী
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
সর্বশেষসর্বাধিক